কলকাতার জন্মদিন!

 

 

নাবিল

 

দিনটি ছিল ১৬৯৮ সালের ১০ নভেম্বরসকাল সকাল বেশ কয়েকজন ইংরেজ কর্মচারীর সঙ্গে উদ্ধত ভঙ্গিতে অহঙ্কারী দর্পে বাংলার দক্ষিণ অঞ্চল বড়িশায় পা রাখলেন জোব চার্নকের জামাতা চার্লস আয়ারএগিয়ে গিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন তামাম এলাকার জায়গীরদার বিদ্যাধর রায়চৌধুরী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাবড়িশায় সাজের আটচালায় এক বৈঠকে বসলেন দু'পক্ষআর তার অল্প কিছুক্ষণ পরেই এক ঐতিহাসিক ঘটনার সূত্রপাতকলকাতা, সূতানুটি ও গোবিন্দপুরের প্রজাস্বত্ব হস্তান্তরিত হলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতেনিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেই বার্ষিক ১৩০০ মুদ্রা খাজনার শর্তে কোম্পানির হাতে দলিল তুলে দিলেন জায়গীরদার রায়চৌধুরী পরিবারশুরু হলো কলকাতার দ্বিতীয় অধ্যায়দিল্লির মসনদে তখন মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব, গোটা ঘটনার নিরব সাক্ষীসাবর্ণ রায়চৌধুরীর পুরনো কুঠি, আটচালা আর সাবর্ণ সংগ্রহশালার সামনে দাঁড়ালেই খোঁজ পাওয়া যায় সেই সব পুরানো ইতিহাসের

দু-দু'বার চেষ্টা করেছিলেন জোব চার্নক কোম্পানির স্বার্থে বাংলায় শুল্ক মুক্ত বাণিজ্যকে পাখির চোখ করে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছিলেন তিনিকলকাতা, সূতানটি ও গোবিন্দপুর তিনটি গ্রামই তার ভারী পছন্দ ছিলবিশেষ করে কলকাতায় বাণিজ্য এবং সূতানটিতে ইংরেজ বসতি গড়ে তোলা লক্ষ্য ছিল তার১৬৮৬ সাল থেকে ১৬৯০ - এর মধ্যে সে উদ্দেশ্য তার সিদ্ধ হয়নিকারণ ইংরজ-মুঘল লড়াইশেষে ইব্রাহিম খানের অনূকুল্যে হুগলী নদীর তীরে বিস্তীর্ণ জলাভূমি সূতানুটিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুঠি স্থাপন করার উদ্যোগ নেনতারিখটি ছিল ১৬৯০ সালের ২৪ আগস্টএই দিনটিই নাকি কলকাতার জন্মদিন? অবশ্য এ নিয়ে বিতর্ক আছেযাইহোক, এখানেই সূতানুটির মাটিতে শেষ আশ্রয়  জোব চার্নকের১৬৯৩ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি বেঁচে ছিলেন

এরপরই স্যার গোল্ডসবরো ওই কুঠিগুলোর সর্বময় কর্তা হয়ে ওঠেনতারপর চার্লস আয়ার ১৬৯৬ সালে কোম্পানির ভার নেনএসেই ১৬ হাজার মুদ্রা দিয়ে বাগে আনার চেষ্টা করেন মুঘল সম্রাটকেকারণ বাংলায় কিছু করতে হলে তার স্বত্ব দরকারতা দিতে পারেন স্বয়ং দিল্লীশ্বরই আওরঙ্গজেবের নাতি আজিম উস সানের মাধ্যমেই সম্রাটের সনদ এসে পৌঁছায়ইচ্ছে ছিল না রায়চৌধুরীদেরইংরেজদের কাছে জমি হস্তান্তরের ইচ্ছা ছিল না বাংলার দেওয়ানদেরওকিন্তু বাদশাহের অনুমতি রয়েছেতাও টালবাহানা করছিলেন তখনকার রায়চৌধুরী জমিদাররা কোম্পানিও নাছোড়শেষে হুগলীর প্রাক্তন গর্ভনর জৈনুদ্দিন খানের মধ্যস্ততায় কোম্পানির তরফ থেকে আজিম উস সানের কাছে যান প্রতিনিধি ওয়ালসএরপরই প্রজাস্বত্ব হস্তান্তর করার আদেশ এসে পৌঁছায় জায়গীরদারের কাছেযদিও জায়গীরদার হিসেবে দলিলে সই করেননি সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের কোনো পরিচালন কর্তাইসই ছিল অন্যান্য সদস্যদের

