|
|
গুরুর
প্রয়োজনীয়তা
(৩)
শাহ্ সূফী ড. এমদাদুল হক
॥
(পূর্ব
প্রকাশের পর)
আল্লাহ আদেশ করছেন - আল্লাহর অনুগত হও,
রসুলের অনুগত হও এবং কর্তৃত্বের (অর্থাৎ হুকুম দেবার এবং তা তামিল করাবার
ক্ষমতা বা অধিকার যার আছে) তার অনুগত হও।
(সুরা
নিসা : ৫৯)।
গুরু
মোহাম্মদ (সা) -এঁর শিষ্যদেরকে সাহাবী বলা হয়।
সাহাবাগণের শিষ্যদের বলা হয় তাবেঈন।
তাবেঈনদের শিষ্যগণ তাবে-তাবেঈন।
এইভাবে সৃষ্টি হয়েছে গুরু-শিষ্যের পরম্পরা,
আমাদের সময় পর্যন্ত।
আল্লাহ বলছেন - ওয়া মাই ইউদলিল ফালান তাজিদা লাহু ওয়ালিয়াম মুর্শিদা
(সুরা
কাহাফ : ১৭)।
অর্থ
- এবং আমি যাকে পথভ্রষ্ট করেছি তার ভাগ্যে কোন ওলি বা মুর্শিদ রাখিনি।
মুর্শিদ
শব্দটির ব্যবহার এ আয়াত থেকেই উদ্ভুত হয়েছে।
কুরআন
মতে যার কোন পথপ্রদর্শক বা মুর্শিদ নেই সে পথভ্রষ্ট অথবা যে পথভ্রষ্ট তার কোন
মুর্শিদ নেই।
গুরুর
প্রতি সমর্পিত ব্যক্তিই মুসলিম।
ইসলাম
এবং মুসলিম এই দুটি শব্দই সলম
ধাতু
থেকে উদ্ভুত।
সলম
অর্থ
- আত্মসমর্পণ।
আল্লাহ বলছেন - হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো আর তোমরা
আত্মসমর্পণকারী না হয়ে মরো না।
(সুরা
আলে ইমরান : ১০২)।
কুরআনিক পরিভাষায় - যিনি আত্মসমর্পণ করেছেন তিনিই মুসলিম।
যার
আত্মসমর্পণ হয়েছে তিনিই ইসলাম অর্থাৎ শান্তি,
সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার জগতে প্রবেশ করেছেন।
কোন
একজন নবীর প্রচারিত আদর্শ মেনে নিয়ে তাঁর কাছে কিংবা তাঁর আদর্শে প্রতিষ্ঠিত
কোন প্রতিনিধির কাছে আত্মসমর্পণ করলে তাকে মুসলিম বা আত্মসমর্পণকারী বলা হয়।
আত্মসমর্পিত না হয়ে কেউ মুসলিম হতে পারে না।
ডাক্তারের ছেলে যেমন উত্তরাধিকার সূত্রে ডাক্তার হয় না,
ইঞ্জিনিয়ারের ছেলে যেমন উত্তরাধিকার সূত্রে ইঞ্জিনিয়ার হয় না ঠিক তেমনি
উত্তরাধিকার সূত্রে কেউ মুসলিম হয় না।
যে
যার কাছে আত্মসমর্পণ করে শান্তিকে নিজের ধর্ম হিসেবে ধারণ করে তিনিই তার
মুর্শিদ।
আল-কুরআন শুরু হয়েছে সুরা ফাতেহা দিয়ে।
সুরা
ফাতেহা ব্যতীত সালাত আদায় করা যায় না।
অবতীর্ণের দিক দিয়েও এটিই প্রথম পূর্নাঙ্গ সুরা
।
এ
জন্যই ফাতেহার নাম - ফাতেহাতুল-কিতাব
বা
কুরআনের উপক্রমনিকা।
সুরাতুল ফাতেহা
সমস্ত
কুরআনের সার সংক্ষেপ।
তাই,
এ
সুরাকে ‘কুরআনে
আযীম
বলেও
অভিহিত করা হয়েছে।
সুরা
ফাতেহার মাধ্যমে প্রতিদিন কমপক্ষে ১৭ বার আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি -
হে আল্লাহ আমাদেরকে সেই পথে পরিচালিত করো যারা তোমার নেয়ামত প্রাপ্ত হয়েছেন।
যারা
