সংলাপ ঃ মুক্তিযুদ্ধে আপনি কিভাবে অংশ নিলেন?
রফিকুল ইসলাম ঃ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে
কিন্তু এর পিছনে একটা সুদীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসকে
বাদ দিয়ে সরাসরি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের কথা বললে সেটা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে।
'৫২-র ভাষা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে আমাদের মধ্যে স্বাধীনতা স্বপ্নের বীজ
অঙ্কুরিত হয়েছে। তার ধারাবাহিকতায় অনেক রাজনৈতিক সংগ্রাম, উত্থান-পতনের মধ্য
দিয়ে ’৬২ ছাত্র আন্দোলনের পরে ছয় দফা কর্মসূচী ঘোষণা করা হলো। পরবর্তীকালে
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার পরে বাঙালিরা বুঝতে পারলো পাকিস্তানীরা কোনমতেই
বাঙালিদের গ্রহণ করবে না এবং তাদের দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করবে - বাঙালিদের
মধ্যে যারাই ওঠার চেষ্টা করবে তাদের ধ্বংস করবে। তারপর '৬৯-র
গণ অভ্যুত্থান ও ’৭০-র নির্বাচন। ওইসময় এক প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ে প্রায়
লক্ষাধিক বাঙালি মারা গেল কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কোন সাহায্য-সহযোগিতা
আসলো না। সবকিছু মিলিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বুঝলো পশ্চিম
পাকিস্তানীরা একটি কোলোনিয়াল টেরিটরি হিসেবে তাদেরকে দেখছে - সমপর্যায়ের
মানুষ হিসেবে গণ্য করছে না। তারপর মার্চ মাসের ১ তারিখ ইয়াহিয়া ৩ মার্চ
অনুষ্টিতব্য সংসদ অধিবেশন স্থগিত করল। মানুষ আশা করছিলো এই সংসদ অধিবেশনের মধ্যে দিয়ে ১৬৭ সিট পেয়ে
জয় লাভ করা আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করবে যারা হয়তো তাদের স্বার্থ দেখবে। কিন্তু
স্থগিত করা হলে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। আমি সেসময়
সেনাবাহিনীর ডেপুটেশনে চট্টগ্রামে ইপিআরের সেক্টর অ্যাডজুটেন্ট হিসেবে
দায়িত্ব পালন করছিলাম। আমাদের দায়িত্ব পড়লো শহরের আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করার
জন্য। সেসময় হরতালের ডাক দেয়া হয়েছিলো - ২ তারিখ ঢাকায় এবং ৩ তারিখ সারা
দেশব্যাপী। ৩ তারিখ বাঙালিদের একটি মিছিল চট্টগ্রাম শহরের দিকে আসে। ওই
মিছিলে হঠাৎ করে আক্রমণ চালানো হয়। ওটা ছিলো ওয়্যারলেস কলোনী সেখানে
অবাঙালিদের সংখ্যা বেশি ছিলো। দেখা গেল, সেই আক্রমণে প্রায় দুশোর মতো
বাঙালিকে তারা হত্যা করে এবং চার-পাঁচশো মানুষ আহত হয়। আমার মেডিকেলে গেলাম।
খবর নিয়ে ডাক্তাররা বললেন যে, বেশির ভাগ লোকের ধারালো অস্ত্রের আঘাত এবং নিহত
কিছু জনের আঘাতে বুলেট পাওয়া গেছে। সেই বুলেটগুলো ৭.৬২ চাইনীজ রাইফেলের। এই
রাইফেলটা তখন শুধুমাত্র সামরিক বাহিনীর কাছেই ছিলো। আমি গোপনে খবর নিয়ে
জানলাম ওয়্যারলেস কলোনীতে সিভিলিয়ানদের সাথে বেলুচ রেজিমেন্টের কিছু সৈন্য
বেসামরিক পোশাক পরে দু’দিন আগে থেকে অবস্থান নিয়েছে। ওই বেসামরিক পোশাক পরা
বেলুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা তাদের রাইফেল দিয়ে বাঙালিদের উপর আক্রমণ করে।
তাহলে জিনিসটা কি দাঁড়ালো, সামরিক বাহিনীর লোকেরা বেসামরিক পোশাক পরে
বাঙালিদের উপর বুলেট ছুড়েছে। সামরিক কোন সদস্য তার রাইফেল নিয়ে বেসামরিক কোন
এলাকায় থাকতে পারে না উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ ব্যতীত। আমার মনে আর কোন সন্দেহ
রইলো না যে, তারা যেভাবেই হোক বাঙালির এই আন্দোলন নস্যাৎ করতে সব ধরনের
পদক্ষেপ নেবে। আর এই পরিকল্পনা তারা মার্চ মাসে করেনি - এটা করেছে ফেব্রুয়ারী
মাসে বা তারও আগে। কারণ সৈন্য আনা শুরু হয়েছে অনেক আগে এবং ২৮ ফেব্রুয়ারী
থেকে সোয়াত নামে একটি জাহাজ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র-গোলাবারুদ নিয়ে চট্টগ্রাম
বহির্নোঙ্গরে অবস্থান করছিলো। মার্চের ১ তারিখ তারা ভেতরে ঢুকে অস্ত্র
খালাশের চেষ্টা করে। বাঙালিরা সেখানে বাধা দেয়। সবাই বুঝতে পারছিলো যে এই
গোলাবারুদ বাঙালিদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা হবে। পাকিস্তান সরকার ঘোষণা দিলো
যে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান-ভারত সীমন্তে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। আমি যেহেতু
ইপিআরের অ্যাডজুটেন্ট, সীমান্তের সব খবর আমার কাছে আসে। আমি খবর নিয়ে দেখলাম,
সীমান্তের ভারতীয়দের মধ্যে কোনরকম সৈন্য সংখ্যা বাড়ানোর তৎপড়তা নেই। আমার মনে
দৃঢ় সন্দেহ হলো যে ওই সবকিছু হচ্ছে বাঙালিদের বিরুদ্ধে তা ব্যবহার করার জন্য।
কারণ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যেসব সৈন্য প্লেনে করে শ্রীলঙ্কা হয়ে ঘুরে
আসছিলো, তারা সকলেই ঢাকায় ছিলো, কেউ সীমান্তে যায়নি। তখন আমি বুঝলাম যে, আমরা
যদি নিশ্চুপ বসে থাকি তাহলে পাকিস্তানীরা আমাদের সবাইকে হত্যা করবে। আমি
