| |
ব্যক্তি
পরিবার ধর্ম,
লক্ষ্য না
মাধ্যম
সমাজে কিছু অভাগা তরুণ-তরুণীর সন্ধান পাওয়া যায়,
তারা আত্মহত্যার পূর্বে প্রেমিক-প্রেমিকার উদ্দেশ্যে লিখে যান-
'তোমাকে
যখন পেলাম না,
তখন বেঁচে থেকে লাভ কি!'
অর্থাৎ তাদের লক্ষ্য হলো প্রেমিক-প্রেমিকার সান্নিধ্য পাওয়া।
আর মাধ্যম হলো পার্থিব ও অপার্থিব জগতের বিভিন্ন কর্মকা
।
আবার বহুল প্রচলিত একটি কথা রয়েছে- বাঁচার জন্য খাওয়া,
না খাওয়ার জন্য বাঁচা।
যদি অনেক কিছু করার জন্য বেঁচে থাকা লক্ষ্য হয়,
তখন মাধ্যম হিসাবে সুস্বাদু খাদ্য বাছাইয়ের চেয়ে সুষম ও স্বাস্থ্যসম্মত
খাদ্যই প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়।
আর যদি লক্ষ্য খাওয়া হয়,
তখন মাধ্যম হবে খাওয়ার অর্থ সংগ্রহের জন্য যাবতীয় পরিশ্রম করা।
রাজনীতিতেও লক্ষ্য ও মাধ্যমের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে।
বলা যায়,
লক্ষ্য ও মাধ্যম নির্ধারণ করা নিয়েই যত দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ।
আধুনিক যুগের শুরুতে ধর্মকে রাজনীতি থেকে পৃথক করা হয়।
এর পেছনে দার্শনিক নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির ভূমিকা ইতিহাস-স্বীকৃত।
তাঁর মতে- লক্ষ্য মাধ্যমের যৌক্তিকতা বিধান করে,
মাধ্যম লক্ষ্যের নয় (ঊহফ লঁং:রভরবং :যব সবধহং,
হড়ঃ সবধহং :যব বহফ)।
রাষ্ট্র হচ্ছে বাস্তব প্রতিষ্ঠান এবং এর ক্ষমতাই সর্বোচ্চ।
সেজন্য তিনি মনে করতেন,
ধর্ম ও নৈতিকতার মাধ্যমে রাষ্ট্র যদি তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারে,
তা হবে সর্বাপেক্ষা উত্তম।
কিন্তু মানুষ প্রকৃতিগতভাবে দুর্নীতিপরায়ণ,
প্রতারক,
লোভী ও হিংসুটে হওয়ায় এ পথে কখনই রাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না।
সেজন্য তিনি মনে করেন,
শাসকের কার্যসিদ্ধি করতে যদি ধর্মকে মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করার প্রয়োজন
হয়,
তাহলে সেটা অনুচিত হবে না।
শাসক তাঁর লক্ষ্য অর্জনের প্রয়োজনে আন্তরিকতা,
সততা,
মানবতা ও ধার্মিকতার ভান করবে (ম্যাকিয়াভেলির এই উপদেশকে অনেকে অনৈতিক
হিসাবে পরিত্যাগ করলেও স্বৈরাচারী শাসকেরা যুগে যুগে এ নীতি ব্যবহার করে
তাদের ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার বহু নজির রয়েছে)।
কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে পারলৌকিকতা যদি একমাত্র লক্ষ্য হয়,
তাহলে ইহলৌকিকতা গৌণ হয়ে যেতে পারে।
আর যদি ইহলৌকিকতা লক্ষ্য হয়,
তখন মাধ্যম হিসাবে ধর্মীয় আদেশ- উপদেশের চেয়ে অন্যান্য আদেশ-উপদেশও
গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এখানে একটি ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে একটি ধারার কিছু অংশ উল্লেখ
করা যায়-
'সৃষ্টিকর্তা
ব্যতীত অপর কাহাকেও বাদশাহ,
রাজাধিরাজ ও সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক মানিয়া লইবে না,
কাহাকেও নিরঙ্কুশভাবে আদেশ ও নিষেধ করিবার অধিকারী মনে করিবে না,
কাহাকেও স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধানদাতা ও আইন প্রণেতা মানিয়া লইবে না।'
নির্বাচন কমিশনের মতে,
সংবিধানের সঙ্গে এ ধারা সাংঘর্ষিক হওয়ায় এ ধারা বাতিল না করলে দলটি
নিবন্ধন পাওয়ার অযোগ্য হবে।
সকলের জানা রয়েছে,
একসময় গীর্জার অধীনে রাষ্ট্র ছিল।
রাজা যাজকদের পরামর্শে রাজ্য চালাতেন।
সে সময় যুক্তি ছিল,
পার্থিব সুখের চেয়ে বড় জিনিস আত্মার মুক্তি।
সেজন্য পারলৌকিকতাকে লক্ষ্য করেই শাসনকার্য পরিচালিত হতো।
মধ্যযুগের শেষের দিকে পোপ ও সম্রাটের বিরোধ চরমে উঠলে দার্শনিকেরা দুই
তরবারির তত্ত্ব দেন।
তা হলো- পার্থিব জীবনে সম্রাট এবং আধ্যাত্মিক জীবনে পোপ।
কিন্তু যখন দার্শনিকেরা প্রমাণ পেলেন,
পার্থিব জগতের সমৃদ্ধি অর্জনে অপার্থিব জগতের যুক্তি সবসময় কাজে আসে না,
তখন ধর্মকে রাজনীতি থেকে চিরতরে বাদ দেন।
আধুনিক যুগের রাজনীতিতে লক্ষ্য অর্জনে মাধ্যম পরিবর্তনের আরও উদাহরণ
রয়েছে;
যেমন,
চীনের বর্তমান রাজনীতিতে একটি কথা আছে-
'বিড়ালটি
সাদা কি কালো বড় কথা নয়,
আসলে বিড়ালটি ইঁদুর ধরতে পারে কি না! অর্থাৎ দেশের সমৃদ্ধি অর্জনে
নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির চেয়ে রাজার অর্থনীতি অধিক কার্যকরী হলে সেটা গ্রহণ
করাই যুক্তিযুক্ত হবে।
অন্যদিকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তারে গণতন্ত্র ও
মানবতাকে মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে।
আবার অনেকে বলে থাকেন,
যাদের লক্ষ্য আর মাধ্যম এক তাদের সঙ্গে পেরে ওঠা মুশকিল।
যেমন,
একজন চরমপন্থীর যদি লক্ষ্য হয় কাউকে হত্যা করা,
কৌশল (মাধ্যম) হিসাবে যদি সে নিজেকে মানববোমা হিসাবে উৎসর্গ করে,
তাহলে তাকে ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে।
এর উল্টো উদাহরণ রয়েছে,
যেমন- মহীয়সী নারী মাদার তেরেসা বলেছেন,
তিনি যখন কোন দুঃস্থকে সেবা করেন তখন তার কাছে মনে হয়েছে স্বয়ং ঈশ্বরকেই
সেবা করছেন।
ফলে তিনি দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মহলের কাছে শ্রদ্ধার আসনে
অধিষ্ঠিত হতে পেরেছেন।
তৃতীয় বিশ্বের প্রায় দেশের রাজনীতি ব্যক্তি ও পরিবারকে কেন্দ্র করে
আবর্তিত হওয়ায় গণতন্ত্র,
মানবতা,
আইনের শাসন ইত্যাদি লক্ষ্য না হয়ে মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
এখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেরেমী বেনথামের (ঔবৎবসু নবহঃযধস) উপযোগ তত্ত্ব
প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
তিনি রাষ্ট্র,
সরকার,
নৈতিকতা,
আইন প্রণয়ন প্রভৃতি ব্যাপারে উপযোগিতার নীতিকেই একমাত্র সূচক হিসাবে
গ্রহণ করেছেন।
তিনি মনে করেন- ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্র,
রাষ্ট্রের জন্য ব্যক্তি নয়- এটিই হচ্ছে বৃটিশ রাষ্ট্রতত্ত্বের মূল ভিত্তি।
প্রকৃতি মানব জাতিকে আনন্দ ও বেদনার দুই সার্বভৌম প্রভুর শাসনাধীনে
স্থাপন করেছে।
সেহেতু সরকারের পক্ষে ব্যক্তি পর্যায়ে প্রত্যেকের বাসনার অনুকূলে কাজ করা
সম্ভব নয়,
অতএব জনসংখ্যার সর্বাধিক অংশের যেটি বাসনা সেটিই হচ্ছে যথার্থ বাসনা এবং
এই বাসনাকে সর্বাধিক মাত্রায় চরিতার্থ করাই হচ্ছে সরকারের সঠিক লক্ষ্য।
বৃটিশ শাসনের বিবর্তনের দিকে তাকালে তাঁর মতামতের যথার্থতা পাওয়া যায়।
১০৬৬ সালে নর্মান বিজয়ের পর ইংল্যান্ডে রাজার ক্ষমতা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে
থাকে।
রাজা উইলিয়াম এবং তাহার উত্তরাধিকারীরা গির্জা,
শায়র ও কাউন্টিগুলোর ওপর সর্বময় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।
কিন্তু ত্রয়োদশ শতাব্দী হতে শাসনতন্ত্রের ক্রমবিকাশে যে সকল ঘটনা ঘটতে
থাকে,
তাতে রাজার ক্ষমতা ক্রমশ হ্রাস পায়।
১২১৫ সালের মহাসনদ,
১২৯৫ সালের আদর্শ পার্লামেন্ট,
১৬২৮ সালের অধিকারের আবেদন পত্র,
১৬৮৯ সালে অধিকারের বিল,
১৭৪২ সালে ক্যাবিনেট প্রথার মূল নীতি প্রবর্তন ইত্যাদিতে জনগণের
সার্বভৌমত্বই জয়ী হতে থাকে।
বর্তমানে ইংল্যান্ডের রানী রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধান ও ঐক্যের প্রতীক
মাত্র।
নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রাজ্য পরিচালনা করছেন।
তবে মাঝেমধ্যে রানীর পরামর্শ মাধ্যম হিসাবে গণ্য হয়ে থাকে।
এদেশের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের পক্ষে-বিপক্ষে বহু মতামত রয়েছে।
কিন্তু স্বাধীকার আন্দোলনের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়,
কোনো আন্দোলনই ব্যক্তি বা পরিবারকে লক্ষ্য করে সংঘটিত হয়নি।
সেজন্য এখন প্রয়োজন গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রায়নের লক্ষ্যে উপযুক্ত মাধ্যম
নির্ধারণ করা।
মোশাররফ হোসেন মুসা
ঈশ্বরদি,
পাবনা।
ফুটবলের
বিশ্বকাপে মিডিয়া
শান্তিপ্রিয় বাঙালিদের ক্রীড়ামোদী হিসেবে পরিচিতি আজকের নতুন নয়।
আর
ফুটবলের প্রতি আগ্রহ ছিল সবার ওপরে।
আন্তক্লাব,
আন্তগ্রাম,
আন্ত ইউনিয়ন,
আন্তস্কুল,
আন্ত থানা ইত্যাদি নানা পর্যায়ের ফুটবল প্রতিযোগিতায় এক সময় মুখের থাকতো
এদেশের জেলা,
মহুকুমা,
থানা ও ইউনিয়নের মাঠগুলো।
ক্রীড়ামোদী হাজারো মানুষ বহু দূর দূরান্ত থেকে এসেও ফুটবল খেলার আনন্দ
উপভোগ করতো।
মিডিয়া অর্থাৎ টেলিভিশনের প্রভাবে সারাদেশে এখন ফুটবলের স্থান দখল করে
নিয়েছে ক্রিকেট।
কিন্তু ফুটবলে বিশ্বকাপের জমজমাট আয়োজনের খবর বিগত প্রায় তিন দশক ধরে
পত্র-পত্রিকাসহ বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে যেভাবে উঠে আসছে তাতে মাতোয়ারা
হয়ে পড়ছে দেশ।
নিজ
দেশের মাটিতে যেভাবে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকা এবারও যেভাবে উড়তে দেখা