ভ্রান্ত পথের অনুসরণে তোমার নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হয়েছে তাদের পথে যেন আমরা না
যাই।
লক্ষণীয় আমাদের প্রার্থনা সেরাতাল্লাজিনা
অর্থাৎ তাঁদের পথ।
তাঁরা
কোন
কিতাব নন,
তাঁরা
-
মানুষ,
নেয়ামতপ্রাপ্ত মানুষ।
সেরাতাল্লাজিনা বলে প্রার্থনা জানিয়ে আমরা গ্রন্থ নয় সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত
হবার জন্য মানুষকে অনুসরণ করার আকুতি জানাই।
কেতাব
হচ্ছে পথনির্দেশিকা বা গাইডবুক।
আর
গাইড হচ্ছেন তাঁরা,
জীবন্ত কুরআন বা পথপ্রদর্শক।
গাইডবুক নিয়ে কেউ দুর্গম পথ পাড়ি দিতে পারে না।
এজন্য
প্রয়োজন জীবন্ত গাইড।
সিরাতাল্লাজিনা
বলে
এই জীবন্ত গাইডের জন্যই আমরা প্রার্থনা করি।
যার এ
প্রার্থনা কবুল হয়নি অর্থাৎ যিনি এখনো কোন পথপ্রদর্শক খুঁজে পাননি তিনি তো পথ
চলাই শুরু করেননি তাঁর পরিত্রাণ আসবে কোন্ পথে?
জীবনে
যিনি গুরুকে খুঁজে পাননি মরণে তিনি কি করে গুরুর গুরুকে খুঁজে পাবেন তা বুঝা
যায় না।
আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথে যাত্রা করা পর্বতারোহণের মতো।
গুরু
ব্যতীত পর্বতারোহণের গাইড বুকে লিখিত রোমাঞ্চকর গল্প পাঠ ও আবৃতি করা যায়
কিন্তু বাস্তবে পর্বতে আরোহণ করা যায় না।
গুরু
নিজে পর্বতের শিখরে আরোহণ করেছেন এবং পর্বতের শিখরে কি আছে তা তিনি জানেন।
পর্বতে আরোহণ করার সহজ ও সরল পথ তার চেনা।
যে
পথে তিনি হেঁটেছেন সে পথে তিনি তার অনুসারীদের দিয়ে পর্বত শিখরের লক্ষ্যে
আরোহণ করেন।
তাঁর
সহযোগিতায় পর্বতারোহণ সহজ এবং তাড়াতাড়ি হয়।
তাই
গুরুকে অবতার বলা হয়।
অর্থাৎ পর্বতের শিখর থেকে যিনি শিষ্যকে হাত ধরে সহজ পথ প্রদর্শন করতে সমতলে
অবতরণ করেন তিনিই গুরু।
পর্বত
আরোহন সহজ ব্যাপার নয়।
পদে
পদে বিপদের আশঙ্কা আছে,
পথপ্রদর্শক না থাকলে পথভ্রষ্ট হবার সম্ভাবনা আছে,
পা
পিছলে গেলে আশঙ্কা আছে জীবন নাশের তাই প্রতিটি মুহূর্তে গুরুর প্রতি অনুগত
থেকে তার নির্দেশিত পথে বিনা বাক্যব্যয়ে পথ চলতে হয়।
গুরুর
প্রদর্শিত পথই সেরাতুল মুসত্মাক্বীম।
আল্লাহ বলছেন,
আল্লাহ আসমান এবং জমিনের নূর বা জ্যোতি
(সুরা
নূর : ৩৫)।
আল্লাহর নূরের তুলনা একটা জ্বলন্ত বাতির মতো।
নিবানো বাতি যখন একটা জ্বলন্ত বাতির সংস্পর্শে আসে তখনই তা জ্যোতি প্রাপ্ত হয়।
সুতরাং আল্লাহর জ্যোতিতে জ্যোতিষ্মান হতে হলে জ্যোর্তিময়ের সংস্পর্শে আসতে হয়।
অন্ধ,
অন্ধের পথপ্রদর্শক হলে দুজনেই গর্তে পতিত হয়।
ভিখারী দান করতে পারে না।
যে
নিজেকে জানে না তার কাছ থেকে নিজেকে জানার পদ্ধতি শেখা যায় না।