মূল দলিলটি ছিল ফার্সী ভাষায় লেখাবলছিলেন সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের দেবর্ষি রায়চৌধুরীবড়িশা সুখেরবাজার অঞ্চলে সাবর্ণ সংগ্রহশালায় এই দলিলের প্রতিলিপি রাখা আছেরয়েছে তার বাংলা ও ইংরেজী অনুবাদওদেবর্ষি জানালেন, জোব চার্নকের আমলে কলকাতার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বলে এর ভুল বার্তা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলএটি ঠিক নয়এই দলিলই তার বড় প্রমাণকলকাতা যদি তার আগে থেকে নাই থাকতো তাহলে তা হস্তান্তর হলো কেমন করেসাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদ ও কয়েকজন শিক্ষাবিদ বুদ্ধিজীবী এর বিরুদ্ধে আদালতে আপিল করেঅধ্যাপক নিমাইসাধন বসুর নেতৃত্বে একটি কমিটি তৈরি হয়রিপোর্ট প্রকাশিত হয় ২০০৩ সালের ৩১ জানুয়ারি১৬ মে উচ্চ আদালত রায় দেন, কলকাতার কোনো নির্দিষ্ট জন্মদিন নেইতাই কলকাতার কোনো প্রতিষ্ঠাতাও নেইঅথচ কলকাতা কর্পোরেশনের ওয়েবসাইটে ও টাউন হলে এখনো ওই ভুল তথ্যই লেখা রয়ে গিয়েছেআবেদন করা হয়েছে এগুলি বাতিল করার জন্য

সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের জায়গীর প্রাপ্তি সম্পর্কে বলতে গিয়ে দেবর্ষি রায়চৌধুরী বলেন, ১৬০৮ সালে মানসিংহের কাছ থেকে জমিদারী প্রাপ্ত হন লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়উত্তরে হালিশহর থেকে দক্ষিণে লক্ষ্মীকান্তপুর পর্যন্ত এই ৮টি পরগণার জায়গীর পান তিনিতখন মোঘল সম্রাট ছিলেন জাহাঙ্গীরতখন থেকেই রায়চৌধুরী উপাধি পান তিনিগোত্র হয় সাবর্ণকালক্রমে এই ধারা চলতে থাকে তার বংশধরদের মধ্যেসে সময়ে তারা এখানে থাকতেন নাতারা পাকাপাকিভাবে বড়িশা অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন ১৭১৬ সাল থেকেতার আগে ১৭১০ সালে কয়েকটি বসতবাড়ি গড়েন তারাতবে আটচালাটি নির্মিত হয় ১৬১০ সালেইসে সময়ে আরো কয়েকটি অফিস বাড়ি তৈরি হয় এই অঞ্চলে

পরিবারের অনেক নিদর্শনই রাখা আছে সাবর্ণ সংগ্রহশালায়রয়েছে মুদ্রা থেকে সে সময়ে ব্যবহৃত জিনিষপত্র, ১৬০৮ সালের ইট, ফসিল ও দলিল দস্তাবেজআছে ১৮ ও ১৯ শতকের কাবিলতিপত্র, যা প্রমাণ করে হালিশহরের যে ভিটা রামপ্রসাদের বলে পরিচিত তা আদৌ রামপ্রসাদের ছিল না - এমন আরো কত কি! পুরনো কলকাতার এক খন্ডচিত্র যেন ফুটে উঠেছে এই সংগ্রহশালায় তারা জানাতে চায় আরো ইতিহাসপুরানো কথা বলতে চায় স্থাপত্যগুলিওকমতো নয়, কলকাতা সংলগ্ন অঞ্চলের এ ইতিহাস যে প্রায় ৩৫০-৪০০ বছরের পুরনো