গেছে তাতে দেশ ও স্বাধীনতা সচেতন যে কোনো মানুষই মর্মাহত হতে বাধ্য।
বিশ্বের আর কোনো দেশে এমনটি সম্ভব কিনা জানা নেই।
অথচ
ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ফুটবল দলের কোন সদস্য আমাদের কারো নাম
এমনকি আমাদের দেশের নামটি জানেন বা শুনেছেন কিনা সন্দেহ।
নাম
না শোনারই কথা।
কেন
না,
কোনো খেলাধুলায় আমাদের দেশের কারো কোনো কৃতিত্ব নেই।
যার
মাধ্যমে আমাদের কারো নাম এমনকি দেশের নাম তারা শুনতে পারবে।
শুধুমাত্র টিভির পর্দায় দেখে আর পত্রিকার পাতায় পড়ে বা ছবি দেখে কার কতটুকু
লাভ হয়েছে তা ভেবে দেখার বিষয়।
অথচ
নিজের দেশ,
গ্রাম,
ক্লাব,
স্কুল বা কলেজের কোনো দলের পক্ষ বা সমর্থক হওয়ার কোনো সুযোগ কম জনেরই আছে।
শেষ
পর্যন্ত ফুটবল খেলোয়াড়দের নৈপুন্য,
চৌকষতা উপভোগ করতে যারা টিভি পর্দার সামনে মাঝে মাঝে বসে তাদের কাছে মনে
হচ্ছে ক্রীড়ামোদী,
ফুটবল প্রিয় বাঙালির সেই দিনটিও যেন হারিয়ে গেছে।
মিডিয়ার দাপটে অধিকাংশ মানুষের এখন আর তেমন কোনো আগ্রহ নেই সামনের দুই
সেমিফাইনালের প্রতি যেখানে একদিকে লড়বে জার্মানি আর স্পেন অপর দিকে উরুগুয়ে
আর নেদারল্যান্ডস।
আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের প্রতি মিথ্যা ভালবাসা আর প্রেমের খেসারত হিসেবে
ইতোমধ্যেই তারা যেন ক্লান্ত আর স্তিমিত।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ফুটবলের বিশ্বকাপের প্রতি মানুষের অনীহা আর
অনাগ্রহের কথা খোদ প্রধান ২০১০ তারিখে দেশের কয়েকটি দৈনিকে খবর বেরিয়েছে যে
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪ জুলাই রবিবার মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকের পর
অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে বিশ্বকাপ নিয়ে মন্তব্য করেন যে,
বাংলাদেশে বিশ্বকাপ শেষ এবং খেলা ঘিরে উন্মাদনাও শেষ।
প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের উদ্দেশ্যে বলেন,
আমার দল আগেই হেরে গেছে।
তারপরও আমি অপেক্ষা করেছি আর্জেন্টিনা কী করে,
তা
দেখার জন্য।
শেষ
পর্যন্ত আর্জেন্টিনাও হেরে গেল।
শেখ
হাসিনা বলেন,
বাংলাদেশের মানুষের সব উন্মাদনা এই দুই দলকে ঘিরে।
বাংলাদেশে এখন তো বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেল এবং এ নিয়ে উন্মাদনাও শেষ হলো।
উল্লেখ্য,
প্রধানমন্ত্রী এর আগে কয়েকবার বলেছেন,
তার
প্রিয় দল ব্রাজিল।
প্রধানমন্ত্রী মহোদয়ের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এদেশের মানুষের ক্রীড়া বিশেষ
করে ফুটবলের প্রতি প্রকৃত আগ্রহ ও মনোভাব সম্পর্কে আঁচ করা যায় সহজেই।
অর্থাৎ বলা যায়,
'আদার
ব্যাপারী জাহাজের খবর'
নিলে তেমন কোনো লাভ নেই।
বাংলাদেশে ফুটবলের যে বিরাট একটি সম্ভাবনা ছিল তা বিগত বছরগুলোতে হত্যা করা
হয়েছিল।
মিডিয়ার পর্দায় আর সংবাদপত্রের পৃষ্ঠাগুলো আগে এত জাঁকজমকভাবে ক্রীড়ার খবর
না থাকলেও বাংলার আনাচে-কানাচে নানা ধরনের খেলাধুলায় মুখর থাকতো।
বর্তমানের ছেলেমেয়েদেরকে খেলার মাঠে পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলেও
জায়গা ও পরিবেশের অভাবে তা করা যাচ্ছে না।
গ্রাম-বাংলা-গঞ্জ-শহরগুলো যে কারণে ক্রমেই অলস ও নিথর হয়ে পড়ছে শুধুমাত্র
টিভি বা বড় পর্দায় খেলা দেখে মানসিক বিকাশ লাভ কতটুকুই বা সম্ভব?
লাভবান হচ্ছে শুধু মিডিয়ার মালিকরাও বিজ্ঞাপন দাতারা।
আর
এদের স্পন্সর নিয়ে ক্রীড়ার বড় বড় আয়োজনগুলো কভার করতে যাওয়া কিছু সংখ্যক
সংবাদকর্মী তথা সাংবাদিকরা।
গোটা দেশের ক্রীড়ামোদী মানুষদেরকে মাঠে নিতে এবং তাদের সন্তানদেরকে ক্রীড়ার
বিভিন্ন ইভেন্টে পারদর্শী করে তোলার পরিকল্পনা নেয়া না হলে এই অন্তসারশূন্য
উন্মাদনাই শুধু দেখা যাবে।
যা
এক প্রকার মানসিক অসুস্থতা।
এ
অবস্থার জন্য মিডিয়ার প্রভাবকেই দায়ী করা যায় এবং তা নিঃসন্দেহে কুপ্রভাব।
সুষ্ঠু ও সুস্থ জাতি তৈরির জন্য তাই মিডিয়ার কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের
ক্রীড়মন্ত্রণালয় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণের এখনই সময়।
বর্ষা
আগুনের আত্মকথা
সুদূর অতীতকালের কথা।
এক
চিন্তাশীল লোকের মনে উদয় হলো একটা প্রশ্ন - বিশ্বপ্রকৃতির রহস্য উদ্ঘাটন
করতে হবে।
একান্ত সাধনা অধ্যবসায় আর বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে একদিন লোকটা আগুন
জ্বালাতে শিখলো - প্রথমত মানুষ আগুন জ্বালালো।
লোকটার নাম নূর।
সে
সিদ্ধান্ত করলো বিভিন্ন সমপ্রদায়ের লোকদের মধ্যে তার আবিষ্কারকে কাজে
লাগানোর পদ্ধতি শিক্ষা দেবে।
নূর
তার আবিষ্কারের তথ্য ও সরঞ্জামাদি সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন গোত্রের উদ্দেশ্যে
রওনা হলো।
একে
একে অনেক গোত্রের কাছে সে তার আগুন জ্বালানোর রহস্য জানালো।
কোন
সমপ্রদায় তার আবিষ্কারকে কাজে লাগালো আবার কোন কোন গোত্রের লোকেরা তাকে
তাড়িয়ে দিল - ভাবলো,
এই
ভয়ঙ্কর আবিষ্কার তাদের ক্ষতি করবে।
এই
মহৎ আবিষ্কারটা তাদের উপকারে লাগতে পারে একথা তারা আদৌ ভাবতে পারলো না।
এমনি করে নানা গোত্র ঘুরে নূর এমন একটা গোত্রের আবাসস্থলে এসে হাজির হলো যে,
তারা সেই আবিষ্কারের দাহিকা শক্তিতে শঙ্কিত হয়ে নূরকে হত্যা করলো।
এই
ঘটনার পর বহু শতাব্দী অতিক্রান্ত হয়ে গেল।
নূর
যে সব গোত্রের কাছে তার আবিষ্কার কাজে লাগানোর রহস্য জানিয়েছিল,
তাদের প্রথম দলটি আগুন জ্বালানোর গোপন কৌশল তাদের পুরোহিতের কাছে গচ্ছিত
রেখেছিল।
আখেরে এই পুরোহিতরা আগুন জ্বালানোর কেরামতি দেখিয়ে প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী
হয়ে উঠলো আর সেই গোত্রের সাধারণ মানুষ আবিষ্কারটার রহস্য বেমালুম ভুলে গেল
- আগুনের ব্যবহারও তারা শিখলো না।
দ্বিতীয় গোত্র আগুন জ্বালানোর কৌশলটাই বেমালুম ভুলে গেল।
আগুন জ্বালানোর পরিবর্তে তারা চক্মকি পাথর আর কাঠের পূজা করতে শুরু করলো।
তৃতীয় গোত্র নূরের এই বিষ্ময়কর আবিষ্কারে মুগ্ধ হয়ে তার মূর্তি তৈরি করে
পূজা করতে লাগলো।
আগুন জ্বালানোর কৌশল তারা ভুলে গেল।
চতুর্থ গোত্র আগুন জ্বালানোর বিবরণটা তাদের গোত্রের গাঁথা হিসাবে মুখে মুখে
প্রচার করতে লাগলো - আগুন কেমন করে জ্বালাতে হয় সে কথাটাকে তারা বাস্তবে
কাজে লাগালো না।
কিংবদন্তির মত আগুন জ্বালানোর এই কাহিনী পরবর্তীকালে কেউ বিশ্বাস করলো -
কেউ বা করলো না।
আগুন জ্বালানোর কাহিনীই তাদের ধর্মীয়বাণী হিসাবে রয়ে গেল।
পঞ্চম গোত্রের লোকেরা নূরের এই আবিষ্কারকে বাস্তবে কাজে লাগালো।
তারা আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণ করতো,
রান্না করতো আর আগুনের সাহায্যে নান রকম জিনিসপত্র বানাতে লাগলো।
...... এর পর অনেক অনেককাল চলে গেল।
একদা এক সূফী তাঁর মুরীদদের সঙ্গে নিয়ে সেই উপজাতীদের দেশের মধ্য দিয়ে
ভ্রমণ করছিলেন।
মুরীদগণ এই উপজাতীদের বিভিন্ন গোত্রের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান দেখে বেশ কৌতুক
বোধ করলেন - এক এক গোত্রে এক এক রকমের ধর্মশাস্ত্র।
মুরীদরা সূফী সাহেবের কাছে সবিস্তারে তাঁদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলো।
তারা বললো -
'হুজুর!
বিভিন্ন গোত্রের ধর্মক্রিয়া বিভিন্ন হলেও সবগুলোই আগুন জ্বালানোর সঙ্গে
সম্পর্কিত - তা ছাড়া অন্য কিছু নয়।
এই
বিভ্রান্ত লোকগুলোকে আমাদের সঠিক পথ দেখানো উচিত।'
সূফী বললেন :
'বেশ,
ভাল
কথা - তা হলে আমাদের ভ্রমণ আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হবে।
ভ্রমণের শেষ পর্যায়ে এসে যে গোত্রের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাত হবে,
তারাই প্রকৃত সমস্যা কি তা আমাদের জানাতে সাহায্য করবে।
তখন
কিভাবে সমস্যাটার মোকাবিলা করা যাবে তাও আমাদের জানা হবে।'
সূফী তাঁর মুরীদদের নিয়ে যখন প্রথম গোত্রের কাছে পৌঁছলেন,
তখন
এই দলকে তারা সাদরে অভ্যর্থনা জানালো।
সেই
গোত্রের পুরোহিত মুরীদান ও সূফী সাহেবকে তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান আগুন
জ্বালানোর অনুষ্ঠানে শরিক হওয়ার দাওয়াত দিল।
তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান অর্থাৎ আগুন জ্বালানোর পর্ব শেষ হলে সেই গোত্রের
সবাই প্রবল উত্তেজনায় আবিষ্ট হয়ে উঠলো।
সূফী সাহেব তাঁর মুরীদদের উদ্দেশ্যে বললেন :
'তোমরা
কেউ কিছু বলতে চাও নাকি?'
সূফী সাহেবের কথায় প্রথম মুরীদান বললেন :
'সত্যের
খাতিরে আমি কিছু না বলে থাকতে পারছি না হুজুর।'
সূফী বললেন :
'যদি
কিছু বলতে চাও,
তবে
তার জন্যে অপ্রীতিকর কিছু ঘটলে তুমিই দায়ী হবে।'
পীরের কথা শুনে প্রথম মুরীদান গোত্রের সর্দার ও পুরোহিতের সামনে এগিয়ে গিয়ে
বললো :
'তোমরা
ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যে ভেল্কী দেখালে তা যদি আমি দেখাতে পারি,
তাহলে তোমরা এতকাল যে ভুল অনুষ্ঠান করেছো সে কথা কি মানবে?'