নিজেই সিদ্ধান্ত নিলাম যে যদি মরতেই হয়, যুদ্ধ করেই মরবো। যখন আমি বুঝতে
পারবো যে তারা আক্রমণ করবে তার আগেই আমাকে আঘাত করতে হবে। কারণ আঘাত সামলে
প্রত্যাঘাত করে বেঁচে ফেরাটা খুব কঠিন হবে। ইপিআরে তৎকালীন চট্টগ্রামসহ সারা
দেশে যতো সৈন্য ছিলো তার মধ্যে ৭০-৭৫ ভাগ ছিলো বাঙালি সৈন্য এবং বাকী ছিলো
অবাঙালি সৈন্য। বাঙালি সৈন্যরা নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার ছিলো। তাদের
প্রমোশন হতো, ঠিক জায়গায় পোস্টিং ও তাদের ওয়েলফেয়ার - এই সবকিছুতেই তারা
বৈষম্যের শিকার ছিলো। পশ্চিমা অফিসাররা বাঙালিদের কোনকিছুই গুরুত্বের সাথে
দেখতো না। স্বভাবতই বাঙালি সৈন্যদের মধ্যে একটা চাপা বিক্ষোভ ছিলো।
'৭১-এর
মার্চে যখন এই ঘটনাগুলো ঘটছে তার আগে থেকেই বাঙালি সৈন্যদের সাথে আলাপকালে
এগুলো আমি বুঝেছিলাম এবং তাদের আমি বলেছিলাম, "তোমরা প্রস্তুত থাকো, সময় আসলে
আমি তোমাদের বলবো কী করতে হবে।" তারাও আশায় বুক বেঁধেছিলো যে, যখন সময় আসবে
আমরাও আর নিশ্চুপ বসে থাকবো না। এর আগে আমি দিনাজপুর ইপিআরে ছিলাম। কাজেই সব
সৈন্যদের মনোভাব সম্বন্ধে আমার একটা স্পষ্ট ধারণা ছিলো। দেখলাম, সবারই মনোভাব
এই যে, পশ্চিমাদের সাথে আর থাকা যাবে না। ৩ তারিখের এই ঘটনার পর থেকে আমি
ভাবলাম যে, একদিকে আমাদের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে, অন্যদিক রাজনৈতিক
দলগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে। কারণ যদি মুক্তিযুদ্ধ করতে হয় তাহলে জনগণকে
সাথে না রাখলে সেটা মুক্তিযুদ্ধ হবে না এবং জনগণকে সাথে নিলে রাজনৈতিক দলকে
সাথে নিতে হবে। সেজন্য আমি আওয়ামী লীগের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলাম।
আমার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন - চোখের ডাক্তার। আমার চোখের ডাক্তার হিসেবেও
তার কাছে যেতাম - একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। আমি তাকে ফোনের আমার
বাসায় আসতে অনুরোধ করলাম। সন্ধ্যার পর আমি তার সাথে আলোচনায় বসলাম। তাকে
বললাম, "দেখেন, আজকে যে ঘটনাটা ঘটেছে ওয়্যারলেস কলোনীতে, আর কোন সন্দেহ নেই
যে তারা একটা গণহত্যা করবে এখানে যাতে কোন বাঙালি আর কোনদিন মাথা তুলে
দাঁড়াতে না পারে। আগামী ২০-২৫ বছরে আর যেন কেউ কিছু করতে না পারে এমন কিছু
করবে।" তিনিও দেখলাম আমার সাথে একমত হলেন। তখন আমি তাকে বললাম যে,
"আমি আমার
ইপিআরের বাহিনীকে গোপনে কিছুটা সংঘটিত করেছি। বাকীটা আমি কালকে থেকে করবো,
আমার কিছু পরিকল্পনাও আছে। আপনি, চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সাথে
আমার একটা গোপন বৈঠকের ব্যবস্থা করেন।" তিনি চলে গিয়ে আমার জন্য বৈঠকের
ব্যবস্থা করেন। আমি এদিকে আমার সৈন্যদের জন্য পরিকল্পনাটা তৈরি করি। সেই
পরিকল্পনায় কোন সৈন্যরা কোথায় অবস্থান করবে সেটা নোট করে তা মাথায় রেখে
কাগজটা ছিড়ে ফেলি। কারণ কাগজ কখন কার হাতে পড়বে সেটা বলা যায়, খুব
ঝুঁকিপূর্ণ। পরিকল্পনা ছিলো মাথায়। পরিকল্পনা খুব সহজ ছিলো। যখন যুদ্ধ শুরু
হবে, যতো পশ্চিমা সৈন্য আমার হাতে আছে তাদের সবাইকে ধ্বংস করতে হবে,
চট্টগ্রাম শহর দখল করে নিতে হবে এবং চট্টগ্রামের সাথে ঢাকার যে লিঙ্ক -
রেলওয়ে ব্রিজ আর ফেরি ঘাট ব্রিজ - এই দুই জায়গায় অবস্থান নিয়ে এটা বন্ধ করে
দিলে ঢাকা এবং কুমিল্লা থেকে কোন রিইনফোর্সমেন্ট আসবে না। আর বিমানবন্দর দখল
করে নিতে হবে। বিমানবন্দরের কাছে একটি পাহাড়ে ইপিআরের প্রায় ২ প্লাটুন সৈন্য
ছিলো। ওদেরকে আমি জানিয়েছিলাম যে, আমার নির্দেশ পেলে তোমরা বিমানবন্দরটাকে
বন্ধ করে দেবে। বিষয়টি খুব কঠিন না, কতগুলো ড্রাম রানওয়ের মধ্যে রেখে দিলে
প্লেন উড়তে-নামতে পারবে না। আমি মোটামুটি আমার সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে ফেললাম।
এর মধ্যে জাফর সাহেব এম আর সিদ্দিকী সাহেবের একটা বৈঠকের ব্যবস্থা করেন।
সিদ্দিকী সাহেব তখন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সভাপতি। বৈঠকটা সম্ভবত ৫ মার্চ এ
কে খান সাহেবের বাসায় হয়েছিলো। আমার বাসা ছিলো সার্শন রোডে একটা পাহাড়ের
ঢালে। আমি রাতের বেলা লুঙ্গি আর গেঞ্জি পড়ে সেই পাহাড় থেকে বেরিয়ে পাহাড়টা
ক্রস করে সেখান থেকে একটা রিক্সা সেই বাসায় যাই। সেখানে পাহাড়ের পিছন দিয়ে
তার বাসায় ঢুকি। রাত সাড়ে ১২-১টা পর্যন্ত বিস্তারিত আলাপ করি। বৈঠকে খান
সাহেব, সিদ্দিকী ও আরো এক-দু’জন ছিলেন। আমি তাদেরকে বললাম,
"আমি একটা যুদ্ধের
প্রস্তুতি রেখেছি - আমি শহর দখল করবো। সেটা সম্ভব। সীমান্ত থেকে আমার সৈন্যরা
যখন আসবে তাদের নিয়ে বন্দর এলাকায় আক্রমণ চালাবো এবং তা দখল করবো।" সমস্যা
রয়ে গেলো ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়। বললাম, "ক্যান্টনমেন্টের জন্য একটা ভিন্নরকম
পরিকল্পনা নিতে হবে। এতো সৈন্য এই মুহূর্তে নাই।" শহর এলাকায় ছিলো ৮ ইস্ট
বেঙ্গল রেজিমেন্ট। তার দায়িত্বে ছিলো একজন পশ্চিমা কর্ণেল - জানজুয়া। আর তার
