পুরুষোত্তম কর্নেল তাহেরের ফাঁসি রহস্য ক্রমাগত উন্মোচনায় -

বাংলার রাজনীতির মোড় ঘুরবে

 

সংলাপ

 

ঘরকুণো, আরামপ্রিয়, ভীরু, পরাধীন  ইত্যাদি ধরনের কত অপবাদই না ছিল শান্তি প্রিয় বাঙালিদেরকিন্তু ৭১'র মহান মুক্তিযুদ্ধের আগুনঝরা দিনগুলোতে এসব অপবাদ দূর করে জাতিকে যারা সাহসী ও বীরের জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, দেশকে পাকিস্তানী হানাদারমুক্ত করেছিলেন, তাঁদেরই একজন ছিলেন কর্নেল এম এ তাহের ১১নম্বর সেক্টরের কমান্ডার এই বীর যোদ্ধাকে ৩৪ বছর আগে সামরিক আদালতে মৃত্যুদন্ড দেয়াসংক্রান্ত গোপন বিচারের নথি হাইকোর্ট তলব করেছেন গত ২৩শে আগষ্টওই নথি সংশ্লিষ্ট আদালতে দাখিল করার জন্য স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষাসচিব এবং কারা মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দেয়া হয়েছেএকই সঙ্গে ১৯৭৬ সালের ১৪জুন জারি করা ১৬ নম্বর সামরিক আইন রেগুলেশন, এই রেগুলেশনের অধীনে গঠিত সামরিক আদালত এবং এই আদালতের গোপন বিচারে তাহেরকে ফাঁসির আদেশ ও তা কার্যকর করা কেন অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, এর কারণ জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়েছে স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, আইন ও মুক্তিযুদ্ধ  বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, কারা মহাপরিদর্শক, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের তত্ত্বাবধায়কসহ সাতজনকে আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছেকর্নেল তাহেরের ভাই ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের অধ্যাপক ড. এম আনোয়ার হোসেন, কর্নেল তাহেরের স্ত্রী লুৎফা তাহের ও কর্নেল তাহেরের আরেক ভাই আবু ইউসুফের স্ত্রী ফাতেমা ইউসুফের  যৌথভাবে দায়ের করা এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত এই রুল জারি করেছেন

হাইকোটের্র এই তলব ও নির্দেশের খবরে দেশের গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তোলপাড়এই রুল জারির মধ্য দিয়ে ৭১'র বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর কমান্ডার তাহেরকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড দেয়ার মাধ্যমে  যে বিতর্ক, প্রতিবাদ ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছিল তা হয়তো শেষ হবে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তির মাঝেদীর্ঘ ৩৪ বছরের বেশির ভাগ সময় ধরে যারা এদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল তাদের অধিকাংশই ছিল স্বাধীনতার বিরোধীদের লালনকারীফলে ওই সময় এ ধরনের রিট করার কোন সুযোগ ছিল নাএ ব্যাপারে ড. আনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেছেন, সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর কারণে সামরিক আদালতের বিচার কার্যক্রম নিয়ে এতদিন প্রশ্ন তোলার সুযোগ ছিল না সুপ্রিম কোর্ট পঞ্চম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়ার কারণেই কর্নেল তাহেরের ফাঁসির রায়ের বৈধতা নিয়ে রিট করা হয়েছে

তাহেরের ফাঁসির রায় দেয়া হয়েছিল 'রাষ্ট্র বনাম মেজর (অবঃ) জলিল ও অন্যান্য' নামের এক রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ১৯৭৬ সালের ১৭ই জুলাইবিচার হয়েছিল কারাভ্যন্তরের এক গোপন কামরায়রায় ঘোষণার মাত্র ৭২ ঘন্টার মাথায় ২১শে জুলাই ভোর রাতে তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয় উল্লেখ্য যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্বামী ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান তখন সেনাপ্রধান ও পরোক্ষভাবে দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী তাহেরের ফাঁসির পর দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রশ্ন আকারে দেখা দেয় প্রশ্নগুলো হচ্ছে- বিচারকার্য অনুষ্ঠিত হয়েছিল সামরিক আইনের আওতায়, কিন্তু এর প্রক্রিয়া শেষ করা হয়েছিল লোকচক্ষুর অন্তরালে তড়িঘড়ি করে- মাত্র এক মাসের মধ্যেতাছাড়া এ ধরনের মামলায় মৃত্যুদন্ড দেয়ার বিধান নেই এমনকি মুক্তিযুদ্ধে একটি পা হারিয়ে তিনি ছিলেন পঙ্গুএকজন পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া যায় কি না সে প্রশ্ন তো রয়েছেইআবার মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করারও কোন সুযোগ ছিল নাআরও বড় কথা হচ্ছে মামলার প্রধান বিচারক ব্রিগেডিয়ার ইউসুফ হায়দার ছিলেন একজন বিতর্কিত লোকএসব প্রশ্ন একত্রিত করলে একজন বিবেকবান বাঙালির বুঝতে খুবই সুবিধা হয় যে, মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর সেনানীকে অন্যায়ভাবে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছিল

এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে যে অপরাধের কথা বলে  তাহেরের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রোদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছিল তাও ছিল এক বিরাট মিথ্যাচারঘটনাটি সংক্ষেপে এ রকম- তাঁর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনা হয়েছিল '৭৫-এর ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলীর ধারাবাহিকতায়প্রকৃত ঘটনা ছিল অভ্যুত্থানের সময় সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে বন্দী করা হয়মূলত তাহেরের নেতৃত্বেই অভ্যুত্থানটি সংঘটিত হয় এবং অভ্যুত্থান শেষে তাহেরের সৈনিকেরাই জিয়াকে মুক্ত করেনকিন্তু মু্‌ক্ত জিয়া সম্পূর্ণ নতুন এক চেহারা নিয়ে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আত্মপ্রকাশ করেন এবং অভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থী সামরিক আইন জারি করেন এবং একজন স্বাক্ষীগোপালকে রাষ্ট্রপতি-কাম-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক পদে বসিয়ে নিজে উপ-প্রধান সামরিক আইন পদে অধিষ্ঠিত হয়ে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করেনসামরিক বাহিনী, দেশ ও জনগণের সাথে তাহেরের সম্পৃক্ততা এবং তাহেরের ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও মেধাকে প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রু গণ্য করে তাঁকেই দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দেয়াকে শ্রেয় মনে করলেন জিয়া রাষ্ট্রোদ্রোহের মামলা সাজিয়ে তাহেরেকে ঝুলিয়ে দিলেন ফাঁসিতেএর ফলশ্রুতিতে জিয়া  হয়ে উঠলেন দেশের সর্বেসর্বাএকজন বিতর্কিত মুক্তিযোদ্ধা ও অতি উচ্চাভিলাষী সেনা কর্মকর্তা বাংলাদেশের রাজনীতি ও সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হলে যা হওয়ার কথা তাই হলজিয়াউর রহমান ওই সময় একবার নিজেই ঘোষণা করলেন,  'আই উইল মেইক দ্য পলিটিক্স ডিফিকাল্ট ফর দ্য পলিটিশিয়ান', অর্থাৎ, 'আমি রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি কঠিন করে দেব'এবং তার সময়ে তাই হল- সৎ, সত্যবাদী ও দেশপ্রেমিক মানুষরা যারা এদেশের সার্বিক  মুক্তি ও কল্যাণের জন্য এতকাল রাজনীতি করে আসছিলেন, তাদের জন্য রাজনীতি করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠল মিথ্যাচার কায়েম হতে থাকলো রাজনীতির সর্বস্তরে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, লুটেরা, অসৎ ও দুর্নীতিবাজদেরকে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশের অবারিত সুযোগ তৈরি করে দেয়া হলোমুছে দেয়ার চেষ্টা চললো জাতির গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুসহ সকল জাতীয় নেতা বীরদের নাম পরিণতিতে স্বাধীনতা পরবর্তী একটি প্রজন্মই হলো  বিভ্রান্ত যার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে জাতিকে ভুগতে হচ্ছে আজও

তাই বলা যায়, কর্নেল তাহেরের ফাঁসির আদেশের নথি তলবের মাধ্যমে মামলাটি পুনর্বিবেচিত হলে দেখা যাবে অনেক সত্য বেরিয়ে আসছে, রাজনীতির অঙ্গনের অনেক নায়কের প্রকৃত চেহারা জাতির কাছে উন্মোচিত হবেআর কর্নেল তাহেরের মতো বীর যোদ্ধার প্রতি যে অন্যায় করা হয়েছিল তার দায়ভার থেকে জাতি কিছুটা হলেও মুক্ত হবে রাজনীতির সার্বিক অঙ্গন হত্যা, সন্ত্রাস ও মিথ্যাচার থেকে মুক্ত থাকার পথ আরো খুলে যাবেপবিত্র কুরআনের ভাষায় বলতে হয়, নাসরুম্‌মিনাল্লাহি ওয়াফাতহুন কারীব, অর্থাৎ, 'সত্য সমাগত, মিথ্যা অপসারিত'