মুরীদানের কথা শুনে পুরোহিত চিৎকার করে উঠলো -
'ধর
বেটাকে।'
সেই
মুহূর্তে আজরাইলের মত উপজাতীয় লোকগুলো তাঁকে ধরে নিয়ে সেখান থেকে অদৃশ্য
হলো - আর তাঁকে খুঁজে পাওয়া গেল না।
মুসাফিরের দল সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে দ্বিতীয় গোত্রের এলাকায় গিয়ে পৌঁছলো।
সে
দেশে গিয়ে মুরীদরা দেখতে পেল যে,
তারা আগুন জ্বালানোর সরঞ্জাম অর্থাৎ চকমকি পাথর আর কাঠের পূজা দিচ্ছে।
এবার দ্বিতীয় একজন মুরীদ উপজাতীয় লোকগুলোকে তালিম দেওয়ার জন্য কিছু বলতে
চাইল।
সূফীর এজাজাত নিয়ে দ্বিতীয় মুরীদ সেই গোত্রের পুরোহিতকে বললো : আপনাদের
কাছে আমার কিছু বক্তব্য আছে - একজন যুক্তিবাদী লোক হিসাবে আমি বলতে চাই যে,
'আপনারা
এমন জিনিসের পূজা করছেন,
যেটার সাহায্যে বড় একটা কাজ করা যায়।
ঐ
জিনিসটাকে সিজদাহ্ করার কোন যুক্তিকতা নেই।
আপনারা এই জিনিস থেকে যে উপকার পেতে পারেন,
তা
থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
আপনাদের এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মূল ভিত্তি কি তা আমি জানি।'
দ্বিতীয় গোত্রের লোকগুলো কিছুটা যুক্তিবাদী ছিল।
তারা আগের গোত্রের মত অতখানি উগ্র নয়।
তাদের ধর্মীয় নেতা বললো :
'আপনারা
মুসাফির মেহমান হিসেবে আমাদের দেশে আছেন,
বিদেশী বলেই আপনারা আমাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও তার মূল ইতহাস সম্পর্কে
অজ্ঞাত।
সেই
জন্যে আপনি আমাদের প্রচলিত রেওয়াজ বুঝতে অক্ষম।
আপনি ভুল করছেন,
আমাদের ধর্মকে যদি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন বা পরিবর্তন করার চেষ্টা করেন
তবে তা আমরা মানবো না।
কাজেই আপনার কোন কথাই আমরা আর শুনতে চাই না।'
মুসাফিরের দল আবার অগ্রসর হলো।
মুসাফির দল এবার তৃতীয় গোত্রের দেশে এসে হাজির হলো।
এখানে এসে তারা দেখতে পেল - প্রতিটি কুঁড়ে ঘরেই একটা করে নরমূর্তি - আগুনের
আবিষ্কারক নূরের মূর্তি
।
তৃতীয় মুরীদান সেই গোত্রের প্রধানের উদ্দেশ্যে বললো :
'এই
মূর্তিটা একটা মানুষের - সেই মানুষটার যে গুণ ছিল,
তা
বাস্তবে কাজে লাগালে আপনাদের অনেক উপকার হবে।'
নূরের মূর্তি পূজারীরা বললো :
'হয়
তো বা সে কথা সত্য কিন্তু দেবতার সেই গোপন সত্যটা হৃদয়ঙ্গম করার সাধ্যি
কয়জনের আছে বলুন?'
তৃতীয় মুরীদান জবাবে বললো :
'এই
গোপন সত্যটা মুষ্টিমেয় কয়েক জনেই বুঝতে পারবে - যারা নির্দিষ্ট
ক্রিয়া-কান্ড ও বাস্তব অবস্থার মোকাবিলা করতে রাজি নয়,
তারা এই গোপন সত্য বুঝতে পারবে না।'
পুরোহিত এই কথার জবাবে বললো :
'আপনার
এই কথা আমাদের প্রচারিত ধর্মমতের বিরোধী
।
তা
ছাড়া আপনি মুসাফির,
আমাদের ভাষা আপনি শুদ্ধ বলতে পারে না।
সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে,
আপনি আমাদের ধর্মের যাজক সমপ্র্রদায়ের কেউ নন।
সুতরাং আপনার কোন কথাই আমরা শুনতে রাজী নই।
অতঃপর মুরীদানের পক্ষে আর কিছু বলা সম্ভব হলো না।'
মুসাফিরের দল এবার চতুর্থ গোত্রের বসতি এলাকার মধ্যে এসে হাজির হলো।
চতুর্থ মুরীদান এবার কিছু ওয়াজ-নসিহত করার জন্য সেই গোত্রের লোকদের এক
জমায়েতের সামনে হাজির হলো।
চতুর্থ গোত্র আগুন জ্বালানোর বিবরণটাকে জাতীয় গাঁথা হিসাবে মুখে মুখে
প্রচার করতো।
চতুর্থ মুরীদান তাদের উদ্দেশ্যে বললো :
'আগুন
জ্বালানোর কাহিনীটা সত্য ঘটনা - এটা কোন স্মৃতিগাঁথা নয় আর আমি জানি কি করে
আগুন জ্বালাতে হয়।'
মুরীদানের এই কথা শুনে উপজাতীয়দের মনে দারুণ অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেল -
তাদের মধ্যে তৎক্ষনাৎ নানা দলের সৃষ্টি হলো।
একদল বললো :
'আপনার
কথা সত্য হলেও হতে পারে।
আর
আপনার কথা যদি সত্য হয়,
তবে
আগুন জ্বালিয়ে আমাদের দেখান,
কেমনভাবে আগুন জ্বলবে।'
তাদের কথা শুনে পীর সাহেব ও তাঁর মুরীদানরা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে
লাগলেন - আগুন জ্বালানো শিখে তারা তা দিয়ে কি কাজ করবে।
যা হোক,
তাদের জবাব থেকে বোঝা গেল যে,
আগুনের সাহায্যে নিজের ব্যক্তিগত কাজকর্ম আর শত্রুতার বিরুদ্ধে কাজে
লাগানোই তাদের আসল উদ্দেশ্য।
আগুন দিয়ে মানবজাতির অগ্রগতি সাধন হতে পারে,
তা তারা ভাবলো না - চরম স্বার্থপরতার উর্ধে তাদের চিন্তাধারা চলতে শিখেনি।
সেই গোত্রের লোকদের মধ্যে আগুনের কেচ্ছাটা এতই বিকৃতভাবে শিকড় গেড়ে
বসেছিল যে,
তাদের কেউ কেউ কাহিনীর সত্যতা মনে-প্রাণে স্বীকার করলেও তারা এতই মানসিক
দিক দিয়ে দুর্বল যে,
আগুন জ্বালানোর পদ্ধতি শিখিয়ে দিলেও তারা বাস্তবে তা কাজে লাগাতে পারবে
না।
এই উপজাতির মধ্যে আরো মতাবলম্বী বা ফেরকা ছিল।
তারা বললো,
'নিশ্চয়ই
গল্পটার মধ্যে কোন সত্যতা নেই।
এই লোকটা আমাদের বোকা বানাতে চায়।
তার উদ্দেশ্য,
আমাদের ওপর আধিপত্য গেড়ে বসা।'
অন্য আর এক ফেরকার লোক মুরীদানের কথা শুনে বললো :
'গল্প
যেমন আছে,
তেমনি থাক - ওটার কোন পরিবর্তন আমরা চাই না।
কারণ,
এই আগুনের কেচ্ছাটা আমাদের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে একতার রক্ষা-কবচ।
যদি আমরা এই কাহিনীর নতুন ব্যাখ্যা বাস্তবে কাজে লাগাতে না পারি,
তা হলে আমাদের সামাজিক ঐক্যের ভবিষ্যৎ কি হবে?'
এ
ছাড়া,
আরও এক ফেরকার লোক এই কাহিনীর বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে যুক্তি দেখিয়ে
মুরীদের প্রস্তাব প্রত্যাখান করলো।
অতঃপর মুসাফিরের দল আবার যাত্রা শুরু করলেন।
এবার তারা পঞ্চম গোত্রের আবাস স্থলে এসে পৌঁছলেন।
এখানে এসে তারা দেখতে পেলেন আগুন জ্বালিয়ে তারা নানা কাজ করছে।
পীর সাহেব এবার তাঁর মরীদানের উদ্দেশ্যে বললেন :
'মানুষকে
কিভাবে শিক্ষা দিতে হবে,
তা তোমাদের আগে শিখতে হবে।
এই সত্যটা না জেনে কোন শিক্ষার কথা বললে,
তা মানুষ গ্রহণ করবে?
মানুষ চায় না যে,
কেউ কোন শিক্ষা তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিক।
সর্বাগ্রে তোমাদের কাজ হচ্ছে,
কিভাবে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয় তা মানুষকে শেখানো।
আর কোন কিছু শেখানোর আগে মানুষকে ধারণা দিতে হবে যে,
সে যেটুকু জানে তার চেয়ে আরও অনেক কিছু এখনও জানতে বাকি আছে।
সবাই ধারণা পোষণ করে যে,
সে জানার জন্যে সদা ব্যগ্র - তার নিজস্ব পথেই সে জানতে চায়।
সবাই চাইবে তাদের ধ্যান-ধারণার পথেই শিখতে - অন্য কোন মত বা পথে নয়।
আর কোন লোক যা শিখেছে বা জেনেছে,
তা আবার নতুন করে কে জানতে চায়?
তোমরা মানুষের এই স্বভাব প্রত্যক্ষ করেছ,
কাজেই এখন তোমাদের শিখতে হবে কি করে শিক্ষা দিতে হয়।
কারণ,
জ্ঞান দান করার জন্য আলাদা যোগ্যতার প্রয়োজন।
শুধু জ্ঞানলাভ এক জিনিস আর সেই জ্ঞান অন্যকে দান করার যোগ্যতা আর এক
জিনিস - দুটি বিষয়ই অবিচ্ছেদ্য;
কিন্তু উভয়ের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান।
উৎস - এই গল্পটি বলেছিলেন মিসরের সূফী হযরত আহমদ এল-বেদাভী।
তিনি আব্বাসীয় খলীফাদের যুগে ১২৭৬ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।
গল্পটি সংকলন করেন ইদ্রিস শাহ্।
গল্পটি নজরুল হক অনূদিত
'দরবেশ
কাহিনী'
-
গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত।
জিহ্বা
আস্ফালন (২)
(পূর্ব প্রকাশের পর)
কৃত্রিমতা মাত্রেই মন্দ,
তথাপি মতের কৃত্রিমতা সহ্য করা যায়,
কিন্তু হৃদয়ের অনুভাবের কৃত্রিমতা একেবারে অসহ্য! আজকাল যেখানে যাহার
তাহার মুখে
'ভারত
মাতা'
সম্বন্ধীয় গোটা কতক হৃদয় সম্পর্কশূন্য বাঁধি ভুল শুনিতে পাওয়া যায়;
তাহারা এমনিভাবে কথাগুলো ব্যবহার করে যেন সব কথার মানে তাহারা জানে,
যেন তাহা তাহাদের প্রাণের ভাষা! কিন্তু ইহাতে তাহাদের দোষ নাই,
যে-সকল সমালোচক দিবারাত্রি চেষ্টা করিয়া এত বড়ো একটি মহৎ ভাবকে ফ্যাশানের
ঘৃণিত হীনত্বে পরিণত করিয়াছেন,
হৃদয়জাত ভাবকে সস্তা করিবার জন্য কলে ফেলিয়া গড়িতে পরামর্শ দিয়াছেন,
অবশেষে তাহা আবালবৃদ্ধ বনিতার হাতে হাতে দোকানের কেনাবেচা দ্রব্যের মতো,
রাংতা-মাখানো শব্দ-উৎপাদক চকচকে ভেঁপুর মতো করিয়া তুলিয়াছেন তাঁহারাই
ইহার জন্য দায়ী।
যে ভাব ও যে কথার অর্থ ভুলিয়া যাই,
যাহারা আর হৃদয় হইতে উঠে না,
কেবল মুখে মুখে বিরাজ করে,
তাহারা মরিয়া যায় ও জীবন অভাবে ক্রমশই পচিয়া উঠিতে থাকে।
দেশ হিতৈষিতার বুলিগুলোরও সেই দশা ধরিবে।
তুমি জিজ্ঞাসা করিতেছ,
'বঙ্গসাহিত্যে
ও ছাইভস্মগুলা কেন?'
