মার্কিন প্রশাসনের এই ড্রোন কর্মসূচী সম্প্রতি খবরের শিরোনামে এসেছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট কাগজে প্রকাশিত এক নিবন্ধের শিরোনাম আন্ডার ওবামা,
অ্যান ইমারজিং
গ্লোবাল
অ্যাপারেটর্স অব ড্রোন কিলিং।
ওয়াশিংটন পোস্ট-এর
নিবন্ধে বলা হয়েছে,
কোনও রকম আইনী পদ্ধতি ছাড়া পৃথিবীর যে কোনও জায়গায় যে কোনও মানুষকে
হত্যা করার মার্কিন সরকারের সিদ্ধান্ত রীতিমতো আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
এভাবেই হাজার হাজার মানুষের হত্যালীলা সংগঠিত হয়েছে।
পোস্ট-এ প্রকাশিত নিবন্ধ অনুসারে এই ড্রোন কর্মসূচীর জন্য পূর্ব উপকূলে
দুটি অপারেশনাল হাব তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমে বিমানবাহিনীর ককপিট তৈরি হয়েছে।
দুটি মহাদেশের অন্তর্গত ছটি দেশে ড্রোন উৎক্ষেপণের ঘাঁটি তৈরি করা
হয়েছে।
মার্কিন কংগ্রেসের বাজেট অনুযায়ী আমেরিকার হাতে ৭৭৫টি প্রিডেটর এবং
অন্যান্য বিমান রয়েছে।
এছাড়াও সিআইএ-র হাতে বিপুল সংখ্যক ড্রোন রয়েছে।
যার সঠিক অংক জানা যায়নি।
ইরাক এবং আফগানিস্তানের যুদ্ধ ছাড়াও তিনটি দেশে হত্যাকা- সংগঠিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক ইরানের ওপর ড্রোন হামলা বিসস্তৃত
অঞ্চল জুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োগের প্রশ্ন তুলেছে।
প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হয়ে ওবামার প্রথম কতগুলো পদক্ষেপের অন্যতম ছিল
পাকিস্তানে ড্রোন আক্রমণের নির্দেশ দেয়া।
সে সময় থেকে প্রায় ২৪০ বার ড্রোন আক্রমণ হয়েছে পাকিস্তানের ওপর।
প্রায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে যার অধিকাংশই পাকিস্তানি
নাগরিক।
ইয়েমেনের ওপর প্রায় ১৫ বার ড্রোন আক্রমণ হয়েছে।
বাদ যায়নি সোমালিয়াও।
পোস্ট-এর নিবন্ধে প্রকাশিত হয়েছে
সিআইএ এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড
(জেএসওসি)-এর হত্যা তালিকা।
কীসের বিচারে হত্যার নিশানা ও পরিকল্পনা স্থির করা হয়েছিল তার কোনও
তথ্য জনসমক্ষে নেই।
সিআইএ-র তালিকাটি অবশ্য মার্কিন সেনাবাহিনীর তালিকা থেকে ছোট।
ইয়েমেনে মৃতদের তালিকায় তিনজন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর সিআইএ-র হাতে নিহত হন আনোয়ার আল-অওলাকি।
এর সপ্তাহকয়েক পরেই জেএসওসি-র হাতে নিহত হন আনোয়ার আল-অওলাকি।
এর সপ্তাহকয়েক পরেই জেএসওসি-র হাতে নিহত হয় অওলাকির ১৬ বছরের কিশার
ছেলে।
পোস্টের দাবি,
অওলাকির ১৬ বছরের কিশোর ছেলে মূল লক্ষ্য ছিল না।
তার সঙ্গে আল-কায়েদার সম্পর্কের কোনও প্রমাণও ছিল না।
তবু এই মার্কিন তরুণের মৃত্যু অনেকটাই অপ্রত্যাশিত বলে মনে করা হচ্ছে।
ড্রোন হানায় নিহতের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধির কারণ হিসেবে পোস্ট
চিহ্নিত করেছে,
ওয়ানতানামো সাগরে সিআইএ-র কর্মসূচীর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি এবং ওই অঞ্চলে
বদলি বন্ধের সিদ্ধান্তকে।
বলা হচ্ছে,
ড্রোন হামলা ছাড়া অন্য কোনও পথ খোলা ছিল না।
অভিযুক্ত সন্ত্রাসবাদীদের জেলখানা এবং নিগ্রহ কেন্দ্রে আটকে রাখার
পরিবর্তে ওবামা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত,
গোপনে স্রেফ মেরে ফেলাই অনেক বেশি কার্যকর হবে।
পোস্ট-এর মন্তব্য,
বর্ষীয়ান ডেমোক্র্যাটরা কেউ প্রশ্ন তোলেননি।
কীভাবে এবং কেনই বা তাদের দলের প্রেসিডেন্ট সন্দেহভাজন সন্ত্রাসবাদীদের
মারতে এধরনের এক অত্যন্ত কার্যকর যন্ত্রকে ব্যবহার করার কথা বললেন।
জনএফ কেনেডি-র হত্যার পর ক্ষমতায় এসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন
স্বীকার করেছিলেন,
ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে সিআইএ এক জঘন্য হত্যালীলা সংগঠিত করেছে।
এর মধ্যে ছিল কিউবার কিংবদন্তী নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রোকে হত্যার ছকও।
অনেক হত্যা পরিকল্পনার নেপথ্যে ছিল নিকসন প্রশাসন।
নানা কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন নিকসন।
তাঁর বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট হয় যার ফলে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
১৯৭০ এর দশকের মাঝামাঝি মার্কিন সিনেটর ওই আদেশনামায় সরকারিভাবে
হত্যাপ্রক্রিয়াকে খারিজ করা হয়।
কিন্তু ওবামা প্রশাসনের আক্রমণাত্মক মনোভাব এবং গোপনে গোপনে সিআইএ এবং
সেনাবাহিনীর উত্তরোত্তর বৃদ্ধি অতীতে অপরাধমূলক কাজের সীমাকে ছাড়িয়ে
গেছে।
আইন বহির্ভূত,
রাষ্ট্র অনুমোদিত হত্যাই এখন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-র
নামে চলছে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধের মাত্রা বাড়ছে।
বাড়ছে আগ্রাসী যুদ্ধ,
অনির্দিষ্টকালীন আটক এবং নির্যাতনের ঘটনা।
মার্কিন সামরিক নীতির কেন্দ্রীয় উপাদান হয়ে উঠেছে এই ব্যবস্থা।
লিবিয়ার যুদ্ধে মার্কিন মদতে মুয়াম্মার গাদ্দাফির হত্যাতেই লিবিয়ার
যুদ্ধ শেষ হয়।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে,
ওসামা বিন লাদেনকে বেআইনীভাবে হত্যার ঘটনাকে নিজ প্রশাসনের
গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত বলে চিহ্নিত করেছেন ওবামা।
দ্রুত বর্ধমান হিংসা এবং গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ একই প্রক্রিয়ার দুই দিক।
আমেরিকার ন্যাশনাল ডিফেন্স অথোরাইজেশন অ্যাক্টে বলা হয়েছে,
কোনও মার্কিন নাগরিক বা নাগরিক নন এই দুই ক্ষেত্রেই অনির্দিষ্টকালীন
আটকের সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্টের পছন্দের ওপর নির্ভর করছে।
এই আইন প্রকাশের দুসপ্তাহের মধ্যেই পোস্ট-এর এই নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়।
এই আইনে বন্দী প্রদর্শনের বিষয়টি আর থাকল না।
মৌলিক সাংবিধানিক অধিকারও খর্ব করা হলো।
মার্কিন প্রশাসনের অবশ্য এ বিষয়ে বিশেষ মাথাব্যথা নেই।
কারণ,
এই প্রশাসনের শীর্ষে আসীন স্বয়ং ওবামা আদতে শক্তিশালী অর্থনৈতিক
স্বার্থ এবং সামরিক গোয়েন্দা ব্যবস্থাপনার এক জোটবদ্ধ উপস্থাপনা।
ওবামার সরকার অবশ্য মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সমর্থন পেয়েছে।
কেউ কেউ বলেই ফেলছেন,
আফ্রিকান-আমেরিকান প্রেসিডেন্ট-এর যে কোনও সিদ্ধান্তই গ্রহণযোগ্য এমনকি
প্রগতিশীল।
যদিও বিশ্বজুড়ে হত্যাকা- সংগঠিত করার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে নেশন।
করেছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সমর্থক বামপন্থীরা।
আটলান্টিক পত্রিকার বর্ষীয়ান সম্পাদক তা-নেহিসি কোট্স এর মতে
গণতন্ত্রের যথার্থ হাতিয়ার হলো ড্রোন।
দেশের শত্রুদের
খতম করার যাবতীয় বাহ্বা কেউ পেতেই পারেন।
সেনা নিধনের দোষ কেউ তাঁর বিরুদ্ধে দেবেন না।
ঘটনাচক্রে ১৬ বছরের ছেলেটির মৃত্যু দুঃখজনক।
গণতান্ত্রিক অধিকারের রক্ষাকবচ,
মার্কিন আধিপত্যবাদের পরাজয়,
সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এসবই শ্রমিকশ্রেণীর রাজনৈতিক
গণ-আন্দোলনের ওপর নির্ভরশীল।
এর এক ভিত্তি রয়েছে।
ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে এ মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে দ্বন্দ্বে মুখোমুখি এই
গণ-আন্দোলন,
গণ-তান্ত্রিক দলগুলো এবং বামপন্থী শক্তি বলে বলীয়ান রাজনৈতিক দলগুলো।