সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি

 

সংলাপ 

 

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আমন্ত্রণে এক সংবাদ সম্মেলনে আগত বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক  কর্মীবৃন্দ এবং উপস্থিত সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাবৃন্দ আসসালামু আলাইকুমদীর্ঘ বহু বছর পর অনুষ্ঠিত সেনাবাহিনী পর্যায়ের শীতকালীন প্রশিক্ষণের শেষ দিনে মাঘের পড়ন্ত বিকেলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ মাসুদ রাজ্জাক, পরিচালক, পিএস পরিদপ্তর এবং লেঃ কর্নেল মুহাম্মদ সাজ্জাদ সিদ্দিক সেনাবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত জাজ এ্যাডভোকেট জেনারেল সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত জানান এবং বলেন : সংবাদ সম্মেলনে প্রথমে আমি আমাদের বক্তব্য পড়ে শোনাবতারপর বক্তব্য শেষে যদি আপনাদের কোন প্রশ্ন থাকে তা আপনারা জিজ্ঞাসা করতে পারবেনআশা করি আমার বক্তব্যের কপি আপনারা হাতে পেয়েছেনএখানে বলা প্রাসঙ্গিক যে সবাইকে সুযোগ দেয়ার লক্ষ্যে প্রতি কর্মকর্তা/সাংবাদিক একটি প্রশ্ন করবেন এবং আপনার নাম ও কোন  মিডিয়া থেকে এসেছেন তা উল্লেখ করবেন

মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সমরে আমরা শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা দেশের তরে মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে আপামর জনসাধারণের পাশে থেকে দেশে ও বিদেশে প্রশংসা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার অধীনে থেকে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যখন সাংগঠনিকভাবে সুসংগঠিত হয়ে সুনির্দিষ্ট ফোর্সেস গোল ২০৩০ এর আওতায় সমর সরঞ্জাম অর্জন ও সুবিন্যস্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেকে গুণগত মাপের উচ্চ ধাপে উঠতে সদাব্যস্ত, তখনই ঝেড়ে ফেলা অতীত ইতিহাসের ক্রমধারায় আবারও একটি চ্যালেঞ্জিং অধ্যায় অতিক্রম করছেএই সাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আপনাদের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক দেশপ্রেমিক জনসাধারণ ও সংশিস্নষ্ট সকলের সহায়তা কামনা করছি

সম্প্রতি কিছু প্রবাসী বাংলাদেশী নাগরিকদের ইন্ধনে অবসরপ্রাপ্ত এবং সেনাবাহিনীতে কর্মরত কতিপয় ধর্মান্ধ কর্মকর্তা কর্তৃক অন্যান্যদের ধর্মান্ধতাকে পুঁজি করে দুরভিসন্ধমূলক কর্মকা-ের মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে ব্যাহত করার একটি বিফল প্রয়াস চালানো হয়এই অপপ্রয়াসটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রতিহত করা হয়েছে

সেনাবাহিনীর ভিতরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একজন লেঃ কর্নেল পদবীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসার গত ১৩ ডিসেম্বর ২০১১ তারিখে একজন কর্মরত মেজর পদবীর অফিসারকে তার ঘৃণ্য র্কমকান্ডের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যোগদানের প্ররোচনা দিলে উক্ত অফিসার তাৎক্ষণিক বিষয়টি তার চেইন অব কমান্ডের মাধ্যমে অবগত করলে বর্ণিত অবসরপ্রাপ্ত অফিসারকে সেনাবাহিনী আইনের ২(১)(ডি) (ও) এবং ৭৩ ধারায় গ্রেফতার করা হয় সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপপ্রয়াসের অপর পরিকল্পনাকারী মেজর সৈয়দ মোঃ জিয়াউল হক গত ২২ ডিসেম্বর ২০১১ তারিখে অপর এক কর্মরত অফিসারের সাথে সাক্ষাৎ করে তাকেও রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র বিরোধী কর্মকা- তথা সেনাবাহিনীকে অপব্যবহার করার কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হতে প্ররোচনা করেউক্ত কর্মরত অফিসার বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবগত করলে সদস্য দীর্ঘ মেয়াদী প্রশিক্ষণ সম্পন্নকারী মেজর জিয়ার ছুটি ও বদলী আদেশ বাতিল করে সত্তর ঢাকার লগ এরিয়া সদর দপ্তরে যোগদানের বিষয়টি টেলিফোনে গত ২৩ ডিসেম্বর ২০১১ তারিখে তাকে জানানো হলেও ছুটিতে থাকা মেজর জিয়া পলাতক অবস্থায় থেকে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সাবভারসিভ কার্যক্রম চালানোর পায়তারা করেও এখনও করছে! এছাড়াও তাৎক্ষণিকভাবে প্রাপ্ত সুনিশ্চিত তথ্যের ভিত্তিতে অপর একজন মেজর পদবীর অফিসারকে চাকুরীরত অফিসারকে সরকারের প্রতি আনুগত্য থাকা থেকে বিরত থাকার জন্য প্ররোচনা প্রদানের অভিযোগে গত ৩১ ডিসেম্বর ২০১১ তারিখে উপরে উল্লেখিত সেনা আইনের ধারায় গ্রেফতার করা হয়েছে। 

সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রের আংশিক তথ্যাদি ফাঁস হয়ে যাওয়া ও কিছু ব্যক্তি গ্রেফতার হওয়ার প্রেক্ষিতে গত ডিসেম্বর ২০১১ তারিখ ১০৫২ ঘটিকায় পলাতক মেজর জিয়া তাকে তথাকথিত গ্রেফতার ও নির্যাতন সংক্রান্ত কল্পনাপ্রসুত ও অবিশ্বাস্য গল্প বর্ণনা করে একটি উস্কানিমূলক ই-মেইল তার পরিচিতদেরকে প্রেরণ করে যা পরবর্তীতে সামাজিক নেটওয়ার্ক ফেসবুক (Facebook) এ ‘Soldiers Forum’ নামক ‘Blog’ এ জনৈক আবু সাঈদ আপলোড করে পরবর্তীতে উক্ত অফিসার কর্তৃক Mid-level officers of Bangladesh Army are Bring down Changes Soon এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে নতুন বছরের উপহার-মধ্যম সারির অফিসাররা অচিরেই বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছেন শিরোনামে কাল্পনিক ও অত্যন্ত বিতর্কিত বিষয়সমূহ উল্লেখ করে দুটি ই-মেইল ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়এই বিষয়টি নিয়ে গত ০৩ জানুয়ারি ২০১২ তারিখে আমার দেশ পত্রিকাটি হলুদ সাংবাদিকতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সম্পর্কে দেশে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপপ্রয়াসে পলাতক মেজর জিয়ার ইন্টারনেটের বার্তাটি প্রকাশ করেএরই ধারাবাহিকতায় গত ০৮ জানুয়ারি ২০১২ তারিখে নিষিদ্ধ ঘোষিত ধর্মান্ধ হিজুবত তাহরীর সংগঠন পলাতক মেজর জিয়ার ইন্টারনেট প্রেরিত বার্তাটিকে ভিত্তি করে দেশব্যাপী উস্কানিমূলক লিফলেট ছড়ায়তার একদিন পর গত ০৯ জানুয়ারি ২০১২ তারিখে দেশের একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক দলও উপরোক্ত মনগড়া, বিভ্রান্তিক ও প্রচারণামূলক সংবাদের সাথে তাল মিলিয়ে সেনাবাহিনীতে গুমের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ করেনযা সেনাবাহিনী তথা সকল সচেতন নাগরিকদের মধ্যে অনাকাঙ্খিত উস্কানিমূলক বিতর্কের সৃষ্টি করেএই মুহূর্তের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ধন্যবাদ জানাচ্ছে সকল দায়িত্বশীল প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াকে যারা বিভ্রান্ত ও উস্কানিমূলক তথ্য পেয়েও দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এ ধরনের বিভ্রান্তিমূলক খবর পরিবেশন না করে পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন

গ্রেফতারকৃত অবসরপ্রাপ্ত দুইজন অফিসার ও অপর চাকুরীরত অফিসারগণ কর্তৃক প্রদত্ত বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী সেনাবাহিনীর ঘাড়ে ভর করে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থাকে উৎখাতের ঘৃণ্য চক্রান্তের সাথে সেনাবাহিনীতে চাকুরীরত কিছু অফিসারের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট তথ্য ইতোমধ্যেই উদ্ঘাটিত হয়েছেকতিপয় বিশৃঙ্খল ও পথভ্রষ্ট সামরিক অফিসার মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের অপব্যবহার করে পলাতক মেজর জিয়ার সাথে যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যমে উক্ত ঘৃণ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চক্রান্তে সক্রিয়ভাবে লিপ্ত থাকেএই সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য উদ্ঘাটনের জন্য গত ২৮ ডিসেম্বর ২০১১ তারিখে একটি তদন্ত আদালত গঠন করা হয়েছে এবং তার কার্যক্রম চলছে

সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের লক্ষে গত ০৯ জানুয়ারি ২০১২ এবং ১০ জানুয়ারি ২০১২ তারিখে পলাতক মেজর জিয়া তার কল্পিত দুইটি অপারেশন আদেশ/নির্দেশের কপি ই-মেইলের মাধ্যমে চাকুরীরত বিভিন্ন অফিসারদের নিকট প্রেরণ করেএছাড়াও বিগত ১০/১১ জানুয়ারি ২০১২ তারিখে পলাতক মেজর জিয়া কর্তৃক বিভিন্ন ফরমেশন ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত/অধ্যয়নরত সমমনা বা তাদের দলভুক্ত কিছু সংখ্যক কয়েকজন অফিসারের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করতঃ প্রণয়নকৃত পরিকল্পনা অনুযায়ী তথাকথিত সেনা অভ্যুত্থান সংক্রান্ত প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চান এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বার বার উদ্বুদ্ধ করতে থাকেনএকই রাতে পলাতক মেজর জিয়া বর্তমানে বিদেশে (সম্ভবত হংকং) অবস্থানরত বাংলাদেশী নাগরিক জনাব ইশরাক আহমেদ (পিতা : জনাব এম রাকিব, দ্বীন মঞ্জিল, গ্রামঃবালুভাড়া, ইউনিয়নঃবারশাইল, থানা ও জেলাঃনওগাঁ) এর সাথে কয়েকবার মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে কথোপকথনে তারা অভ্যুত্থানের অগ্রগতি ও তা সম্পাদন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেএ সময় পলাতক মেজর জিয়া তাকে বিদেশে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে বাংলাদেশে সংঘটিত সেনা অভ্যুত্থান বাস্তবায়ন শেষ হলে পুনরায় তাকে অবগত (১০/১১ জানুয়ারি ২০১২ তারিখে রাত আনুমানিক ২টার সময় টেলিফোন করতে বলেন) করার জন্য পলাতক মেজর জিয়াকে নির্দেশ দেন যাতে তিনি কম সময়ের মধ্যে বিমানযোগে বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারেনধারণা করা যায় যে, বিশৃঙ্খলা পরবর্তী সুবিধা প্রাপ্তির জন্যই জনাব ইশরাকের বাংলাদেশে আসার এই পরিকল্পনা

গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সরকারের অধীনে থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যখন বিভিন্ন সংস্কারমূলক কর্মকা-ের মাধ্যমে একটি গুণগত মানে সমৃদ্ধ বাহিনী হিসেবে সংগঠিত হওয়ার প্রয়াসে লিপ্ত তখনই অতীতের গণতন্ত্র ধ্বংসের বিভিন্ন অপশক্তি দেশপ্রেমিক একটি রাষ্ট্রীয় শক্তি সেনাবাহিনীর উপর সওয়ার হওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ততারা নিকট ও দূর অতীতের ন্যায় এবারও ধর্মান্ধের অনুভূতি, অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানোর প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করেছেএই সকল ঘৃণ্য চক্রান্তকারীদের দোসর হয়েছে ধর্মীয় অনুশাসন পালনে হঠাৎ অতিমাত্রায় কট্টর এবং পারিবারিক বন্ধন, চাকুরী ও ব্যবসার ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিবর্গ অপপ্রচার চালানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে স্বার্থান্বেষী সংবাদপত্র, নিষিদ্ধ ঘোষিত ধর্মভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের প্লাটফর্ম মুক্তিযুদ্ধের মাঝেই জন্ম নিয়ে যুদ্ধে জয়লাভ করা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাঁধে ভর করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অতীতে বিভিন্ন অপশক্তি রাজনৈতিক সুবিধা লাভ করছে কিংবা ব্যর্থ হয়েছেকিন্তু সাংগঠনিকভাবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ঘটনার বদনামের দায়ভার বহন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাগত ভাবে দক্ষ এবং সুশৃঙ্খল সেনাসদস্যদের বক্তব্য এই যে, ‘আমরা আর এ ধরনে দায়ভার আমাদের সংগঠনের কাঁধে নিতে চাই না

সামগ্রিক বিষয়টি দেশে/বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশী নাগরিকদের মদদে এবং ধর্মান্ধের অনুভূতিকে পুঁজি করে কতিপয় চাকুরীরত ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসারের ঘৃণ্য প্রচেষ্টা বলে প্রতীয়মানএ সকল ব্যক্তিবর্গ সেনাবাহিনী ও দেশের সকল সুযোগ/সুবিধা গ্রহণ করে স্বার্থান্বেষী মহলের সাথে যুক্ত হয়ে দেশে ও বিদেশে সেনাবাহিনীর ঈর্ষনীয় সাফল্য, উন্নয়ন এবং ঐক্যকে বিনষ্ট করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে বলেও প্রতীয়মান উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে আলোচ্য চক্রান্তের সাথে জড়িত কিছু চাকুরীরত ও অবসরপ্রাপ্ত অফিসার তাদের সম্পৃক্ততার কথা অকপটে স্বীকার করেছেনতদন্ত শেষে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে সেনাবাহিনীর কষ্টার্জিত ভাবমূর্তিকে অড়্গুণ্ন রাখতে এবং সমৃদ্ধির পথকে সুগম করতে এ ধরনের ঘৃণ্য অপচেষ্টাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করতে হবে দেশমাতৃকার সার্বভৌমত্ব এবং অখন্ডতা রক্ষার্থে প্রতিটি সেনা সদস্য আত্মত্যাগের জন্য সদা প্রস্তুততবে সেনা সদস্যদের আত্মত্যাগের উপর ভর করে কোন দেশী বা বিদেশী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠি তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করুক তা কারোরই কাম্য নয়পলাতক মেজর জিয়ার আইনের নিরাপত্তা ও সঠিক বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করার স্বার্থে অনতিবিলম্বে সেনাবাহিনীতে আত্মসমর্পণ করা একান্ত অপরিহার্য্যমেজর জিয়ার বর্তমান অবস্থান ও কর্মকা- সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া গেলে তা যথাসময়ে কর্তৃপক্ষকে অবগত করতে সকলকে অনুরোধ জানানো হলো

আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ

 

