|
আমি হালাল
ছাড়া খাই না!
সবে
কাজ থেকে বাসায় ফিরেছি খেতে বসবো,
এমন
সময় ফোন বেজে উঠলো।
সচরাচর এ সময় বিজ্ঞাপনী ফোনই এসে থাকে,
পারতপক্ষে ধরি না।
আজ
কাছে ছিলাম বলেই হয়তো না ভেবেই ফোনটি তুলে বললাম,
হ্যালো।
দীর্ঘ লয়ে উত্তর পেলাম
'আসসালামু
আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহে ওয়াবারাকাতুহু’।
মনে
মনে বললাম,
এই
শুভেচ্ছা বাণীটি আরো সংক্ষিপ্ত করলেও আপনার সদিচ্ছার ব্যাপারে আমি কখনো
সন্দেহ প্রকাশ করতাম না।
ইদানিং বাংলাদেশ,
ভারত ও পাকিস্তান থেকে মুসলমান লেখকের তিন বাক্যের যেসব ইমেইল পাই,
তার
বেশির ভাগেই অবশ্যই দুটো বাক্য থাকে
'আসসালামুয়ালাইকুম
ওয়াবারাকাতুহু’,
'আল্লাহ
হাফেয'বা
'ইনশাল্লাহ'বা
'ফি
সাবিলিল্লাহ'জাতীয়।
বয়সে ছোট কয়েকজন আত্মীয়কে উত্তরে জানিয়েছিলাম,
একই
সূত্রের একাধিক ইমেইলের আদান-প্রদানে বারবার এই কথাগুলো না লিখলে,
তোমাদের আঙ্গুলের পরিশ্রম কিছুটা কম হবে,
আর
আমি এটি প্রিন্ট করলে কালি কম খরচ হবে।
আমার উপদেশে কোন কাজ হয়নি।
কদাচিৎ পাওয়া অন্যান্য মুসলিম দেশ থেকে কোন ইমেইলে আশ্চর্যজনক ভাবে এই
বাক্যগুলোর বাহুল্য কম থাকে।
কাজেই ধরে নিলাম আমার আজকের ফোনের আগন্তুক উপমহাদেশেরই ধার্মিক কেউ হয়ে
থাকবেন।
তাই
গুনাহর ভয়ে মোলায়েম স্বরে
'ওয়ালাইকুম...'প্রত্যুত্তর
দিতে দিতে আমার খালি পেট
'ভাত
কই ভাত কই'বলে
হুঙ্কার দিয়ে উঠলো।
এক
হাতে পেটের অন্ত্রনালি চেপে ধরে নিজের কন্ঠনালিতে যথাসম্ভব শক্তি এনে
জিজ্ঞেস করলাম,
'ভাই
আপনি কে বলছেন?'বললো
স্যার,
আমি
আপনার পুরনো এক ছাত্র,
সাবিউল্লাহ।
খুব
খুশি হলাম,
পেটও আমার সাথে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে তর্জন-গর্জন ছেড়ে কাঁইকুঁই করতে
থাকলো।
আসলে সত্যিকার অর্থে সাবিউল্লাহ আমার ছাত্র ছিল না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি যখন শেষ বর্ষের ও তখন প্রথম বর্ষের ছাত্র।
পরবর্তীকালে শিক্ষক হয়ে ওদের গোটাকয়েক ক্লাশে আমি একটি অধ্যায় পড়িয়েছিলাম
মাত্র।
স্যার সম্বোধন করে সে নিজেরই বিনয় প্রকাশ করলো,
শিক্ষক হিসেবে আমার কোন কৃতিত্ব ছিল না।
পিএইচডি করে এদেশের একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা-গবেষণা করছিল।
ওর
মেধা ও বিজ্ঞানে অবদানের প্রশংসা করে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন বিভাগকে আমি
একটি চিঠি লিখেছিলাম,
আর
গ্রীণ কার্ড পাওয়ার সাথে সাথে আমাকে ফোন করে জানিয়েও ছিল।
এখন
একটি কাজে এসে ওর এক বন্ধুর বাড়িতে উঠেছে,
দুদিন থাকবে।
যেহেতু সময় বেশি নেই,
কাল
সন্ধ্যায় ওর বন্ধুকে নিয়ে আমার সাথে দু’টো
ডালভাত খেতে আমন্ত্রণ জানালাম,
প্রায় তিরিশ বছর পরে দেখা হবে আশায়।
অতি
বিনয়ের সাথে বললো কাল সন্ধ্যায় ও শুধুই দেখা করতে আসবে কিন্তু খাওয়া-দাওয়া
নিয়ে আমাকে ঝামেলায় ফেলতে চায় না।
আসলে ঝামেলার কিছুই নেই,
কাল
আমার ও আমার স্ত্রীর দু’জনেরই
কাজ আছে,
চাইলেও ওকে আমরা উপযুক্ত সমাদর করতে পারবো না।
কাজেই সচরাচর যা খাই,
সেটাই সাবিউল্লাহ ও তার বন্ধুর সাথে ভাগাভাগি করবো,
দেখা হওয়াটাই মূখ্য।
ও
আবার বললো,
স্যার ভাবীকে কোন কষ্ট না দিয়ে শুধুই ডিম সিদ্ধ ও আলু ভর্তা করতে বলবেন।
মনে
পড়লো আমাদের স্বাস্থ্য সচেতন বন্ধু মনোয়ার ভাই লং ড্রাইভে বেড়াতে গেলে
কোলেষ্টারোলের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে অবশ্যই সেদ্ধ ডিম সাথে নেবেন,
আর
প্রতিটি কামড়ের সাথে এর স্বাদ ও সুগন্ধের ধারাবাহিক বর্ণনা দিয়ে যাবেন।
ভাবলাম লং ড্রাইভের থেকেও বহু দূরে এসে সাবিউল্লাহ হয়তো ডিমের স্বাদ থেকে
বঞ্চিত হতে চায় না।
সাথে সাথে এই ডিম নিয়ে যে এক মহাবিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলাম তাও মনে পড়লো।
বছর
দু’য়েক
আগে এক বিজ্ঞান সম্মেলনের বক্তার তালিকায় পরিচিত একটি নাম দেখে তার সাথে
দেখা করতে এগিয়ে গেলাম।
সুবল মিত্র আমাকে দেখেই হৈ হৈ করে উঠলো।
আশির দশকে যখন এদেশে পোষ্ট-ডক্টোরাল ফেলোশিপ নিয়ে আসি,
বেশি কেউ ছিলেন না বলে বাংলাদেশের কাউকেই চিনতাম না।
একই
পাড়ায় থাকা,
একই
পেশার কলকাতার বেশ ক’জন
বাঙালিই হয়ে উঠেছিলেন আমাদের পরমাত্মীয়।
সুবল মিত্র ছিলেন তেমনি এক বন্ধু।
একমাত্র মুসলমান বলে,
আমাদের গোমাংসের বাসায় ছিল ওদের স্বাচ্ছন্দ্য যাতায়াত।
পরে
নিজেই রান্না করে এক বসায় এক পাউন্ড গোমাংস সাবাড় করে দিয়েছিল সুবল।
দিল্লির নামকরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও একটি বিভাগীয় প্রধান ড.
সুবল মিত্র এক সম্মানিত অতিথি হিসেবে এখানে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন।
বিজ্ঞানী হিসেবে সুনাম অর্জন ও ভারতের সর্বোচ্চ বিজ্ঞান পুরষ্কার প্রাপ্ত
এই বিজ্ঞানী এখন ওই দেশের জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থার একজন নীতিনির্ধারক বিধায়
ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটান।
অনেক লোকের ভিড়ে ব্যস্ততার মাঝে বললো আশরাফ ভাই,
এবার আপনার বাসায় থাকতে পারবো না তবে বাইশ বছর থেকে বৌদির হাতের রান্না
খাই না! বলবেন একটু কষ্ট করে ডিম রান্না করে রাখতে,
আমি
পরশু সন্ধ্যায় আপনাদের বাসায় ডিনার খাব।
কাজ থেকে একদিন ছুটি নিয়ে আমার স্ত্রী,
সুবল পছন্দ করে বলে পরম যত্ন করে শুধুই মাংস জাতীয় খাবার রান্না করলো।
ঝাল
গরুর মাংস,
মুরগির রোষ্ট,
খাসির মাংসের বিরিয়ানী,
টার্কির টিকিয়া,
টুনার কাবাব ও রুই মাছের দো’পেয়াজা
রান্না করে অপেক্ষা করতে থাকলো।
সুবল এলে পুরনো সব বন্ধু,
বলুদা,
অশোকদা,
প্রহ্লাদ,
পিযূষ,
কৃষ্ণাদি,
রতন,
দিব্যেন্দু,
বৈশাখি,
কল্যাণী,
ওদের সবাইকে নিয়ে স্মৃতিচারণ হল।
খাওয়ার টেবিলে এসে প্লেট নিয়ে সুবল সব কিছুর দিকে তাকিয়ে বললো,
বৌদি আপনি এত কষ্ট করতে গেলেন কেন,
আমার ডিম কোথায়?