যার
কাছে আগুন নেই সে আগুন দিতে পারে না।
একটা
নেবানো বাতির কাছে আর একটা নেবানো বাতি যুগ যুগ বসে থাকলেও আগুন জ্বলবে না।
জ্যোতির সংস্পর্শে না এসে জ্যোতিষ্মান হবার অন্য কোন উপায় নেই।
জ্যোতির সংস্পর্শে না এসে যতই প্রার্থনা করা হোক না কেন নেভানো বাতিতে
আল্লাহর রহমতের আগুন জ্বলবে না।
আল্লাহ সর্বশক্তিমান,
তিনি
সব পারেন কিন্তু কখনো তাঁর বিধির লঙ্ঘন করেন না।
আল্লাহর বিধি হচ্ছে,
আগুনের কাছ থেকে আগুন দিয়ে আগুনময় হতে হবে।
আল্লাহ মোহাম্মদ (সা) সম্পর্কে বলেছেন যে,
তিনি
তাঁকে প্রজ্জ্ব্বলিত প্রদীপরূপে প্রেরণ করেছেন।
সবকিছুর ধ্বংস আছে কিন্তু নূরের কোন ধ্বংস নেই।
যিনি
আল্লাহর গুণে গুনান্বিত,
তাঁর
নূরে প্রজ্জ্বলিত তিনিই মোহাম্মদ।
মোহাম্মদ অর্থাৎ প্রশংসিত কোন অতীত সত্ত্বা নয়,
চির
বর্তমান।
অতীতেও আহমদ থেকে মোহাম্মদে অর্থাৎ প্রশংসাকারী থেকে প্রশংসিত স্তরে মানুষের
উদবর্তন হয়েছে,
এখনো
হচ্ছে ভবিষ্যতেও হবে।
মোহাম্মদ ছিলেন,
আছেন
এবং থাকবেন।
রসুল
(সা) বলেছেন - আউয়ালুনা মোহাম্মদ,
আখেরুনা মোহাম্মদ,
আওসাতুনা মোহাম্মদ,
কুল্লানা মোহাম্মদ।
আমাদের আদিতে,
অনেত্ম এবং মধ্যে রয়েছেন মোহাম্মদ।
নূরী
মোহাম্মদী এক মৃত্যুহীন জ্যোতি।
এ
জ্যোতি একজন থেকে অন্যজনে সঞ্চারিত হয়।
নিজের
মধ্যে আগুন জ্বালাতে হলে তাই সেই জ্যোর্তিময়ের সান্নিধ্যে যেতে হবে।
এই
জ্যোর্তিময় ব্যক্তিত্বই প্রশংসিত মুর্শিদ।
আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন উপমা দিয়ে তাঁর নির্দেশনা কুরআনের মাধ্যমে বিশদ ভাবে
বর্ণনা করেছেন।
অথচ
এসব উপমার তাৎপর্য অন্বেষণ না করে মানুষ অহেতুক তর্ক করে।
মানুষকে সত্য পথের অনুসারী হতে বাধা দেয় তার সংস্কার।
সত্যকে ব্যর্থ করার জন্য সংস্কারের জালে আবদ্ধ মানুষ সতর্ককারীদের উপেক্ষা
করে সীমালঙ্ঘনকারীদের দলভুক্ত হয়।
এভাবে
এদের চিনত্মার জগতে মিথ্যার আবরণ পড়ে এবং ক্রমান্বয়ে এরা অন্ধ ও বধির হয়ে যায়।
তাই
কুরআন স্মরণ করিয়ে দেয় সেই সময়ের কথা যখন মুসা (আ) তাঁর গুরু-কে অনুসরণ
করেছিলেন।
সুরা কাহাফের ৬০ থেকে ৮২ নং আয়াত পর্যন্ত উপমার মাধ্যমে গুরুর প্রয়োজনীয়তা
এবং গুরুকে অনুসরণ করার ক্ষেত্রে শিষ্যের ভ্রান্তিসমূহ গুরুর গুরু মহান
আল্লাহ তায়ালা শিক্ষা দিয়েছেন।
উপমাটি এরকম - একদিন হযরত মুসা (আ) বনি ইসরাঈলের এক সভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন।
জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করলেন,
‘সব
মানুষের মধ্যে অধিক জ্ঞানী কে?’