টাইম ম্যাগাজিন যা লিখলো

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের তিন বছরের শাসনকালে তার দল ও ইসলামভাবাপন্ন বিএনপির মধ্যে যে ঝগড়া ও শত্রুতা সব সময় ছিল তা আগের অবস্থায়ই আছে বিশ্ব রাজনীতিতে ঘৃণা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখানেই সবচেয়ে বেশি বিরোধীরা এবং সমালোচকরা অভিযোগ করেন, সরকার ভিন্ন মতাবলম্বী ও ইসলামপন্থীদের দমন করছেএ ইসলামপন্থীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সম্পর্ক অস্বাভাবিক পর্যায়ে সারাবিশ্বে সুপরিচিত টাইম ম্যাগাজিনে বিহাইন্ড বাংলাদেশজ ফেইন্ড কু প্লট: এ হিস্ট্রি অব ভায়োলেন্স শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন ইশান ঠারুরএতে বাংলাদেশের সর্বশেষ সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টা, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) মইন উ আহমেদ সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেনবলেন, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মতো নয়, তারা অধিক গণতান্ত্রিক বোধসম্পন্নইশান ঠারুর লিখেছেন-বিস্ময়ের কিছু নেই যে, কিছু রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে বিশ্বব্যাপী জিহাদি গ্রম্নপ হিজবুত তাহরির বাংলাদেশের সর্বশেষ এ সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টায় জড়িতএ সুবিধা নিয়ে শেখ হাসিনা ও তার মিত্ররা অধিক ধর্মীয় বিরোধীদের দমন করতে পারেনইশান ঠারুর ওই প্রতিবেদনে লিখেছেন-বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ১৯শে জানুয়ারি ঘোষণা করেছে, তারা গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের একটি সামরিক অভ্যুত্থান পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছে সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র এ হীন প্রচেষ্টায় কট্টর ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি আছে এমন মধ্যম-পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা জড়িত বলে জানিয়েছেন তাদের সঙ্গে একই রকম স্বার্থবাদী বিদেশী একটি নেটওয়ার্কও কাজ করেছে বলে জানানো হয়েছেএখনও এর বিস্তারিত বলা হয়নি কিন্তু সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কমপক্ষে দুকর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়েছেএ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় আরও এক ডজন ব্যক্তি জড়িত বলে জানানো হয়েছেএর মধ্যে মধ্যম সারির একজন সেনা কর্মকর্তা পলাতক রয়েছেন সন্দেহভাজন আরেক ষড়যন্ত্রকারী হংকং রয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে আগামী দিনগুলোতে সেনাবাহিনীর তদন্তে আরও দোষী ও সন্দেহভাজনের নাম বেরিয়ে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থান নতুন কোন বিষয় নয় এখানে এ যাবৎ তিনটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪০ বছরে এখানে অনেকগুলো সামরিক বিদ্রোহ হয়েছে দীর্ঘ সময় সেনাশাসন স্থায়ী ছিল তত্ত্বাবধায়ক সেনা শাসকগোষ্ঠি বাংলাদেশে সর্বশেষে হস্তক্ষেপ করে বাংলাদেশে তাদের বিশৃঙ্খল (কেউ কেউ বলেন অকার্যকর) গণতান্ত্রিক শাসনের ২ বছর পর ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসেনএর এক বছর আগে আমি বাংলাদেশর তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) মইন ইউ আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি যে রক্ষকের ভূমিকায় ছিলেন তা নিযে সতর্কতামূলক একটি লেখাও লিখেছিলামতিনি মৃদুভাষী  ও বিনয়ী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেত্রী শেখ হাসিনা ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়া-এ দুজনের স্বভাবের নিন্দা জানালেন তিনিএখনও দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষ করে দুটি দেশে যা এক সময় পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান ছিল-তাদের রয়েছে সামরিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে দীর্ঘ ইতিহাসমনে করা হয়, ওইসব সামরিক ব্যক্তিত্ব জানেন, তাদের দেশবাসীর জন্য সবচেয়ে ভাল কি হতে পারে তারপর আমি লিখেছিলাম - গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গিয়ে মইন বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন বাংলাদেশে কার্যকর নেতা বানানোর আলোচনায়একই সঙ্গে তিনি দেশের বেশির ভাগ অশিক্ষিত সমাজকে শিখাতে থাকেন যে তাদের নিজেদের পা কেটে ফেলা উচিত নয়কোন ব্যক্তি যদি তার দেশে নিজ ত্রাণকর্তা হতে চান তাহলে তার মুখে এমন কথা মানায়তিনি আরও বলেছিলেন-একটি দেশের জনগণ যে ধরনের নেতা নির্বাচন করেন সেসব নেতার ধরন দেখে আপনি একটি জাতির বিচার করতে পারেন তারা কেমনযখন সে সুযোগ পাবেন তখন বেশির ভাগ বাংলাদেশীই বিস্মিত হবেন হ্যাঁ, তারা সে সুযোগ পেয়েছিল এবং জেনারেল (অব.) মইনের সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এ নির্বাচনের প্রশংসা করে একে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন বাংলাদেশের সেনাবাহিনী একটি সুশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠান পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মতো নয়, তাদের চেয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতাদের বেশির ভাগই সাংবিধানিক রাজনীতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষ, মধ্য-বামপন্থী দলএই দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আদর্শ ধারক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ব্যাপক সফলতায় আশা করা হয়েছিল দেশটি এবার শেষবারের মতো মতবিরোধ ও রক্তপাতের ধারা থেকে বেরিয়ে এসেছে কিন্তু সর্বশেষ যে খবর পাওয়া গেছে তাতে অতীতের ঐতিহাসিক বিষয়গুলোকে আর ভুলে যাওয়া অধ্যায়ে রাখা যাবে নাএতে আরও উদ্বেগ বাড়ছেশেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার মাত্র দুই মাস পরেই ঢাকায় সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর সদর দপ্তরে একটি বিদ্রোহ হয়তাতে ৭০ জনের বেশি সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে প্রায় ৮০০ ব্যক্তিত্বের (বর্তমানের বর্ডার অব বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের বা জওয়ানদের বোঝানো হয়েছে) বিচার চলছেওই বিদ্রোহের ঘটনায় বাংলাদেশের বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছিল অধিকন্তু, শেখ হাসিনার সরকারের তিন বছরের শাসনকালে তার দল ও ইসলামভাবাপন্ন বিএনপির মধ্যে যে ঝগড়া ও শত্রুতা সব সময়ে ছিল তা আগের অবস্থায়ই আছে বিশ্ব রাজনীতিতে ঘৃণা ও জিরো-সাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখানেই সবচেয়ে বেশি বিরোধীরা এবং সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, ভিন্নমতাবলম্বী ও ইসলামপন্থীদের দমন করছে সরকারএ ইসলামপন্থীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সম্পর্ক অস্বাভাবিক পর্যায়ে১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানিদের দখলদারিত্ব থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে যে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছিল তাতে যে সব নৃশংসতা হয়েছে তার বিচারে মাইলফলক যুদ্ধ অপরাধ আদালত তদন্ত করছেএতে শেখ হাসিনার প্রধান শত্রু বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামির বেশ কয়েকজন নেতার বিচার হচ্ছে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, কিছু রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে বিশ্বব্যাপী জিহাদি গ্রম্নপ হিজবুত তাহরির বাংলাদেশের সর্বশেষ এ সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টায় জড়িতএ সুবিধা নিয়ে শেখ হাসিনা ও তার মিত্ররা অধিক ধর্মীয় বিরোধীদের দমন করতে পারেন অভ্যুত্থানের বিষয়ে সেনাবাহিনী টের পাওয়ার বিষয়ে আওয়ামী লীগের কর্মকর্তারা প্রশংসা করেছেনতারা বলেছেন, এটা পুরো দেশের বিজয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন-এ ষড়যন্ত্র চেষ্টার সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকে খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি করা হবে বাংলাদেশে তাদের জায়গা হবে না আমাদের মতের অমিল থাকতে পারে কিন্তু গণতন্ত্রের বেলায় আমাদের কোন ভিন্নমত নেইতাই সবারই দায়িত্ব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা রক্ষা করাএটা শুধু সরকারের একার কাজ নয়, সবারই দায়িত্ব দেশের গণতন্ত্রকে রক্ষা করাএ গণতন্ত্র ছাড়া বাংলাদেশের কোন ভবিষ্যত নেই

যেহেতু তদন্ত চলছে এবং ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আমাদের ধারণা নিবিড় হচ্ছে-আমরা আরও ভাল করে বুঝতে চেষ্টা করবো ষড়যন্ত্রকারীরা দেশের গণতন্ত্রের প্রতি প্রকৃতপক্ষে কি ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছিল কমপক্ষে শুধু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নন, অনেক বাংলাদেশীর কাছে সাম্প্রতিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার স্মৃতি একেবারে তরতাজা১৯৭৫ সালে বিদ্রোহকারী সেনারা শেখ হাসিনার পিতা তখনকার বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে গিয়ে হানা দেয় এবং ভোরের ড়্গীণ আলোতে তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের গুলি করে হত্যা করে পর্যটকরা এখনও তার সেই বাসভবন পরিদর্শন করেন পরিদর্শন করেন বাড়িটির দেয়ালে বুলেটের গর্তশেখ মুজিব যেখানে নিহত হয়েছিলেন তা একটি কাঁচ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছেএটা বাংলাদেশীদের কাছে আবেগের এক জাদুঘরে পরিণত হয়েছে

 

ছয় সদস্যের তদন্ত আদালত গঠন

 

নস্যাৎ হয়ে যাওয়া সেনা অভ্যুত্থানে জড়িতদের দ্রম্নত খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি করার সবরকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ব্যাংকের একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠন করা হয়েছে ৬ সদস্যের একটি তদন্ত আদালতএই ঘটনায় দেশের বাইরে থেকে ইন্ধন যোগানো প্রবাসী বাংলাদেশী ইশরাক আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সশস্ত্রবাহিনী বিভাগের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তা চাওয়া হবে এছাড়া ঘটনা অন্যতম প্রধান হোতা পলাতক মেজর সৈয়দ জিয়াউল হককে গ্রেফতারের লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে কর্তৃপক্ষ ধারণা করছে যে, মেজর জিয়া দেশের অভ্যন্তরেই কোথাও লুকিয়ে রয়েছে সম্প্রতি শুক্রবার ইত্তেফাক প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) লে. জেনারেল মইনুল ইসলাম এসব তথ্য জানান প্রসঙ্গত, সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় যে, গত ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে কিছু প্রবাসী বাংলাদেশীর ইন্ধনে কতিপয় ধর্মান্ধ সেনা কর্মকর্তার উদ্যোগে (কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত) অন্যদের ধর্মান্ধতাকে পুঁজি করে দূরভিসন্ধিমূলক কর্মকা-ের মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে ব্যাহত করার একটি বিফল প্রয়াস চালানো হয় কিন্তু অপপ্রয়াসটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রতিহত করা হয়েছে সেনাসদরের এই সংবাদ সম্মেলনের খবর গত শুক্রবার দেশের সকল সংবাদ মাধ্যমের প্রধান খবর ছিল বিদেশের নামকরা গণমাধ্যমগুলোতেও খবরটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হয়এ কারণে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলসহ দেশের সকল পর্যায়ে তোলপাড় শুরু হয় দিনভর সর্বত্র এটিই ছিল মানুষের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ইত্তেফাক প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে সিজিএস লে. জেনারেল মইনুল ইসলাম বলেন, ঘটনার বিস্তারিত অনুসন্ধান ও জড়িতদের খুঁজে বের করার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ৬ সদস্যের তদন্ত আদালত গঠন করা হয়েছেএই আদালতের রিপোর্ট ও সুপারিশের ভিত্তিতেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যের বিচার করা হবেআর সেনাবাহিনীর বাইরের যেসব ব্যক্তি ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে বিচার করা হবেতিনি জানান, হংকংয়ে অবস্থানরত ইশরাক আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সশস্ত্রবাহিনী বিভাগের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হবেএকই সঙ্গে টেলিফোন কল রেকর্ড এবং ইন্টারনেট বার্তাটি কারা আপলোড করেছে তা খুঁজে বের করার জন্য বিটিআরসির কাছেও চিঠি দেয়া হবেতিনি বলেন, ইতোমধ্যেই ঘটনার অন্যতম প্রধান হোতা মেজর সৈয়দ জিয়াউল হকের গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজারে খোঁজ নেয়া হয়েছে সেখানে তাকে পাওয়া যায়নিতবে সে কোনো বৈধ পথে দেশ ছেড়ে পালাতে পারেনি বলে ধারণা করা হচ্ছেকারণ, ইতোমধ্যেই ইমিগ্রেশনের সকল পয়েন্টে তার ব্যাপারে জানানো হয়েছেতিনি আরো বলেন, এই অভ্যুত্থান চেষ্টাকারীদের কোন তথ্যই গোপন রাখা হবে না তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর আবারও সংবাদ সম্মেলন করে দেশবাসীকে বিস্তারিত জানানো হবেএ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশেস্নষক মেজর (অব.) মাসিহুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, সেনাবাহিনীর নিয়মানুযায়ী তদন্ত আদালতের রিপোর্ট ও সুপারিশের ভিত্তিতে জড়িতদের বিচারের জন্য কোর্ট মার্শাল গঠন করা হবে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ যদি কোর্ট মার্শালে নিজেদের দোষ স্বীকার করেন, তাহলে সরাসরি শাস্তির আদেশ জারি হবেআর তারা যদি দোষ স্বীকার না করেন, তাহলে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য ফিল্ড জেনারেল কোর্ট মার্শাল (এফজিসিএম) গঠন করা হবে সেখানে বিস্তারিত শুনানি তথ্য যুক্তিতর্ক ও তথ্য প্রমাণ উপস্থাপনের ভিত্তিতে এই বিচার সম্পন্ন হবেতিনি বলেন, ফিল্ড জেনারেল কোর্ট মার্শালের প্রয়োজন না হলে এই বিচার দেড় থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবেআর ফিল্ড কোর্ট মার্শালে গেলে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে 