আসলে সুবল সেদিন বিনয় করে বলেছিল বলে ধরে নিয়ে ডিমের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম।
জানালো ওর নিরামিষাশি অবাঙালি স্ত্রীকে বিয়ে করার পর থেকে সব ধরনের মাংস
জাতীয় খাবার খাওয়া সে ছেড়ে দিয়েছে।
এত
বছর পরে দেখা,
কাজ
থেকে ছুটি নেয়া,
আমাদের এতো আয়োজন,
এতো
উৎসাহ এক নিমেষেই মাটি হয়ে গেল।
নিজের নির্বুদ্ধিতায় নিজেকে দোষারোপ করা ছাড়া উপায় রইলো না।
এত
বছর পর এই সম্মানিত অতিথি তাই শুধু সালাদ খেয়েই আমার বাড়ি থেকে বিদায়
নিলেন! উর্দূ একটি বচণ
'আকেলমন্দ
কি লিয়ে ঈশারাই ক্কাফি হ্যায়'মনে
পড়লো।
হতে
পারে সাবিউল্লাহ হালাল ছাড়া কোন মাংস খায় না,
সরাসরি তা বলতে না পেরে ডিমের কথা বলছে।
মনে
মনে সাবিউল্লাহ’র
বুদ্ধির তা’রিফ
করে বিস্তারিত না জানিয়ে বললাম,
ওর
জন্যে ডিম সিদ্ধ ও আলু ভর্তা থাকবে,
আর
আমরা যা খাই তাও থাকবে।
কাজেই কোন ঝামেলাই হবে না।
আসলে হালাল অর্থাৎ মুসলমানী কায়দায়
'আল্লাহু
আকবর'বলে
হত্যা করা প্রাণীর মাংস এবং এখানকার গ্রোসারি ষ্টোরের কসাইখানার মাংসের
ব্যাপারে আমার কোন বাছবিচার নেই।
স্বাদেও কোন পার্থক্য পাই না।
এব্যাপারে ধর্মীয় বই-পুস্তক বিস্তর ঘাটাঘাটি করেছি।
তবে
যেহেতু বেশির ভাগ লোকের কাছেই আমার যুক্তি কোন সাড়া পাবে না,
হালাল সম্পর্কে আমি প্রচণ্ড ধার্মিক,
বয়োজ্যেষ্ঠ এক ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুর মতামতকেই প্রাধান্য দেই।
গভীর রাতে তাহাজ্জ্যোত নামাজ সহ সব সময়েই জামাতে নামাজ পড়তে পারেন,
সেই
জন্যে তিনি বাড়ি করেছেন মসজিদের পাশে।
কুরআন-হাদিসের আলোকে তিনি বলেছিলেন,
'রোগমুক্ত
ও প্রাপ্ত বয়স্ক যে পশু মা-কালি বা অন্য কোন দেব-দেবীর নামে উৎসর্গ করা
হয়নি,
তার
মাংস হালাল’।
আর
যেহেতু এদেশের গ্রোসারি ষ্টোরের মাংসের উৎসে গরুকে কারো নামে হত্যা করা হয়
না,
অথচ
স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে কাটা ও সংরক্ষণ করা হয়,
সেগুলো অবশ্যই হালাল।
এই
হালালের ব্যাপারটি পর্যবেক্ষণ করতে তিনি ঢাকায় এক কসাইখানায় গিয়ে দেখলেন,
স্বল্প সময়ের মধ্যে কসাইরা কসরৎ করে একে একে গরুগুলোকে মাটিতে যখন ফেলে,
তখন
'আল্লাহু
আকবর'বলার
কথা মনে থাকে না।
তার
পরিবর্তে যেটি বলাতে তারা বেশি অভ্যস্ত,
গরুটির মায়ের সতিত্ব নষ্ট করার একটি প্রতিজ্ঞা,
তাই
উচ্চারণ করে ছুরি চালিয়ে দেয়।
জানিনা বলে আমরা দেশে কখনো এটি হারাম বা হালাল নিয়ে মাথা ঘামাই না।
কিছুদিন আগে শুনলাম ঢাকার সাংবাদিকেরা কসাইখানায় গিয়ে দেখতে পেলেন,
দুই
হিন্দু কসাই প্রতিদিনের মত একের পর এক খাসী জবাই করে চলেছে
'আল্লাহু
আকবর'না
বলেই।
আর
তার মাংস বায়তুল মোকাররামের খতিব থেকে শুরু করে সব মুসলমান নিশ্চিন্ত মনে
খেয়ে চলেছেন বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করেই!
তারপরও এদেশে অনেক অতিথি আছেন যারা হালাল ছাড়া কিছুই খান না,
আর
দাওয়াত খেতে এসে সরবে প্রশ্ন করে জেনে নেন মাংসটা হালাল কিনা।
তাঁদের কাছে মুসলমানের দোকান থেকে কেনা মাংস মানেই হালাল।
তাঁরা ভুলে যান,
মুসলমানরাও ব্যবসায়ী।
আর
আমরা মিথ্যা কারো চেয়ে কম বলি তারও কোন নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই।
ছোট
কাল থেকে জেনে এসেছি অসৎ উপার্জন হারাম,
অথচ
কোন বিজ্ঞজনকে প্রশ্ন করতে শুনিনি যে টেবিলের খাবারগুলো সৎ উপার্জনের কিনা।
খাওয়া নিয়ে বাছবিচার শুধু আমাদের মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না।
ঈহুদীদের কোশার-প্রীতি সম্পর্কে তো সবাই জানেন।
এদেশেও অনেকে আছেন,
যারা পশুর প্রতি দয়াপরবশ হয়ে নিরামিষাশি হয়েছেন,
কোন
ধর্মীয় অনুশাসনের জন্যে নয়।
এক
দুপুরে লাঞ্চ করতে গিয়ে জানলাম ইষ্টার্ণ মেথডিষ্ট নামে খ্রিষ্টানদের একটি
সেক্টের অনুসারি এক সহকর্মী শক্রবার কোন মাংস খান না।
ভারত ও আমাদের দেশের নিরামিষাশি হিন্দুদের খাবার ব্যাপারে কঠিন বাছ-বিচারের
কথাও আমরা জানি।
তাদের অনেকের পানি বা খাবারে আমাদের ছোঁয়া লাগলে উপোসে থাকলেও তা ফেলে দিতে
হয়।
একবার শ্বশুর বাড়ির দেশের হিন্দু একটি পরিবার আমাদের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন।
এঁদের বয়োজ্যেষ্ঠ জন অনেক কুন্ঠার সাথে আমার স্ত্রীকে বলেছিলেন,
মা
কিছু মনে করো না,
বুড়ো হয়েছি তো,
ছোটকালের অভ্যাস ছাড়াতে পারিনি বলে আমার আর তোমার মেশোমশাই এর রান্নার হাড়ি,
চুলো ও সব সরঞ্জাম আমরা সাথে নিয়ে এসেছি,
কিন্তু তোমার দাদা,
বৌদি,
ভাইটি ও ছোটরা তোমাদের সাথেই খাবে।
অতি
রক্ষণশীল হলেও তাদের এই কুন্ঠা ও বিনয়ের কথা মনে হলে আজো শ্রদ্ধায় মাথা নত
হয়ে আসে।
তুরস্কের এক ধার্মিক মুসলমানকে সবার মাঝে কখনো খাবারটি হালাল কিনা প্রশ্ন
করতে শুনিনি,
কখনো সন্দেহ হলে কাউকে কিছু না বলে শুধু সবজি ও মিষ্টি খেয়েই আসরকে
প্রাণবন্ত রাখতে দেখেছি।
আমার কেন জানি মনে হয় বাঙালি মুসলমানদের বেলায় হালাল-প্রীতি জাহির করার
প্রবণতাটা হয়তো একটু বেশি;
এতে
যে নিমন্ত্রিয়েতা (গহকর্তা-কর্ত্রী) এক অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে পারে এ
ব্যাপারে তারা পুরোপুরি উদাসীন।
(এই
ধারণা আমার ভুলও হতে পারে কারণ অন্য গোত্রের লোকজনের সাথে আমাদের সামাজিক
মেলামেশা তো বাঙালি মুসলমানদের তুলনায় অনেক কম।)
আগে
এদেশে হালাল জিনিস পাওয়া যেত না বেশি,
এখন
বড় বড় শহরগুলোতে মুসলমান জনসসংখ্যা বেশি হওয়ায় অনায়াসে পাওয়া যায়।
তাই
কখন কোন হালাল মেহমান চলে আসে,
কোন
ঝুঁকি না নিয়ে আমরাও সব সময় বেশি দাম দিয়ে মুসলমান দোকান থেকেই মাংস কিনি
ও ফ্রিজে মজুদ রাখি,
খালি হতে দেই না।
সাবিউল্লাহকে আমরা অভ্রান্তচিত্তে ও নিঃসঙ্কোচে আপ্যায়ন করতে পারবো ভেবে
খুব ভাল লাগলো।
কাল
সন্ধ্যায় দেখা হবে,
তারপরও এটা সেটা নিয়ে দুয়েকটা কথা বললাম ফোনে।
সাবিউল্লাহ আবারো বললো স্যার,
ভাবীকে কিন্তু অবশ্যই বলবেন কোন কষ্ট না করতে,
আমি
কিন্তু হালাল ছাড়া খাই না,
শুধুই যেন ডিম আর আলু ভর্তা করেন।
মনটা খারাপ হয়ে গেল।
আমি
বললাম,
সাবিউল্লাহ,
তোমার সাথে এতদিন পরে দেখা হবে,
তোমার পছন্দের ডিম-আলু ভর্তা নিশ্চয়ই হবে,
তবে
মুরগিটি বা পাখিটি যে
'বিসমিল্লাহ'বা
'আল্লাহু
আকবর'বলে
ডিম পেড়েছিল আমি তো ভাই তোমাকে সেই গ্যারান্টি দিতে পারবো না।
তা’ছাড়া
কি করে তোমার ধারণা হল যে আমরা হারাম খাই?
সৈয়দ আশরাফউদ্দিন আহমেদ
সূফী সাধক
আনোয়ারুল হক্ এঁর বাণী তাৎপর্য অন্বেষণে -
''সাবধান।
হাসতে,
খেলতে,
দেখতে আর বলতে
ঈমান চলে যেতে পারে''
''বিশ্বাসের
সুবাস উড়ে গেলে বিশ্বাস হয়ে বিষ''
ড.