আমি বলিতেছি,
'কী
করা যায়! একদল মহা বীর আছেন,
তাঁহারা বঙ্গসাহিত্যে অগ্নিকাণ্ড করিতে চান।
সময় অসময় আবশ্যক অনাবশ্যক কিছু না মানিয়া দিনরাত্রি আগুন জ্বালাইয়া
রাখিতে চান,
কাজেই বিস্তর ছাই ভস্ম জমিয়াছে।'
এইখানে একটা গল্প বলি।
একটা পাড়ায় পাঁচ-সাতজন মাতাল বাস করিত।
তাহারা একত্রে মদ্যপান করিয়া অত্যন্ত গোলমাল করিত।
পাড়ার লোকেরা একদিন তাহাদিগকে ধরিয়া অত্যন্ত প্রহার দিল।
সেই প্রহারের স্মৃতিতে পাঁচ-সাত দিন তাহাদের মদ খাওয়া স্থগিত রহিল,
অবশেষে আর থাকিতে না পারিয়া তাহারা প্রতিজ্ঞা করিল আজ মদ খাইয়া আর কোনো
প্রকার গোল করিব না।
উত্তমরূপে দরজা বন্ধ করিয়া তাহারা নিঃশব্দে মদ্যপান আরম্ভ করিল।
সকলেরই যখন মাথায় কিছু কিছু মদ চড়িয়াছে,
তখন সহসা একজনের সাবধানের কথা মনে পড়িল ও সে গম্ভীর স্বরে কহিল,
'চুপ!'
অমনি আর-একজন উচ্চতর স্বরে কহিল,
'চুপ!'
তাহা শুনিয়া আবার আর-একজন আরো উচ্চস্বরে কহিল,
'চুপ',
এমনি করিয়া সকলে মিলিয়া চিৎকার স্বরে
'চুপ
চুপ'
করিতে আরম্ভ করিল--সকলেই সকলকে বলিতে লাগিল
'চুপ'।
অবশেষে ঘরের দুয়ার খুলিয়া সকলে বাহির হইয়া আসিল,
পাঁচ-সাতজন মাতাল মিলিয়া রাস্তায়
'চুপ
চুপ'
চিৎকার করিতে করিতে চলিল,
'চুপ
চুপ'
শব্দে পাড়া প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিল।
আমাদের উঠ জাগো শব্দটিও কি ঠিক এইরূপ হয় নাই?
সকলেই সকলকে বলিতেছে,
উঠ,
সকলেই সকলকে বলিতেছে,
জাগো,
কে যে উঠে নাই ও কে যে ঘুমাইতেছে সে বিষয়ে আজ পর্যন্ত ভালোরূপ মীমাংসাই
হইল না।
ইহাতে একটা হানি এই দেখিতেছি,
সকলেই মনে করিতেছে,
কাজ করিলাম।
গোলমাল করিতেছি,
হাততালি দিতেছি,
চেঁচাইতেছি,
কী যেন একটা হইতেছে! দেশের জন্য প্রাণপণ করিতেছি মনে করিলে নিজের
মহত্ত্বে নিজের শরীর লোমাঞ্চিত হইয়া উঠে,
অতি নিষণকে সেই অতুল আনন্দ উপভোগ করিতেছি।
মাথা-মুণ্ডহীন একটা গোলেমালেই সমস্ত চুকিয়া যাইতেছে,
আর কাজ করিবার আবশ্যক হইতেছে না।
একদল লোক আছেন,
তাহারা কেবল উত্তেজিত ও উদ্দীপ্তই করিতেছেন,
তাহাদের বক্তৃতায় বা লেখায় কোনো উদ্দেশ্য দেখিতে পাওয়া যায় না।
তাহারা কেবল বলিতেছেন,
'এখনও
চৈতন্য হইতেছে না,
এখনও ঘুমাইতেছ?
এই বেলা আলস্য পরিহার করো,
গাত্রোত্থান করো।
আমাদের পূর্বপুরুষদের একবার স্মরণ করো-- ভীষণ গৌতম বশিষ্ঠ ইত্যাদি।'
কী করিতে হইবে বলেন না,
কোন পথে যাইতে হইবে বলেন না,
পথের পরিণাম কোথায় বলেন না,
কেবল উত্তেজিতই করিতেছেন।
বন্দুকের বারুদে আগুন দিতেছেন,
অথচ কোনো লক্ষ্যই নাই,
ইহাতে ভাল ফল যে কী হইতে পারে জানি না,
বরঞ্চ আপনা-আপনির মধ্যেই দু-চারজন জখম হওয়া সম্ভব! কোনো একটা কাজে
প্রবৃত্ত হইতে পারিতেছি না কেবল তপ্তরক্তের প্রভাবে ইতস্তত ধড়ফড় করিতেছি!
কতকগুলো অসম্ভব কল্পনা গড়িয়া তুলিয়া তাহাকে প্রাণ দিবার চেষ্টা করিতেছি,
স্বদেশের বুকে যে শেল বিঁধিয়াছে,
মনে করিতেছি বুঝি তাহা বলপূর্বক দুই হাতে করিয়া উপড়াইয়া ফেলিলেই দেশের
পক্ষে ভাল,
কিন্তু জানি না যে তাহা হইলে রক্তস্রোত প্রবাহিত হইয়া সাংঘাতিক পরিণাম
উপস্থিত করিবে।
বীরত্ব ফলাইবার জন্য সকলেই অস্থির হইয়া উঠিতেছেন,
অথচ সামর্থ্য নাই,
কাজেই দৈবাৎ যদি সুবিধামতে পথে অসহায় ফিরিঙ্গি-বালক দেখিতে পান অমনি
তিন-চার জনে মিলিয়া তাহাকে ছাতিপেটা করিয়া আপনাদিগকে মস্ত বীরপুরুষ মনে
করেন,
মনে করেন একটা কর্তব্য কাজ সমাধা হইল।
যথার্থ কর্তব্য কাজ চুলায় যায়,
আর কতকগুলো সহজসাধ্য মিথ্যা-কর্তব্য তাড়াতাড়ি সাধন করিয়া তপ্তরক্ত শীতল
করিতে হয়,
নহিলে মানুষ বাঁচিবে কী করিয়া?
তাই বলিতেছি,
কতকগুলো অর্থহীন অনির্দিষ্ট অস্পষ্ট উদ্দীপনাবাক্য বলিয়া মিথ্যা উত্তেজিত
করিবার চেষ্টা পাইয়ো না।
কারণ,
এইরূপ করিলে দুর্বলেরা অভদ্র হইয়া উঠে,
অভদ্রতাকে বীরত্ব মনে করে,
স্ত্রীর কাছে গর্ব করে ও কার্যকালে কী করিবে ভাবিয়া পায় না।
গুরুজনকে মানে না,
পূজ্যলোককে অপমান করে ও একপ্রকার খেঁকিবৃত্তি অবলম্বন করে।
সম্প্রতি নরিস সাহেব ও জুরিসডিকশন বিল প্রভৃতি লইয়া কোনো কোনো বাংলা কাগজ
যেরূপ ব্যবহার করিয়াছে তাহা দেখিলেই আমাদের কথা সপ্রমাণ হইবে।
তিরস্কার করিবার সময়,
এমন-কি,
গালাগালি দিবার সময়েও ভদ্রলোক ভদ্রলোকই থাকে,
কিন্তু বানরের মতো মুখ-ভেংচাইয়া দাঁত বাহির করিয়া রুচিহীন অভদ্রের মতো
অতিবড়ো শত্রুকেও অপমান করিতে চেষ্টা করিলে নিজেকেই অপমান করা হয়,
তাহাতে বিপক্ষপক্ষের যত না মানহানি হয় ততোধিক আত্মগৌরবের লাঘব করা হয়।
এরূপ ব্যবহারকে যাহারা নির্ভীকতা ও বীরত্ব মনে করেন তাহারা ভীরু,
হীন,
কারণ প্রকৃত বীরত্ব আত্মসম্মান রক্ষা করিয়া চলে।
পুনশ্চ বলিতেছি,
যাহারা বক্তৃতা দেন ও উদ্দীপক গদ্য পদ্য লেখেন তাহারা যেন একটা উদ্দেশ্য
দেখাইয়া দেন,
একটা কর্তব্য নির্দেশ করিয়া দেন।
আমাদের সমাজের পদে পদে এতশত প্রকার কর্তব্য রহিয়াছে যে,
কতকগুলো অস্পষ্ট বাঁধি ভুল বলিয়া সময় ও উদ্যম নষ্ট করা উচিত হয় না।
দীপ্তরক্ত যুবকেরা যাহাতে কতকগুলো কুহেলিকাময় পর্বতাকার উদ্দেশ্য লইয়াই
নাচিয়া না বেড়ান,
ছোটো ছোটো কাজের মধ্যে যে-সকল মহৎ বীরত্বের কারণ প্রচ্ছন্ন আছে সেগুলোকে
যেন হেয় জ্ঞান না করেন।
গড়ের মাঠে,
বা কেল্লার মধ্যেই কেবল বীরত্বের রঙ্গভূমি নাই,
হয়তো গৃহের মধ্যে,
অন্তঃপুরের ক্ষুদ্র পরিসরের মধ্যে তাহা অপেক্ষা বিস্তৃত রণস্থল রহিয়াছে!
এত সামাজিক শত্রু চারিদিকে রহিয়াছে তাহাদিগকে কে নাশ করিবে!
দুর্ভাগ্যক্রমে ইহাতে এজিটেস্যান করিতে হয় না,
ইহাতে ঢাকঢোল বাজে না,
হট্টগোল হয় না।
এজিটেস্যান করা অনেকের একটা নেশার মতো হইয়াছে,
মদ্যপানের মতো ইহাতে আমোদ পান--সকলেই উদ্দেশ্য বুঝিয়া কতর্ঞ্চব্য বুঝিয়া
এজিটেট করেন না।
সুযোগ্য বক্তা শ্রীযুক্ত বাবু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সেদিন
বঙ্গবাসীদিগকে মডারেশান,
অর্থাৎ মিতব্যবহার অবলম্বন করিতে অনুরোধ করিয়াছেন শুনিয়া অত্যন্ত সুখী
হইলাম।
অধিকাংশ বঙ্গযুবক মনে করেন পেট্রিয়ট হইতে হইলে হঠাৎ অত্যন্ত উন্মাদ হইয়া
উঠিতে হইবে,
হাত-পা ছুঁড়িতে হইবে,
হুটোপাটি করিতে হইবে,
যাহাকে যাহা না বলিবার তাহা বলিতে হইবে।
তাহারা মনে করেন,
সফরীপুচ্ছের ন্যায় অবিরত ফর্ফরায়মান তাহাদের অতি লঘু,
অতি ছিবলা ওই জিহ্বাটার জুরিসডিকশন সর্বত্রই আছে।
একটি স্থির উদ্দেশ্য অবলম্বন করিয়া,
আত্মসংযমন করিয়া,
না ফুলিয়া ফাঁপিয়া ফেনাইয়া,
বালকের মতো কতকগুলো নিতান্ত অসার কথা না বলিয়া অপ্রতিহত বেগে বহিয়া যাও,
গম্যস্থানে গিয়া পৌঁছিবে,
যে-সকল পাষাণ স্তূপ পথে পড়িয়া আছে,
অবিশ্রাম স্থির প্রবাহ- বেগে তাহারা ক্রমেই ভাঙিয়া যাইবে।
যতদিন পর্যন্ত না আমরা আত্মসংযম করিতে শিখিব,
যতদিন পর্যন্ত অপরিণত বুদ্ধির ন্যায় আমাদের ভাবে ভাষায় ব্যবহারে একপ্রকার
ছেলেমানুষী আতিশয্য প্রকাশ করিব,
ততদিন পর্যন্ত বুঝিতে হইবে যে,
আমরা স্বায়ত্তশাসনের উপযুক্ত হইতে পারি নাই।
যখন আমরা নিজের স্বত্ব বুঝিব ও ধীর গম্ভীর দৃঢ়স্বরে যুক্তিসহকারে সেই
স্বত্ব দাওয়া করিতে পারিব,
তখন আমাদের কথা শুনিতেই হইবে।
আর,
নিতান্ত বালকের মতো না বুঝিয়া না শুনিয়া কেবল অনবরত আবদার করিলে,
ঘ্যানঘ্যান করিলে,
চিৎকার করিলে,
কে আমাদের কথায় কর্ণপাত করিবে?
