'জীবন চলার পথে গুরু'

 

সংলাপ

 

গত ২৪ ডিসেম্বর ২০১০, শুক্রবার সকাল ১০টায় মিরপুরস্থ জ্যোতি ভবনে সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ আয়োজিত 'জীবন চলার পথে গুরু' বিষয়ক গবেষণা ভিত্তিক বৈঠক হয়েছে বৈঠক পরিচালনা করেন গোলাম মাহমুদ মামুন। লিখিত বক্তব্য দেন যা পাঠ করা হয় তার সারাংশ হলোঃ

 

 

ড. এমদাদুল হক কাজল

 

 

মানুষ শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পারে কিন্তু শিখতে হলে গুরু চাই কোন দিন ক্রিকেট খেলার অনুশীলন না করেও শিক্ষক ক্রিকেট খেলার  নিয়ম-কানুন শেখাতে পারেন কিন্তু খেলা শিখতে হলে এমন একজনের কাছ থেকে শিখতে হয় যিনি পাকা খেলোয়াড় তিনিই গুরু, বা পথপ্রদর্শক

যে কোন প্রতিষ্ঠানে একজন নিয়ন্ত্রক না থাকলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় কারখানায় মালিক না থাকলে শ্রমিকেরা অহেতুক উছিলায় বিদ্রোহ করে মানুষের জীবনও একটা কারখানা এই কারখানার মালিকই গুরু জীবনে গুরুকে প্রতিষ্ঠিত করার সাথে শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়

নিজের বিশৃঙ্খলা ও অস্বাভাবিকতা সম্পর্কে সচেতনতাই গুরু প্রতিষ্ঠার কারণ নিজেকে যিনি পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন তিনি অন্যকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন যিনি তা পারেন তিনিই গুরু। 

শিষ্যের কাছে গুরু, দুগ্ধপুষ্য শিশুর কাছে মায়ের মতো শিশু কত কিছুই না চায়, মা কি তার শিশুকে চাইলেই সব দেন? শিশু জানে না তার জন্য কোন্‌টা ভালো আর কোন্‌টা মন্দ শিশু কান্নাকাটি করে, মা বকুনি দেন, প্রয়োজনে মৃদু প্রহারও করেন কিন্তু তাই বলে কি শিশু মাকে ত্যাগ করতে পারে? মায়ের কাছে শিশু যেভাবে নিজেকে সমর্পন করে গুরুর কাছে শিষ্য সেভাবে নিজেকে সমর্পন করতে না পারলে গুরু মায়ের মতো শিষ্যকে লালন করতে পারেন না

গুরুর কাছ থেকে কি পেলাম এই চিন্তা যে করে সে বণিক, শিষ্য নয় শিষ্য ভাবে কি দিতে পারলাম, কতটুকু দিতে পারলাম? গুরুর সন্তুষ্টি ছাড়া শিষ্য আর কিছু চায় না কোন কিছুর জন্য গুরুকে নয়, গুরুর জন্য যে সবকিছু ছাড়তে প্রস্তুত সেই শিষ্য

শিষ্যের চিন্তা জগতের কেন্দ্রবিন্দুতে গুরুর অবস্থান তা না হলে শিষ্যের মধ্যে গুরুর প্রতি কাতরতা জন্মায় না সকল চিন্তা গুরুচিন্তায় রূপান্তরিত হলেই শিষ্যের রূপান্তর হয় গুরু চিন্তায় মগ্নতাই শান্তি তখন জগতের অন্য কোন চিন্তা চিত্তকে অশান্ত করতে পারে না যে শিষ্য গুরুকে নিয়ে চিন্তা করে গুরু সে শিষ্যকে ভুলে থাকতে পারেন না গুরু চিন্তায় নিমগ্নতা থেকে শুদ্ধতা জন্মে শুদ্ধতায় গুরুর শুভ্রতা পরিস্ফুট হয়

শিষ্যের ধর্ম তার গুরু গুরুর নির্দেশনাকে জীবন চলার পথে রূপায়িত করাই শিষ্যের সাধনা গুরুর নির্দেশনা বাসত্মবায়নে রত থাকাই গুরুর সাথে সংযুক্ত থাকা গুরুর নির্দেশনা বুঝতে শিষ্যের কষ্ট হতে পারে, শিষ্যকে স্মরণে রাখতে হয় যে গুরু কখনো অপ্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন না