এমদাদুল হক কাজল ॥
সূফী সাধক আনোয়ারুল হক্ এঁর উক্ত বাণী দু’টি
ঈমান বা বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত।
তাই আমরা এই দু’টি
বাণী একসাথে বিশ্লেষণের চেষ্টা করবো।
প্রথম বাণীটিতে আনোয়ারুল হক্ বলেছেন -
''সাবধান।
হাসতে,
খেলতে,
দেখতে আর বলতে ঈমান চলে যেতে পারে।''-
এই বাণীটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ঈমান।
'ঈমান'আরবি
শব্দ।
যা 'আল-আমনু'
শব্দমূল থেকে উদ্ভুত।
'আল-আমনু'শব্দের
অর্থ হচ্ছে বিশ্বাস।
তাই ঈমান শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে বিশ্বাস স্থাপন করা।
মানুষ ঠোঁট দিয়ে বিশ্বাস করে না,
বিশ্বাস করে হৃদয় দিয়ে।
তাই ঈমানের স্থান ঠোঁটে নয় - হৃদয়ের কন্দরে।
আল্লাহ্ বলেন -
''বেদুঈনরা
বলে আমরা ঈমান আনলাম,
বল,
তোমরা ঈমান আননি বরং,
তোমরা বল,
'আমরা
আত্মসমর্পণ করেছি’,
কেননা তোমাদের হৃদয়ে এখনও ঈমান প্রবেশ করেনি।''(সূরা
হুজুরাত : ১৪)।
অর্থাৎ,
মুখে
'লা
ইলাহা ইল্লাল্লাহু'কলেমা
পড়লেই কেউ ঈমানদার হয়ে যায় না,
যদি না বাস্তব কর্মে এ বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটে।
কুরআনে চারটি জিনিসের উপর বিশ্বাস স্থাপনের কথা বলা হয়েছে।
১. ফেরেশ্তাদের উপর বিশ্বাস : দুই জন ফেরেশতা ভাল-মন্দ কাজের হিসাব
রাখছেন।
তাই ফেরেশতাদের উপর বিশ্বাস স্থাপনের অর্থ হলো ভাল কাজ করা এবং সদা
অন্যায় ও খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকা।
২. আসমানী কিতাবের উপর বিশ্বাস : আসমানী কিতাবের উপর বিশ্বাস করার
র্অথ হলো - সেই সমস্ত কেতাবে বর্ণিত ন্যায় ও সত্য পথে চলা এবং ব্যক্তি ও
সমাজ-জীবনকে তদানুসারে নিয়ন্ত্রিত করা।
৩. নবী-রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস : নবী-রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের
অর্থ হলো - মহামানবদের ত্যাগ,
সাধনা ও কর্মকৌশলের মহান আদর্শ অনুসারে জীবন গড়ে তুলা এবং বিশ্ব মানবতার
কল্যাণ সাধনে ব্রতী হওয়া।
৪. শেষ বিচারের দিনের প্রতি বিশ্বাস : মানুষের প্রতিটি কর্মের বিচার করা
হবে।
তাই শেষ বিচার দিনের প্রতি বিশ্বাসের অর্থ হলো - হাসতে,
খেলতে,
দেখতে,
বলতে অর্থাৎ জীবন চলার পথে প্রতিটি ক্ষেত্রে অধর্ম হতে দূরে থাকা।
অন্তরের গোপন বিশ্বাসকে ঈমান বলা যাবে না যদি তা হাসি,
খেলা,
দেখা ও বলায় প্রকাশিত না হয়।
আন্তরিক বিশ্বাসের নিদর্শন থাকতে হবে বাস্তব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে।
কুরআন মতে সেই ব্যক্তিই ঈমানদার যার চরিত্র সবচেয়ে ভাল,
যার মধ্যে ধৈর্য,
সহনশীলতা,
দানশীলতা,
নমনীয়তা ও উদারতা আছে এবং যে
'অপরের
জন্য তা পছন্দ করবে না যা নিজের জন্য পছন্দ করে না।'যখন
কোন ব্যক্তি ভাল কাজ করতে আনন্দ পায় এবং খারাপ ও অন্যায় কাজ করলে মনে মনে
এবং প্রকাশ্যে অনুতপ্ত হয় তখনই একজন মানুষ বলতে পারে যে সে ঈমানদার।
অন্যায় ও অনাচারকে অন্তর দিয়ে ঘৃণা না করলে তার মধ্যে ঈমানের কোন
অস্তিত্ব আছে বলে মনে করার কোন কারণ নেই।
যার উৎপীড়ন হতে প্রতিবেশী নিরাপদ নয়,
যে মিথ্যা বলে,
আমানত খিয়ানত করে,
ওয়াদা ভঙ্গকরে,
যে লোক পেট ভরে খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়ে রাত্রি যাপন করল এবং সে জানলো যে তার
প্রতিবেশী না খেয়ে ক্ষুধার্ত অবস্থায় রয়েছে নিশ্চয়ই তার ঈমান নেই।
এক কথায় লোকে যাকে বিশ্বাস করে না,
সে মুখে যাই বলুক না কেন অন্তর দিয়ে আল্লাহ্র প্রতি ঈমান আনেনি।
সূফী সাধক আনোয়ারুল হক্ বলেছেন - সাবধান! হাসতে,
খেলতে,
দেখতে আর বলতে ঈমান চলে যেতে পারে।
একটু অনুসন্ধিৎসু হলেই আমরা দেখতে পাই যে,
হাসতে,
খেলতে,
দেখতে আর বলতে অন্তত ১৯ ভাবে ঈমান চলে যেতে পারে।
যথাঃ ১. উপহাস করা ২. পরিহাস করা ৩. জুয়া খেলা ৪. লটারী খেলা ৫. বাজি ধরে
খেলা ৬. অশ্লীল দৃশ্য দেখা ৭. অকারণে বেশি কথা বলা ৮. ঝগড়া করা ৯.
বাকবিতন্ডা করা ১০. রূঢ়বাক্য প্রয়োগ বা তিরস্কার করা ১১. গালাগালি দেয়া
১২. ধিক্কার দেয়া ১৩. অভিশাপ দেয়া ১৪. ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা ১৫. মিথ্যে বলা
১৬. মিথ্যে শপথ করা,
১৭. পরনিন্দা করা ১৮. একের কথা অপরের কানে লাগানো অর্থাৎ চোগলখোরী করা।
১৯. দু’মুখো
হওয়া বা বন্ধু এবং বন্ধুর শত্রু উভয়ের কাছে মিত্রতার ভান করা অথবা
প্রশংসা করা।
হজরত নিজামুদ্দিন (র.) বলেন,
''তুমি
কালেমা পাঠ করে মুসলমান হয়েছ।
অর্থাৎ,
আল্লাহ্র বরাবরে অঙ্গীকার করেছো যে,
এক আল্লাহ্র প্রতিই তুমি অনুগত।
তাঁর শেষ নবীর তরিকা ছাড়া আর অন্য কোন আদর্শের অনুসারী তুমি নও।
এ
সুবাদেই তোমার প্রতি প্রশ্ন জাগে,
এ
অঙ্গীকারে তুমি কায়েম আছ কি-না,
তার প্রমাণ কি?
তোমার কাছে কি কোন সাক্ষী আছে?
কি হতে পারে তোমার সে অঙ্গীকারের যথার্থ সাক্ষী?
তুমি যার অনুগত রূপে নিজেকে গণ্য করছো,
তার নির্দেশাবলী কতটুকু মেনে চল?
যে সব বিষয় থেকে তিনি তোমাকে বিরত থাকতে বলেছেন,
সেসব থেকে তুমি বিরত রয়েছ কি?''হযরত
নিজামুদ্দিন (রাঃ) - এর এসব প্রশ্নই পুঞ্জিভূত হয়েছে আনোয়ারুল হক এর
সংক্ষিপ্ত বাণীটিতে -
''বিশ্বাসের
সুবাস উড়ে গেলে বিশ্বাস হয় বিষ।''বিশ্বাসের
সুবাস কি?
বিশ্বাসের সুবাস হচ্ছে সৎকর্ম।
ভেতরে ঈমান থাকলে বাহিরে যে সুবাশ বেড়িয়ে আসে তা-ই সৎকর্ম।
গোলাপের সুবাস থেকে যেমন গোলাপকে আলাদা করা যায় না ঠিক তেমনি ঈমান থেকে
সৎকর্মকে আলাদা করা যায় না।
তাই কুরআন যখনই ঈমানের কথা বলছে তখনই সাথে সাথে উল্লেখ করছে সৎকর্মের কথা।
যেমন কুরআন বলছে : ১.
''যারা
আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে,
তাদের রবের নিকট থেকে তাদের জন্য রয়েছে পুরস্কার।
আর তাদের কোন ভয় নেই,
চিন্তাও নেই।''(সূরা
বাকারা: ৬২)।
২. ''যারা
ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে তাদের জন্য রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার।''(সূরা
হা-মিম-সিজদা: ৮)।
৩. ''যারা
ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে তারাই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ।''(সূরা
বাইয়িনা:৭)।
৪. ''তোমাদের
মধ্যে যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ্ তাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন
যে,
তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন।''(সূরা
নূর : ৫৫)।
উপরের চারটি আয়াতেই বলা হচ্ছে -
''যারা
ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে''তাই
এটা নিশ্চিত যে ঈমান ও সৎকর্ম এক সূত্রে গাঁথা।
সৎকর্ম হচ্ছে ঈমান বা বিশ্বাসের সুবাস।
সৎ কর্ম করার অর্থই হচ্ছে অন্তর দিয়ে ঈমান আনা।
সৎকর্ম যদি বাড়তে থাকে তাহলে বাড়তে থাকে ঈমানের সুবাস আর সৎকর্ম যদি কমতে
থাকে তাহলে ঈমানের সুবাসও কমতে থাকে।
তাই হযরত আবু বকর রা. বলেন -
''কোন
সৎকাজ না করে যদি তোমার জীবন থেকে একটা দিনও চলে যায় তবে সেদিনটির জন্য
আক্ষেপে ক্রন্দন কর।''ঈমানের
স্বাভাবিক দাবী এই যে,
হৃদয়ে তার বীজ সুপ্ত হয়ে সৎ কাজের আকারে তার বৃক্ষ গজাবে।
যে ঈমান থেকে সৎকাজের বৃক্ষ গজায় না তা ঈমান নয়।
দৈনন্দিন জীবনে ও হাসতে,
খেলতে,
বলতে যারা কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস থেকে মুক্তির আন্দোলনের বিরোধিতা করে
তাদের ভেতরে ঈমান থাকতে পারে না এবং আল্লাহ্র কাছ থেকে কোনো প্রতিদান
পাওয়ার অধিকারও তাদের নেই।
ঈমান হচ্ছে এমন এক সুদৃঢ় বিশ্বাস যে,
মানুষের কার্যকলাপ প্রতিমুহূর্তে তার উপস্থিতি প্রমাণ করে।
বিশ্বাস যতক্ষণ পর্যন্ত না কার্যে রূপান্তরিত হয় ততক্ষণ পর্যন্ত তার কোন
মূল্যই নেই।
একই কথার প্রতিধ্বনি শুনি ইমাম গাজ্জালীর কন্ঠে,
তিনি বলেন -
'ঈমানের
অর্থ হচ্ছে মন-মানসের দ্বারা উপলব্ধি করা,
মৌখিক ভাবে মেনে নেয়া এবং বিশ্বাসকে কার্যে পরিণত করে দেখানো।'যদি
কেউ মনে মনে আল্লাহ্র অস্তিত্বকে মেনে নেয় কিন্তু তার কোন আচরণে
আল্লাহ্র প্রতি প্রীতি প্রদর্শিত না হয় তবে তাকে ঈমানদার বা বিশ্বাসী
বলা যাবে না।
ঈমানের প্রমাণ হচ্ছে সৎকর্ম,
তাই কোন ব্যক্তি যদি তার কর্মময় জীবনে ইসলাম বিরোধী কর্মপন্থা অবলম্বন
করে তবে শুধু মুখে
'আমি
ঈমান এনেছি'বলার
জন্য সে নিজেকে ঈমানদার বলে দাবী করতে পারেনা।
বিশ্বাসের সুবাস সৎকর্ম,
তাই সূফী সাধক আনোয়ারুল হক্ আশীর্বাদপুষ্ট হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ-এর
আদর্শ হচ্ছে - শান্তি,
লক্ষ্য হচ্ছে - সমাজ সংস্কার,
মূলনীতি হচ্ছে - ধর্ম মানবতার জন্য।
হাক্কানী মিশন আজ তাদের কার্যক্রমকে শিক্ষা,
গবেষণা,
সেবা ও প্রকাশনা এই চারটি মূলধারায় বিস্তৃত করেছে।
শিক্ষাই হচ্ছে উন্নয়নের সোপান।
তাই হাক্কানী মিশন গড়ে তুলেছে হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ ও হাক্কানী মিশন
মহাবিদ্যালয়।
উদ্যোগ নিয়েছে মানব সম্পদ উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষা ও বয়স্ক শিক্ষাকে
বিস্তৃত করার
।
ঈমানের সুবাস
'সৎস্বভাব
অর্জন'এবং
সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমাজে সত্য ও
শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হাক্কানী মিশন সাধারণ মানুষকে আত্যাত্মিক
শিক্ষা ও জ্ঞান দান করে যাচ্ছে।
ইসলামকে মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে গড়ে তুলেছে কুরআন গবেষণা
কেন্দ্র।
হাক্কানী মিশন বিশ্বাস করে ঈমানের সুবাস (সৎকর্ম) যদি না থাকে তবে
বিশ্বাস পরিণত হবে বিষে।
যে বিশ্বাস থেকে সৎকর্ম উৎসারিত হয় না সে বিশ্বাস বিষ নয়তো কি?