সেকেন্ড ম্যান ছিলেন জিয়াউর রহমান সাহেব ও আরো কয়েকজন অফিসার ছিলেন বাঙালি।
সৈনিকদের মধ্যে বেশিরভাগই বাঙালি ছিলো। কাজেই আমার পরিকল্পনা খুব সহজ রাখলাম।
শহরা দখল করা, শহরে যতো পশ্চিমা অফিসার ও সৈন্য আছে তাদের ধ্বংস করা আর
সীমান্ত ফাঁড়িগুলো পশ্চিমাদের ধ্বংস করে দখলে নিয়ে এসে পাহারায় এক-দু’জনকে
রেখে বাকি সবাই শহরে এসে যুদ্ধ করা। আর ঢাকা থেকে যাতে রিইনফোর্সমেন্ট আসতে
না পারে সেজন্য ব্রিজটা ক্ষতিগ্রস্ত করা, পুরো উড়িয়ে দেবার মতো বোমা আমাদের
কাছে তখন ছিলো না। তাকে আমি আরেকটা জিনিস বললাম যে, চট্টগ্রাম শহর দখল করার
পরে এই শহরটা দু'সপ্তাহ পর্যন্ত আমরা ধরে রাখতে পারবো। এই দু'সপ্তাহের মধ্যে
আপনাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যারা আছেন বঙ্গবন্ধু সহ, তাদেরকে মিত্র দেশগুলোর
কাছ থেকে সাহায্য সহযোগিতা আদায় করতে হবে - রসদ, গোলাবারুদ, রসদ ও ঔষধপত্র।
তা না হলে আমাদের পক্ষে শহর দখল করে রাখা কঠিন হবে। কেননা তাদের
ডেস্ট্রয়ারগুলো এসে যাচ্ছে, তাদের প্লেন, ট্যাংঙ্ক ও আর্টিলারি আছে। আমাদের
এগুলো কিছুই নেই। কাজেই ম্যাক্সিমাম দু'সপ্তাহ আমরা ধরে রাখতে পারবো। আমি
তাকে বললাম, "আপনি ঢাকায় গিয়ে গোপনে বঙ্গবন্ধুর সাথে এ ব্যাপারে আলাপ করেন।"
তিনি তারপর ঢাকা যান এবং যোগাযোগ করেন। ৫ মার্চ থেকেই আমার আওয়ামী লীগ
নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ ছিলো ডা. জাফরের মাধ্যমে। এইসব প্রস্তুতির পাশাপাশি
আমি সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করলাম। সীমান্ত থেকে সৈন্যরা কীভাবে আসবে,
পশ্চিমা সৈন্যদের নিরস্ত্র করা এবং প্রয়োজনে ধ্বংস করার সমস্ত পরিকল্পনা আমরা
সম্পন্ন করলাম। কীভাবে তা করা হবে, কারো মনে কোন সন্দেহের উদ্রেক না করে।
তখনকার দিনে কম্পিউটার ছিলো না তাই কয়েকজনের দায়িত্ব ছিলো কয়জন বাঙালি সৈন্য
আছে এবং কয়জন পশ্চিমা সৈন্য আছে নাম সহকারে তার তালিকা রাখা এবং ধারাবাহিকতা
বজায় রাখা। পোস্টিং হলে আবার তালিকাটা পরিবর্তন করা। হাতে কলমে এটা করা একটা
বিশাল ব্যাপার ছিলো। কিন্তু তারা এটা সুন্দরভাবে করছিলো। কাজেই আমি জানতে
পারছিলাম যে সীমান্তে কোন ফাঁড়িতে কতজন বাঙালি সৈন্য ও কতজন অবাঙালি সৈন্য
আছে এবং কারা বেশি হুমকিস্বরূপ। সে অনুযায়ী পরিকল্পনা নিচ্ছিলাম। এর মধ্যে
বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ ভাষণ দিয়েছেন এবং সে প্রেক্ষিতে ইয়াহিয়া খান আবার সংসদ
অধিবেশন বসানোর ঘোষণা দিলেন। তারপর আলোচনার জন্য তিনি ঢাকায় আসবেন ঘোষণা হলো।
আমারও প্রস্তুতি চলছে। এদিকে পাকিস্তান থেকে প্রচুর সৈন্য আসছে। আমার বদ্ধমূল
ধারণা ছিলো যে তারা কোন অবস্থাতেই বাঙালির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না।
সম্ভবত মার্চ মাসের ১৪ বা ১৫ তারিখ আমি জিয়াউর রহমান সাহেবের বাসায় গেলাম।
তার সাথে আলাপ করলাম। তাকে বললাম, "ইপিআরের যে পরিমাণ বাঙালি সৈন্য আছে তারা
সবাই বিশ্বস্ত। তাদেরকে নিয়ে আমি শহর দখল করে রাখতে পারবো। আপনার রেজিমেন্ট
ইস্ট বেঙ্গলে যা সৈন্য আছে অর্থাৎ দু'হাজার বাঙালি সৈন্য এদের ঠিকমতো নেতৃত্ব
দিলে আপনি সহজেই ক্যান্টনমেন্ট দখলে নিয়ে আসতে পারবেন।" ইবিআরসিতে একজন
বাঙালি কর্ণেল ছিলেন - চৌধুরী সাহেব। তার সাথেও আমরা আলাপ করলাম যে,
"আপনি
এবং জিয়াউর রহমান সাহেব মিলে এই ইবিআরসিটাকে দখলে নিয়ে আসবেন। নেয়ার পর
সীমান্ত থেকে আমার সৈন্যরা আসলে আমরা চট্টগ্রাম শহরে আমাদের দখলটাকে আরো দৃঢ়
করবো। ফেনী নদী বরাবর আমরা শক্ত ডিফেন্স নেবো। বিমানবন্দর এবং চট্টগ্রাম
বন্দরটা আমরা পুরো নিয়ন্ত্রণে নেবো। পাকিস্তানীরা এখানে আর কিছুই করতে পারবে
না।" আমি ধরে নিলাম, যেসব যুবা অফিসার আছে, আমি নিজেও তখন যুবক - তাদের কোন
পিছটান নেই ও পরিবার পরিজনের ঝামেলা নেই, তারা সকলেই এই পরিকল্পনা সহজেই
অংশগ্রহণ করতে পারবে। কিন্তু যারা বিবাহিত অফিসার ছিলো তারা অতটা ঝুঁকি নিতে
নাও পারে। সেজন্য ৮ বেঙ্গলের কিছু যুবা অফিসারকে নিয়ে আমি চট্টগ্রাম
বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম। সেখান থেকে লাইব্রেরিয়ান আলম সাহেবের বাসায় গিয়ে তাদের
নিয়ে আমি একটা গোপন বৈঠক করি। তাদেরকে বুঝিয়ে দিলাম যে কী কী ঘটতে যাচ্ছে, কী
হতে পারে এবং আমাদের কী করা উচিত। তারাও দেখলাম আমার সাথে মোটামুটি একমত যে
এরকম খারাপ কিছু হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তখন আমি তাদেরকে বললাম যে আমি শহর দখলে
নেবো, কীভাবে নেবো তা বিস্তারিত জানার প্রয়োজন নেই। তোমাদের কাজ হলো
ক্যান্টনমেন্ট দখল করতে সৈন্যদের নিয়ে যাওয়া। সীমান্ত থেকে যখন আমার সৈন্যরা
আসবে তখন আমরা সম্মিলিতভাবে চট্টগ্রাম নৌ ও বিমানবন্দর দখল করবো। তারা সবাই
একমত হলো।
এরমধ্যে ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। নানা ধরনের গুজব