 

গুরুর কথা ছাড়া আর কারো কথা কইতে ভালো লাগে না, গুরুর কথা ছাড়া আর কারো কথা শুনতেও ভালো না, ভাবতেও ভালো লাগে না, এই ভাবে প্রতিষ্ঠা পেলে গুরুর সাথে শিষ্যের সম্পর্ক তৈরী হয়

ভক্তের ভক্তিতে গুরু সাড়া না দিয়ে পারেন না গুরুর প্রতি ভক্তিই শিষ্যকে জ্যোর্তিময় করে ভক্তি আসে প্রেম থেকে প্রেমাস্পদের সন্তুষ্টির জন্য প্রেমিক ফকির হয় এটাই ফকিরী ফকিরী হলো - নিজেকে নিঃস্ব করে উজাড় করে দেয়া গুরুর চরণে

প্রেমেই শান্তি, মানব জাতির আরাধ্য ধন শান্তি প্রেমময় অসিত্মত্বের একটা মনসত্মাত্বিক অবস্থা ছাড়া আর কিছু নয়

যে শিষ্য গুরুকে ধারণ করে সে মৃত্যঞ্জয়ী হয়, কারণ সে ধারণ করে আছে মৃত্যুঞ্জয়ী গুরুকে গুরু শিষ্যের কাছে উন্মোচন করেন জীবনের অসীম রহস্যময়তা, হাত ধরে পথ দেখান অনন্তলোকের

অন্ধকারই সৃষ্টি করে রহস্যময়তা গুরু জ্যোর্তিময় গুরুই আঁধার তাড়ানিয়া প্রদীপ তাঁর উপস্থিতি মানেই আলোকবর্তিকা গুরুর আলোতেই ভেতরে আলো জ্বলে, ফলে নিজেকে দেখা যায় তাই গুরুর স্মরণই নিজেকে জানার শ্রেষ্ঠ উপায় যার গুরু নেই, গুরুর আলোতে যার চিন্তাজগত আলোকিত হয়নি সে নিজেকে জানবে কি করে?

গুরুকে পেতে চাইলে শিষ্যের ব্যাকুলতাই যথেষ্ট ব্যাকুলতাই সহজ সরল পথ শিশুর ব্যাকুল ডাকে সাড়া না দিয়ে মা থাকতে পারেন না, গুরুরও সাধ্য নেই শিষ্যের ব্যাকুলতাকে উপেক্ষা করবার

গুরু শিষ্যের প্রকৃতি বুঝে তার শান্তি লাভের পথটি বাৎলে দেন গুরুর ভার যে বহন করে সে শিষ্য একই সাথে গুরুও বহন করেন শিষ্যের ভার

যে শিষ্য গুরুর উপর নির্ভর করে তার জন্য তার গুরুই যথেষ্ট কিন্তু গুরুর উপর নির্ভর করা খুবই কঠিন মানুষ নিরাকার মিথে নির্ভর করতে পারে, মাটির মূর্তিতে নির্ভর করতে পারে কিন্তু তারই মতো দেখতে একজন মানুষের উপর নির্ভর করা, মানুষ হয়ে মানুষের পূজা করা অতি দুরূহ কাজ গুরুর পূজা করতে হলে তাঁকে চিনতে হয় গুরুকে চেনার পথ গুরুই দেখিয়ে দেন

গুরু শিষ্যকে সৃষ্টি করেন তাই গুরুই স্রষ্টা জীবনের রহস্যময়তা উন্মোচনে মানুষকে দ্বীজ হতে হয় অর্থাৎ, দুইবার জন্ম নিতে হয় একবার পিতার ঔরষে, মাতৃগর্ভে দ্বিতীয়বার গুরুগৃহে তাই গুরুই পরম পিতা, দ্যা ফাদার

গুরুর শক্তিতে শক্তিমান হয়েই শিষ্য গুরু হয় যাঁর কাছে যা নেই তিনি তা দিতে পারেন না গুরুর কাছে জ্যোতি আছে বলেই তিনি তা অন্যকে দিতে পারেন