এজন্যই হাক্কানী মিশন তাদের সৎকর্মকে - সঞ্চয় ও ঋণদান প্রকল্প,
কল্যান তহবিল,
প্রবীণ কল্যান কার্যক্রম,
পথকন্যা পুনর্বাসন কর্মসূচি,
ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ,
ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা ইত্যাদি বহুধারায় প্রবাহিত করেছে।
আর গণজাগরণের হাতিয়ার হিসাবে পত্রিকা,
পুস্তিকা ও গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে মিশন চালিয়ে যাচ্ছে তাদের প্রকাশনা
কার্যক্রম।
''বিশ্বাসের
সুবাস উড়ে গেলে বিশ্বাস হয় বিষ।''আর
বিশ্বাসের সুবাস বা সৎকর্মে ডুবে থাকলে বিশ্বাস হয়ে উঠে অমৃত।
বিষক্রিয়ায় মৃত্যু ঘটে আর অমৃতক্রিয়ায় মানুষ মৃত্যুঞ্জয়ী হয়।
আসুন আমরা মৃত্যঞ্জয়ী হই।
হাক্কানী মিশনের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেই বিশ্বাসের সুবাস।
হযরত ইবনে মাজারী বলেন -''যদি
কয়েক মাসের মধ্যেই ফসল চাও তবে গমের চাষ কর।
যদি কয়েক বৎসর ফল চাও,
তবে গাছ লাগাও।
আর যদি পুরুষানুক্রমে ফল ভোগ করতে চাও,
তবে সৎ মানুষ সৃষ্টি করার আন্দোলনে শামিল হও।''
মিলাদুন্নবী
=
সীরাতুন্নবী
রুহুল আমিন
॥
১৮৩৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার কামারপুকুর গ্রামে
জন্মগ্রহণ করেন রামকৃষ্ণ।
তিনি ধর্ম সাধক ছিলেন।
তাঁর পিতার নাম ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় এবং মাতা চন্দ্রমণি দেবী।
তাঁর বাল্যনাম গদাধর।
বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে অনুশীলনের ফলে হিন্দু,
ইসলাম,
খ্রিস্ট,
শিখ,
বৌদ্ধ প্রভৃতি ধর্মের সঙ্গে তাঁর নিবিড় পরিচয় ঘটে।
১৮৫৫-তে রাণী রাসমণি নির্মিত দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ির পুরোহিত নিযুক্ত হন।
এখানে কালী সাধনায় তাঁর সিদ্ধি লাভ ঘটে।
তেইশ বছর বয়সে তিনি সারদামণির পাণি গ্রহণ করেন।
সারদামণির বয়স তখন ছিল ছয় বছর।
এ
ছিল নামে মাত্র বিবাহ,
উভয়ের মধ্যে কোনো কালেই কোনো দৈহিক সম্পর্ক ছিল না।
পরে উনিশ বছর বয়সে যখন সারদামণি দক্ষিণেশ্বরে আসেন,
তখন রামকৃষ্ণ তাঁকে সাক্ষাৎ জগদম্বা-জ্ঞানে পূজা করেন।
তাঁর সরল অনাড়ম্বর জীবন,
জ্ঞান ও উপদেশে মুগ্ধ হয়ে কলকাতার তৎকালীন শিক্ষিত সমাজ কর্তৃক তাঁকে
যুগাবতার রূপে মান্য করে।
সাধারণভাবে তিনি পরমহংসদেব নামে অভিহিত।
তিনি ধর্মের জটিল ও গভীর বিষয়গুলোকে অতি প্রাঞ্জলভাবে ব্যাখ্যা করতেন।
বিবেকানন্দ ছিলেন তাঁর অতি প্রিয় শিষ্য।
এছাড়া শিবনাথ শাস্ত্রী,
কেশবচন্দ্র সেন,
গিরিশচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তি তাঁর সংস্পর্শে আসেন।
ফরাসি মনীষী রঁমা রোঁলা স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে আলোচনা করে রামকৃষ্ণ
দেব সম্পর্কে এক বৃহৎ জীবনী প্রণয়ন করেন।
রামকৃষ্ণের উপদেশাবলী
'শ্রী
শ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃত'
নাম পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়।
'শক্তি'র
উপাসনা তাঁর ধর্মমতের মূল কথা।
ধর্ম সম্পর্কে তাঁর ব্যাখ্যা :
'সব
ধর্মই সত্য।
যত মত তত পথ'।
রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব এক বিরাট প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছেন।
দেশে-বিদেশে তাঁর অসংখ্য ভক্ত আছে এবং ভক্তগণ কর্তৃক রামকৃষ্ণ মিশন
প্রতিষ্ঠা তাঁর বিপুল প্রভাবকেই প্রমাণিত করে।
মূর্তিগড়া,
ছবি আঁকা এবং অভিনয় কলাতেও পারদর্শী ছিলেন।
তিনি পরলোক গমণ করেন ১৮৮৬ সালের ১৬ জুন।
শান্তির অন্বেষায় সূফীতত্ত্ব (১০)
(পূর্ব প্রকাশের পর)
জালালুদ্দীনের মতে প্রেম হচ্ছে আত্মসম্মান ও অহংকার দূর করার মহৌষধ।
আমাদের সকল সংশয় দূর করার চিকিৎসক যে প্রেমের পোশাক পরিধান করেছে সেই শুধু
স্বার্থত্যাগী হতে পারে।’
নূরী,
রাককাস ও অন্যান্য সূফীদেরকে প্রচলিত আরবীয় ধর্মের বিরোধিতা করায়
মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়।
জল্লাদ রাককাসের দিকে অগ্রসর হওয়া মাত্র নূরী উল্লাস ও আনন্দের সাথে উঠে
দাঁড়ান এবং রাককাসের পরিবর্তে তাকে বধ্যভূমিতে আগে নেয়ার অনুরোধ করলে,
জল্লাদ বলে উঠলেন,
'হে
যুবক তরবারী কোনো সুখপ্রদ বস্তু নয় এবং তোমার পালা এখনও আসে নাই।'নূরী
জবাব দিলেন,
'আমার
ধর্ম স্বার্থ ত্যাগের উপর প্রতিষ্ঠিত।
পৃথিবীতে জীবন সবচেয়ে দামী।
আমি
আমার বন্ধুকে এ জীবন আরও কিছুক্ষণের জন্য ভোগ করতে দিতে চাই।’
নূরী নিম্নোক্ত রূপে প্রার্থনা করতেন।
'হে
প্রভু,
তুমি সকল জ্ঞান ও শক্তির অধিকারী।
তুমি পাপী মানুষদেরকে দোজখে পুড়িয়ে শাস্তি দেবে।
তুমি পাপীদের দ্বারা দোজখ পূর্ণ করতে দূঢ় সংকল্প করলে তাহলে আমাকে দিয়ে সেই
ইচ্ছা পূরণ করো এবং অন্যদেরকে বেহেশতে যেতে দাও।’
সূফীরা মুর্শিদ ভালোবাসেন,
তাকে সকল সৃষ্টির মধ্যে প্রত্যক্ষ করেন,
তাদের সকল কাজের ভিত্তি হচ্ছে প্রেম।
একটি অসুখীকে আনন্দ দাও,
তাহলে তোমার কর্ম হাজার মন্দির গড়ার চেয়ে উত্তম হবে।
তোমার প্রেমে কেউ উৎফুল্ল হলে,
তবে
তা হবে হাজার ক্রীতদাস মুক্ত করার চেয়ে উত্তম।’
পশু-পাখী,
কীট-পতঙ্গের প্রতি মুসলিম সাধকদের দয়া রূপকথার মত বিখ্যাত।
বলা
হয় সূফী সাধক বায়জীদ হামাদাহান শহরে ভ্রমনের সময় কিছু এলাচ ক্রয় করেন।
ভ্রমন শেষে অব্যবহৃত এলাচ আলখেল্লার পকেটে রেখে তিনি ফিরতি যাত্রা করেন।
বিস্তাম শহরে ফেরত এসে তিনি পকেট হতে এলাচ বের করে তাতে কয়েকটি পিঁপড়া
দেখতে পেয়ে বলে উঠেন,
'আমি
এদেরকে ঘর ছাড়া করেছি যা ঠিক হয় নি।
এদেরকে ঘরে ফেরত দিয়ে আসা উচিৎ।'তিনি
সাথে সাথে কয়েকশত মাইল দূরে অবস্থিত হামাদাহান শহরের দিকে পুনঃ যাত্রা করেন।
এই
দয়া হচ্ছে সর্বেশ্বরবাদীর প্রেমের নিদর্শন।
সূফীরা স্রষ্টাকে অত্যুৎকৃষ্ট ব্যক্তিত্ব রূপে চিন্তা করেন,
যা
পরবর্তীকালে সর্বশক্তি রূপে নয়।
এই
চিন্তা হতে তারা মানবীয় গুণাবলী যথা - মায়া মমতাকে নিষ্ঠুর ভাবে পরিহার
করতেন।
সাধক ফুদায়েল ইবনে আইয়াদ-এর জীবনের একটা হৃদয় বিদারক ঘটনা এখানে বর্ণনা
করা হলো :
'একদিন
তিনি তার চার বছরের ছেলেকে কোলে নিয়ে চুমা দিতে উদ্যত হলেন।
ছেলে প্রশ্ন করলো,
'পিতা
তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?'হ্যাঁ
- তিনি উত্তর দিলেন।
'তুমি
কি স্রষ্টাকে ভালোবাসো?'ছেলে
প্রশ্ন করলো।
হ্যাঁ - তিনি বললেন।
ছেলে আবার প্রশ্ন করলো
