বাংলাদেশে সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা বা ষড়যন্ত্রের বিষয়টি নস্যাৎ হওয়ার
পরই নিশ্চিত করা হয় যে,
ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে এ
ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে ঢাকার শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ার করা
হয়েছিল।
এবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সময়মতো পদক্ষেপ নেয়ায় অঙ্কুরেই ষড়যন্ত্র বিনষ্ট
করতে সক্ষম হয়েছে।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের ১৫ সদস্য সামরিক
বাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার সময়ও ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ ওই হামলা সম্পর্কে
শেখ মুজিবুর রহমানকে জানিয়েছিল।
কিন্তু তৎকালীন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা নিজেরাই ওই অভ্যুত্থানের সঙ্গে
যুক্ত থাকায় তারা ইচ্ছা করেই তা প্রতিহত করার কোন উদ্যোগ নেননি।
এর ফল তো সবারই জানা।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যে দেশের ক্ষমতা গ্রহণে আগ্রহী নয় সেটা ২০০৮ সালে
বেসামরিক কর্তৃপক্ষের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর,
অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।
ওই নির্বাচনে পার্লামেন্টে তিন-চতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে শেখ হাসিনা
ক্ষমতায় ফিরে আসেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেপথ্যে থেকে সামরিক বাহিনী যখন দেশের জঞ্জাল
পরিষ্কার করছিল তখন দেখা গেছে,
শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ এবং খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের
শীর্ষ অনেক রাজনৈতিক নেতাই দুর্নীতিতে জড়িত।
সামরিক বাহিনীর অনেকেই তখন শংকিত ছিলেন যে,
একই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হলেই সেই পুরনো দুর্নীতির অবস্থা ফিরে আসবে।
তা সত্ত্বেও সেনাবাহিনী বেসামরিক শাসনকেই শ্রেয় মনে করেছে এবং
জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে জনতার ইচ্ছার প্রতি
শ্রদ্ধা জানিয়েছে।
নির্বাচকমন্ডলী যা প্রত্যাশা করেছিলেন বাস্তবে সেটা ঘটেনি।
প্রশাসন প্রাপ্য সম্মান পায়নি।
প্রতিশোধের বাসনা নিয়ে আবার দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি ফিরে এসেছে।
অথচ জনগণকে এ ধরনের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়।
সামরিক বাহিনী এ কাজ করতে পারে না।
কারণ গণতন্ত্র আর স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে এটাই পার্থক্য।
বিগড়ে যাওয়া শক্তি
সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে,
কিছু প্রবাসী বাংলাদেশীর ইন্ধনে গুটি কয়েক অবসরপ্রাপ্ত এবং বর্তমানে
দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা অন্যদের ধর্মীয় উদ্দীপনাকে পুঁজি করে সামরিক
বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে উৎখাত
করার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছ।
এতে আরও বলা হয়েছে,
এ
ধরনের তৎপরতা নস্যাৎ করে দেয়া হয়েছে।
দেখা গেছে,
ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং অসন্তুষ্ট সামরিক কর্মকর্তাদের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধিই
এ অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালিয়েছিল।
শেখ হাসিনার উদার এবং ধর্মনিরপেক্ষ সরকার কঠোরভাবে মৌলবাদীদের দমন করেছে
বলে মৌলবাদীরা অসন্তুষ্ট।
এছাড়া সেখানে ভারতবিরোধী আরও অনেক শক্তিই রয়েছে।
তারা পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে সব ধরনের পন্থাই কাজে লাগাচ্ছে।
শেখ মুজিবকে যখন হত্যা করা হয় তখনও একই অবস্থা ছিল।
তিনিও কট্টরপন্থী ও বাংলাদেশ সৃষ্টির কারণে অসন্তুষ্ট শক্তির কাউকে কোন
ছাড় দিতেন না।
সেনাবাহিনীতে ইসলামপন্থীরা ঢুকে পড়েছে বলে শেখ হাসিনা হতাশা প্রকাশ
করেছেন।
বিষয়টি মোটেও শুভ নয়।