 

আরাধনায় বিদ্যা-অবিদ্যা

 

সংলাপ

 

পুরাণের বর্ণনা অনুসারে ভগবান নারায়ণ এবং দেবী লক্ষ্মীর মধ্যে কথোপকথনের সময় ভগবান নারায়ণের জিহ্বা থেকে এক পরমা সুন্দরী চতুর্ভুজা দেবীর আবির্ভাব ঘটে চতুর্ভুজা দেবী আবির্ভুত হয়ে ভগবান নারায়ণের সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ানোর পর ভগবান নারায়ণ দেবীকে বাক্‌শক্তি, জ্ঞান, শুভ চেতনাদানের জন্য নিযুক্ত করেন সেই পরমা সুন্দরী দেবীর নাম রাখেন স্বরস্বতী ভগবান নারায়ণের বাক্‌ বা কথা থেকে তিনি উৎপন্না বলে দেবীর আর এক নাম বাকদেবী তিনি শুভ্রবস্ত্র পরিহিতা তাঁর এক হাতে বীণা, এক হাতে পুস্তক, এক হাতে জপমালা এবং অন্য হাতে বরাভয় মুদ্রা তিনি বীণা বাদনের সময় যখন দু-হাত ব্যবহার করেন তখন জপমালার হাত দিয়েই তিনি মানুষকে বরাভয় এবং আশীর্বাদ দান করে থাকেন ভগবান নারায়ণের জিহ্বা থেকে যখন বাক্‌ দেবীর আবির্ভাব ঘটে তখন ভগবান নারায়ণের পৃষ্ঠদেশ থেকেও পরমাসুন্দরী দ্বিভূজা এক দেবীর আবির্ভাব ঘটে তিনিও ভগবান নারায়ণের সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ালে ভগবান নারায়ণ বললেন হে দেবী, তুমি যেহেতু আমার পৃষ্ঠদেশ থেকে উৎপন্ন হয়েছ তখন তোমার নাম হোক অবিদ্যা যে সমস্ত মানুষ অর্থের ও বিদ্যার কারণে অহংকার পোষণ করবে তাদের তুমি অবিদ্যা দান করে বিপথগামী করবে সেই থেকে একই সঙ্গে বিদ্যাদাত্রী স্বরস্বতী এবং অবিদ্যাদাত্রী দেবী সমভাবেই ত্রিলোক নিজ নিজ প্রভাব বিস্তারে ব্রতী হয়েছেন কলির প্রভাবে পৃথিবীতে এখন বিদ্যাদেবীর চেয়ে অবিদ্যাদেবীর প্রাধান্যই পরিলক্ষিত হচ্ছে

বৈদিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশু চার বছর পূর্ণ হয়ে পাঁচ বছরে পা রাখলেই শুভদিন দেখে হাতে খড়ি দিয়ে বিদ্যা শিক্ষার ব্যবস্থা করা হতো কাঁচা দুধ দিয়ে পাখীর পালক অথবা কচির কলম দিয়ে তিনবার  কলাপাতায় লিখে দেয়ার পর শিশু তার উপর হাত ঘুরিয়ে বর্ণ লেখার অভ্যাস শুরু করতো সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সব কিছুরই পরিবর্তন ঘটেছে এখন তিন বছর বয়সেই মা-বাবা তাদের সন্তানকে ইংরেজি নার্সারী স্কুলে ভর্তি করে দেন প্রথাগতভাবে বিদ্যা শিক্ষা শুরু করার রীতি এখন শেষ হয়ে গেছে স্বাধীনতা লাভের পরও রাষ্ট্র নায়কগণ বিদেশী ইংরেজি ভাষাকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আবশ্যিক ভাষা হিসেবে চালু না করলেও মাতৃভাষাকে গুরুত্ব না দিয়ে বিদেশী ইংরেজি ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা পরিচালিত কয়েক লক্ষ স্কুল, কলেজ এবং শিক্ষার প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে সারা বিশ্বজুড়েই অবিদ্যা প্রাধান্য থাকায় শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের সংখ্যা কমে গেছে বিশ্বে ভোগ, বিলাস, ব্যাভিচার, দম্ভ ও অহংকারের যেমন প্রাধান্য ঘটেছে তেমনি অবিদ্যা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মানুষ হিংসা, দ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, নারীর উপর অত্যাচারের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।  এক শ্রেণীর সন্ত্রাসবাদীর হুমকির কারণে বিদ্যা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না তাতে বিদ্যার কোন ক্ষতি না হলেও ক্ষতি হচ্ছে মানব সভ্যতার কারণ সূর্য, চন্দ্র, যেমন সকলকেই কিরণ দান করেন নদী যেমন সকলকে জল দান করেন তেমনি বিদ্যা সকলেরই জন্য যারা বিদ্যার আরাধনা করেন না তাদের একটা বড় অংশের মানুষকেই শেষ জীবনে বৃদ্ধাশ্রমে চরম অবহেলা এবং অনাদরে শেষ কাটাতে হয়

বৈদিক শিক্ষা ব্যবস্থায় মা ও বাবাকে দেব-দেবীর চেয়েও উচ্চ আসনে বসানো হয়েছে বলা হয়েছে মাতা গুরু, পিতা গুরু, গুরু জ্যেষ্ঠ ভাই তার চেয়ে অধিক গুরু ত্রিজগতে নাই যে কারণে প্রতিনিয়ত চলার পথে মা-বাবা এবং গুরুজনদের শ্রদ্ধা জানানো হতো ইংরেজি শিক্ষার প্রভাবে আমরা আমাদের সনাতনী শিক্ষা ব্যবস্থাকে অবহেলা করার কারণে আমাদের মধ্যে যে ভোগবাদ সৃষ্টি হয়েছে তাতে আমরা আমাদের গুরুজনদের কথা ভুলে গেছি বৃদ্ধ মা-বাবাকে অনেক ক্ষেত্রেই খরপোষ পাওয়ার জন্য আদালতের শরণ নিতে হচ্ছে

ছোট সময়ে আমরা অধীর আগ্রহে স্বরস্বতী পূজার দিনটির জন্য অপেক্ষা করতাম স্বরস্বতী পূজার অন্যতম ফুল হচ্ছে পলাশ ফুল অভাবে উদাল ফুল