হযরত মুসা (আ) -এঁর জানা মতে তাঁর চেয়ে অধিক জ্ঞানী আর কেউ ছিলেন না।
(চলবে)
বাংলা
ভাষায় যুগোপযোগী খোতবা কবে হবে?
সংলাপ
॥
খোতবা
শব্দের বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,
এটা
আরবি ‘খুৎবুন’
শব্দ
হতে উদ্ভুত,
যার
আভিধানিক অর্থ হলো বক্তৃতা।
ইসলামী পরিভাষায় খোতবা বলতে আল্লাহ্র প্রশংসা,
রাসুলের প্রশংসা ও বক্তৃতা বুঝিয়ে থাকে।
খোতবার উদ্দেশ্য আল্লাহ্র জিকির বা স্মরণ এবং বক্তৃতা উপদেশ প্রদান করা।
আর এর
মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের নৈতিক সংশোধন সংস্কার।
খোতবার এসব উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইসলাম কর্তৃক নির্বাচিত ও
নির্ধারিত ক্ষেত্রগুলো পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে,
জুম্মার নামাজের পূর্বে মসজিদে কিংবা ঈদগাহে,
দুই
ঈদের নামাজের পরে,
আরাফাতের ময়দানে হাজীদের উদ্দেশে,
বিবাহ
অনুষ্ঠানে আক্তের সময় এবং জানাজার দোয়া ইত্যাদি কোনো না কোনোভাবে আমাদের
সমাজ ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত।
শুক্রবার দিনটি অন্য সব দিনের তুলনায় শ্রেষ্ঠ,
কারণ
এদিন সারা বিশ্বের সব মসজিদে জুম্মার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
শহর
গ্রামের সব মুসল্লিরা
এ দিন মসজিদে একত্রিত হন।
রাসুল
সা. এর যুগে তিনি নিজেই খোতবা প্রদান করতেন।
রাসুল
সা. খোতবার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মাসলা-মাসায়েল,
নাজিলকৃত অহির বাণী,
দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা,
ব্যবসা-বাণিজ্যের রীতিনীতি,
কৃষি
কাজ,
স্বাস্থ্য,
সামাজিক সমস্যা,
ইবাদত-বন্দেগি,
বিচার
ব্যবস্থাসহ যাবতীয় বিষয়ের সমাধান তুলে ধরতেন।
মুমিন
হতে হলে তার করণীয় ও বর্জনীয় বিভিন্ন বিষয়গুলো কি তা বিশদভাবে আলোচনা করতেন।
আমাদের দেশে খতিবগণ সাধারণতঃ বার চান্দের খোতবার কিতাব সংগ্রহ করে তা দেখে
দেখে আরবি ভাষায় পাঠ করেন।
অথচ
এদেশের মানুষের ভাষা বাংলা।
বেশির
ভাগ মানুষই আরবি ভাষা জানেন না,
তাই
খতিবের দেয়া খোতবা শ্রবণ করেন বটে কিন্তু এ থেকে কোন শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন
না।
ফলে
খোতবার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।
অধিকাংশ খতিবগণই সাধারণত নিজের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে প্রতি শুক্রবারের
জন্য আলাদাভাবে কোন খোতবা তৈরি করেন না।
একজন
খতিব যদি প্রতি সপ্তাহের জন্য নিজে খোতবা তৈরি করেন,
তবে
তার নিয়মিত জ্ঞান চর্চা হয়।