ছড়াচ্ছে বাইরে - আলোচনা সফলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম
এগুলো কিছুই হবে না ইয়াহিয়া খান সময় নিচ্ছে তার সৈন্য সংখ্যা বাড়ানোর জন্য।
যখন প্রয়োজনীয় সংখ্যক সৈন্য এখানে এসে যাবে তখন তিনি গণহত্যা শুরু করবেন। এ
ব্যাপারে আমার মনে কোন সন্দেহ ছিলো না।
২৪ মার্চ আসলো। চট্টগ্রামে একজন মার্শাল
এ্যাডমিনিস্ট্রেটর ছিলেন বাঙালি ব্রিগেডিয়ার - মজুমদার সাহেব। তাকে কৌশলে
ঢাকায় সরিয়ে নেয়া হয়। সেখানে একজন অবাঙালি ব্রিগেডিয়ার আনসারিকে দায়িত্ব দেয়া
হয়। তিনি দায়িত্ব নিয়েই বললেন সোয়াত জাহাজে যে গোলাবারুদ আছে এগুলো যে কোন
মূল্যেই খালাশ করতে হবে। এ ঘটনার পর যে সব বাঙালি অফিসার সোয়াত জাহাজ থেকে
অস্ত্র খালাশ করতে বাধা দেয় তাদের লাইন বেধে গুলি করে মারে এবং লাশগুলো নিয়ে
গভীর সমুদ্রে ফেলে আসে। ২৪ মার্চ যখন এই ঘটনা ঘটে তখন বন্দর এলাকা থেকে
প্রচন্ড গোলাগুলির আওয়াজ শোনা যায়। নির্বিচারে বাঙালিদের ওপর গুলি করা হয়।
আমি রেলওয়ে এলাকার থেকে এইসব শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। এই মুহূর্তে আমি ভাবলাম
যে ওরা আজকে রাতেই হয়তো আক্রমণ শুরু করবে, তাই আমাকে আগেই আক্রমণ শুরু করতে
হবে। আমার দুটো কোড ওয়ার্ড ছিলো - 'এরেঞ্জ সাম উড'
এবং 'ব্রিঙ সাম উড'।
ইংরেজিতেই ছিলো কোড ওয়ার্ড গুলো। আমি পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু
করলাম এবং সীমান্ত ফাড়িগুলোতে গোপন সাংকেতিক বার্তার মাধ্যমে নির্দেশ পাঠিয়ে
দিলাম তখন সীমান্তে আমাদের বাঙালি সৈন্যরা কোড ওয়ার্ড পেয়ে পশ্চিমাদের আক্রমণ
করে মেরে ফেলতে শুরু করে। আগে থেকেই ঠিক করা ছিলো যে রেলের পাহাড়ই হবে আমার
হেডকোয়ার্টার। আমি সেখানে অপেক্ষা করছিলাম সীমান্ত ফাড়িগুলো থেকে খবরের জন্য
যে তারা আমার নির্দেশ মতো কাজ করেছে কিনা। একটা ম্যাসেজ যাওয়ার পর এক ঘন্টার
একটা গ্যাপ টাইম থাকে। তখন জিয়া সাহেব ও চৌধুরী আসলেন এবং আমাকে খবরটা দিলেন।
যখন এটা হয়ে গেলো তখন আমি বন্ধ করে পরেরদিন ২৫ মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে
লাগলাম। আমি খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম কারণ পশ্চিমারা যদি জেনে যায় যে
সীমান্তে কী ঘটে গেছে - যে তাদের সৈন্যদের মেরে ফেলা হয়েছে - তাহলে তারা
আমাকে কোর্ট মার্শাল করবে এবং ফায়ারিং স্কোয়াডে পাঠাবে। কাজেই আমার কাছে সময়
অত্যন্ত মূল্যবান ছিলো এবং আমি জানতাম ২৫ তারিখ রাতের মধ্যে যদি আমি ব্যবস্থা
না নিয়ে চুপচাপ বসে থাকি তাহলে তারা আমাকে মেরে দেবে। আমি সময়ের অপেক্ষায়
ছিলাম যে ২৫ তারিখ রাতের মধ্যে আমাকে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমার যে আওয়ামী লীগ
নেতাদের সাথে যোগাযোগ ছিলো - ড. জাফর ও কায়সার, তারা বিকাল বেলা আসলেন। আমি
জিজ্ঞেস করলাম, "ঢাকা থেকে কোন খবর পেয়েছেন কিনা।" তারা বললেন,
"না, পাইনি।"
আমি খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম যে তারা সীমান্তের খবরটা পেয়ে যাবে, তার আগেই
আমাকে আঘাত করতে হবে। রাত সাড়ে আটটার দিকে আমার একজন বন্ধু ক্যাপ্টেন বাঙালি
মুসলমান, ও আমার সাথে খাচ্ছিল। এমন সময় ড. জাফর ও কায়সার দৌড়ে ঢুকলেন আমার
বাসার মধ্যে। আমি তাদের ঢোকার অবস্থা দেখে বুঝে ফেললাম যে কিছু একটা ঘটে
গেছে। তারা আমাকে জানালেন যে তারা ৭.০০টার দিকে ঢাকা থেকে খবর পেয়েছেন আলোচনা
ব্যর্থ এবং ইয়াহহিয়া ঢাকা ছেড়ে চলে গেছে। এই খবর পেয়ে তারা আওয়ামী লীগের একটা
জরুরি সভায় বসে - এম আর সিদ্দিকী সহ, তিনি ছিলেন তৎকালীন ওই এলাকার আওয়ামী
লীগ সভাপতি। তারা বুঝতে পারছিলেন না কী করবেন। আমার সাথে আওয়ামী লীগের যোগযোগ
মার্চের ৩ তারিখ থেকেই যেহেতু ছিলো তারা বললেন আগে থেকেই ইপিআরের ক্যাপ্টেন
রফিক সাহেবের যোগাযোগ আমাদের আছে এবং তিনি কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন, তিনি
ভালো জানেন যে মিলিটারী ব্যবস্থা কি করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ তখনও জানে না
যে মিলিটারী ক্র্যাকডাউন হলে কি ব্যবস্থা নিতে হবে। আমি তাদের বলেছিলাম যে
আমি প্রস্তুতি নিচ্ছি এবং বঙ্গবন্ধুকে চট্টগ্রামে নেয়ার জন্যও বলেছিলাম।
গোপনে আমি ইপিআরের কিছু অস্ত্রও আওয়ামী লীগের হাতে তুলে দিয়েছিলাম যেন যুদ্ধ
শুরু হলো তারা সেগুলো ব্যবহার করতে পারে। কাজেই সেই মুহূর্তে তারা দু’জন যখন
আমাকে ওই খবরটা দিলেন আমি তখন ভাত খাওয়া শুরু করেছি - খাওয়াটা বন্ধ করে ১৫-২০
সেকেন্ড চিন্তা করলাম, আমার সামনে দুটো রাস্তা - কিছু না করা বা প্রতিরোধ
করা। কিছু না করলে আমি ধ্বংস হয়ে যাবো কারণ সীমান্ত থেকে খবর কালকের মধ্যে
এসেই যাবে। এখন যেহেতু এই সংবাদ এসেছে এবং আমি একটা মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা
করছিলাম যে উপযুক্ত মুহূর্ত আসলেই আমাকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে যখন জনগণ