এই মরশুমী স্বরস্বতী পূজার আগে থেকেই ফুটতে শুরু করে শীত শেষ হলে এরাও আর ফুটে না স্বরস্বতী দেবীর চরণে আত্মনিবেদনের জন্যই যেন পলাশের আবির্ভাব পূজায় আমের মুকুল এবং কুল বড়ই লাগে আমের মুকুল এবং কুল বড়ই স্বরস্বতী পূজার সময়েই পাওয়া যায় নূতন বই নূতন ক্লাসের আনন্দের মধ্যেই বিদ্যাদেবীর আরাধনার দিনটি আসে বলে স্কুল জীবনে স্বরস্বতী পূজা এক পরম আনন্দ নিয়েই আবির্ভূত হত এখন যে সব ছেলে-মেয়েরা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ে অবিদ্যার প্রভাবে দেশে প্রেমের অভাব ঘটায় এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ এবং উচ্চ পদস্থ কর্মচারী গরীবের অর্থ শোষণ করে বিদেশী ব্যাংকে সুদ দিয়ে টাকা জমা রেখে আর্থিক এবং নৈতিক দিক দিয়ে দেশকে দুর্বল করে দিচ্ছে এরাই বিভিন্ন নেশায় ডুবে গিয়ে রাতের পর রাত হোটেলে অতিবাহিত করে যৌবন পার করে নিঃস্ব হয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে মৃত্যু কামনা করছে

সুখ, যৌবন মানব জীবনে বিদ্যুৎ চমকের মতোই কোটি কোটি বছর ধরে চলে আসা ধর্মের ঋষিগণ ও সাধকগণ তাই মানব জীবনে সাধনার গুরুত্বের কথা বলে এসেছেন সাধনায় ভক্তি ও শ্রদ্ধার উন্মেষ ঘটে আর সে কারণেই মানুষ হতাশায় যেমন নিমজ্জিত হয় না তেমনি আনন্দেও উল্লাসিত হয় না

দুর্ভাগ্যের বিষয় সেই বিদ্যাকে দূরে সরিয়ে আমরা অবিদ্যাকে নিয়েই মেতে রয়েছি দেবী স্বরস্বতীর আবির্ভাব ঘটেছিল মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে তাই এই তিথিতে মা স্বরস্বতীর আরাধনা করে ভগবান বিষ্ণু স্বয়ং ত্রিলোকে দেবী স্বরস্বতীর পূজার প্রচলন করেছিলেন বিদ্যা আমাদের নির্মল ভক্তি ও জ্ঞান দান করুন তাতেই আমাদের মর্তের পৃথিবীতে শান্তি, সমৃদ্ধি ও ভালবাসার বিকাশ ঘটবে।  

 

মাইকেল মধুসূদন দত্ত স্মৃতিবিজড়িত সাগরদাঁড়িতে মধুমেলা

 

 

ফরিদা

 

উনিশ শতকের নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা, বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার রূপকার, অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও বাংলা সনেটের প্রবর্তক কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৮৮ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কবির জন্মস্থান যশোর জেলার কেশবপুরের সাগরদাঁড়িতে আয়োজন করা হয় সপ্তাহব্যাপী সাংস্কৃতিক উৎসব মধুমেলা ২০১২ বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায়, মুঠোফোন কোম্পানি বাংলা লিংক এর সহযোগিতায় এবং যশোর জেলা প্রশাসকের আয়োজনে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হোক আমাদের দিন বদলের অনুপ্রেরণা’-এই শেস্নাগানের মধ্য দিয়ে ২১ জানুয়ারি হতে ২৭ জানুয়ারি ২০১২, এই ৭দিনব্যাপী মধুমেলা অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিল প্রতিদিন আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান স্থানীয় শিল্পীবৃন্দ ছাড়াও অনুষ্ঠানে জাতীয় পর্যায়ের কবি সাহিত্যিক ও শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেন এছাড়াও আয়োজন করা হয় লোক ও কারুশিল্প মেলা মেলায় প্রতিদিন সার্কাস ও জাদু প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয় সপ্তাহব্যাপী মেলার উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন

 

জন্ম ও শিক্ষা জীবন

 

যশোর জেলার কেশবপুর থানা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে কপোতাক্ষ তীরের সাগরদাঁড়ি গ্রামে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি ছিলেন কবি, নাট্যকার ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও বাংলায় সনেট (চতুর্দশপদী কবিতা) রচনার প্রথম কৃতিত্ব তাঁরই তাঁর মাতা জাহ্নবী দেবী পিতা-রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন কলকাতা দেওয়ানি আদালতের একজন আইনজীবী কবি ১৮৩৩ সালে সাগরদাঁড়ি পাঠশালার পাঠ শেষ করে ১৮১৭ সালে কলকাতার হিন্দু কলেজ এর জুনিয়র স্কুলে ভর্তি হন স্কুলের শিক্ষা সমাপ্ত করে ১৮৪১ সালে এই কলেজেরই সিনিয়র বিভাগে প্রবেশ করেন এ সময়ে পাশ্চাত্যের ভাবও আদর্শের প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে মাতৃভাষা বাংলার প্রতি অনীহা প্রকাশ এবং ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় অনুরাগ জন্মে নারী শিক্ষার উপর ইংরেজিতে এক প্রবন্ধ লিখে তিনি হিন্দু কলেজ থেকে স্বর্ণপদক লাভ করেন ইংরেজিতে লেখা তাঁর কবিতা বেঙ্গল স্পেকটেটর’, ‘লিটার‌্যারী গ্রামার, ‘ক্যালকাটা লিটার‌্যারী গেজেট,’ ‘লিটার‌্যারী বস্নসম কমেট’, প্রভৃতি তৎকালীন পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এক সময় তাঁর অন্তরে হোমার, ভার্জিল, ও বিদ, দান্তে, টাসো ও মিলটনের মতো মহাকবি হওয়ার আকাঙ্খা জাগে ইংল্যান্ডে গিয়ে ইংরেজিতে কাব্যচর্চা করলে তাঁর এই আশা পূর্ণ হবে মনে করে এবং বিলেতে যাবার সুবিধে হবে এই ভেবে ১৮৪৩-এর ৯ ফেব্রম্নয়ারি হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন এদিন থেকে তাঁর নামের আগে মাইকেল শব্দটি যুক্ত হয় ধর্মান্তরিত হওয়ার দরুন হিন্দু কলেজ থেকে বিতাড়িত হন ১৮৪৩ সালে অতঃপর বিশপ্‌স্‌ কলেজে ভর্তি হন এখানে গ্রিক, ল্যাটিন ও সংস্কৃত ভাষা শিক্ষালাভ করেন

 

বর্ণাঢ্য জীবন ও সাহিত্য সম্ভার

 

অতি অল্প বয়সে এবং বেকার অবস্থায় ধর্মান্তরিত হবার ফলে কবি তার পিতা ও আত্মীয়-স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন পিতা অর্থ সাহায্য বন্ধ করে দিলে কলকাতা ত্যাগ করে ভাগ্য অন্বেষণে মাদ্রাজ গমন (১৯৪৮) সেখানে এক অনাথ  বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগদান ১৮৫২ সালে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাইস্কুল বিভাগে দ্বিতীয় শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত সেখানকার দৈনিক পত্রিকা স্পেকটেটর’-এর সহকারী সম্পাদক পদেও দায়িত্ব পালন কিছুদিন মাদ্রাজের হিন্দু ক্রোনিকল’  পত্রিকা সম্পাদনা মাদ্রাজে প্রবাসকালে হিব্রু, ফরাসি, জার্মান, ইটালিয়ান, তামিল ও তেলেগু ভাষা শিক্ষা মাদ্রাজে বাসকালে রেবেকা টমসন নাম্নী এক ইংরেজ মহিলার পানিগ্রহণ (১৮৪৮) পরে হেনরিয়েটা মাদ্রাজ স্কুলে থাকাকালীন কবির এক সহকর্মীর কন্যা) নাম্নী অন্য এক ইংরেজ মহিলার সঙ্গে প্রণয়ন সূত্রে আবদ্ধ (১৮৫৮)টিমোথি পেনপোয়েম এই ছদ্মনামে ইংরেজিতে প্রবন্ধ লিখে মাদ্রাজ সার্কুলার’, ‘স্পেকটেটর, ‘হিন্দু ক্রোনিকল প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশ

এরপর পিতামাতার মৃত্যুর পর মাদ্রাজ ত্যাগ করে কলকাতায় প্রত্যাবর্তন (১৮৫৬) কলকাতা পুলিশ কোর্টে প্রথম কেরানিগিরি, পরে দোভাষীর চাকরি গ্রহণ এতোকাল ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেছিলেন, এবার তাঁর বাংলাভাষার প্রতি আগ্রহ জাগে এবং বাংলায় সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন

তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যসম্ভারের মধ্যে রয়েছে-মহাভারতের দেবযানী যযাতি উপাখ্যান অবলম্বন করে পাশ্চাত্য রীতিতে রচিত শর্মিষ্ঠা (১৮৫৮) নাটক উল্লেখ্য রামায়ণ তর্করত্মের রত্মাবলী’ (১৮৫৮) নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করতে গিয়ে নাট্যশালার সাথে যুক্ত ও নাটক রচনায় ব্রতী হন তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে পদ্মাবতী (১৮৬০) ও কৃষ্ণকুমারী (১৮৬১) তাঁর বিখ্যাত কাব্যের মধ্যে রয়েছে-তিলোওমাসম্ভব (১৮৬০), রামায়ণের রাম-বাবনের কাহিনী অবলম্বনে রচিত অমর মহাকাব্য মেঘনাদবধ (১৮৬১) রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক গীতিকাব্য ব্রজাঙ্গনা (১৮৬১) ও রোমক কবি ও বিদের হিরোয়দস কাব্যের আদর্শে প্রণীত পত্রকাব্য-বীরাঙ্গনা’ (১৮৬২) মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা পদ্যসাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের স্রষ্টাপদ্মাবতী নাটকের পদ্যাংশে, ‘মেঘনাদবধ বীরাঙ্গনা কাব্যের আদ্যোপান্ত অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত

কবি ১৮৬২র ৯ জুন ব্যারিষ্টরি পড়ার জন্য ইংল্যান্ড গমন করেন, ১৮৬৩ সালে লন্ডন থেকে ফ্রান্সে যান ফ্রান্সের ভাসাই নগরীতে অবস্থানকালে বাংলায় প্রথম চতুর্দশপদী কবিতা’ (সনেট) রচনা এবং চতুদর্শপদী কবিতাবলী’ (১৮৬৬) নামে এগুলো পুস্তক আকারে প্রকাশ করেন তিনি ১৮৬৬ সালে লন্ডনের গ্রেজ ইন্‌ থেকে ব্যারিস্টার ডিগ্রী লাভ করেন ১৮৬৭-র ৫ জানুয়ারি লন্ডন থেকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসায় যোগদান করেন ১৮৭১-এ হোমারের ইলিয়াড’-এর উপাখ্যান অবলম্বন করে হেকটর বধ রচনা বাংলা গদ্যে তাঁর উল্লেখযোগ্য কীর্তি

মাইকেল মধুসূদন দত্তের শেষ জীবন বিদেশে এবং দেশে অবস্থানকালে অমিতব্যয়ীতার জন্য ঋণগ্রস্ত ও দারিদ্র্যপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং এক সময় প্রখ্যাত সাহিত্যিক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এঁর নিকট হতে অর্থ সাহায্য গ্রহণ করে চলেন এবং শেষে কর্পদকহীন অবস্থায় ২৯ জুন ১৮৭৩ সালে কলকাতা জেনারেল হাসপাতালে পরলোক গমন করেন বাংলা ভাষার অন্তর্নিহিত শক্তি জাগরণে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত এর অমর সৃষ্টি সমূহ বাঙালির অহংকার

 

ফ্রিজ কথা বলবে, ওভেন তা শুনবে!

 

 

সংলাপ

 

স্মার্ট অ্যাপ্লায়েন্সেস এর মানে হলো ঘরে ব্যবহারের জিনিসপত্র যদি বুদ্ধিমান হয় তাহলে জীবনটা আরেকটু সহজ হয়ে যায় ব্যাপারটা আলোচিত হচ্ছে বহুদিন ধরেই এবার বাস্তবায়নের পালা ধরুন, আপনি অফিসে এমন সময় কেউ একজন ফোন করে রাতে আপনার অতিথি হতে চাইলো কিন্তু হয়তো আপনি কাজে এতোটাই ব্যস্ত যে অতিথিকে আপ্যায়ন করার মতো যথেষ্ট সময় নেই এই পরিস্থিতিতে আপনাকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসতে পারে স্মার্ট অ্যাপ্লায়েন্সেস যেমন বুদ্ধিমান রেফ্রিজারেটর, ওভেন, রোবোটিক ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ইত্যাদি তাদের সাহায্য পেতে আপনাকে শুধু আপনার স্মার্টফোন দিয়ে ওইসব বুদ্ধিমান গ্যাজেটগুলোকে কাজের নির্দেশ দিলেই সব ঝামেলা শেষ হয়ে যাবে নিজে ঘরে না থেকেও রান্না তৈরি হয়ে যাবে আর আপনার অতিথিও আপ্যায়িত হয়ে যাবে এমন ফ্যান্টাসির কথা এতোদিন শুধু শোনা যাচ্ছিল কিন্তু এবার এর একটা বাস্তব রূপ দেখা গেছে আমেরিকার লাস ভেগাসে সম্প্রতি শেষ হয়ে যাওয়া কনজিউমার ইলেকট্রনিক শোতে এ ধরনের গ্যাজেট দেখা গেছেস্মার্ট অ্যাপ্লায়েন্সস উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার এলজি তারা মেলায় একটা রেফ্রিজারেটর নিয়ে এসেছিল যাতে সংযুক্ত ছিল একটা টাচস্ক্রিন ফ্রিজের ভেতরে কী কী আছে এবং কোন জায়গায়, তা লেখা রয়েছে ওই স্ক্রিনে এছাড়া ফ্রিজে থাকা দুধের মেয়াদ কতদিন আছে সেটাও স্ক্রিনেই দেখতে পাওয়া যায় এই ফ্রিজকে বাইরে থেকে স্মার্টফোনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায় যেমন আপনি বাজার করার সময় ফোনের মাধ্যমে জেনে নিতে পারবেন ফ্রিজে কী কী জিনিস আছে, আর কী কী কিনতে হবে আবার আপনি যদি ফ্রিজকে জানিয়ে দেন আপনি কী রান্না করতে চান তাহলে ফ্রিজ সেটা জানিয়ে দেবে ওভেনকে আর ওভেন সে অনুযায়ী কাজ শুরু করে দেবে এর মানে হচ্ছে, ওইসব গ্যাজেটকে আপনার কথা শোনাতে হবে এবং গ্যাজেটগুলোকেও নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে হবে এসব নিশ্চিত করতে গ্যাজেটগুলোর মধ্যে ওয়াই-ফাই কানেক্টিভিটি প্রয়োজন এলজি সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছে একই সঙ্গে ঘরের কাজে সহায়ক এসব যন্ত্রপাতিগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয়ী করতেও গবেষণা করছে এলজি দক্ষিণ কোরিয়ার আরেকটি কোম্পানি স্যামসাংও বুদ্ধিমান ফ্রিজ নিয়ে কাজ করছে

তাদের উদ্ভাবিত ফ্রিজকে আপনি শুধু বলবেন, আপনার এটা এটা প্রয়োজন ব্যস, ফ্রিজই সব বাজার করে আনবে! ব্যাপারটা এরকম যে, ফ্রিজে যে টাচস্ক্রিনটা রয়েছে সেটা ব্যবহার করে আপনি শুধু ফ্রিজকে জানিয়ে দেবেন আপনার এক কেজি আপেল আর এক হালি ডিম দরকার সঙ্গে সঙ্গে ফ্রিজ সেটা এসএমএস বা সংক্ষিপ্ত বার্তার মাধ্যমে জানিয়ে দেবে দোকানিকে দোকানি তখন সেগুলো বাসায় পৌঁছে দেবে অবশ্য এজন্য কতগুলো নির্দিষ্ট দোকানের সঙ্গে ফ্রিজের সংযোগ থাকতে হবে দক্ষিণ কোরিয়ায় সংক্ষিপ্ত পরিসরে এই ব্যবস্থা চালুও হয়ে গেছে

ফ্রিজের পর এবার বুদ্ধিমান ভ্যাকুয়াম ক্লিনার খবর দেয়া যাক এলজির তৈরি একটা রোবোটিক ক্লিনারে রয়েছে তিনটি ক্যামেরা আপনার কাছে থাকা স্মার্টফোন দিয়ে আপনি ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের ক্যামেরা ব্যবহার করতে পারবেন আপনি দেখতে পারবেন ঘরের কোথায় ময়লা জমে আছে সে অনুযায়ী ক্লিনারকে নির্দেশ দিতে পারবেন।   

 

পাখির মতো গাইবে ইঁদুর!

 

ফরিদা

 

জাপানি বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এমন এক ধরনের জেনেটিকালি মডিফাইড ইঁদুরের জন্ম দিয়েছে যা গান গায় পাখির মতো মিষ্টি সুরে পাখির মতো করেই তারা শব্দ করে, ডাকে, একে অপরের সঙ্গে ভাব বিনিময় করে সেই গান গাওয়া ইঁদুরের নাম দেয়া হয়েছে টুইটিং মাউস

জাপানের ইউনিভার্সিটি অফ ওসাকার একদল গবেষক ইঁদুর এবং পাখির মধ্যে কিছু ডিএনএ অদল-বদল করে তাদের জেনেটিকালি মডিফাইড করে এরপর সেই সব জেনেটিকালি মডিফাইড ইঁদুরের ভ্রুণ থেকে জন্ম নেয় কয়েকটি ইঁদুর ছানা

এই গবেষণার প্রধান আরিকুনি উচিমুরা বলেন, ‘প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম ডিএনএ অদল-বদলের কারণে ইঁদুরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে কিছু পরিবর্তন আসবে কিন্তু যখন দেখলাম তারা স্বাভাবিক ইঁদুর ছানার মতোই দেখতে, আমরা একটু হতাশ হয়ে পড়েছিলাম কিন্তু যখন ইঁদুর ছানাগুলো একটু বড় হলো একদিন শুনলাম তাদের কণ্ঠ একদম পাখির মতো শোনাচ্ছে তারা পাখির মতো সুর করে গানও গাইছে