গুরুর কৃপা শিষ্যের দৃষ্টিকে প্রসারিত করে অজ্ঞানতা দূর করে গুরুর কৃপাই শিষ্যের উদ্দীপনা গুরুর চিন্তায় বিভোর থাকলে আত্মোউন্নতির জন্য আর কোন সংগ্রাম করতে হয় না গুরুই তখন আত্মা উন্নতির দায়িত্বও তাঁরই আত্ম উন্নতির সংগ্রাম থেকে মুক্তিই সিদ্ধি

শিষ্য গুরুর মাঝে নয়, গুরুই নিজেকে লীন করেন তাঁর শিষ্যের মাঝে এটাই মহামিলন শুধু শিষ্য গুরু খুঁজে না গুরুও খুঁজেন তাঁর আধার

শিষ্য গুরুর সেবা করবে কি? শিষ্য সেবার কি বোঝে? গুরুই করেন শিষ্যের সেবা গুরুই শিষ্যের সেবক যে শিষ্য নিজের কথা ভাবে না, গুরুকে সেই শিষ্যের কথা ভাবতেই হয়

শিষ্য গুরুর প্রশংসা করে না, গুরুই শিষ্যকে প্রশংসিত করে এই প্রশংসা আমিত্বের আবরণ তৈরি করলে গুরুই তা নিন্দায় পরিণত করেন শিষ্য বিপদে পড়লে গুরু তাকে উদ্ধার করেন কিন্তু আবার গুরুই ইচ্ছে করে শিষ্যকে বিপদে ফেলে দেন গুরুর সৃষ্ট বিপদ শিষ্যের জন্য তাবারুক এই তাবারুক হজম না করতে পারলে শিষ্যের গুরুজ্ঞান হয় না গুরু শিষ্যকে নিয়ে খেলেন গুরুর খেলা যে ধরতে পারে সেই তাঁর শিষ্য হয়ে উঠে

গুরু শিষ্যকে আদব শেখান, কে কতটুকু শিখতে পারছে তারও পরীক্ষা নেন শিষ্যের আদব বিকশিত হয়ে পরিণত হয় ভক্তিতে ভক্তি থেকে মুক্তির দ্বার খুলে শিষ্য প্রবেশ করে গুরুর রহস্যময় জগতে ভক্তিতে শির নত হয় অর্থাৎ, শিষ্য যখন তার শিরে রাখা তথ্যভান্ডারকে গুরুর চরণে সমর্পন করতে পারে তখনই আসে প্রকৃত ভক্তি গুরুর প্রতি ভক্তিতে শিষ্য নিজেকে শূন্য করে যে নিজেকে শূন্য করে গুরু তাকে পূর্ণ করে দেন তথ্য জানা সহজ, কিন্তু তা ত্যাগ করা খুবই কঠিন গুরু ডিভাইজ তৈরি করে শিষ্যের তথ্য ত্যাগের পরীক্ষা নেন

যে প্রেমে কামনা থাকে কামনা চরিতার্থ হলে সে প্রেম যায় চলে গুরু শিষ্যের প্রেম নিষ্কাম তাই এর আবেদন চিরন্তন গুরু শিষ্যের প্রেমে কামনা থাকে না বলেই সর্বদা শান্তভাব বজায় থাকে, বিরহে মিলন হয় গুরু শিষ্যের প্রেমে কে প্রেমিক আর কে প্রেমাস্পদ তা বুঝা কঠিন গুরুই শিষ্যকে প্রেমের প্রথম পাঠ শিক্ষা দেন গুরু শিষ্যের প্রেমিক হয়ে তাকে প্রেম শিক্ষা দেন আবার প্রেমাস্পদ হয়ে শিষ্যের প্রেমের গভীরতা যাচাই করেন এই প্রেমের সুধা প্রেম তৃষ্ণাকে নিবৃত করে না, প্রজ্জ্বলিত করে বহুগুণে

ভক্তের ভক্তি ও বিশ্বাস থেকে জন্ম নেয় আত্মসমর্পণ গুরুতে আত্মসমর্পণে আত্মোপলব্ধি হয় গুরুর নাম শিষ্যের শ্বাস প্রশ্বাসে স্বাভাবিক হলে গুরু শিষ্যের মধ্যে প্রাণময় হয়ে উঠেন