আমার সাথে থাকবে। কাজেই আমি তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম যুদ্ধ করবো। আমি তাদের
বললাম, "আপনাদের কথার পরিপ্রেক্ষিতে আমি পুরোপুরি যুদ্ধ শুরু করে দিচ্ছি এবং
আপনারা জানেন রেলের পাহাড়ই হবে আমার হেডকোয়ার্টার। আপনারা গিয়ে ইস্ট বেঙ্গল
রেজিমেন্টের সৈন্যদের সাথে কথা বলেন।" তারা সেখানে গিয়ে তাকে পাননি। তার
সিনিয়র অফিসার কর্ণেল জানজুয়া সাহেব তখন তাকে সোয়াত জাহাজে পাঠিয়েছে তাই তারা
তাকে পাননি।
পরিকল্পনা অনুযায়ী আমি প্রথমেই গেলাম ওয়্যারলেস কলোনিতে। ওখানে একটা প্লাটুন
ছিলো। তার চার্জে ছিলো একজন অবাঙালি ক্যাপ্টেন হায়াত। আমি জানতাম এদের যদি
আমি নিউট্রালাইজ না করি তারা আমার জন্য যথেষ্ট সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। আমি
তাকে নিউট্রালাইজ করি। আমি অফিসারদের নির্দেশ দিলাম, বাঙালি সৈন্যদের
প্রস্তুত করে তাদের অস্ত্র দাও, আর কোন পশ্চিমা অফিসার যেন বেরোতে না পারে।
ওই প্লাটুনটাকে নিয়ে বের হলাম। আরেকটা প্লাটুন ছিলো পাহাড়তলী রেলওয়ে স্কুলে
তাদেরকে শহরে পাঠালাম যুদ্ধ করতে। আগেই বলা ছিলো কে কোথায় অবস্থান নেবে। আমি
চলে আসলাম হালি শহরে। সৈন্যরা চট্টগ্রামে বিভিন্ন ভবনে নিজ নিজ অবস্থানে চলে
গেলো। সব রাস্তায় তাদের অবস্থান হয়ে গেলো। ২৫ তারিখ রাত্রে আমরা মোটামুটি
অবস্থান নিয়ে নিলাম।
যখন থেকে আমার ভেতর চেতনার উন্মেষ হয়েছে তখন থেকেই আমি ভাবতাম - ওরা অন্য
ভাষায় কথা বলে, ওদের সাথে আমাদের কোনদিকে মিল নেই এবং ওরা আমাদেরকে নিচু মনে
করে তাই আমরা কেন ওদের সাথে থাকবো। দেশকে স্বাধীন করার একটা প্রচন্ড আবেগ
আমার মধ্যে ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাটা একটা আত্মঘাতি আবেগ। তারা আমাদের
শোষণ করেছে - ইংরেজ চলে গেছে কিন্তু পাকিস্তানীরা ইংরেজের অবস্থানে চলে গেছে।
আমরা কেন অন্যের কথামতো চলবো। এদেশের ভাগ্য এদেশের মানুষ গড়বে। এই যে চেতনা
ওই বয়সে আমার মধ্যে ছিলো। এই সব কিছু মিলিয়ে একটা আবেগ আমার মধ্যে কাজ
করেছিলো। মৃত্যুকে আমি কখনোই ভয় করি না। দেশ স্বাধীন করতে হবে - এটা সবসময়ই
আমার মধ্যে কাজ করেছে।
সংলাপ ঃ ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে রেসকোর্সে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণকে
আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
রফিকুল ইসলাম ঃ মুক্তিযুদ্ধ বা কোন সশস্ত্র যুদ্ধ শুধুমাত্র সামরিক বাহিনীর
যুদ্ধ নয় বরং জনগণের যুদ্ধ। জনগণের অংশগ্রহণ ব্যতিত কোনো স্বাধীনতা সংগ্রাম
হতে পারে না, মুক্তি সশস্ত্র চূড়ান্ত বিজয় অর্জন সম্ভব হয় না। জনগণই
স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল চালিকা শক্তি জনগণ যদি মুক্তিযুদ্ধ না চায়, সেখানে
যুদ্ধ করে সফল হওয়া যাবে না। জনগণ যদি স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য যে কোন মূল্য
দিতে প্রস্তুত থাকে তাহলেই মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি হয়। কাজেই আমি যখন
যুদ্ধের পরিকল্পনা করি তখন আমার মূল শক্তি কী - এটা শুধু একটা বন্দুক আর গুলি
নয়, সেই শক্তি হলো জনগণ। এই জনগণকে পেতে হলে আমার রাজনৈতিক সমর্থন দরকার।
কারণ জনগণের সাথে আমাদের যোগসূত্র হচ্ছে রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের মাধ্যমে। সে
কারণেই আমি আওয়ামী লীগের সাথে যোগাযোগ করেছিলাম। জনগণের নেতা তখন ছিলেন
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বিজয়ী আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠদের নেতা।
কাজেই ৭ মার্চ তিনি যখন বললেন, "এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।" সেখানে এটা একটা সুস্পষ্ট বার্তা যে এই
সংগ্রাম স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রাম। সেটা থেকে আমার বা যে কোন সামরিক
অফিসারের জন্য সুবিধা হলো যে আমরা যদি এখন বিদ্রোহ করি এটাকে শুধুমাত্র
সামরিক ক্যু বলা যাবে না বরং মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে আমরা আখ্যায়িত করতে পারবো।
কাজেই আমরা রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্যে একটা সশস্ত্র যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে পারবো।
এটার একটা রাজনৈতিক বৈধতা থাকবে এবং জনগণের সমর্থন থাকবে। ওই দৃষ্টিকোণ থেকে
৭ মার্চ ভাষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দল ও জনগণের জাতিকে তিনি এই বার্তা
দিলেন। যারা মুক্তিযুদ্ধের জন্য অস্ত্র ধরবো, আমরা একটা শক্তি পেলাম, একটা
নতুন ধরনের চেতনা পেলাম এবং আমরা জানলাম আমরা যদি যুদ্ধ করি এর পিছনে একটা
রাজনৈতিক সমর্থন রয়েছে।
সংলাপ ঃ "এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার
সংগ্রাম" - বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার এই অংশটি সুস্পষ্টভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার
শামিল ছিলো কিনা?