'তোমার
কয়টা হৃদয়?'একটা।
ছেলে পুনঃ বললো,
'তাহলে
তুমি এক হৃদয় দিয়ে দু’জনকে
কিভাবে ভালোবাসো?'ফুদায়েল
বুঝতে পারলেন যে ছেলের কথার মাধ্যমে স্রষ্টা তাকে তিরষ্কার করছেন।
তিনি তার ভুলের জন্য নিজের মাথায় আঘাত করতে লাগলেন এবং এরপর হতে
সম্পূর্ণভাবে মুর্শিদ প্রেমে মশগুল হয়ে পড়লেন।’
সূফীরা প্রেমকেই চির সত্যের সাথে সেতু বন্ধন রূপে মনে করে থাকেন।
জালালুদ্দীন রূমীর মতে : ইহজগতে বা পরজগতে প্রেমই তোমাকে ঐখানে নিয়ে যাবে।
হুজুউরীর মতে,
প্রেম এমন গুণ যা সাধকের হৃদয়ে গভীর শ্রদ্ধার ও ভক্তির জন্ম দেয়।
সে
তার প্রেমাস্পদকে খুশি করার এবং তাকে দেখার জন্য উদগ্রীব থাকে এবং তাকে
ছাড়া শান্ত হতে পারে না।
বিশ্রাম তার জন্য অবৈধ হয়ে পড়ে এবং শান্তি দূরে সরে যায়।
সে
সব কিছু পরিত্যাগ করে প্রেমের মাঝে মুর্শিদের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
এই
সকল সাধক ব্যক্তিত্বরা তাদের সহচরদেরকে ভালোবেসে থাকেন।
তারা একমাত্র মুর্শিদের শাস্তি ছাড়া অন্য শাস্ত্তি গ্রাহ্য করে না।
মুর্শিদের শাস্ত্তি তাদের কাছে মধুর মনে হয়।
মুর্শিদ কাউকে ভালোবাসলে তিনটা বস্তু দিয়ে থাকেন।
১)
সমুদ্রের মতো উদারতা;
২)
সূর্যের মতো সহানুভূতি;
এবং
৩) মাটির মতো নম্রতা।
একজন বিশ্বাসীর কাছে কোনো কষ্টই তখন কষ্ট বলে মনে হয় না।
ইবনে আল আরাবীর মতে ইসলাম হচ্ছে সম্পূর্ণরুপে প্রেমের ধর্ম।
নবী
মোহাম্মদ (সাঃ)-কে স্রষ্টা স্বয়ং প্রশংসা করেছেন।
কুরআনে এই তত্ত্বের কথা বার বার বলা হয়েছে।
প্রেম হচ্ছে ঐশী দান একে অর্জন করা যায় না।
সারা পৃথিবী এই প্রেমের কাঙাল হলেও একে পাবে না বা একে পরিহার করতে চাইলে
পরিহার করতে পারবে না।
মুর্শিদ যাদেরকে ভালোবাসেন তারাই ক্রমান্বয়ে প্রেমিক হন।
জালালুদ্দীন রুমী বলেন,
মানুষের প্রেম বিশ্বে নীতিকথার মত চালু আছে।
জনৈক পরহেজগার ব্যক্তি জোরে জোরে প্রার্থনা করার সময় শয়তান তার সামনে এসে
বললো, 'খোদা,
খোদা বলে তুমি কতক্ষণ চিৎকার করবে।
তুমি শান্ত হও।
কারণ খোদা তোমার চিৎকারের জবাব দেবে না।
ফলে
মুসল্লী তার মাথা নিচু করে চুপ হয়ে পড়লো।
কিছু সময় পর তিনি খিজির (আঃ)-কে দেখতে পেলেন।
খিজির (আঃ) তাকে বললেন,
'তুমি
কেনো খোদার নাম নেয়া হতে বিরত হলে?'কারণ
তার কাছ থেকে কোনো উত্তর পাই না।’-
তিনি উত্তর দিলেন।
খিজির (আঃ) বললেন খোদা আমাকে তোমার কাছে পাঠিয়েছে এই কথা বলার জন্য যে -
'আমি
কি তোমাকে কাজের জন্য পাঠাইনি?
আমার নাম স্মরণ করার জন্য কি বলিনি?
তোমার ডাকার সাথে সাথে আমি কি আসি নি?
আমার রসুল কি বলে নি?
সকল
অশ্রু,
চিৎকার বা প্রার্থনা আমার কাছে চুম্বকের আকর্ষণের মত চলে আসে।’
ঐশী
প্রেম বর্ণনাতীত।
তথাপি এর নমুনা দৃশ্যমান হয়।
সূফী সাধক সারী আল সাকতি প্রেম সম্পর্কে জুনায়েদকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন
-
'অনেকে
একে ঐক্যতান আবার অনেকে একে পরার্থবাদ বলে বর্ণনা করেছেন।'সারী
তার হাতের চামড়া টেনে ধরলেন কিন্তু তা লম্বা হলো না।
তিনি বললেন,
'আল্লাহ্র
কসম,
এই
চামড়া হাড়ের উপর দৃঢ়ভাবে তার প্রেমের কারণেই লেগে আছে।'তিনি
নেশাগ্রস্তের মতো চলে গেলেন।
তার
মুখমন্ডলে আলোর ছটা দেখা যাচ্ছিলো।’
ঐশী
রহস্যের মধ্যে প্রেম হচ্ছে অন্যতম।
সকল
ধর্মেই এর উল্লেখ আছে।
প্রেম স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই অন্তরে জাগরিত হয়।
অন্তরের এই আলো কে যে দেখতে পেয়েছে সে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করেছে।
নিম্নের উদ্ধৃতি সমূহ প্রেমের ব্যাপারে কিছুটা ধারণা দিতে সক্ষম হবে।
'হে
খোদা এই জগতে যা কিছু তুমি আমার জন্য বরাদ্দ করেছো তা তুমি আমার শত্রুদেরকে
দান করো।
পরজগতে আমার জন্য যা বরাদ্দ রেখেছো তা তোমার বন্ধুদেরকে দেও।
আমার জন্য তুমিই যথেষ্ট।'(রাবেয়া
বসরী)
'হে
খোদা যদি দোজখের ভয়ে তোমার উপাসনা করি তা হলে দোজখের আগুনে আমাকে জ্বালিও।
যদি
বেহেশতের লোভে তোমার উপাসনা করি তবে আমাকে বেহেশতে দিও না।
যদি
তোমাকে পাওয়ার আশায় উপাসনা করে থাকি তবে তোমার রূপ দর্শন হতে বঞ্চিত করো না।'(রাবেয়া
বসরী)
কিছুক্ষণের জন্য মুর্শিদকে অনুভব করা সৃষ্টি জগতের প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত
উপাসনার চেয়ে উত্তম।
প্রেমাস্পদ হতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার তুলনায় আগুনের ভীতি হচ্ছে মহাসমুদ্রের এক
ফোটা পানির মতো।
আমার হৃদয় তোমা মুখী না হলে,
আমার প্রার্থনা কোনোভাবেই প্রার্থনা হবে না।
তোমার প্রেমে যদি তোমার দিকে না তাকাই তবে তুমি এবং প্রার্থনা কোনটাই সঠিক
হবে না।
প্রেম হচ্ছে স্বর্গীয় অনুভূতি।
প্রেম,
যা শান্তির দিকে উড়াল দিতে চায়,
সত্যের পথ ধরে প্রতি পদে কঠিন আবরণ চূর্ণ করে,
প্রথম পদে ভোগের জীবনকে পরিত্যাগ করে,
শেষ পদে এই পৃথিবীকে তুচ্ছ করে আর নিজের সত্তা ভুলে।
প্রতিটি অণুর গতি তার মূলের দিকে,
সেইরকম মানুষ সেদিকে ঝুঁকে যেখান থেকে এসেছে।
প্রেমের আকর্ষণে প্রেমিক,
প্রেমাস্পদের গুণাবলী ধারণ করে,
যে কিনা চরম লক্ষ্য।
মানুষ সেদিকে ঝুঁকে যেখান থেকে এসেছে এর অর্থ কি?
মানুষ তাই যা সে ভালোবাসে।
পাথরকে ভালোবাসলে সে পাথর,
মানুষকে ভালোবাসলে মানুষ,
স্রষ্টাকে ভালোবাসলে সে........?
এর উত্তর না দেয়াই শ্রেয়।
যার যার মতো বুঝে নেয়াই ভালো।
অধ্যাত্মবাদীরা অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে থাকেন।
সাধকরা মুর্শিদের সাথে মিলিত হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়তার সাথেই তাদের মত
ব্যক্ত করে থাকেন।
সূফী সাধক আবু সাঈদ বলেন - আমার হৃদয়ে তুমি অধিষ্ঠিত,
তা না হলে রক্তের সাথে বের করে দিতাম।
আমার চোখে তুমি ঝলমল করো,
তা না হলে কান্নার সাথে বের করে দিতাম।
আমার হৃদয়ের বাসনা তোমার সাথে এক,
তা না হলে আমার দেহ হতে তোমাকে বের করে দিতাম।
প্রেমাষ্পদের প্রতি প্রেমিকের ভালোবাসা হচ্ছে প্রেমিকের প্রতি
প্রেমাষ্পদের ভালোবাসা।
প্রেমিককে ভালোবাসার অর্থ নিজকে ভালোবাসা।
এর ফলে নিজকে নিজের কাছে টেনে নেয়া।
জালালুদ্দীন রুমী বলেন :-
'হে
আমার স্রষ্টা,
তোমাকে আমি পথে পথে খুঁজেছি,
কিন্তু প্রেমাস্পদকে ছাড়া তোমাকে পাই নাই।
আমাকে নাস্তিক বলো না যদি বলি প্রেমাস্পদ আমার স্রষ্টা,
প্রেমাস্পদ যখন দেখা দেয় তখন প্রেমিক কোথায় থাকে?