উচিমুরা আরো জানান, এর মাধ্যমে তাদের সম্ভাবনার দ্বার আরো প্রসারিত হলো তারা এখন গবেষণা করছে এবং ভাবছে, যদি ডিএনএ পরিবর্তনের মাধ্যমে ইঁদুরকে পাখির কণ্ঠ দেয়া যায়, তাহলে মানুষের কণ্ঠস্বরও তাদের মধ্যে প্রয়োগ করা যাবে সেই লক্ষ্যেই ইউনিভার্সিটি অফ ওসাকার বিজ্ঞানীরা আরো ১০০ টুইটিং মাউস জন্ম দেয়ার পরিকল্পনা করছে উচিমুরা বলেন, ‘হয়তো আমার চিন্তাকে উচ্চাশা বলা যেতে পারে, কেউবা একে পাগলামিও বলতে পারে কিন্তু আমি আশা করছি ইঁদুরকে মানব কণ্ঠস্বর দিয়ে বাস্তবে মিকি মাউসের জন্ম দেয়ার  

 

ভিয়েনা কেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নগরী

 

 

সংলাপ

 

মানুষের কাছে স্বর্গের ধারণাটি কী রকম? প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাহিত্য-চিত্রকলায় মানুষ তার কল্পনায় যতখানি স্বর্গের ছবি আঁকতে পেরেছে তা অনেকটা এরকম : স্বর্গ হবে মনোরম, সুস্নিগ্ধ আর সাজানো-গোছানো, ছিমছাম স্বর্গের হ্রদ অথবা নদীর জল হবে টলোমলো, থাকবে চারদিকে পাখির কলকাকলী, ফুলে ফুলে সুশোভিত থাকবে সব বাগান সর্বোপরি স্বর্গে থাকবে ঝগড়া-বিবাদহীন সুখ আর শান্তির এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ আর সেই স্বর্গীয় পরিবেশটাই অস্ট্রিয়ার ভিয়েনাতে খুঁজে পেয়েছেন পৃথিবী বিখ্যাত লিভিং স্ট্যান্ডার্ড নির্ণায়ক প্রতিষ্ঠান মার্সার মার্সার পৃথিবীতে বসবাসের জন্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শহর কোনটি, সেটি জানতে বিশ্বজুড়ে সম্প্রতি একটি জরিপ চালায় এ জরিপে পৃথিবীতে বসবাসের জন্য শ্রেষ্ঠ নগরী নির্বাচিত হয়েছে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা

সারাবিশ্বের প্রায় আড়াইশর মতো শহরের অবকাঠামো, সড়ক নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্যসেবা প্রভৃতি বিষয়ের ওপর জরিপ চালিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করেছে মার্সার বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা এ তালিকার ২০৪ নম্বরে অবস্থান করছে আর বাগদাদ রয়েছে সর্বনিম্ন অবস্থানে

তালিকার শীর্ষ ১০ নগরীর সব কটিই জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডের শহর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে জার্মানির মিউনিখ, ডুসেলডর্ফ ও কানাডার ভ্যাঙ্কুভার সপ্তম, অষ্টম ও নবম স্থানে রয়েছে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট, সুইজারল্যান্ডের জেনেভা ও বার্ন দশম স্থানে রয়েছে ডেনমার্কের কোপেনহেগেন জরিপে বলা হয়েছে, ভিয়েনার সুসজ্জিত ভবন, পার্ক ও সাইকেলের প্রভূত ব্যবহার শহরে প্রতিদিনের পরিবহনের খরচ সম্প্রতি ১ ইউরোতে নিয়ে এসেছে ১ কোটি ৭০ লাখ বাসিন্দার এ শহরে গুরুতর অপরাধের ঘটনা বিরল মার্সারের গবেষক পাবাকাটিল বলেন, নিরাপত্তার দিক থেকে কম নম্বর পাওয়ায় ইউরোপীয় শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিচে স্থান পেয়েছে এথেন্স এছাড়া অ্যান্ডার্স ব্রেইভিকের গণহত্যার পর অসলোর অবস্থানও ২৪ ধাপ নেমে গেছে

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে সবচেয়ে নিচের স্থানটি পেয়েছে বাগদাদ একই কারণে মধ্যপ্রাচ্য ও অফ্রিকার দেশগুলোর অনেক শহরের অবস্থান নেমে গেছে তবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে উঠে এসেছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অনেক শহরের অবস্থান শীর্ষ ২০ শহরের মধ্যে রয়েছে এ অঞ্চলের অকল্যান্ড, সিডনি, ওয়েলিংটন, মেলবোর্ন ও পার্থ এশিয়ার সেরা শহরের মর্যাদা পেয়েছে সিঙ্গাপুর

যা হোক, এবার আসা যাক বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শহরের মর্যাদা লাভকারী ভিয়েনা শহরের কথায় ভিয়েনা লোয়ার অস্ট্রিয়া প্রদেশের ৩০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ছোট, সুন্দর, ছবির মতো সাজানো-গোছানো একটি শহর খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতাব্দীতে ভিয়েনার গোড়াপত্তন হয় তবে ভিয়েনার আধুনিক নগর যাত্রার শুরু৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে এর বয়স ১০০০ বছরের বেশি হলেও এখনও এটি যেন চিরনতুন এক শহর ভিয়েনা মোট ২৩টি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত একেকটি প্রশাসনিক অঞ্চল বাংলাদেশের একেকটি ইউনিয়ন পরিষদের মতো পরিসরের অথবা কোন কোনটি এর চেয়েও ছোট এ প্রশাসনিক অঞ্চলগুলো ঠিক এমনভাবে গঠন করা হয়েছে যেন যে কোন সমস্যায় ৫ মিনিটের ভেতর পুলিশ, ফায়ার ব্রিগেড অথবা জরুরি বিভাগে কর্মরত ডাক্তাররা ওই এলাকায় যেতে পারেন শুধু ভিয়েনা নয়, পুরো অস্ট্রিয়ার ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক ধরনটা ঠিক এরকম

প্রতিটি প্রশাসনিক অঞ্চলের কাউন্সিলর ও ভিয়েনার মেয়র জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলেও কার্যত ভিয়েনার পুরো প্রশাসন পরিচালনা করেন প্রতিটি প্রশাসনিক অঞ্চলের সরকার নিযুক্ত ম্যাজিস্ট্রেটরা প্রতিটি প্রশাসনিক অঞ্চলে ঠিক কতজন লোক বাস করছে, তার সঠিক হিসাব এসব ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে রয়েছে ভিয়েনায় রয়েছে রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থা ফলে কেউ বাসা পরিবর্তন, অন্য প্রদেশে বসবাস অথবা দেশান্তরিত হতে চাইলে ম্যজিস্ট্রেটদের কাছে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতেই হবে উদাহরণস্বরূপ, কারও ছেলের কিন্ডারগার্টেনে যাওয়ার সময় হলে ম্যাজিস্ট্রেটরাই চিঠি দিয়ে জানাবেন সে প্রশাসনিক অঞ্চলের কোন কিন্ডারগার্টেনে তার ছেলে বা মেয়েকে ভর্তি করাবেন প্রসঙ্গত বলা দরকার, আমাদের বাংলাদেশের কিন্ডারগার্টেনের মতো নয় ওখানকার কিন্ডারগার্টেন ভিয়েনার সব কিন্ডারগার্টেন সরকারি বেসরকারি কোন কিন্ডারগার্টেন নেই সেখানে সকাল ৭টা থেকেই বাবা-মায়েরা সন্তানদের কিন্ডারগার্টেনে রেখে আসে প্রতি ৮ বা ১০ জনের একেকটি শিশুদলের পরিচর্যার জন্য কিন্ডারগার্টেনে রয়েছে ফুফু অথবা খালাম্মারা কিন্ডারগার্টেনে স্যার বা ম্যাডাম বলে কোন শব্দ নেই বাবা-মায়ের মতোই খুব যত্ন ও আদরে সেখানে আনন্দ ও বিনোদনমূলক শিক্ষা দেয়া হয় কিন্ডারগার্টেনে শিশুদের ইচ্ছামাফিক খাবার ও পানীয় সরকার সরবরাহ করে বিনামূল্যে কিন্ডারগার্টেনগুলোতে শিশুদের শৃংখলা শেখানোর চেষ্টা করা হয় একটু বড় হলে ওসব শিশুকে নেয়া হয় রাস্তায় ট্রাফিক লাইটের সংকেত চেনানো, সিনেমা হলে নেয়া হয় শিশুতোষ ছবি দেখানো এবং রাস্তাঘাটে উচ্চস্বরে কথা বলা অভদ্রতা- এসব শেখানোর জন্য ভিয়েনাতে শিশুরা কিন্ডারগার্টেন এত উপভোগ করে যে সেখান থেকে ফিরে না আসার জন্য অনেক ছেলেমেয়েকে কান্নাকাটি করতে দেখেছি কিন্ডারগার্টেন থেকে প্রাইমারি স্কুল হয়ে হাইস্কুল পর্যন্ত- শিশুদের পড়াশোনার ব্যাপারটা মা-বাবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ম্যাজিস্ট্রেটরাই অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করেন