রফিকুল ইসলাম ঃ স্বাধীনতা ঘোষণা একটা ভিন্ন জিনিস। সেখানে সরাসরি বলতে হবে,
"স্বাধীনতা ঘোষণা করা হলো।" সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হয়তো ওই সময় সম্ভব
ছিলো না। কিন্তু তিনি বলে গেছেন কি করতে হবে। তিনি কৌশলগত কারণে করেছিলেন না
কেন করেছিলেন তা তিনি জীতি থাকলে বলতে পারতেন। আমার পক্ষে বলা সম্ভব না। কারণ
তখন আলোচনা চলছে। কিন্তু তার ওই ভাষণে আমরা বুঝলাম যে জনগণ সম্পৃক্ত হয়ে গেছে
এবং জনগণ স্বাধীনতা চায়। আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। তিনি এটাও বললেন যে,
"আমি যদি আর হুকুম দেবার নাও পারি।" এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে
"শত্রুর
মোকাবেলা করতে হবে।" এরপরে আমি মনে করি নতুন করে আর স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়ার
মানে নেই। কারণ তিনি বলেই দিলেন তার হুকুমের অপেক্ষা না করতে। আমরা এইটুকু
বৈধতা পেলাম যে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবো যখন সময় আসবে। ওই
লাইনটা যুদ্ধ শুরু করার একটা বৈধতা।
সংলাপ ঃ ১ মার্চ গণপরিষদ অধিবেশন স্থগিত করার মধ্য দিয়ে সমগ্র পূর্ববাংলায়
বিদ্রোহের যে দাবানল প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠে ৭ মার্চের বক্তৃতা এবং এর আগে-পরে
বঙ্গবন্ধুর দিক নির্দেশনায় পরিচালিত হয়েছিলো গোটা বাংলা। নিজস্ব অভিজ্ঞতার
আলোকে এ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি?
রফিকুল ইসলাম ঃ এটা ঠিক যে তার নির্দেশ ছাড়া কোন কিছু চলেনি - কোর্ট-কাচারি,
সরকারী- বেসরকারী অফিস। তিনি যেভাবে বলেছেন ঠিক সেভাবেই হয়েছে। জাতির এরকম
চরম এক সন্ধিক্ষণে একজন ব্যক্তির হুকুমে পুরো জাতি চলেছে ইতিহাসে এ ধরনের
নজির খুব কম। একমাত্র গর্ভমেন্ট হাউস ও ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া কোথাও পাকিস্তানী
নিয়ন্ত্রণ ছিলো না।
সংলাপ ঃ ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসে সেনানিবাস আর গভর্নর হাউস
ছাড়া সারা বাংলায় আর কোথাও পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা ওড়েনি। ২৩ মার্চ সারা
দেশে ঘরে ঘরে উড্ডীয়মান স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা বঙ্গবন্ধু সেদিন তার
বাসভবনেও আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করেন এবং এর মধ্য দিয়েই কার্যত কবর রচিত হয়
পূর্ব-পাকিস্তানের। মন্তব্য করুন।
রফিকুল ইসলাম ঃ এটা ২৩ মার্চও বলতে পারেন আবার ৭ মার্চও বলতে পারেন। আমি তো
মনে করি কবর রচনা হয়েছে ১ মার্চ। কারণ ওইদিন পুরো বাংলাদেশ বিদ্রোহ করে
ফেলেছে। ওইদিনই পাকিস্তানের কবর হয়ে গেছে।
সংলাপ ঃ আপনার জানা মতে ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস ঘোষণার ভিত্তি কি?
রফিকুল ইসলাম ঃ এটা আমাদের সংবিধানে এসে গেছে। তারপর মুজিবনগর সরকার তার
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলেছে - "যেহেতু বঙ্গবন্ধু ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা
করেছেন।" এই 'যেহেতু' শব্দটাই গুরুত্বপূর্ণ। এখন আর বিতর্ক করে কোন লাভ নেই।
ঐতিহাসিকগণ কখনো তোলেননি। তবে ভবিষ্যত প্রজন্ম একথা তুলবে। আমি এ মুহূর্তে
এটা নিয়ে কোন বিতর্কে যেতে চাচ্ছি না কারণ বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত।
সংলাপ ঃ সেসময় ইপিআরের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে কোন ম্যাসেজ পাঠানোর ব্যবস্থা
ছিলো কি না?
রফিকুল ইসলাম ঃ পুরো ঢাকা ইপিআর পাকিস্তানীদের দখলে ছিলো। তাই ইপিআরের
ওয়্যারলেস দিয়ে পাঠানো সম্ভব ছিলো না। বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকা অবস্থায়ও এ ধরনের
কোন বলেননি। যারা এগুলো বলছেন আমি মনে করি, তারা তার প্রতিও অন্যায় করছেন।
আর ইপিআরের মাধ্যমে জহুর আহমেদ চৌধুরীর কাছে বার্তা পৌঁছে ছিল কি না আমি বলতে
পারবো না। কারণ, হান্নান সাহেব, সিদ্দিকী সাহেব ও জহুর সাহেব সহ ভারতীয় শচীন
বাবুর সাথে আমরা একটা বৈঠকে বসেছিলাম। সেখানে শচীন বাবু তাদের প্রশ্ন করেন যে
বঙ্গবন্ধু কোন নির্দেশ দিয়ে গেছেন কি না। তারা বললেন যে তারা কোন নির্দেশ
পাননি।
সংলাপ ঃ ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণার কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ
নেই এবং ঘটনার গতিধারাতে স্পষ্ট যে ৭ মার্চের বক্তৃতায় ও তৎপরবর্তী ঘটনাবলীর
পর নতুন করে এরূপ কোনো ঘোষণা প্রদানের প্রয়োজনও ছিলো না - যুক্তিও দেখা যায়
না। আপনার অভিমত কি?