সবখানে অথবা কোনখানেই নয়।
তার নিজস্ব সত্তা তার থেকে চলে যায়,
প্রেমাষ্পদের সাথে প্রেমিকের মিলন ঘটে।
(চলবে)
আত্মদর্শনঃ পথের বাঁকে বাঁকে (১১)
সংলাপ
॥
ইচ্ছাকে নিয়ে শুধু পড়ে থাকলে বস্তুলাভ হয় না।
সত্যকে ধরে থাকবার ইচ্ছা জাগালে,
সত্যরক্ষা করতে পারা যায়।
তা
না হোলে সত্যরক্ষা করতে পারা যায় না।
সত্যই হচ্ছে সাধকের শক্তি।
সেই
শক্তিকেই যে যত ধরে কাজ করতে পারবে,
তার
তত সত্যরক্ষা হবে।
এই
সত্যই হচ্ছে মানুষের একমাত্র উদ্ধারের পথ।
জ্ঞান,
যোগ,
ভক্তি সবই সত্যকে ধরবার জন্য।
সত্যকে না ধরে এসব পথে চললে কোন আত্মিক উন্নতি হয় না।
ব্যাধি হল মূল শারীরিক মিথ্যা এবং চিকিৎসক হল সেই গুরু যাঁর কাজ জগতে
সত্যের জন্য যুদ্ধ করে চলা।
নিজের ক্ষেত্রে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিকার হল নিজের ত্রুটি ও বাধা সম্বন্ধে শুধু
চিন্তা নয় তার সঙ্গে করতে হবে,
যে
আদর্শ ও কর্ম দিয়েছেন গুরু তা পূর্ণ করতে।
একটা বিপর্যয় আসলে,
প্রতিবাদ করা ঠিক নয়।
তাকে গ্রহণ করতে হবে আশীর্বাদ রূপে,
আর
তখনই তা গুরুর পক্ষ থেকে আশীর্বাদ হয়ে উঠবে।
গুরুর ছত্রছায়ায় যারা রয়েছেন,
তারা আর অন্য সাধারণ মানুষ সকলে যা পারে না তাই করবার জন্যে,
সাধারণ মানুষ পারে না কারণ তাদের ধারণাতেই আসে না এমন কিছু করা যায় গুরুর
ছত্রছায়ায়।
গুরু চান ভবিষ্যতের সন্তান যারা,
তাদের কাছে ভবিষ্যতের পথ খুলে ধরতে।
দুঃখভোগ যে করতেই হবে এমন বাধ্য-বাধকতা কিছু নেই,
আর
তা বাঞ্ছনীয়ও নয়।
তবে
শিষ্যের কাছে দুঃখ এসে পড়লে,
তখন
তা পার্থিব অনেক সাহায্যও করতে পারে জ্ঞান অর্জনের পথে।
দুরাকাঙ্খা ভাল নয়,
কোনোরকম ভান করা তা মিথ্যাচারিতার সামিল।
গুরুর চোখে তা ধরা পড়ে।
প্রত্যেক মুহূর্তে হয়ে ওঠ ততটা যতখানি হয়ে ওঠা তোমার পক্ষে সম্ভব।
সৃষ্টির মধ্যে শিষ্যের স্থান কোথায়,
একমাত্র গুরুই তা নির্দেশ করে দিবেন।
সর্বদা প্রেমের অধিকার সম্বন্ধে বলা হয়-প্রেমের একমাত্র অধিকার নিজেকে দান
করা অর্থাৎ পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ।
গুরুজ্ঞানের কাজ হল,
শিষ্যের নিজেকে ও জগৎকে জাগিয়ে তোলা যাতে আসে পূর্ণসৌষ্ঠব।
এই
পূর্ণসৌষ্ঠব হল গুরুর নিজস্ব বস্তু,
আর
কেউ জানতেও পারে না কী সে বস্তু! বাধাবিঘ্ন সব শিষ্যের কাছে পাঠানো হয়ে
থাকে কেবল শিষ্যের সিদ্ধি পরিপূর্ণ নিখুঁত করে তোলবার জন্য।
যতবার শিষ্য চেষ্টা করে একটা কিছু সিদ্ধি অর্জন করতে এবং যতবারই একটা বাধা
বা বিঘ্ন,
এমনকি ব্যর্থতা এসে পড়ে-অর্থাৎ ধারণা হয় তা ব্যর্থতা-ততবার তার সম্বন্ধে
জানতে হবে,
কখনও ভুললে চলবে না যে এ হল শুধু সিদ্ধিকে পরিপূর্ণ নিখুঁত করে তোলবার জন্য
গুরুর নির্দেশ।
হতাশ হওয়া,
অস্বস্তি বোধ করা বা নিজের উপর দোষারোপ করা- এসবই হল পুরোপুরি নির্বুদ্ধিতা।
বিনীত হওয়ার অর্থ চিন্তায়-প্রাণে-দেহে কখনও ভুলবে না যে গুরু ছাড়া আর
কিছুই জানো,
আর কিছু করতে পারো।
গুরু ছাড়া হল কেবল অজ্ঞান,
বিশৃঙ্খলা (চিন্তায়) এবং অক্ষমতা।
একমাত্র গুরুই সত্য-জীবন-শক্তি-প্রেম-আনন্দ।
কাজেই দেহ জুড়ে এই জ্ঞান এই বোধ হওয়া চাই যে গুরুকে বুঝবার বিচার করবার
বিন্দুমাত্র ক্ষমতা শিষ্যের নেই,
শুধু গুরুর স্বরূপ নয়,
তাঁর কর্ম,
তাঁর প্রকাশও শিষ্যের জ্ঞানের বাহিরে।
এই ভাব ধারণ করা হচ্ছে একমাত্র সত্যিকার বিনয়,
এটা থাকলেই মেলে স্থিরতা,
শান্ত ভাব।
স্মরণ রাখতে হবে শান্তভাব থেকে আসে শান্তি।
শান্ত থাকা হচ্ছে সকল অশান্তির আক্রমণের বিরুদ্ধে একমাত্র নিরাপদ ধর্ম।
সত্যি কথা বলতে কি,
মানুষের মধ্যে বহু শক্তি ভিতর ও বাহির হতে এসে যে দরজা দিয়ে ভিতরে করাঘাত
করে তা হল অহংকার,
এই দরজার ভেতর দিয়েই সে আসে-যায়।
কেবলমাত্র শিষ্যের জীবনযাত্রার পরিবর্তন দ্বারা আশা করতে পারা যায়
সত্যিকার স্বাস্থ্য ও উন্নতির বর্তমান অবস্থা।
কোনো মানুষী ইচ্ছাই শেষ পর্যন্ত গুরুর ইচ্ছার বিরুদ্ধে টিকে না।
শিষ্য সম্পূর্ণভাবে কেবলমাত্র গুরুকে অনুসরণ- আদেশ,
উপদেশ ও হুকুমের পক্ষে গিয়ে দাঁড়ালে,
শেষ পর্যন্ত বিজয় সুনিশ্চিত।
সময়ের কথা না ভেবে,
স্থানিক ও অর্থনৈতিক ভয় না করে,
শিষ্য এগিয়ে চলবে,
অগ্নি-পরীক্ষার ভেতর দিয়ে পবিত্র-হয়ে না থেমে কেবল শিষ্য উড়ে চলবে
সিদ্ধির লক্ষ্যের অভিমুখে- অতিমানসের বিজয়ের দিকে।
অন্যকে
'সাহায্য'করবার
বাসনা যেন শিষ্যকে পেয়ে না বসে-শিষ্যের কর্তব্য অন্তর-স্থিতি থেকে নিজে
ঠিক মতো কাজ করা,
ঠিকমতো চলা আর অপরকে সাহায্য করার ব্যাপারটা গুরুর ওপর ছেড়ে দেয়া।
কেউ কাউকে সাহায্য করতে পারে না-একমাত্র গুরুর করুণা ছাড়া।
আগে ভেতরটা,
বাইরেটা পরে।
তা নইলে শিষ্যের অন্তর-শক্তি ও জ্ঞানের সীমা ছাড়িয়ে কিছু করতে গেলে তা
ব্যর্থ হবে,
ভেঙে পড়বেই।
শিশু তার আপন বিকাশের জন্য মোটেই চিন্তা করে না,
সে আপনা থেকেই সহজে বেড়ে ওঠে।
চলতে হয় ঋজু হয়ে দৃঢ়ভাবে লক্ষ্য সম্বন্ধে সচেতন হয়ে,
নিজের মাঝে গুরুর অবস্থান নিয়ে।
পূর্ণ সিদ্ধির পথে যে শিষ্য এগিয়ে যেতে চায়,
সে কখনো জীবনের বাধাবিঘ্নের জন্য প্রতিবাদ করে না-প্রতিটি বাধাই হল আরও
এক-পা এগিয়ে যাবার সুযোগ-প্রতিবাদ মানেই হল দুর্বলতা ও কপটতার লক্ষণ।
গুরু বলতে শিষ্যের বিশ্বাস- যা কিছু জ্ঞান শিষ্যকে অর্জন করতে হবে,
যা কিছু শক্তি লাভ করতে হবে,
যতটুকু ভালোবাসার পাত্র শিষ্যকে হয়ে উঠতে হবে,
পরিপূর্ণতা পেতে হবে,
জ্যোতি আর আনন্দকে অবলম্বন করে যা-কিছু সুসঙ্গতিময় ও প্রগতিমূলক জীবনে
প্রকাশ করতে হবে,
যা কিছু অজ্ঞাত এবং অভিনব আলো রয়েছে তাদের উপলব্ধি করতে গুরুই সর্বেসর্বা
এবং গুরুই আধার।
গুরু শিষ্যদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন আবার যাকে ইচ্ছা সত্য ও
শান্তির লক্ষ্যে পথ চলার পদ্ধতির উপদেশ দেন।
গুরু সকল শিষ্যের,
কিন্তু একমাত্র গুরুই জানেন শিষ্য তাঁর কে।
যেহেতু গুরু প্রজ্ঞাময় ও তত্বজ্ঞানী সেহেতু শিষ্যের চিন্তার স্তর অনুসারে
তাকে মর্যাদায় আসীন করেন।
আবার তা রক্ষা করতে না পারলে শিষ্য নিজ কর্মফলে অশান্তির মধ্যে কালযাপন
করেন।
গুরু ইচ্ছা করলে কর্মের মাধ্যমে পরীক্ষা করে শিষ্যকে দূরে সরিয়ে দিতে
পারেন আবার যাকে ইচ্ছা ওই শিষ্যের জায়গায় বসাতে পারেন।
শিষ্যদের মধ্যে যারা নিজের সাথে অন্য শিষ্যের তুলনা করেন এমনকি গুরুর
সঙ্গেও নিজেকে তুলনা করেন তারা ভ্রান্তপথে আছেন।
গুরুর প্রতি আদবই শিষ্যের সবচেয়ে মহামূল্যবান ধন।
চিলিতে ভয়াল ভূমিকম্প
শহীদুল্লাহ
॥