তাই বলিতেছি,
আগে দেশের অবস্থা সম্বন্ধে উদাহরণ সংগ্রহ করো,
ভাবিতে আরম্ভ করো ও বলিতে শেখো,
তাহা হইলে আর সকলে শুনিতে আরম্ভ করিবে।
বেশি করিয়া বলিলে কিছুই হয় না,
ভাল করিয়া বলিলে কী না হয়! আতিশয্যের দিকে যাইয়ো না,
কারণ যেখানেই যুক্তিহীন আতিশয্যপ্রিয় প্রজা,
সেইখানেই স্বেচ্ছাচারী প্রভুতন্ত্র শাসন প্রণালী।
(সমাপ্ত)
- সংগৃহীত।
বড়পুকুরিয়া
কয়লা খনির বেহাল অবস্থা
একরামুল হক বেলাল
॥
দেশের উত্তর জনপদের দিনাজপুর জেলার রেলওয়ে জংশন খ্যাত উপজেলা
পার্বতীপুরের হামিদপুর ইউনিয়নের বড়পুকুরিয়ায় ১৯৮৫ সালে আবিসৃ্কত হয় কয়লা
খনি।
খনি এলাকার আয়তন ৩ বর্গ কিলো মিটার।
খনিতে মজুদ কয়লার পরিমান ৩৯০ মিলিয়ন মেঃ টন।
উত্তোলন যোগ্য মজুদ কয়লার পরিমান ৬৪ মিলিয়ন মেঃ টন।
পেট্রোবাংলার সাথে ১৯৯৪ সালে ১লা জুন খনি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য
মেসার্স চীনা মেসিনারিং এন্ড এক্সপোর্ট ও ইমপোর্ট কোম্পানি (সি এম সি)র
চুক্তি স্বাক্ষরীত হয়।
প্রায় ২শ'
৫০ একর জমি নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হয় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।
প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ১৯৪.৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এই খনির মেয়াদ কাল ধরা হয় ৬৪ বছর।
খনিটিতে বানিজ্যিক ভাবে উত্তোলন শুরু হয় ২০০৫সালে।
প্রাতিদিন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৩ হাজার ৩ শ'
মেট্রিক টন।
উৎপাদন চলাকালিন ১৯৯৮ সালের ৫ এপ্রিল খনির ভূ-গর্ভে ওয়াটার ওয়াল ভেঙ্গে
পানি প্রবাহের কারনে ঘটনা স্থলেই ৫ জন খনি শ্রমিক নিহত হয়।
আহত হয় বেশ কয়েক জন।
এই দুর্ঘটনার কারনে প্রায় আড়াই বছর খনির কাজ বন্ধ থাকে।
পরে নকশা পরিবর্তন করে কয়লা উত্তোলনের কাজ শুরু করা হয়।
ফলে প্রকল্পের কাজ ৪ বছর পিছিয়ে যায়।
২০০৫ সালে ৫ আক্টোবর খনিতে অতিমাত্রায় কার্বন মনো অক্সাইড গ্যাস ও মিথেল
গ্যাস নির্গম হলে ভূ-গর্ভের প্রধান ফেইজ ছিল গালা করে বন্ধ করা হয়।
এর মধ্যে ছোট খাটো ঘটনা ঘটলেও সর্বশেষ দূর্ঘটনাটি ঘটে ২০১০ সালের ১১ মে।
ঘটনার দিন সকাল শিফটে শ্রমিকরা খনির ১৭শ'
ফুট নীচে কয়লা উত্তোলনের কাজ করাকালে ১১০৮ ফেজের ৩ নম্বর রাস্তায় সকাল
১০টার দিকে দেয়াল ধ্বসে কয়লার নীচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই রনজিৎ কুমার (৪০)
নামে এক স্থানীয় শ্রমিক মারা যায়।
এই দূর্ঘটনায় আহত হয় আরো কয়েক জন।
গত ১১ মে খনির ভূ-গর্ভে দূর্ঘটনায় ১ শ্রমিকের মৃত্যৃর পর থেকে কয়লা
উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
ভূ-গর্ভের নিচে রাস্তা সংস্কারের পর দীর্ঘ দেড় মাস অতিবাহিত হয়েছে।
গত ২৭ জুন থেকে কয়লা উত্তোলনের কথা থাকলেও চীনা সি.এম.সি,
এক্স.এম.সি ও কয়লা খনি প্রকল্প কর্তৃপক্ষ উত্তোলনের কাজ এখন পর্যন্ত শুরু
করতে পারেনি।সংবাদপত্র
সূত্রে জানা যায়,
বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে বন্ধ হয়ে যাওয়া উৎপাদন কাজ শুরু নিয়ে বিদুৎ
মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
২৮ জুন সোমবার দুপুরে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জনারেল (অব.)
মোহাম্মদ এনামুল হকের সভাপতিত্বে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী
চৌধুরী,
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান অধ্যাপক হোসেন মনসুর,
পেট্রোবাংলায় নিয়োজিত ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞ এবং চায়না বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত
ছিলেন।
জানা গেছে,উভয়
দেশের বিশেষজ্ঞরা বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে কয়লা উৎপাদন ঝুঁকিমুক্ত নয়
বলে মত প্রকাশ করেন।
তাদের মতে সেখানে আবারও মাটি ধসে পড়ার সম্ভবানা রয়েছে।
এ
পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের জন্য উভয় বিশেষজ্ঞ বৈঠকে পরামর্শ দিয়েছেন।
চায়না বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন,
কয়লা খনির ২শ মিটারের মধ্যে অত্যাধিক চাপ রয়েছে।
এ
চাপকে অন্যদিকে সরানোর জন্য নিচ থেকে ওপরের দিকে বিস্ফোরণ ঘটাতে হবে।
এতে কিছু চাপ অন্যদিকে সরে যাবে।
এ
২শ মিটারের মধ্যে ১০ মিটার অন্তর অন্তর বিস্ফোরণ ঘটাতে হবে।
অন্যদিকে ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন,
পানির প্রবাহ ঘটিয়ে এ ঝুঁকি দূর করা যাবে।
জানা যায়,
প্রতিমন্ত্রী এবং উপদেষ্টা উভয়ে দুটি ব্যবস্থার মধ্যে যে কোন একটির
মাধ্যমে কয়লা উত্তোলনে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য পেট্রোবাংলার
সংশিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন।
১১ মে দূর্ঘটনার পর থেকে কয়লা উত্তোলন সম্পূর্ন রুপে বন্ধ থাকায় এই খনিকে
কেন্দ্র করে পার্শ্বে গড়ে উঠা ২৫০ মেঘাওয়াট কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ
কেন্দ্র নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন কৃর্তপক্ষ।
বর্তমানে মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা মজুদ আছে।
যা দিয়ে বড়পুকুরিয়া কয়লা ভিত্তিক ২৫০ মেগাওয়ার্ট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ
কেন্দ্র ৭০ থেকে ৭৫ দিন চলতে পারবে।
এ
সময়ের মধ্যে কয়লা উৎপাদনে আনতে হবে।
নতুবা বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র জ্বালানির অভাবে বন্ধ হয়ে
যাবে বলে কর্তৃপক্ষ আশংকা করছেন।
এদিকে ১১ মে'র
দূর্ঘটনার পর থেকে খনি কর্তৃপক্ষ ও বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি শ্রমিক কর্মচারী
ইউনিয়নের মধ্যে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়েছে।
ফলে শ্রমিকেরা ২৯ জুন থেকে আন্দোলন শুরু করেছে।
গত ২৭ জুন থেকে কয়লা উত্তোলনের কথা থাকলেও চীনা সি.এম.সি,
এক্স.এম.সি ও কয়লা খনি প্রকল্প কর্তৃপক্ষ উত্তোলনের কাজ শুরু করতে পারেনি।
অন্যদিকে ১ জুলাই থেকে খনি কর্তৃপক্ষ
'অনিবার্য
কারন বশত খনি এলাকায় চায়নাদের অধিনে কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিকদের প্রবেশ
নিষেধ'
লেখা নোটিশ খনির গেটে টাঙ্গিয়ে দিলে শ্রমিকেরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে।
তারা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করতে থাকে।
৩
জুলাই এ নিয়ে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কর্তৃপক্ষের সাথে শ্রমিকনেতৃবৃন্দের এক
সমঝোতা বৈঠক বসে।
বৈঠকে সমঝোতা না হওয়ায় শ্রমিকেরা তাদের বিক্ষোভ ও সমাবেশ কর্মসূচীর
অব্যাহত রেখেছে।
এ
নিয়ে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি রবিউল ইসলাম
রবির সাথে আলাপকালে তিনি বলেন,
খনিতে কয়লা উত্তোলন বনন্ধ থাকায় প্রায় ১২ শ'
খনি শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা কর্তৃপক্ষের সাথে বারবার যোগাযোগ করে
ব্যর্থ হয়ে আন্দোলনে নেমেছি।
একটি বিশেষ মহল এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানটিকে বন্ধের পাঁয়তারা করছে।
এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা ও শ্রমিকদের জীবন-জীবিকার তাগিদে আমরা যে
কোন পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবো না।
ইতোপূর্বেও কয়লা খনিকে কেন্দ্র করে এখানে বড় ধরনের আন্দোলন হয়েছে।
সূফী সাধক
আনোয়ারুল হক্ এঁর বাণী তাৎপর্য অন্বেষণে
'না'
দিয়ে পৃথিবী
ধ্বংস করা যায়,
'না'
দিয়ে নতুন
সৃষ্টি করা যায় যদি বোঝা যায়
'না'
এর মর্মকথা'
(১)
ড.এমদাদুল হক
কাজল
॥
'না'
এর
প্রথম মর্মকথা :
২৪
শে মার্চ ১৯৪৮।
কার্জন হল।
সমাবর্তন উৎসব।
পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বললেন -
'উদুর্,
একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা,
অন্য কোন ভাষা নয়।
এ
ব্যাপারে যেই আপনাদের বিভ্রান্ত করতে চাইবে সেই পাকিস্তানের দুশমন।'
সেদিন একদল ছাত্র দাঁড়িয়ে চিৎকার করে শুধু একটা শব্দই উচ্চারণ করেছিলো -
'না'!
'না'!!।
সেদিনের সেই
'না'
ঝড়
তুলে বাঙালির চিন্তার জগতে।
'না'
প্রতিধ্বনিত হতে থাকে পরবর্তী ২৩টি বছর।
সেইদিনের সেই
'না'
শব্দটির মধ্যে এত তেজ,
বলিষ্ঠতা ও শক্তি ছিল যে এই
'না'
টি
সৃষ্টি করেছিলো
'রাষ্ট্রভাষা
বাংলা চাই'
আন্দোলন।
সৃষ্টি হয়েছিলো অমর ২১শে ফেব্রুয়ারী।
সেইদিনের সেই
'না'
শব্দটির মাঝে এত দূরদর্শিতা ছিল যে,
তার
পরবর্তী ২৩ বছরের মধ্যে বাঙালি জাতি আর পশ্চিমাদের কাছে হাঁ বলেনি,
মাথা নত করেনি।
সেদিনের সেই
'না'
শব্দটির মাঝে এত সাহস ও বীরত্ব ছিল যে এই একটি মাত্র
'না'
বাঙালি জাতিকে নিয়ে গেলো স্বাধীনতার যুদ্ধে।
'৭১
এর ১৬ই ডিসেম্বর
'না'
বিজয়ী হলো।
পাকিস্তানের ধ্বংস স্তুপে সৃষ্টি হলো একটি নতুন দেশ -
'বাংলাদেশ'।
শাসকদের বিরুদ্ধে
'না'
হচ্ছে শক্তি,
বিদ্রোহ ও বীরত্বের প্রকাশ আর
'হাঁ'ঁ
হচ্ছে দুর্বলতা ও বশ্যতা স্বীকার।
জনগণ যতদিন
'হাঁ'
বলতে থাকে ততদিন তাদের শোষণ করা সহজ হয়।
মানব সভ্যতার বিকাশে প্রতিটি স্তরে স্তরে মানুষ যতবার
'না'
বলেছে ততবারই একটা সমাজব্যবস্থার ধ্বংস স্তুপে সৃষ্টি হয়েছে নতুন একটা
সমাজব্যবস্থা।
'না'
থেকেই দাস প্রথার বিলুপ্তি ঘটেছে,
বিলুপ্তি ঘটেছে সামন্তবাদের।
মানুষের আগামীদিনের
'না'
জন্ম দিবে নতুন ও উন্নততর সমাজব্যবস্থা।
'না'
থেকেই সৃষ্টি হবে এমন একটি সমাজব্যবস্থার যেখানে মানুষের উপর মানুষর
আধিপত্য ও শোষণের অবসান হবে।
'না'
হচ্ছে প্রগতি,
সামাজিক অগ্রগতি,
উন্নতি,
সমৃদ্ধি ও সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার।
তাই
আনোয়ারুল হক বলছেন -
'না'
দিয়ে পৃথিবী ধ্বংস করা যায়,
'না'
দিয়ে নতুন সৃষ্টি করা যায় যদি বোঝা যায়
'না'
এর
মর্মকথা।
'না'
এর
দ্বিতীয় মর্মকথা :
'না'
হচ্ছে একটা সাধন পদ্ধতি কিন্তু এই পদ্ধতি সকলের জন্য নয়।
খুব
কম লোকই এই পদ্ধতিকে অনুসরণ করতে পারে।
'না'
সাধনার জগতে যত পদ্ধতি আছে সকল পদ্ধতির মধ্যে সবচেয়ে কঠিন।
'না'
পদ্ধতি অনুসরণ করা কেবল তাদের পক্ষেই সম্ভ্বব যাদের শক্তিশালী ইচ্ছাশক্তি
আছে।
যাদের চিন্তা এবং দেহ ইচ্ছাশক্তির অধীন কিংবা যারা মনে করে যে ইচ্ছা শক্তি
দিয়ে মন ও দেহকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে তাদের জন্যই এই পদ্ধতি।
ইচ্ছাশক্তি ছাড়া
'না'
বলা
যায় না।
প্রতিটি মানুষেরই ইচ্ছাশক্তি আছে।
ইচ্ছাশক্তি ছাড়া কোন মানুষের পক্ষেই কোন কাজ করা সম্ভব নয়।
যে
কোন কাজ করার আগে মানুষের মধ্যে সে কাজটি করার জন্য ইচ্ছা জাগ্রত হতে হয়।
ইচ্ছা সে কাজটা সম্পাদন করার জন্য দেহ ও চিন্তাকে ব্যবহার করে থাকে।
মানুষের ইচ্ছাশক্তি মূলত দুটি ভাবে কাজ করে।
সচেতন ইচ্ছা এবং অসচেতন ইচ্ছা।
মানুষ যতক্ষণ সচেতন ইচ্ছায় কাজ করে ততক্ষণ সে যা ইচ্ছা করে তাই করে।
সে
যে বিষয়ে চিন্তা করতে ইচ্ছা করে সে বিষয় নিয়েই চিন্তা করে,
যে
কথা বলতে চায় সে কথাই বলে,
যা
শুনতে চায় তা-ই শুনে।
কিন্তু মানুষ বেশিক্ষণ তার সচেতন ইচ্ছায় থাকে না।
মানুষ তার নিজের অজান্তেই অসচেতন ইচ্ছা বা খেয়ালের উপর সমর্পিত হয়ে যায়,
তখন
যেসব বিষয়ে সে চিন্তা করতে চায় না সেসব বিষয়েই চিন্তা করে,
তখন
সে এমন কথা বলে ফেলে যে কথা আসলে সে বলতে চায়নি।
সচেতন ইচ্ছাশক্তি যাদের আছে তারাই
'না'
বলতে পারে।
অসচেতন ইচ্ছাশক্তি নিয়ে
'হাঁ'
বা
'না'
বলার কোন মূল্য নেই।
কারণ,
এ
রকম একজন হয়তো এখনই বলছে -
'আমি
আর কোন দিনই মিথ্যা কথা বলবো না'
কিন্তু পরক্ষণেই পূর্বপ্রতিজ্ঞা ভুলে গিয়ে মিথ্যা বলবে।
যাদের সচেতন ও শক্তিশালী ইচ্ছাশক্তি আছে শুধু তাদের জন্যই
'না'
হচ্ছে দেহ ও চিন্তার অধীনতা থেকে মুক্তির মন্ত্র।
দেহ
ও চিন্তা যতক্ষণ ইচ্ছাশক্তির অধীনে থাকে ততক্ষণ ইচ্ছাশক্তি রাজা,
দেহ
ও চিন্তা ভৃত্য।
আর
যখন মানুষ দেহের প্রয়োজন মেটানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে যায় তখন দেহই রাজা হয়ে
যায়।
'আমার
রাজা কে?