 শিষ্যের কাছে গুরু স্বপ্নেও ধরা দেন।  স্বপ্নে পাওয়া গুরুর নির্দেশনা বাসত্মব, তাই বাসত্মবের মতোই শিষ্য তা পালন করে

গুরুই সত্য নিজের মধ্যে গুরুকে প্রতিষ্ঠিত করাই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা গুরুর প্রতিচ্ছবি চোখের সামনে স্থির ভাসিয়ে রাখার নাম সালাত সালাত ছাড়া সম্পর্ক হয় না গুরু স্রষ্টা, গুরু প্রভু, গুরু মা, গুরু বন্ধু, গুরু প্রেমাস্পদ আবার গুরুই প্রেমিক শিষ্য যেভাবে তাঁকে চায় সেভাবেই ধরা দেন তিনি, তাঁর রূপের অন্ত নাই

গুরু শিষ্যের সম্পর্কে হতাশার কোন স্থান নেই হতাশা আসে আশা থেকে যার সব আশা গুরুতে সমর্পিত তার হতাশা আসবে কোত্থেকে? গুরুকে পাবার সাধনায় যে শিষ্য হতাশ হয়, জগত থেকে তার আর কিছুই আশা করার থাকে না

গুরু জীবন চলার পথে প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁকে স্মরণে রাখার উপলক্ষ তৈরি করে দেন গুরুকে স্মরণে রাখার জন্য শিষ্যের কোন বেগ করতে হয় না সম্পর্ক হলে গুরু শিষ্যের অবস্থান জানতে পারেন, গুরুর কৃপায় শিষ্যও জানতে পারে গুরুর অবস্থান গুরুই অনন্ত, গুরুই অনাদি সত্ত্বা গুরুই নিরাকার গুরু আকার থেকে নিরাকারে বিচরণ করেন

গুরুর কাছে ছাড়া অন্য কারো কাছে প্রার্থনা করা বৃথা শিষ্য গুরুর কাছেই প্রার্থনা করে, অন্য কারো কাছে করে না তোমাকে ছাড়া আর কিছু চাই না, এটাই গুরুর কাছে শিষ্যের একমাত্র প্রার্থনা

 

মুক্ত আলোচনায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দরবার হতে যাঁরা অংশগ্রহণ করেন তাঁরা হলেন সর্বজনাব আল্লামা মো: সাদেক নূরী, আব্দুল আযীয সাদেক, সালাউদ্দিন মাহমুদ আহমদ, শাহ্‌ ওয়াজউদ্দিন মোল্লা, শামসুর রহমান বিপ্লব, শাহ্‌ শেখ মজলিশ ফুয়াদ, শাহ্‌ শাহাবউদ্দিন খান, মো: জিয়াউল হক, শাহ্‌ মো: শহীদুল আলম, সফিউল আলম খোকন, নজরম্নল ইসলাম সিদ্দিকী, হোসনে আরা রায়হান, হামিদা নার্গিস, মো: মহিউদ্দিন সরকার, বিলকিস বেগম, ফরিদা ইয়াছমিন, শাকিলা ইসলাম, ফরিদা ইয়াসমিন, শাহ্‌ জোহরা খানম, জুবায়ের, সামিয়া লাবনী, শাহীনূর আক্তার, মোছা: আফরোজা খানম, আবেদা বানু, মাহমুদা আক্তার, সালমা আক্তার, আশরিফা সুলতানা শাহ্‌ শাহনাজ সুলতানা, শাহ্‌ আসমা ইসলাম, শাহ্‌ আনোয়ারা বেগম, আফরোজা রত্না, ফরিদা খাতুন মনি, সৈয়দ আশেক মাহমুদ, শাহ্‌ আব্দুল হালিম মিয়া, শাহ্‌ সূফী শেখ আমজাদ হোসেন, শাহ্‌ কামরম্নজ্জামান খাঁন, শিব রঞ্জন দত্ত, শাহ্‌ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন, শাহ্‌ মো: লিয়াকত আলী, শাহ্‌ মো: শাহআলম খান, ফখর উদ্দিন