গত শনিবার ভোরে চিলিতে ভয়াল ভূমিকম্পে ৪০০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দ্রুত বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা।
ভূকম্প অনুভূত হয়েছে আর্জেন্টিনাতেও।
জানা গিয়েছে,
রিখটার স্কেলে কম্পনের তীব্রতা ছিল ৮.৮।
মার্কিন জিওলজিক্যাল সার্ভে বলেছে,
মোট ২০টি
'আফটার
শক’ও
হয়েছে।
এর মধ্যে একটি তীব্রতা ছিল ৫।
প্রশ্ন উঠেছে এটা প্রাকৃতিক নাকি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের প্রাকৃতিক পরিশোধ।
বিধ্বংসী এই ভূকম্পে সমুদ্রগর্ভে তৈরি হয় সুনামি।
দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে ৭০০ কিমি দূরে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত
রবিনসন ক্রুসো দ্বীপে বিশাল উঁচু ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে।
উত্তাল সাগরের বাধা পেরিয়েই রওনা হয়েছে এক ঝাঁক উদ্ধারকারী জাহাজ।
চিলিতে ভয়ানক ভূকম্পনের জেরে সতর্কতা জারি হয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন
দেশ,
হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ,
অস্ট্রেলিয়া,
নিউজিল্যান্ড,
ফিলিপিন্স,
রাশিয়া,
জাপান এমনকী আ্যান্টার্কটিকাতেও।
প্যাসিফিক সুনামি ওয়ার্নিং সেন্টার এক সতর্কতায় বলেছে,
প্রশান্ত মহাসাগর উত্তাল হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা গিলে নিতে পারে।
ঢেউয়ের উচ্চতা হতে পারে ন’ফুট
পর্যন্ত।
টোকিওর খবর,
জাপানের বিস্তীর্ণ এলাকাকে সুনামির আশঙ্কায় সতর্ক করা হয়েছে।
কাল রবিবার ভারতীয় সময় অনুযায়ী সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ সুনামি এসে আছড়ে পড়তে
পারে জাপানে।
এদিন ভোরে রাজধানী সান্তিয়াগো দুলে ওঠে ভূকম্পে।
কম্পন স্থায়ী ছিল দেড় মিনিট।
প্রেসিডেন্ট মিচেলে বাচেলেত জানিয়েছেন,
অনেক বহুতল গুঁড়িয়ে গিয়েছে।
ফোন ও বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে রাজধানীর বেশিরভাগ জায়গায়।
এখনও পর্যন্ত প্রাণ ও সম্পত্তিহানির পুরো ছবিটা জানা সম্ভব হয়নি।
তবে উদ্ধার ও ত্রাণের কাজ চলছে পুরোদমে।
হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।
বিস্তারিত তথ্য পাওয়া মাত্র সব প্রকাশ করা হবে।
দেশের সব নিউজ চ্যানেলেই দেখা গিয়েছে,
গুড়িয়ে যাওয়া বহুতল,
দোমড়ানো গাড়ির ছবি।
বহু মানুষ এসে দাঁড়িয়েছেন পথে।
কেউ কেউ রাস্তাতেই আগুন জ্বেলে ঠান্ডার হাত থেকে স্বস্তি খুঁজছেন।
আরো 'আফটার
শকে’র
আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।
স্থানীয় সময় ভোর তিনটে বেজে ৩৪ মিনিটে (বাংলাদেশী সময় শুক্রবার রাত ১২টা
বেজে ৩৪ মিনিট নাগাদ) কম্পন শুরু হয়।
একটি রিপোর্ট অনুসারে,
সান্তিয়াগো থেকে ৩২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে মাটির ৩৫ কিলোমিটার ভিতর
ছিল কম্পনের উৎসস্থল।
প্রেসিডেন্ট বাচেলেত এও জানিয়েছেন,
উদ্ধার ও ত্রাণের জন্য আমরা যতটা সম্ভব চেষ্টা করছি।
অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে,
বিও বিও নদীর তীরে রয়েছে চিলির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর কনসেপসিওন।
সেখান বাস করেন দু’লক্ষ
মানুষ।
ওই শহর থেকে ১১৫ কিলোমিটার দূরেই ছিল ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র।
সান্তিয়াগোর ক্রাউন প্লাজা হোটেলের ২০ তলায় ছিলেন আমেরিকান মার্কো ভিদাল।
তিনি বলেছেন,
'হঠাৎ
সব কিছু হুড়মুড়িয়ে মাটিতে পড়তে শুরু করল।
তারপর ঘরটাই দুলতে শুরু করল দক্ষিণ থেকে উত্তরে।
আমি ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম।'
চিলিতে সবচেয়ে ভয়ানক ভূকম্প হয়েছিল ১৯৬০ সালে।
সেবার দেড় হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
গৃহহীন হয়েছিলেন ২০ লক্ষ লোক।
ধূমপান মানেই বিষপান
সংলাপ
॥
উন্নয়নশীল দেশে পুরুষরা বেশি ধূমপান করেন।
বন্ধুদের অনুরোধ তার ওপর স্বাস্থ্য সম্পর্কে কম উদ্বেগ এবং ক্রয় ক্ষমতা -
বেশি সিগারেট খাওয়ার এটাই প্রাথমিক সোপান।
সচেতনতা এবং ধূমপানের ওপর বিধি নিষেধ থাকার কারণে চলতি সময়ে উন্নত দেশে
মানুষের মধ্যে ধূমপানের হার কমে যাচ্ছে।
সেই জন্য সিগারেট কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসাকে তৃতীয় বিশ্বের দেশের দিকে
ঠেলে দিচ্ছে।
এই মুহূর্তে যা পরিস্থিতি তাতে উন্নত দেশে মহিলারা এখন বেশি ধূমপান করছেন।
মানসিক চাপ ও দেহের ওজন কমানোর জন্য মহিলারা এখন ধূমপানে বেশি অভ্যস্ত
হয়ে পড়ছেন।
মারাত্মক ক্ষতির কথা জেনেও ধূমপায়ীরা প্রত্যহ খেয়ে যাচ্ছেন একের পর এক
সিগারেট।
ধূমপান থেকে রোগ-ফুসফুস,
গলা,
মুখ,
খাদ্যনালী,
অগ্নাশয়,
বৃক্ক,
মূত্রথলি,
জরায়ু এবং পাকস্থলীর ক্যান্সার হতে পারে।
এছাড়াও লিউকোমিয়া (এক ধরনের রক্তের ক্যান্সার),
ফুসফুসের অন্যান্য রোগ (যেমন এফাইসিম),
রক্তনালী শক্ত এবং সরু হয়ে যাওয়া (অ্যাথেরোস্কেলেরোসিস),
দাঁতের মাড়ির রোগ,
চোখের সমস্যা,
এমনকি দৃষ্টিহীনতা পর্যন্ত হতে পারে।
এছাড়া ধূমপান করলে যে কোনো অসুখই দীর্ঘস্থায়ী হয়।
অপারেশনের পর ক্ষতস্থানে সংক্রমণ বাড়ে।
গর্ভধারণের সমস্যা হয়।
কোমর বা উরুর হাড় ভাঙার ঝুঁকি বাড়ে।
গর্ভাবস্থায় ধূমপান শরীরে সাংঘাতিক প্রভাব ফেলে।
গর্ভফুল (প্লাসেন্টা) জরায়ু মুখের খুব কাছাকাছি চলে আসে,
তাতে স্বাভাবিক প্রসব বাধাপ্রাপ্ত হয়।
সেক্ষেত্রে সিজারিয়ান অপারেশন ছাড়া উপায় থাকে না।
গর্ভফুল সঠিক সময়ের আগেই
'লেবার
পেইন'হয়
অথবা গর্ভেই বাচ্চার মৃত্যু হতে পারে।
ধূমপান ছেড়ে দিলে আপনি যে বাড়তি সুফল পেতে পারেন - ধূমপানের জন্য বারংবার
কর্মস্থল বা ঘর ছেড়ে বেরোতে হবে না।
আপনার দাঁত পরিষ্কার থাকবে।
আপনার শ্বাস দুর্গন্ধমুক্ত হবে।
আপনার আঙুলের নিকোটিন রঙ হালকা হয়ে যাবে।
আপনার ত্বকের কুঁচকানো ভাব কমে যাবে।
খাবারের ঘ্রাণ ও স্বাদ আগের থেকে ভালো উপভোগ করতে পারবেন।
দেহে বেশি করে শক্তি অনুভব করবেন।
ধূমপান ছাড়ার উপায়-দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিন এবং ভালো বোধ করুন! যদি আপনি
অভিনন্দন! এতে আপনার স্বাস্থ্যই শুধু উন্নত হবে না,
আপনি আপনার প্রিয়জনদের স্বাস্থ্যও রক্ষা করতে পারবেন পরোক্ষ ধূমপান থেকে।
এটা কঠিন সত্য যে,
ধূমপান একেবারে ছেড়ে দেয়া অত্যন্ত কঠিন।
আপনি কি জানেন,
অনেক ধূমপায়ীই ভালোর জন্য ধূমপান ছাড়তে চান কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হওয়ার
আগে দুই বা তিনবার ব্যর্থ হয়?