রফিকুল ইসলাম ঃ ‘প্রমাণ নেই’ এ ব্যাপারে আমার কোন মন্তব্য নেই কারণ আমি জানি
না। তিনি তো ৭ মার্চ বলেই দিয়েছিলেন, ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি’ -
তোমাদের যা আছে তাই নিয়ে যুদ্ধ শুরু করো। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে গ্রেপ্তার
হতে পারেন বা তাকে হত্যা করা হতে পারে। তাই বলে গিয়েছিলেন প্রস্তুত থাকতে
যাতে সময় থাকতে যুদ্ধ করে শত্রুকে পরাজিত করা যায়। এরপরে তিনি যদি ঘোষণা দিতে
পারেন ভালো কথা, না দিলেও কোন অসুবিধা নেই। কারণ তিনি বলে গেছেন, আমি বিষয়টা
ওই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখছি।
সংলাপ ঃ ২৭ মার্চ মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ-কে ঠেকাতে গিয়ে ২৬
মার্চ বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বস্তুতঃ
বঙ্গবন্ধুকে হেয় করার সামিল এবং মিথ্যাচারে ভরপুর। মন্তব্য করুন।
রফিকুল ইসলাম ঃ ২৫ তারিখ মধ্য রাতের পর রেডিওতে কিছু ঘোষণা করার জন্য প্রথমেই
আমার কাছে আসে কারণ আমি শহরের মধ্যে যুদ্ধ করছিলাম। জিয়াউর রহমান সাহেব শহর
ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন কর্ণফূলি নদীর ওইপারে কটিয়ায়। ২৫ মার্চ রাত ২টার সময়
খন্দকার নামে একজন ভদ্রলোক (আমি পরে নাম জেনেছি), খুব লম্বা প্রায় ৬ ফিটের
মতো, সম্ভবত তিনি ক্যানাডিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনে কাজ করতেন। ছুটিতে বা
কোন কারণে পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন। আমি তখন রেলের হেডকোয়ার্টারে ছিলাম।
সেখানে তিনি কয়েকজনকে সাথে নিয়ে আসলেন। সাথে আওয়ামী লীগের নেতারা ছিলেন। তিনি
জানতেন যে আমি কে। তিনি বললেন, "রফিক সাহেব আপনি যুদ্ধ করছেন, রেডিও ষ্টেশনে
গিয়ে একটা ঘোষণা দেন যে আপনারা যুদ্ধ করছেন।" এটা একটা ভালো প্রস্তাব ছিলো।
তারপর বললেন, "আপনি আমার সাথে কক্সবাজার পর্যন্ত আসেন। সেখানে একটি বিশেষ
দেশের হেলিকপ্টার এসে আপনাকে নিয়ে যাবে একটা এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ারে সেখানে
আপনার সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা হবে।" আমি তখন ইপিআরের একমাত্র বাঙালি অফিসার
যে সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণ করছে, আর কোন অফিসার নেই। সমস্ত সৈনিক আমার দিকে চেয়ে
আছে - আমি কি বলি ও কি করি। প্রায় ১৩০০ সৈন্য। আমি ওই অবস্থান ছেড়ে যদি রেডিও
ষ্টেশনে যাই, যেটা শহরের বাইরে প্রায় চার মাইল দূরে, অত্যন্ত নিরাপদ একটা
এলাকা, কালুর ঘাট রেডিও ষ্টেশন। সৈন্যরা হয়তো ভাববে স্যার শহর ছেড়ে চলে গেছে।
তারা তখন নিজেদের অবস্থান ছেড়ে চলে যাবে। আর আমি যদি কক্সবাজার চলে যাই তাহলে
পুরো দলটাই ঘুরে কক্সবাজার চলে যাবে। স্বাভাবিক, কারণ তারা ভাববে আমরা একলা
কেন এখানে থাকবো। আমি বললাম, "দেখেন, আমি যতক্ষণ এখানে আছি, সৈন্যরা ততক্ষণ
এখানে থাকবে। আমি এখান থেকে সরা মাত্র সব সৈন্য সরে যাবে। তারা থাকতে চাইবে
না এখানে। আমার পক্ষে যুদ্ধের হেডকোয়ার্টার ছেড়ে যাওয়া সম্ভব না।" তখনও
আমাদের ওপর আক্রমণ হচ্ছিলো। "এই অবস্থায় আমার এই অবস্থান ছেড়ে যাওয়া সঠিক হবে
না।" এটা নিয়ম না, পৃথিবীর কোন স্থানে এমন নজির দেখা যায়নি যে যুদ্ধের মাঠ
রেডিও ষ্টেশনে বক্তৃতা দিতে যায়। আর শুধু রেডিও ষ্টেশনে বক্তৃতা দিয়ে কোন
দেশে কেউ কখনও জয়ী হয়নি। জয় হতে হবে যুদ্ধের মাঠে। আমি তাকে বললাম,
"আমি যেতে
পারবো না। আপনি এক কাজ করেন, আপনি একটা টেপ রেকর্ডার নিয়ে আসেন, আমি সেখানে
আমার বক্তব্যটা টেপ করে দেবো, সেটাই আপনারা নিয়ে গিয়ে সমপ্রচার করতে পারবেন।"
তিনি আমার প্রস্তাব মেনে নিলেন এবং বললেন যে তিনি টেপ রেকর্ডার নিয়ে আসবেন।
সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তিনি যখন ফিরে রেলওয়ে হেডকোয়ার্টারের দিকে ফিরবেন এমন
সময় আমাদের পাহাড়ে পাকিস্তানী সেনাদের শেলিং শুরু হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পরে
হেলিকপ্টার ওড়া শুরু হলো। এখন এই অবস্থাতে তিনি আমার কাছে আর আসতে পারলেন না।
পরে তিনি আমার সাথে ফোনে যোগাযোগ করলেন। আমি তাকে বললাম,
"আপনি এক কাজ করেন,
আমাদের বেশ কিছু সৈন্য শহর ছেড়ে কটিয়ার দিকে গেছেন, আপনি ওই দিকে যান, গিয়ে
বাঙালি যে কোন অফিসারকেই পান তাকে নিয়ে রেডিও ষ্টেশনে যান। সে শুধু এটুকু
ঘোষণা দিবে যে, সেনাবাহিনী এবং ইপিআরের বাঙালি সৈন্য ও অফিসার আছেন তারা
জনগণের সাথে মিলে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার
পক্ষে।" এইটুকু ঘোষণা দিতে বলেছি। তিনি তখন আওয়ামী লীগ ও ছাত্র লীগের কিছু
নেতাকে নিয়ে কালুর ষ্টেশন পার হয়ে গিয়ে পেলেন কিছু বাঙালি সৈন্য ও জিয়াউর
রহমান সাহেব ও শওকত সাহেবকে পেলেন। এটা হলো ২৭ তারিখ সকাল বেলায়। ২৬ তারিখ
তিনি সেখানে যেতে পারেননি। এরপর জিয়াউর রহমান সাহেব নদী পার হয়ে কালুরঘাট এসে
একটা ড্রাফট তৈরি করে সেটা পাঠ করেন সন্ধ্যার দিকে। সেখানে তিনি বঙ্গবন্ধুর
কথা বলেননি। তিনি নিজেকে হেড অব দ্যা স্টেট ঘোষণা করেছিলেন। আমি তখন যুদ্ধ
করছি কাজেই রেডিও শোনার কোনো অবকাশ নেই। রাত ৮টার দিকে এ কে খান সাহেব আমাকে
ফোন করলেন। বললেন, "হু ইস দিস মেজর জিয়া?" যুদ্ধের ওই অবস্থাতে অর্থাৎ আপনার
পাশে আপনার সৈন্য আহত অবস্থায় পড়ে আছে - কারো হাত নেই, কারো পা নেই। তখন
মানসিক অবস্থা কীরকম হতে পারে। যাই হোক, আমি তাকে বললাম,
"কেন, কী হয়েছে?