এবার আসি যোগাযোগ ব্যবস্থার কথায় যোগাযোগ ব্যবস্থায় ভিয়েনা বিস্ময়কর অগ্রগতি সাধন করেছে ভিয়েনায় চলাচলকারী বাস, ট্রেন, ট্রাম ও আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল- সবই সরকারি ৩০ ইউরো দিয়ে একেকটি যাতায়াত কার্ড কেনার পর নগরবাসী সারামাস ধরে ভিয়েনার যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাতায়াত করতে পারে ভিয়েনার যে কোন প্রান্তে যাতায়াতের জন্য প্রতি ৫ মিনিট পর পর বাস, ট্রেন, ট্রাম ও মেট্রোর ব্যবস্থা রয়েছে বাস, ট্রেন, ট্রাম ও মেট্রোয় সাধারণত টিকিট চেকিং হয় না যাত্রীরা নিজ দায়িত্বেই টিকিট কেটে থাকেন ভিয়েনায় রয়েছে আন্ডারগ্রাউন্ড-১, আন্ডারগ্রাউন্ড -২ ও আন্ডারগ্রাউন্ড-৩ মেট্রো রেল, যা পুরো শহরকে অতি অল্প সময়ে যানজটহীন যাতায়াতের এক শ্রেষ্ঠ শহরে পরিণত করেছে

এবার আসি নিরাপত্তা ব্যবস'ার কথায় অস্ট্রিয়ায় গুরুতর অপরাধ অথবা খুনোখুনির ঘটনা একেবারেই বিরল বলা চলে পুলিশ কঠোর হাতে এখানে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করে ভিয়েনার প্রতিটি পাড়ায় রয়েছে একেকটি থানা সেসব থানা কর্তৃক রয়েছে সার্বণিক টহলের ব্যবস্থা রয়েছে ওয়াটার পুলিশ, যারা ভিয়েনার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত দানিয়ুব নদীতে টহল দিচ্ছে প্রতিদিন রয়েছে আকাশ থেকে হেলিকপ্টারযোগে শক্তিশালী ক্যামেরা দিয়ে নিরাপত্তা তলাশি এছাড়া ভিয়েনার ওয়াটার পুলিশ কর্তৃক প্রতি সপ্তাহে একবার করে ডুবুরি দিয়ে দানিয়ুব নদীর তলদেশ তলাশির ব্যবস্থা রয়েছে ভিয়েনায় যে কোন ঘটনা-দুর্ঘটনায় পুলিশকে ৩ থেকে ৫ মিনিটের ভেতর হাজির হতেই হবে দ্রুততম সময়ের ভেতর উপস্থিত হওয়ার জন্য প্রতিটি পাড়ায় একেকটি থানার ব্যবস্থা করা হয়েছে ৩ থেকে ৫ মিনিটের ভেতর হাজির হতে না পারলে রয়েছে চাকরিচ্যুতির ব্যবস্থা পুলিশের জন্য রয়েছে সার্বণিক মানসিক ডাক্তার, যাদের কাজ হচ্ছে পুলিশদের চাঙ্গা রাখা- যাতে কোন ব্যর্থতায় অথবা অসফল অপারেশনের পর পুলিশের মনোবল ভেঙে না যায়

পুলিশ হচ্ছে, অস্ট্রিয়ায় সবচেয়ে সম্মানীত চাকরি স্কুল-কলেজগুলোতে শৈশব থেকেই ছেলেমেয়েদের স্বপ্নের চাকরি হচ্ছে পুলিশ গত বছর জনমত জরিপে জনবিশ্বাসের দিক থেকে অস্ট্রিয়ার পুলিশ ১ নম্বরে, বিচার বিভাগ ২ নম্বরে এবং রাজনীতিকরা ৩ নম্বরে স্থান পেয়েছেন দায়িত্ব পালনকালে বিবাদমান কোন পক্ষ থেকে অথবা বাইরের সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে এক গস্নাস পানি পান করাও পুলিশের জন্য দণ্ডনীয় অপরাধ চা, কফি অথবা টাকা-পয়সা নেয়া তো দূরের কথা আইন এখানে গরিব, ধনী সবার জন্য সমান দায়িত্ব পালন ছাড়াও পুলিশ তার অবসরে অথবা ছুটির সময়ে কারও কাছ থেকে কোন সুবিধা নিতে পারে না পুলিশের কনস্টেবল থেকে অফিসার- সবার বেতন ১৫০০ থেকে ২০০০ ইউরোতে বাঁধা বেতনের বাইরে এক কানাকড়িরও প্রত্যাশা করতে পারে না পুলিশ এখানে

ভিয়েনায় রয়েছে সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য নিরাপত্তা প্রতিটি হাসপাতাল এখানে সার্বক্ষণিক সেবা দিয়ে চলছে রোগীদের ভিয়েনা তো বটেই, অস্ট্রিয়ার সব হাসপাতালেই রয়েছে সর্বাধুনিক হেলিকপ্টার অ্যাম্বুলেন্স ভিয়েনার যে কোন স্থানে যে কোন ঘটনা-দুর্ঘটনায় প্রতি ৫ মিনিটের ভেতর রোগীর কাছে ডাক্তারকে পৌঁছাতেই হবে না হলে জরুরি বিভাগ এবং দুর্ঘটনা বিভাগের ডাক্তার ও নার্সদের চাকরিচ্যুতির ব্যবস্থা রয়েছে ভিয়েনায় চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অথবা ডায়াগনোসিসের জন্য ডাক্তারদের কোন ফি দিতে হয় না জনগণকে ফার্মেসি থেকেও ওষুধ কিনতে হয় না নিজের খরচে রাষ্ট্র এখানে স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করেছে যে কোন কারণেই হোক না কেন, ডাক্তাররা রোগীর অথবা রোগীর আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দুর্ব্যবহার বা অসংযত আচরণ করতে পারবে না, ব্যবস্থাপত্র দেয়ার আগে রোগীর কেস হিস্ট্রি শুনতে হবে ডাক্তারকে নিরুদ্বিগ্ন হয়ে এমনকি ডাক্তারের চিকিৎসা-মান নিয়ে অসন্তুষ্ট রোগীকে জিজ্ঞেস করতে হবে, সে অন্য কোন ডাক্তারের চিকিৎসা নিতে আগ্রহী কিনা তাছাড়া সিরিয়াল দেয়া রোগীদের নির্ধারিত সময়ের ১০ থেকে ১৫ মিনিটের বাইরে বসিয়ে রাখা হয় না

এবার আসা যাক ভিয়েনার ডাক্তারদের চিকিৎসা আর সেবার কথায় ভিয়েনায় বেশিরভাগ ডাক্তারই প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে না দু’-একজন করলেও রোগীরা ব্যবস্থাপত্র নেয় না ওসব ডাক্তারের ফলে সরকারি চাকরিতেই ফিরে আসতে হয় ডাক্তারদের শেষ পর্যন্ত একজন ডাক্তার তৈরি করতে সাধারণ মানুষের বিপুল অংকের করের টাকা ব্যয় হয় বলে ওখানকার ডাক্তাররা সনদ অর্জন শেষ করে সরকারি হাসপাতালগুলোতেই ফিরে আসে চিকিৎসাসেবা দেয়ার জন্য আমাদের দেশের মতো ক্লিনিক ব্যবস্থা ভিয়েনায় নেই ধনী-গরিব সবার জন্যই সমান সুবিধা নিয়ে সদা উন্মুক্ত সরকারি হাসপাতালগুলো

এছাড়া ভিয়েনায় নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে ফায়ার ব্রিগেড সড়ক দুর্ঘটনা অথবা অগ্নিকাণ্ডস্থলে ৫ মিনিটের ভেতর ফায়ার ব্রিগেড কর্মীদের পৌঁছতে হবেই না হলে রয়েছে চাকরিচ্যুতির ব্যবস্থা তবে ভিয়েনায় বাড়িঘরে সাধারণত আগুন লাগে না কারণ প্রতিটি পাড়ায় রয়েছে ফায়ার ব্রিগেড এবং সেসব ফায়ার ব্রিগেডে রয়েছে প্রতিটি বাড়ি বা দোকানের নম্বরধারী অগ্নিনির্বাপন সফটওয়্যার কোন বাসা বা বন্ধ দোকানে আগুন লাগার সম্ভাবনা থাকলে ফায়ার ব্রিগেড স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানতে পারে ইলেকট্রনিক সংকেতের মাধ্যমে জনগণকে ফোন করে ফায়ার ব্রিগেডে খবর দেয়ার কোন দরকার হয় না

সব ক্ষেত্রেই এমন কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলবৎ রয়েছে ভিয়েনায়, যা চোখে না দেখলে শুধু লেখা পড়ে আন্দাজ করা কঠিন আর এ নিরাপত্তা ব্যবস্থাই ভিয়েনাকে আজ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভেতর শ্রেষ্ঠ শহরে পরিণত করেছে