সিগারেটের মূল উপাদান
'নিকোটিন'সাংঘাতিক
এক আসক্তির উপাদান।
সুসংবাদটি হচ্ছে,
নিজের পরিবারের কথা ভেবে লক্ষ লক্ষ মানুষ ধূমপান ছেড়ে দিতে পারছেন।
ধূমপান ছেড়ে দেয়া কঠিন কাজ হলেও সম্ভব।
আপনি শিহরিত হবেন,
যখন নিজেকে ব্যয়বহুল একটি নেশা থেকে মুক্ত করতে পারবেন।
নিজে নিশ্চিত হবেন আপনার ধূমপান অন্যের ক্ষতি করবে না।
ধূমপান ছাড়ার পাঁচটি টিপস: (গবেষণালব্ধ ফল) বিশেষ একটি দিন ঠিক করুন।
দিনটির আগে দিন সব সিগারেট,
অ্যাসট্রে এবং লাইটার ফেলে দিন।
আপনার বাড়িতে অন্য কাউকে ধূমপান করতে দেবেন না।
একটি কাগজে লিখে রাখুন কেন আপনি ধূমপান ছাড়তে চান এবং লিস্টটি সংরক্ষণ
করুন রিমাইন্ডার হিসাবে।
আপনার পরিবার,
বন্ধু এবং সহকর্মীর সহযোগিতা নিন।
গবেষণায় দেখা গেছে,
অন্যের সহযোগিতা পেলে ধূমপান ছাড়া সহজ।
আপনার কাছে যারা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি,
ধূমপান ছাড়ার তারিখটি তাদের জানিয়ে রাখুন।
তাদের কাছ থেকে সহযোগিতা চান।
অনুরোধ করুন তারা যেন আপনার চারপাশে ধূমপান না করেন বা সিগারেট অফার না
করেন।
ধূমপানের বিকল্প খুঁজুন।
যখন ধূমপান করার ইচ্ছে হবে,
এমন কিছু করুন,
যাতে আপনার মন ওই বিষয় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
বন্ধুর সঙ্গে কথা বলুন,
হাঁটতে বের হয়ে যান,
অথবা সিনেমা দেখতে হলে চলে যান।
চিনিবিহীন চিউয়িং গাম,
লজেন্স বা জোয়ান খেতে পারেন।
এগুলো ধূমপানের আকাঙ্খাকে কমিয়ে দেয়।
প্রচুর জল,
পারলে ফলের রস খান।
এর সঙ্গে আপনি আপনার প্রতিদিনের রুটিন বদলাতে পারেন।
কফির পরিবর্তে চা নিন।
সকালের খাবার প্রতিদিন এক জায়গায় বসে খাবেন না।
কর্মস্থলে যাওয়ার রাস্তা প্রতি দুই দিন অন্তর পরিবর্তন করতে থাকুন।
বর্তমানে ধূমপান ছাড়ার কিছু ওষুধ রয়েছে তা নিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
অনেকে বলেন - ধূমপান ছেড়ে দিলে কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
মনমরা,
ঘুম ঘুম ভাব,
অল্পে বিরক্ত বা অস্বস্তিবোধ এবং দীর্ঘ সময় এক বিষয়ে চিন্তা করতে না
পারার মতো সমস্যা হতে পারে।
এই সব সমস্যার জন্য ভালো ওষুধ আছে।
যারা বেশি ধূমপান করে থাকেন তাদের হঠাৎ করে সিগারেট ছাড়তে না বলে
চিকিৎসকরা প্রথমে কম করে পরে ছেড়ে দেয়ার পরামর্শ দেন।
বিকল্প উপায়েও সিগারেট না খেয়ে দেহের দীর্ঘদিন অভ্যস্ত নিকোটিনের মাত্রা
ঠিক রাখা সম্ভব।
তার জন্য রয়েছে নিকোটিন প্যাঁচ।
এটি দেখতে অনেকটা ছোট ব্যান্ডেটের মতো।
হাতের চামড়ায় লাগানো হয়।
চামড়ার মাধ্যমে নিকোটিন দেহে মেশে।
ধূমপায়ী সিগারেট খাওয়ার জন্য বিশেষ তাগিদ অনুভব করেন না।
অনেক জায়গায় নিকোটিন চিউয়িং গাম বা লজেন্স পাওয়া যায়।
মুখের ভেতরের ঝিল্লি দিয়ে রক্তে মেশে নিকোটিন।
নিকোটিন নেজাল স্প্রে,
নিকোটিন ইনহেলার রয়েছে।
তবে অনেক ক্ষেত্রে দরকার পড়ে না।
মন খারাপ আটকাতে বিউপ্রোপিওন একটি ভালো ওষুধ।
এছাড়াও রয়েছে রকমারি ওষুধ।
পুনঃধূমপানের প্রবণতা থেকে সতর্ক থাকুন : বেশিরভাগ ধূমপায়ীই ধূমপান ছাড়ার
প্রথম তিন মাসের মধ্যেই আবার ধূমপান করতে শুরু করেন।
এতে আশাহত হবেন না।
মনে রাখবেন,
অনেকের ক্ষেত্রেই এটি ঘটতে পারে।
তবে একইভাবে আবার ছাড়ার চেষ্টা করুন।
নিজেই ভেবে দেখুন কোন কোন বিষয়গুলো ধূমপান ছাড়ার জন্য সহায়ক ছিল আর কোনটি
নয়।
পরবর্তী সময়ে তা ছাড়ার চেষ্টা করুন।
জানবেন তিনবার পর পর আপনি এই কাজটি করতে পারলে আপনাকে আর সিগারেট বা বিড়ি
ছুঁতে পারবে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রকের এশিয়া উপমহাদেশের পরিসংখ্যান এমন কথাই বলছে।
মকবুল ফিদা হুসেনকে নাগরিকত্ব দিল কাতার!
সংলাপ
॥
ভারতের হিন্দু দেবীদের নিয়ে বিতর্কিত ছবি এঁকে দেশের দক্ষিণপন্থী
গোষ্ঠীগুলোর রোষের মুখে পড়া চিত্রশিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনকে নাগরিকত্ব দিল
কাতার।
ডানপন্থীদের হুমকিতে দেশত্যাগী হওয়া হুসেন গত চার বছর হল প্রবাসে রয়েছেন।
অধিকাংশ সময়ই তিনি কাটাচ্ছেন দুবাইয়ে।
এবার কাতার সরকার আচমকা তাকে নাগরিকত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ায় জোর বিতর্ক
হচ্ছে।
নিন্দুক-সমালোচকরা হুসেনের উপর খাপ্পা হয়ে উঠেছেন তিনি কাতারের নাগরিকত্ব
গ্রহণ করার ইঙ্গিত দেয়ায়।
যদিও ইউপিএ সরকার
'ভারতের
গর্ব;
বলেছে তাকে।
হুসেন বলেছেন,
কাতারের নাগরিকত্ব দেয়ার সিদ্ধান্তে তিনি
'সম্মানিত'বোধ
করছেন।
যদিও কাতার তাকে সাম্মানিক নাগরিকত্ব দিচ্ছে বা তিনি ভারতের নাগরিকত্ব
ছাড়ছেন কিনা,
কোনওটাই পরিষ্কার নয়।
এই
ইস্যুতে হুসেন বা তার ছেলের প্রতিক্রিয়া অবশ্য জানা যায়নি।
ভারত একইসঙ্গে দু’টি
দেশের নাগরিকত্ব অর্থাৎ দ্বৈত নাগরিকত্ব মানে না।
যদিও ওভারসিজ ইন্ডিয়ান ক্যাটাগরি বলে একটি ব্যবস্থা রয়েছে ওই দেশে।
বিতর্কের মুখে নয়াদিল্লির তরফে জানানো হয়েছে,
হুসেন চাইলে ভারতে ফিরতেই পারেন।
সরকার তাকে নিরাপত্তা দিতে তৈরি।
বিদেশসচিব নিরূপমা রাও বলেছেন,
আমি
চাইব তিনি এদেশে নিরাপদ বোধ করবেন,
স্বস্তি পাবেন।
গত
মাসে হুসেন নিজেই সংবাদ সংস্থাকে বলেছিলেন,
তিনি ভারতকে
'দারুণভাবে'মিস
করছেন।
কিন্তু তার বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা রুজু হওয়ায় তিনি দেশে ফেরার সাহস পাচ্ছেন
না।
যদিও এদিন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব জি কে পিল্লাই বলেছেন,
এমএফ হুসেনের বিরুদ্ধে কোনও মামলাই নেই।
সুপ্রিম কোর্ট তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সব মামলা খারিজ করে দিয়েছে।
কংগ্রেসও বলেছে,
হুসেন দেশে ফিরতে চাইলে তার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
কাতার হুসেনকে নাগরিকত্ব দেয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে শিল্পী মহল।
চিত্রশিল্পী অঞ্জলী এলা মেনন বলেছেন,
তিনি একজন সত্যিকারের কর্মযোগী।
হিন্দু দেবীদের ছবি নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
ওই সময়ে ওনার নিরাপত্তা ব্যাপারটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত ছিল
সরকারের।
খ্যাতনামা চিত্রপরিচালক শ্যাম বেনেগাল বলেছেন,
ওনার কাজকে আমাদের দেশে যেমন খাটো নজরে দেখা হয়েছে,
যেভাবে ওর প্রতি অসম্মান দেখানো হয়েছে,
তাতে তিনি অন্য দেশের নাগরিকত্ব নেবেন,
এতে বিস্ময়ের কী আছে?
তিনি ভারতের একজন লিভিং লেজেন্ড।
অথচ ওনাকে আমরা যোগ্য সম্মান দিতে পারিনি।
প্রসঙ্গত,
একটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিকে হুসেনের কাতারের নাগরিকত্ব গ্রহণের খবরটি প্রথম
প্রকাশিত হয়।
তাতে একেবারে নিজস্ব স্টাইলে আঁকা ঘোড়ার উপরে হুসেন লিখেছেন,
আমি,
ভারতীয় বংশোদ্ভূত পেইন্টার এমএফ হুসেন,
কাতারের নাগরিকত্ব গ্রহণ করছি।
আফগানে হামলা বাড়ছে
সংলাপ
॥
মধ্য কাবুলের শহর-ই-নও এলাকায় আজ ভারতীয়দের একটি হোটেল ও অতিথিশালায়
আত্মঘাতী হানায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৬ জন।
এদের মধ্যে অন্তত ৯ জন ভারতীয়।
যার মধ্যে রয়েছেন একজন সরকারি কর্তা,
রোশন লাল নামে এক আইটিবিপি কনস্টেবল এবং রোশন লাল নামে হিমাচল প্রদেশের
এক তবলাবাদক।
এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়েছিলেন ৩৫ বছরের রোশন।
বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন ৩০ জনেরও বেশি।
তাদের মধ্যে ১২ ভারতীয় ও একজন পাকিস্তানিও আছেন।
আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের মুখপাত্র সাইমক হেরাউই হামলার কথা
জানিয়েছেন।
অতিথিশালায় প্রথম বিস্ফোরণটি ঘটায় একটি আত্মঘাতী গাড়িবোমা।
ভারতীয় দূতাবাস থেকে ভাড়া নেয়া পার্ক রেসিডেন্স অতিথিশালার পুরোটাই ধসে
পড়ে।
মৃতদের মধ্যে আছেন কয়েকজন দূতাবাস কর্মী।
পরে সিটি সেন্টারের ভেতর লুকিয়ে থাকা দুই জঙ্গির সঙ্গে পুলিশের প্রচণ্ড
গুলি বিনিময় হয়।
ওই হানার তীব্র নিন্দা করেছেন আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই।
পাশাপাশি বলেছেন,
এর প্রভাব ভারত-আফগান সম্পর্কে পড়বে না।
তিনি ভারত সরকারের উদ্দেশ্যে দুঃখ প্রকাশ করে মৃতদের পরিবারের প্রতি
সমবেদনাও জানিয়েছেন।
এদিকে হামলার দায় স্বীকার করে তালিবান মুখপাত্র জাবিউল্লা মুজাহিদ
জানিয়েছেন,
পাঁচ তালিবানি সদস্যকে পাঠানো হয়েছিল বিদেশীদের পছন্দের এই দুটো জায়গায়
হামলা চালাতে।
ভারত সরকারের পক্ষ থেকে মৃত ভারতীয়দের মৃতদেহ নিয়ে আসার জন্য বিশেষ বিমান
পাঠানো হচ্ছে।
|