আমার উপর কি আমার কোন কর্তৃত্ব আছে?
আমি
কি সেই বিষয়েই চিন্তা করি যে বিষয়ে চিন্তা করতে চাই?
আমার নির্ধারিত বিষয়ে আমি একটানা কতক্ষণ থাকতে পারি?
আমার চিন্তা আমার নির্ধারিত পথ ছেড়ে অন্য পথ ধরে কেন?
আমি
কি সেই সব কথাই বলি যা আমি বলতে চাই?
কিংবা সেই সব কাজই করি যা আমি করতে চাই?
আমি
যা করতে চাই না তা করছি কেন?
যা
বলতে চাই না তা বলছি কেন?
তবে
কি আমার উপর আমার কোন কর্তৃত্ব নেই?
আমার উপর আমার কোন কর্তৃত্ব না থাকলে আমি যে জীবনটা যাপন করছি এটা আসলে কার
জীবন?'
এসব
প্রশ্ন যদি বাচনিক পর্যায় থেকে আন্তরিকতার পর্যায়ে উন্নীত হয়,
অর্থাৎ এসব প্রশ্ন যদি আমাদের অস্তিত্বের সাথে সম্পৃক্ত হয় তাহলেই ইচ্ছার
শক্তি বাড়তে থাকে।
ইচ্ছাশক্তি বাড়লেই কেবল দেহের অনাবশ্যক চাহিদাগুলোকে
'না'
বলা
যায়।
দেহের কার্যাবলী দুই ভাগে বিভক্ত : স্বনিয়ন্ত্রিত ও ইচ্ছা নিয়ন্ত্রিত।
স্বনিয়ন্ত্রিত কার্যাবলি দেহ নিজেই তার অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার সাথে অত্যন্ত
সুক্ষ্নভাবে সম্পাদন করে।
এত
আশ্চর্যজনকভাবে দেহ তার এসব কার্যাবলীকে নিয়ন্ত্রণ করে যা মানুষের পক্ষে
কল্পনা করাও কঠিন।
যেমন,
প্রতিদিন আমরা যেসব খাদ্য গ্রহণ করি সেসব খাদ্যের নির্যাস থেকে দেহ একটা
অংশ দিয়ে রক্ত তৈরী করে,
একটা অংশ দিয়ে শক্তির সৃষ্টির করে,
একটা অংশ দিয়ে তৈরী করে মগজ ও বুদ্ধি,
কিছু অংশ আবার চর্বি আকারে মজুত করে রাখে।
দেহ
হচ্ছে এমন একটা আশ্চর্যজনক যন্ত্র যা মাছ থেকে মগজ তৈরী করতে পারে।
দেহযন্ত্রের অন্যান্য অঙ্গ যেমন,
ফুসফুস,
হৃদযন্ত্র,
পরিপাকযন্ত্র,
কিডনী প্রত্যেকেই স্বনিয়ন্ত্রিতভাবে তাদের কাজ করে যাচ্ছে।
দেহের এসব কর্মকান্ডকে
'না'
বলার কোন প্রশ্ন উঠে না।
বরঞ্চ পরিমিত খাদ্য,
শরীরচর্চা ও উপযুক্ত পরিবেশে থেকে দেহ যেন তার এসব কার্যাবলী নির্বিঘ্নে
সম্পাদন করতে পারে সেজন্য দেহকে ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সহযোগিতা করাই কর্তব্য।
পক্ষান্তরে দেহের কিছু কিছু কাজ আছে যেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য।
যেমন,
কথা
বলা,
পানাহার,
শ্রবণ করা,
স্পর্শ করা,
দেখা ইত্যাদি।
এখানেই আসছে
'না'
বলার প্রশ্ন,
প্রচেষ্টা বা সাধনার প্রশ্ন।
আধ্যাত্মিক সাধনা অবাস্তব কিছু নয়।
সাধনার মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে - প্রতিটি ইন্দ্রিয়কে তাদের যথাযথ কাজে নিয়োজিত
রাখা এবং অনাবশ্যক বাক্যব্যয়,
অনাবশ্যক পানাহার,
অনাবশ্যক দর্শন ও শ্রবণকে
'না'
বলা।
জীবন থেকে অনাবশ্যকগুলোকে বাদ দিতে পারলেই আবশ্যকগুলো উন্মোচিত হয়।
তাই
আনোয়ারুল হক বলছেন -
'না'
দিয়ে পৃথিবী ধ্বংস করা যায়,
'না'
দিয়ে নতুন সৃষ্টি করা যায় যদি বোঝা যায়
'না'
এর
মর্মকথা।
'না'
এর
তৃতীয় মর্মকথা :
মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনের ক্রমবিকাশের সারমর্ম হচ্ছে একটি মাত্র প্রশ্ন
'আমি
কে?'
আমি
কে তা আমার জানা নেই।
এই
অজ্ঞতাকে অজ্ঞতা বলে উপলব্ধি করাই আধ্যাত্মিক ভ্রমনের প্রথম পদক্ষেপ।
যখন
আমি জানতে পারি আমি কে তখনই আমি পরমসত্তাকে জানি।
এই
মহাবিশ্বে একজন মাত্র আমি আছেন।
আমিই এই মহাবিশ্বের কেন্দ্র,
আমি
এক এবং অদ্বিতীয়।
একটা আমিই খন্ডিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে অগনিত আমিতে।
তাই
আমি কে?
এই
প্রশ্নের উত্তরই আত্মজ্ঞান।
আমি
কে?
এই
প্রশ্নের উত্তরটি জানার একটা মন্ত্র হচ্ছে
'না'।
বুদ্ধি,
পূর্ব ধারণা এবং স্মৃতি
'আমি
কে?'
এই
প্রশ্নের যত উত্তরই সরবরাহ করবে প্রত্যেকটা উত্তরকে
'না'
বলতে হবে।
ধরা
যাক একাগ্রচিত্তে নিজেকে প্রশ্ন করলাম আমি কে?
উত্তর এলো -
'আমি
শিক্ষক'।
এই
উত্তরটিকে
'না'
বলতে হবে।
বলতে হবে
'না'
আমি
তো শিক্ষক নই! শিক্ষকতা আমার পেশা,
জীবিকা নির্বাহের একটা উপায়।
জীবিকা নির্বাহের উপায়তো আমি নই।
তাহলে আমি কে?
আমার চুল,
নখ,
দন্ত,
ত্বক কি আমি?
'না'।
আমার মাংস,
রক্ত,
স্নায়ু,
অস্থি কি আমি?
'না'।
আমার মজ্জা,
বৃক্ক,
হৃদয়,
যকৃত কি আমি?
'না'।
আমার প্লীহা,
পাকস্থলী,
উদর,
মল
কি আমি?
'না'।
আমার পিত্ত,
মূত্র,
কফ,
মেদ
কি আমি?
'না'।
আমার চোখ,
অশ্রু,
নাক,
কান
মস্তিষ্ক কি আমি?
'না'।
তাহলে আমি কে?
আমি
কি বেদনা,
অনুভূতি,
তথ্য,
জ্ঞান?
'না'।
আমি
কি পূর্ব ধারণা,
সংস্কার,
কিংবা বিশ্বাস?
'না'।
তাহলে আমি কে?
'না'
'না'
করতে করতে
'আমি
কে'
এই
প্রশ্নটি যখন জীবনের এক নম্বর প্রশ্ন হয়ে যায়,
যখন
শয়নে,
স্বপনে,
জাগরণে,
বিশ্রামে,
খেতে,
বসতে,
উঠতে,
হাঁটতে এই একটি মাত্র প্রশ্ন সমগ্র সত্তায় তোলপাড় করতে থাকে তখনই উত্তর আসে।
'না'
এর
চতুর্থ মর্মকথা :
'না'
হচ্ছে অনাসক্তি (ন-আসক্তি)।
অনুরুক্তি,
প্রণয়াসক্তি,
সংসক্তি,
আবিষ্টতা,
সংলিপ্ততা,
লিপ্সা ও ভোগ-বিলাসকে
'না'
বলাই অনাসক্তি।
অনাসক্ত মানুষই খাঁটি মানুষ বা সিদ্ধ পুঁরুষ।
যশ-খ্যাতি,
পদমর্যাদা,
অর্থবিত্ত,
ক্ষমতা ইত্যাদি সকল প্রকার আসক্তি এমনকি অনাসক্তির প্রতিও আসক্তি থেকে
মুক্ত পুঁরুষই অনাসক্ত।
তাঁরা জীবনের সকল দুঃখ,
গ্লানি,
পাওয়ার আকাঙ্খা ও না পাওয়ার যন্ত্রণা থেকে মুক্ত।
তাঁরা নিজেরা ভ্রমণ করেন চিরন্তন আনন্দলোকে এবং অন্যকেও দুঃখ থেকে
মুক্তির পথ নির্দেশনা দেন।
পিথাগোরাস,
হেরাক্লিটাস,
সক্রেটিস,
লাও সু,
বুদ্ধ,
যীশু,
মুহাম্মদ সা.,
কবির এঁদের প্রত্যেকের ধর্ম ও জীবন দর্শনের প্রাণবস্তু হচ্ছে অনাসক্তির
প্রতি আহবান।
বৌদ্ধ দর্শনকে অনাসক্তির দর্শন বললেও অত্যুক্তি হবে না।
বুদ্ধ বলেন,
'প্রিয়
কিংবা অপ্রিয় কোন কিছুতে কখনো অনুরক্ত হয়ো না।
কারণ প্রিয়বস্তুর অদর্শন এবং অপ্রিয়বস্তুর দর্শন উভয়ই দুঃখজনক';
'আসক্তি
থেকে শোক উৎপত্তি হয়,
আসক্তি থেকে ভয় উৎপত্তি হয়।
যিনি আসক্তি থেকে উত্তীর্ণ তাঁর শোক থাকে না,
ভয় থাকবে কিভাবে?;
'কাম
থেকে শোক উৎপত্তি হয়,
কাম থেকে ভয় উৎপত্তি হয়।
যিনি কাম থেকে উত্তীর্ণ তাঁর শোক থাকে না,
ভয় থাকবে কিভাবে?'