তাড়াতাড়ি বলুন আমার হাতে সময় নেই। আমার উপর আক্রমণ হচ্ছে।" তিনি বললেন,
"উনি
তো নিজেকে হেড অব দ্যা স্টেট ডিক্ল্যায়ার করেছেন। তাহলে তো এটা আপনাদের একটা
মিউটিনি।" আমি দেখলাম পরিস্থিতি খারাপ, এটা জনগণের যুদ্ধ, জনগণ যদি সরে যায়
তাহলে তো আমরা হেরে যাবো। আমি তাকে বললাম, "আপনি এক কাজ করেন, ওনার সাথে আমার
আগেই আলোচনা হয়েছে, তিনি আমাদের সাথেই থাকবেন বলেছেন। তা তিনি যদি এই ধরনের
বক্তব্য দিয়েই থাকেন হয়তো উত্তেজনার কারণে সঠিকভাবে বলতে পারেননি। তার কি বলা
দরকার সেটা আপনারা খসড়া করে তার কাছে পাঠান তাহলে তিনি তাই বলবেন।" তখন
নেতৃবৃন্দ আবার খান সাহেবের বাসায় বৈঠকে বসলেন। বসে তারা একটা খসড়া তৈরি
করেন। তারপর সেটা জিয়াউর রহমানের কাছে নিয়ে যান। সেই খসড়া ছোটখাটো দুটো
সংশোধনী করে জিয়াউর রহমান ২৮ তারিখ সকালে ওটা পাঠ করেন।
আর হান্নান সাহেব ঘোষণা দিয়েছিলেন ২৬ তারিখ দুপুর ২টার দিকে। হান্নান সাহেবের
সাথে আমার ফোনেই কথা হয়। আমি তাকে বলি, "আপনি গিয়ে বলেন যে আমরা যুদ্ধ করছি।"
যেহেতু ওই ভদ্রলোক আমাকে আইডিয়াটা দিলো তাই আমি তাকে বললাম বলতে। প্রথমে আমার
মাথায় এটা ঢোকেনি যুদ্ধের ওই অবস্থাতে। তাই তাদের একজনকে বলতে বললাম। তারপর
ভাবলাম সেনাবাহিনীর একজনের বলা দরকার। তাই তারপর তিনি যখন টেপ রেকর্ডার আনতে
ব্যর্থ হলেন আমি তাকে বললাম যাকেই পান যে কোন বাঙালি অফিসার, তাকে দিয়েই
বলান। আমি কারো নাম উল্লেখ করি বলিনি।
সংলাপ ঃ এই সকল বিষয়গুলোর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলতে চাচ্ছি যে ৭ মার্চকে
স্বাধীনতা দিবস ঘোষণা করা হোক - এ বিষয়ের সাথে আপনি কি একমত।
রফিকুল ইসলাম ঃ এটাতে অনেকগুলো অসুবিধা আছে। যদি ৭ মার্চকে স্বাধীনতা দিবস
ধরা হয় তাহলে ৭ থেকে ২৫ মার্চ কেন তাদের সাথে আলোচনা চালানো হলো। এটা একটা
বিশাল প্রশ্ন। এর মধ্যে ইয়াহিয়াকে আমাদের রাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট হিসেবে
বিবেচনা করা হলো। যদি স্বাধীনতাই ঘোষণা করা হলো তাহলে এসবের মধ্যে আবার কেন
যাওয়া হলো। এখানে আইনগত অনেক প্যাঁচ ছিলো। আসলে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি।
তিনি বলেছেন, স্বাধীনতার সংগ্রাম - শুরু, মুক্তির সংগ্রাম - শুরু। তিনি
বলেননি, "আমি স্বাধীনতা ঘোষণা করলাম।" তিনি বলেননি,
"এখন থেকে বাংলাদেশ
স্বাধীন।" কাজেই এটা করা যাবে না। যদি বলা ২৬শে মার্চের আইনগত ভিত কী, তাহলে
বলতে হবে যে যখন একটা প্রবাসী সরকার গঠন করা মুজিবনগরে তখন এই সরকারের ঘোষণার
মধ্যেই ছিলো - যেহেতু জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা
দিয়ে গেছেন - সত্য-মিথ্যা আমার কাছে ব্যাপার না কারণ এটা তাদের ঘোষণায় এসে
গেছে। ভবিষ্যতে এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হতে পারে। কিন্তু আমরা এটার ব্যাপারে
প্রশ্ন তুললে এটার সমাধান হবে না। আমি মনে ১৬ ডিসেম্বরকে আমরা স্বাধীনতা দিবস
ধরতে পারি কারণ ওইদিনই আমরা সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হয়েছি - বিজয় পেয়েছি। যদি
১৬ ডিসেম্বর না আসে তাহলে তো বাংলাদেশই আসে না। এগুলো নিয়ে আলোচনা করে
সমাধানে আসা আমার মনে হয় আমাদের জীবিত অবস্থায় হবে। যেটা স্বীকৃতি পেয়েছে
সেটা নিয়েই চলতে হবে, এটার কোন বিকল্প নেই। সময় এর সিদ্ধান্ত দেবে।
------------------