আর
নির্ধারিত খোতবা পাঠে তার চিন্তা গবেষণা উন্মোচিত হয় না।
কুরআন
সর্বকালের সর্বাধুনিক সমস্যার সমাধান গ্রন্থ।
অতএব
কুরআনের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনা করতে পারলে,
আমরা
সব সমস্যার সমাধান খুঁজে পেতাম।
আমাদের দেশের স্বাধীনতা লাভের প্রায় ৪০ বছর পরও মাতৃভাষায় ইসলামী
সাহিত্যচর্চা ও গবেষণার পথ উন্মুক্ত হতে পারেনি।
প্রতি
শুক্রবার জুম্মার দিন খোতবাগুলো যদি গঠনমূলকভাবে তৈরি করে দেয়া যেত,
তবে এ
দেশের অনেক খতিবই যোগ্য,
দক্ষ
ও উপযুক্ত লেখক এবং গবেষক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারতেন।
একটি
সুন্দর উপযুক্ত,
মানসম্মত ও আদর্শ খোতবা তৈরির জন্য কতগুলো নিয়ম পদ্ধতি এবং কলাকৌশল অনুসরণ
করতে হয়।
যার
মাধ্যমে গোটা বিশ্ব,
জাতি
সঠিক দিকনির্দেশনা খুঁজে পাবে।
বর্তমান বিশ্বে যেসব ফেৎনা-ফ্যাসাদ,
যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদি বিষয়ে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন এলাকায় নতুন নতুন
কলহ-কোন্দল বিরাজমান,
যেমন
গণহত্যা,
বর্বরতা,
নির্যাতন,
নিপীড়ন,
হত্যাকান্ড ইত্যাদি নিয়মিত চলছে - এসব কিছুর প্রতিকার কী?
কী
উপায়ে এর থেকে জাতি মুক্তি পেতে পারে।
এ
সম্পর্কেও জাতিকে দেয়া যায় দিক নির্দেশনা।
সমাজের সাধারণ মানুষও খতিবের কাছে দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্যই আশা করেন।
আমাদের দেশের খতিবগণ প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন খোতবা তৈরি করে দেশ ও জাতির
চরিত্র গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারেন।
তবে
এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে যে,
একটি
আদর্শ ও মানসম্মত খোতবা যেন বিষয়বস্তুর আলোকে দু’ভাগে
বিভক্ত হয়।
১.
কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খোতবা।
যেমন
১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে
ধরা।
১৯৭১
সালের ২৫ মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ভয়াবহ আক্রমণ।
২৬
ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস,
পহেলা
মহররম হিজরি নববর্ষের তাৎপর্য,
১০
মহররম আশুরা শরিফ,
আখেরি
চাহার শোম্বা,
১২
রবিউল আউয়াল পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সা. ইত্যাদি বিষয়াবলির প্রকৃত ঘটনা ও
তাৎপর্য গুরুত্বসহকারে মুসলমানদের সামনে তুলে ধরা।
২.
কুরআনের আলোকে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করা।
যেমন
ঈমান,
আখলাক,
আদব,
আখেরাত কী?