কারণ পাকিস্তানেও একই ঘটনা ঘটছে।
আমার কাছে তথ্য আছে,
এবারের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের হোতারা ভারতে সক্রিয় জঙ্গিদের সহযোগিতা
পেয়েছে।
ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসামের অংশ বিশেষ রয়েছে তাদের সঙ্গে।
বৈরী ভাবাপন্ন নাগাদের সংগঠন এবং মনিপুরের বিদ্রোহীরাও ওই ষড়যন্ত্রের অংশ
ছিল।
বাংলাদেশ আগে ভারতবিরোধী বাহিনীর তৎপরতা সেখানে মেনে নিলেও এখন তারা এ
ধরনের কোন তৎপরতা বরদাশত করে না।
অথচ ভারত এ ব্যাপারে বেশ ধীরে চলা এবং অকার্যকর নীতি অবলম্বন করছে।
বিষয়টি বেশ অদ্ভুত।
বৃহৎ পরিসরে নয়া দিল্লির বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ আনা যেতে পারে।
তারা ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
লেনদেন,
বিদ্যুৎ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ঢাকাকে যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে
তা এখনও অপূর্ণই রয়ে গেছে।
ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক জোরদার করতে শেখ হাসিনা একতরফাভাবে এতটাই এগিয়ে
এসেছেন যে,
তাতে বাংলাদেশের অনেকেই অসন্তুষ্ট হয়েছেন।
কিন্তু তারপরেও প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনার সঙ্গে বাণিজ্য,
বিদ্যুৎ এবং অর্থ সংক্রান্ত যে চুক্তি করেছেন দিল্লির আমলারা সেটা
বাস্তবায়ন হতে দিচ্ছেন না।
আমলারা বাংলাদেশ বিরোধী নন,
কিন্তু তারাই লাল ফিতার প্রতিনিধিত্ব করছেন,
যা যে কোন পরিকল্পনা বা প্রকল্পের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে।
আমার মনে আছে,
পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে আসার পর দিল্লি পাঁচ বছর মেয়াদী এক
পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল।
সামগ্রিকভাবে ওই অঞ্চলের উন্নয়নের স্বার্থেই ওই পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল।
বিষয়টি নয়া দিলস্নী মাঝে মধ্যে স্মরণ করলেও এর কোন ফলোআপ করা হয়নি।
ঢাকার ব্যর্থ অভ্যুত্থান নয়া দিল্লির জন্য কেবল হুঁশিয়ারি নয়,
এটি একটি সুযোগও বটে।
নয়া দিল্লিকে দ্রুততার সঙ্গে বেশ কিছু বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে হবে,
যাতে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি বীতশ্রদ্ধ জনগণ বুঝতে পারে যে,
বাংলাদেশের প্রয়োজনে ভারত যে কোন ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
একই সঙ্গে ঢাকা নয়া দিল্লির সম্পর্ক আরও জোরদার করা উচিত।
মনমোহন সিং আসামের বেশ কিছু জমি বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করেছেন।
এ
জমির দাবিদার বাংলাদেশই।
পার্লামেন্টের পরবর্তী অধিবেশনে সংবিধানের সংশোধনী আনার মাধ্যমে
প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
বিজেপি এবং আসামের কয়েকটি সংগঠন ওই জমি হস্তান্তরের বিরোধিতা করেছে।
কিন্তু তাদের বোঝা উচিত,
ওই জমি বাংলাদেশেরই অংশ এবং ৪০ বছর ধরে সেটা ভারতের সঙ্গে ভুলক্রমে জুড়ে
রয়েছে।
ঢাকার পক্ষ থেকে আরেকটি অব্যাহত অভিযোগ হচ্ছে,
বাংলাদেশের কেউ সীমান্ত দিয়ে ভুল করে ঢুকে পড়লেও সীমান্তরক্ষীরা তাদের
প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করে।
একটি ছেলে ভুল করে সীমান্ত অতিক্রম করে ঢুকে পড়ায় সীমান্ত পুলিশ কতটা
নির্দয়ভাবে তাকে পিটিয়েছে সেটা সম্প্রতি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে দেখানো
হয়েছে।
বাংলাদেশে সফর সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়কে
সুপরামর্শ দেয়া উচিত।
তিনি বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয় এবং আশা করা হচ্ছে,
বাংলাদেশে সফরের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় অনুপস্থিত থেকে যে ভুল
করেছিলেন,
সেটা এবার শুধরে নেবেন।
কুলদীপ নায়ার,
যুক্তরাজ্যে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার এবং রাজ্য সভার সাবেক সদস্য
(২৮ জানুয়ারি গালফ নিউজ-এ প্রকাশিত লেখার অনুবাদ)