'যাঁর
কামনা নিঃশেষ হয়েছে - তিনিই পুরুষোত্তম'।
লাও সু বলেন,
'ক্ষমতার
পূজা যদি বন্ধ হয়,
মানুষের হানাহানি তবে শেষ হবে।
যে জিনিস সহজে মেলে না,
তার চাহিদা যদি না থাকে,
মানুষ তবে ডাকাত হবে না।
আকাঙ্খার জিনিসটি যদি না দেখে তবে মানুষের মন অশান্ত হবে না।'(চলবে)
ধর্ম
নিরপেক্ষতা (২)
আল্লামা মো:
সাদেক নূরী
॥
(পূর্ব প্রকাশের পর)
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণকে বুঝাতে চেষ্টা করেন যে,
ধর্মনিরপেক্ষতা,
ধর্মহীনতা নয়।
কিন্তু আওয়ামী লীগের পক্ষপুটে অবস্থানকারী ধর্মবিদ্বেষী উন্নাসিক তথাকথিত
প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের তরফ থেকে অনুকূল সহযোগিতার অভাবে জনগণকে স্পষ্ট
বুঝানো গেলো না যে,
ধর্মনিরপেক্ষতা,
ধর্মহীনতা নয়;
তবে
কী?
ধর্মের ব্যাপারে জনগণের যখন এরূপ বিভ্রান্ত অবস্থা বরং দেশের অধিকাংশ জনগণ
বঙ্গবন্ধুর সরকারকে যখন ধর্মবিরোধী সরকার মনে করছে,
ঠিক
সে মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে শাহাদাত বরণ করেন।
বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতের পর জেনারেল জিয়াউর রহমানের পূর্বসূরী খন্দকার মোশতাক
ও বিচারপতি সায়েম সরকার গঠন করলেও তারা সংবিধানে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ
করেননি।
কিন্তু পর্যায়ক্রমে তাদের সরিয়ে দিয়ে পছন্দমতো তৈরি সুযোগে তিনি ক্ষমতার
শীর্ষে আত্মপ্রকাশ করেন,
নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন এবং ৭২-এর সংবিধানে
বেয়নেট চালানোর মতো ঔদ্ধত্যপূর্ণ কাজকর্ম শুরু করেন।
তিনি সংবিধানের মাথায় বিসমিল্লাহ্ বসান,
'ধর্মনিরপেক্ষতা'
এর
স্থলে আল্লাহ্র প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস'
প্রতিস্থাপন করেন এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ'র
ধারা সংবিধান থেকে হটিয়ে দেন।
ভাবখানা এমন যে,
পূর্বে বাংলার মুসলিমদের আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস ছিল না,
'বিসমিল্লাহ'
না
বলেই তারা ভাত খেতো,
কোরবানীর পশু জবাই করতো এবং ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার বানাবার সুযোগ করে
দিয়ে দেশবাসীর ইহ-পরকাল উদ্ধার করেছেন।
বলা
বাহুল্য,
'বিসমিল্লাহ্
বলে'
যে
কোন কাজ শুরু করা ইসলামের একটি শিক্ষা।
এটা
কোথাও লেখা থাক আর না থাক,
প্রত্যেক মুসলিম তা মেনে চলার চেষ্টা করেন।
ভাতের প্লেটে অথবা ভাতের গায়ে বিসমিল্লাহ্ লেখা থাকে না,
কোরবানীর পশুর শরীরেও।
তা
সত্ত্বেও কোন মুসলিম
'বিসমিল্লাহ্'
না
বলে ভাত খায়?
না
কোরবানীর বা যে কোন পশু জবাই করে?
বিসমিল্লাহ্ মু'মেদের
মনে থাকবে,
যে
কোন কাজের সময়ে তা উচ্চারণ করবে।
কিন্তু মু'মেন
যা কিছু লিখবে,
তার
পূর্বে বিসমিল্লাহ লিখতেই হবে,
তেমন কোন বিধান নেই।
কুরআনের সব সুরার শুরুতে বিসমিল্লাহ লেখা হলেও সুরা তাওবা'র
শুরুতে বিসমিল্লাহ্ লেখা হয়নি।
এমতাবস্থায় একটি দেশের সংবিধান,
যা
সারা পৃথিবীর সব ধর্মের লোকের পাঠ্য,
তাতে 'বিসমিল্লাহ্'
লেখা আর না লেখায় ইসলামের দৃষ্টিতে আমি কোন তফাৎ দেখিনা।
কারণ,
মুসলিম
'বিসমিল্লাহ্'
লেখা না থাকলেও
'বিসমিল্লাহ্'
বলে
তা পাঠ করতে পারে,
জিয়া সাহেবরাও পারেন।
আর
অমুসলিম তা লেখা থাকলেও তা নাও পড়তে পারেন।
অথবা অবিশ্বাসে বিসমিল্লাহি পড়লেও কোন ফলোদয় হচ্ছে না।
তা'ছাড়া,
এটা
কি সত্য যে,
জিয়া সাহেব এবং
'বিসমিল্লাহ্'
জন্য আত্মশ্লাঘা প্রদর্শনকারীরা সংবিধানের যে কোন ধারা খোঁজ করবার পূর্বে
এর শীর্ষে লেখা
'বিসমিল্লাহ্'
পাঠ
না করে সংবিধানের ভিতরে প্রবেশ করেন না।
যদি
তা না হয়,
তা
হলে সংবিধানের শীর্ষে লিখিত
'বিসমিল্লাহ্'
অর্থহীন হলো না কি?
সংবিধানে
'বিসমিল্লাহ্'
সংযোজনে সত্য সত্যই আমার কোন আপত্তি নেই,
থাকতেও পারে না।
তবে,
এখানে আমার মূল প্রতিপাদ্য এই যে,
আলোচ্য
'বিসমিল্লাহ্'
লেখার কোন ধর্মীয় কার্যকারিতা বা ভিত্তি নেই।
কেবল জনগণকে ধর্মের নামে বিভ্রান্ত করে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন করে রাজনৈতিক
ফায়দা হাসিল করতে গিয়ে দেশের সংবিধানের মতো একটি সার্বজনীন দলিলকে বিতর্কিত
করায় একজন দেশ প্রেমিক ধর্মসচেতন নাগরিক হিসেবে আমার মতো অনেকেরই এর দ্বারা
ইসলামের কোন সেবা হয়েছে বলে মনে করেন না।
নিঃসন্দেহে এটা তাদের নিরেট ধর্মবোধ ও জাতীয় ঐক্য এবং জাতীয় স্বার্থচেতনারই
বহিঃপ্রকাশ।
অপরদিকে,
'ধর্মনিরপেক্ষতা'
এর স্থলে
'আল্লাহর
দৃঢ় বিশ্বাস'
শব্দগুলোর প্রতিস্থাপন সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক।
কারণ,
রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতার সাথে আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের
কোনই সম্পর্ক নেই।
কারণ,
ধর্মে বিশ্বাসের সম্পর্ক কেবল ব্যক্তির সাথে।
উপরে বিষয়টি আলোচনা করা হয়েছে।
রাষ্ট্রের ধর্মরিপেক্ষতা স্থলে
'আল্লাহর
প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস'
প্রতিস্থাপন প্রমাণ করে,
রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ইসলামে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের
নির্দেশ কার উদ্দেশ্যে,
এ
দুটো বিষয়েই জিয়া সাহেবদের সুস্পষ্ট ধারণার অভাব রয়েছে এবং তাদের ধারণা এ
দুটি পরস্পর বিরোধী।
অথবা নিছক সস্তা জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের কৌশল হিসেবে এসব
করেছেন।
সংবিধান থেকে রাজনীতির হাতিয়াররূপে ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধ'র
বিধানটি হটিয়ে দেয়ার মধ্য দিয়ে তাদের উক্ত অধার্মিক উদ্দেশ্যেটি
স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
ধর্মের অপব্যবহার সকল ধর্মে সবচেয়ে বড় পাপ।
এমতাবস্থায়,
৭২-এর সংবিধানে ধর্মের
'অপব্যবহার'
নিষিদ্ধ করে সকল ধর্মের সার বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি করা হয়।
ধর্ম সম্পর্কে যার সামান্য জ্ঞান বা শ্রদ্ধা আছে,
তেমন কেউ ধর্মের
'অপব্যবহার'
নিষিদ্ধ করার বিরোধিতা করতে পারে না।
প্রসঙ্গক্রমে,
নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে,
জাতীয় জীবনে সৃষ্ট একটি অন্যায় ধারণা নিরসনের পবিত্র উদ্দেশ্য,
একটি মর্মান্তিক বিষয়ের প্রতি বিনীতভাবে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।
সে বিষয়টি হলো,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাহাদাৎ।
এক্ষেত্রে যারা জেনারেল জিয়াউর রহমানকে শহীদ বলেন,
তারা বঙ্গবন্ধুর বেলায় তা বলেন না।
তারা মনে করেন,
জেনারেল জিয়াউর রহমান সংবিধানের শীর্ষে বিস্মিল্লাহ বসিয়ে,
'ধর্মনিরপেক্ষতার'
বদলে
'আল্লাহর
প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস'
প্রতিস্থাপন করে এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং ইসলামকে রাজনৈতিক
উদ্দেশ্যে অপব্যবহার করার সাংবিধানিক সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে ইসলামের
বিরাট খেদমত করেছেন এবং আল্লাহ্ রাসূলকে নিজের ও নিজের দলের পেয়ে গেছেন।
অপরদিকে,
বঙ্গবন্ধু তাদের ভাষায়,
পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ স্বাধীন করে এবং ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে
আল্লাহ্র অভিশপ্ত হয়েছেন।
এ
জন্য,
তারা জেনারেল জিয়াকে শহীদ বললেও বঙ্গবন্ধুকে শহীদ বলেন না।
অথচ দু'জনের
পরিণতিতে কোনই তফাৎ নেই।
বস্তুতঃ এ ধরনের মনোভাব ও প্রচার কোন মু'মিনের
শোভা পায় না এবং ধর্মে,
বিশেষ করে,
ইসলামে নিষিদ্ধ ও হারাম।
তবে,
উভয় হত্যাকান্ডের প্রতিই রয়েছে আমাদের আন্তরিক ঘৃণা এবং আমরা মনে করি,
সকল ঘাতক ধর্মমতে সমান পাপী এবং তাদের বিচার হওয়া উচিৎ।
(সমাপ্ত)
মানুষের
অসহায়ত্বের কারণ মানুষ
গোলাম মাহমুদ
মামুন
॥
মানুষ যখন যে অবস্থানেই থাকুক সে সেই অবস্থানে থেকেই ভীষণ অসহায়।
বিশেষ করে মানুষ যখন একা হয়ে যায় তখন তার মত অসহায় আর অন্য কোন প্রাণী
পাওয়া যাবে না।
একা
হয়ে যাওয়া আর একাকীত্ব এক নয়।
একাকীত্ব মানুষকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায় আর একা হয়ে যাওয়া মানুষ হিতাহিত
জ্ঞানশূন্য হয়ে চরম হীংস্র হয়ে উঠে।
তখন
হয় সে নিজেকে ধ্বংস করে নয়তো অপরকে ধ্বংস করে।
সেজন্য মানুষকে কখনো একা হতে নেই,
তাকে একা হতে দিতে নেই।
মানুষ সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার স্বার্থে সামাজিকভাবেই সব
মানুষকে সব মানুষ সহযোগিতা করার দরকার যেন কেউ কখনো একা হয়ে না যায়।
একা
হয়ে যাওয়া থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে মানুষের বন্ধন।
বন্ধন - ব্যক্তিগত,
পারিবারিক,
সামাজিক,
আত্মীয়তার বন্ধন একটি সামাজিক ব্যাপার।
একজনের সঙ্গে অন্যজনের বন্ধনের বা অনেক জনের বন্ধনের বিষয়টি নির্ভর করে
পারস্পারিক দ্বায়িত্বশীলতা,
দ্বায়িত্ব সচেতনতা,
নির্ভরশীলতা,
ভাললাগা,
ভালবাসা,
আস্থা,
আকর্ষণ,
বিশ্বাস,
শ্রদ্ধা বা স্নেহ,
মমতা,
উপলব্ধি,
বোধ,
আত্মসচেতনতা,
বিদ্যা,
বুদ্ধি,
জ্ঞান,
প্রজ্ঞা ইত্যাদি।
এক
কথায় মানুষ নিজেকে নিজে কতটা ভালবাসে তার উপরে নির্ভর করে অপরকে ভালোবাসার
পরিমাণ।
মানুষ যখন নিরাশ্রয় হয় তখন সে আশ্রয় খুঁজে।
শত্রুর আশ্রয়ে যেতে হলেও তখনকার জন্য সে আশ্রয়কেই নিরাপদ মনে করে।
অর্থাৎ সর্বাবস্থায় মানুষ নিরাপত্তা চায়।
তার
এই চাওয়ার মধ্যদিয়েই প্রকাশ পায় একই বিষয় তার নিজের পক্ষ থেকে অপরকে দেয়ারও।
তখনই প্রশ্ন আসে সাম্য,
প্রীতি ও বন্ধনের,
তখনই প্রশ্ন আসে
'আমি'
থেকে 'আমরার'
(আমাদের)
উপলব্ধির কথা।
এ
পর্যায়ে এসে মানুষ তার সকল অসহায়ত্ব ঘুচাতে পারে।
এ
লক্ষ্যেই সম্ভবত,
মহান সাধক আনোয়ারুল হক সবসময় বলতেন
'আমরার'
,
কখনো আমি বলতেন না।
'আমি'
খোলসের ভেতরে আটকা পড়া মানুষ স্বজন হারিয়ে এক হয়ে যেতে বাধ্য হয়,
যেখানে মহান সাধকদের থাকে হাজার-হাজার,
লাখো-লাখো স্বজন।
'একতাই
শক্তি',
'ঐক্যই
বল'
মানুষ জানে,
তারপরেও মানেনা এবং ঐক্যবদ্ধ হয় না।
কখনো সংকীর্ণ স্বার্থে জোট বাঁধে,
যেটাকে ঐক্য বলা চলে না।
নিজে অন্যজনের সহায় না হলে অন্যজন তার সহায় হয় না।
যখনই অন্যজনকে প্রতিদ্বন্দ্বি ভেবে তার সঙ্গে টেক্কা দেয়ার প্রবণতা আসে তখন
সে পথ বেয়েই আসে ধ্বংস।
মনোভাবটা সহযোগিতার হলে তখন বন্ধু,
শুভাকাঙ্খি ও স্বজন বাড়ে যার মধ্যে একজন মানুষ বেঁচে থাকতে পারে।
মানুষ বেঁচে থাকার জন্য অনন্যোপায় অন্য মানুষের কাছে সমর্পণে বাধ্য হয়
যা তার অস্তিত্বের বিলীনতা অথচ সে একজনের কাছে সজ্ঞানে সমর্পণ করলে সে
রকম একজনের কাছে সে সবজন পেতে পারে।
সে দশজনের একজন হয়ে সমমর্যাদার ভিত্তিতে বেঁচে থাকতে পারে।
এরজন্য মানুষের দরকার মান্যতা,
শৃংখলা,
অনুসরণ,
অনুকরণ যে সবের মাধ্যমে তার মধ্যে ইতিবাচক গুণগুলো প্রবেশ করবে বা নিজের
ভেতর সৃষ্টি হবে,
যে গুণগুলো তার অসহায়ত্বকে দূর করে।
দায়িত্ব নেয়া,
দায়িত্বশীল হওয়া,
দায়িত্ব সচেতন থেকে পা বাড়ানো এবং দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকলে
পারিপার্শিক কারণেই মানুষের অসহায়ত্ব ঘুচে যায়।
অসহায়ত্ব না থাকার অর্থ হলো নিজের সামর্থ বাড়া,
গ্রহণযোগ্যতা থাকা,
কদর-সম্মান থাকা,
নিরাপত্তাহীনতায় না থাকা অর্থাৎ অপরের অসহায়ত্ব ঘুচাবার যোগ্যতা থাকা।
অসহায়ত্ব ঘুচানোর বিষয়টা সামষ্টিক।
পরিবার এবং সমাজ সম্মিলিতভাবে কাজটি করতে পারে।
প্রতিটি ব্যক্তি প্রত্যেকের প্রতি যথোপোযুক্ত সাড়া দিতে হবে।
সামর্থবানেরা দায়িত্ব নিয়ে সামাজিক উন্নয়নের বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে
বিবেচনা করবে।
মানুষের অসহায়ত্ব মানুষকেই ঘুচাতে হবে এ ক্ষেত্রে দৈবশক্তির অপেক্ষায়
থাকলে ধ্বংসই অনিবার্য।
সুন্দরবনের
বাঘ
সংলাপ
॥
যে
নদীতে জোয়ার-ভাটা খেলে,
সেখানে এক বিশেষ ধরনের গাছপালা দেখা যায়।
এরা 'ম্যাংগ্রোভ'
পরিচিত।
সমষ্টিগত ভাবে ম্যাংগ্রোভ এর নাম
'ম্যাঙ্গাল'।
পর্তুগিজ শব্দ
'ম্যাঙে'
থেকেই ম্যাংগ্রোভ শব্দটির উৎপত্তি।
পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়।
আমাদের দেশে সুন্দরবনে এই জঙ্গলের দেখা মেলে।
বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ম্যাংগ্রোভ ছড়িয়ে আছে সুন্দরবন জুড়ে।
সুন্দরবনের বৈশিষ্ট্য হল,
বাঘের অস্তিত্ব।
ম্যাংগ্রোভে গাছে বৈশিষ্ট্য হল শিকড়।
নরম পলি জমে মাটির উপরিভাগের গর্তগুলো এমন ভাবে বুঝে যায় যে,
গাছের মাটির তলা থেকে শিকড় দিয়ে অক্সিজেন নিতে পারে না।
ফলে শ্বাসমূলগুলো মাটির উপরে বেরিয়ে পড়ে।
ইংরাজিতে এদের বলে
'নিউমাটোফোর',
আর বাংলায় শুলো।
গাছেদের মধ্যে আমাদের সুন্দরবনে যে গাছগুলো সচরাচর দেখা যায় সেগুলো হল
বাইন,
গর্জন,
কাঁকড়া,
হেঁতাল,
ধুন্দুল,
ক্যাওড়া,
পশুর,
গরান,
গোলপাতা,
ওরা তোড়া প্রভৃতি।
সুন্দরী গাছ থাকলেও সেগুলোর স্বাস্থ্য মোটেই ভাল না।
এক এক গাছের শ্বাসমূলের গঠন এক এক রকম।
যেমন,
বাই,
কাঁকড়া,
পশুর প্রভৃতি গাছে শ্বাসমূল মাটির উপরে সোজা হয়ে বেরিয়ে থাকে।
এদের মধ্যে কারো মূল সরু,
আবার কারো বা গজালের মতো।
আবার গর্জন গাজের দেখা যায় ঠেস মূল।
হেঁতালের থাকে গুচ্ছমূল।
সুন্দরবন বলতেই সবার আগে মনে ভেসে ওঠে ভয়ঙ্কর সুন্দর রয়াল বেঙ্গল টাইগার!
বাঘের পরিস্থিতি মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা ভাবলে অবাক হতে হয়।
সুন্দরবনের জলকাদায় ভরা ম্যাংগ্রোভে বাঘের উপস্থিতি।
সুন্দরবনে বাঘের জীবনযাত্রা ভীষণ কঠিন।
এখানকার নদীনালায় দিনে দু'বার
জোয়ার-ভাটা হয়।
জোয়ারের সময় জল ওঠে বিশ-বাইশ ফুট পর্যন্ত,
জঙ্গলের অনেকটা অংশই চলে যায় জলের তলায়।
আবার যখন ভাটার টান হয়,
জোয়ারের জলে বয়ে আসা পলি মিলিয়ে বাঘের পক্ষে শিকার ধরা রীতিমতো কঠিন।
সেই জন্যে বাঘ এখানে সব কিছুই খায়।
হরিণ,
শুয়োর,
বাঁদর যেমন খাদ্য তালিকায় আছে,
তেমনই মাছ,
কাঁকড়া,
কচ্ছপ সব কিছুই এরা খেয়ে থাকে।
যে পরিস্থিতিতে বাঘ সুন্দরবনে বাস করে,
অনুরূপ পরিস্থিতিতে অন্যান্য কোনও জঙ্গলের বাঘের বেশি দিন বেঁচে থাকা
প্রায় অসম্ভব।
সুন্দরবনের বাঘ সম্বন্ধে মানুষের একটা অহেতুক ভীতি আছে।
সাধারণত বলা হয়,
ওরা মানুষখেকো।
এটা কিন্তু ভ্রান্ত ধারণা।
মানুষ বাঘের স্বাভাবিক খাদ্য নয়।
যদি জিম করবেট বা কেনেথ অ্যান্ডারসনের শিকার কাহিনী পড়া যায়,
দেখা যাবে এক বার যদি বাঘ মানুষ শিকার করে,
তবে সে অন্য কোনও শিকার-প্রাণী ছোঁয় না।
শুধু মানুষের মাংসই খায়।
তাই আমরা দেখি এক একটা মানুষখেকো বাঘা ১৫০-২০০ অথবা তারও বেশি মানুষ
মেরেছে।
অথচ হিসাব নিলে দেখা যাবে সুন্দরবনে যে বাঘটা এক বার মানুষ মেরেছে,
সে হয়তো তার জীবনে আর কোনও মানুষই মারেনি।
আসলে সুন্দরবনে শিকার ধরা ওখানকার বাঘের পক্ষে এতটাই কঠিন যে,
ওরা সামনে যা পায় তাকেই আক্রমণ করে।
মানুষও ব্যতিক্রম নয়।
জেলেরা মাছ ধরার জন্যে যখন গভীর অরণ্যে তাদের ডিঙি নৌকো নিয়ে সরু খাঁড়ির
মধ্যে ঢোকে,
তখন কখনও কখনও তাদের বাঘে মুখোমুখি হতে হয়।
ক্ষুধার্ত বাঘও ছাড়ার পাত্র নয়,
সে নিমেষের মধ্যে মানুষকে আক্রমণ করে বসে।
বেশিরভাগ সময়ই মানুষটির মৃত্যু ঘটে,
আবার কখনও,
কখনও অন্যান্য সঙ্গী-সাথীরা বাঘের সঙ্গে আপ্রাণ লড়াই করে মানুষটিকে
বাঁচাতে সক্ষম হয়।
সুন্দরবনের বাঘ মানুষ থেকে কাঁকড়া সবই খায়।
অর্থাৎ মানুষও তাদের খাদ্য শৃঙ্খলের অন্যতম খাদ্য।
সুন্দরবনের বাঘের সঙ্গে অন্যান্য বনের বাঘের আর একটা বড় তফাত হল,
সুন্দরবনের বাঘ নদীর নোনা জল খেতে অভ্যস্ত।
এরা অসম্ভব ভাল সাঁতারও বটে।
নির্দ্ধিধায় এক কিলোমিটার নদী সাঁতরে পার হয়ে যায়।
দিনে দু'বার
জোয়ার-ভাটা,
শিকার ধরার কঠিন পরিস্থিতি আর সামুদ্রিক ঝড়ের তাণ্ডব-সব মিলিয়ে এখানকার
বাঘ হয়ে উঠেছে অন্যান্য জায়গার বাঘের তুলনায় একটু বেশি উগ্র মেজাজি।
সুন্দরবনের নদীনালাগুলোর উৎসমুখ ক্রমশ বন্ধ হয়ে আসছে,
ফলে মিষ্টি জল নদীতে কম ঢুকছে,
অন্যদিকে আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রে জলের স্তর বাড়ছে আর ফলস্বরূপ
জোয়ারের সময় নদীতে বেশি পরিমাণে লবণাক্ত জল ঢুকছে,
নদীর জলে নুনের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে।
প্রত্যেক প্রাণীর শরীরে নুন সহ্য করার একটা সীমা থাকে।
সুন্দরবনের বাঘ যদিও নদীর নোনা জল পান করে থাকে,
তবুও ওদের শরীরেও নুনের একটা সহ্যসীমা আছে।
আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যে হারে নদীতে নুন বেড়ে চলেছে,
তাতে হয়তো এমন এক দিন আসবে যে,
নুনের পরিমাণ বাঘের শরীরের সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যাবে আর বাঘ চলে যাবে
অবলুপ্তির পথে!
|
|