কুরআনের উপদেশ সংবলিত ঘটনাবলি,
ও
আদেশ-নিষেধ বর্ণনা করা।
ইতিহাস জীবনী : নবী-রাসুল সা.,
সাহাবায়ে কেরাম রা. মুসলিম মনীষীদের জীবনদর্শন আলোচনা করা।
গবেষণামূলক আলোচনা করা,
যেমন
আমাদের মাঝে নিত্যনতুন যেসব আবিষ্কার ও পরিভাষা সৃষ্টি হচ্ছে তা আলোচনা করা।
সর্বশেষ আগামী দিনের চরিত্র গঠনমূলক আলোচনা ও ইসলাম ধর্মের দিকনির্দেশনামূলক
খোতবা দেয়া।
অতএব
কোন খতিব যদি এ নিয়মে তার খোতবা সাজাতে পারেন,
তবে
তার খোতবাটি একটি আদর্শ ও মানসম্মত খোতবায় পরিণত হবে।
মুসলমানদের মাঝে খোতবা শুনার আগ্রহ বাড়বে।
তাই
আমাদের মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রতি শুক্রবার নতুন খোতবা প্রস্তুত করে মুসলমানদের
সামনে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা উচিত।
স্মর্তব্য,
১৯৬০
সালে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা প্রথমবারের মতো ইমাম প্রশিক্ষণ প্রবর্তন করেছিল।
সে
সময় খোতবা সংস্কারেরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল এবং তৎকালীন বিশিষ্ট উলামা এবং
বিশেষজ্ঞগণ কর্তৃক বাংলা অনুবাদসহ নতুন খোতবাও রচিত হয়েছিল বলে জানা যায়।
একযোগে তা অনেক মসজিদে পঠিতও হয়েছিল।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য
যে,
নব্বই-এর দশকে বাংলাদেশে খোতবা সংস্কারের প্রথম উদ্যোগ গৃহীত হয়েছিল এবং এ
ব্যাপারে কিছুটা বাস্তব পদক্ষেপও নেয়া হয়েছিল।
প্রসঙ্গতঃ আরো উলেস্নখ্য,
১৯৮৮
সালের ১৪ জানুয়ারী ইকবাল রোডে ইমাম প্রশিক্ষণ প্রকল্প আয়োজিত ১৯৮তম দলের
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইমামদের সনদ বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণদানকালে
তৎকালীন ধর্মমন্ত্রী একটি খোতবা প্রণয়ন কমিটি গঠন করার তথ্য প্রকাশ করেন।
তিনি
বলেন,
দেশে
প্রচলিত পুরাতন খোতবার অংশ বিশেষ পরিবর্তন করে মুসলস্নীদের মধ্যে প্রচার
উপযোগী বলিষ্ঠ ও প্রাঞ্জল ভাষায় মুদ্রিত একটি নতুন খোতবা শীঘ্রই প্রণয়ন করা
হবে।
তৎকালীন ধর্মমন্ত্রী ঘোষিত খোতবা সংস্কার কমিটি কিছুদিন কাজও করেছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পট পরিবর্তনের ফলে সেই খোতবা সংস্কার
কমিটির আর কোনো ভূমিকা পরিলক্ষিত না হলেও স্বাধীন বাংলাদেশে খোতবা সংস্কারের
সেটি ছিল প্রথম পদক্ষেপ।
এরপর
খোতবা সংস্কারের আর কোনো উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে বলে জানা যায় না।
বর্ণিত পটভূমির আলোকে বলা যায় যে,
খোতবা
সংস্কারের মহৎ উদ্দেশে অতীতে যেসব পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছিল তার বিশদ বিবরণ
সরকারী রেকর্ড-পত্রে সংরক্ষিত থাকার কথা।
নতুন
শতকের নতুন পরিস্থিতিতে খোতবা সংস্কারের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনার দাবি
রাখে।
যেহেতু এ সম্পর্কে অতীতে যথেষ্ট কাজ হয়েছে এবং বেশ অগ্রগতিও সাধিত হয়েছিল।
তাই
ধর্ম মন্ত্রণালয় বিষয়টি বিবেচনায় এনে সংরক্ষিত কাগজপত্র/রেকর্ড পত্রের আলোকে
অথবা বিজ্ঞ আলেম সমাজের পরামর্শক্রমে পুনরায় খোতবা সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ
করতে পারে।
পূর্বের গৃহীত উদ্যোগের সাথে যেসব বিজ্ঞ আলেম সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন,
তাদের
মধ্যে এখনও কিছু কিছু ব্যক্তিত্ব জীবিত আছেন,
তাদের
মূল্যবান পরামর্শ খোতবা সংস্কারে বিশেষ উপকারে আসতে পারে।
খোতবার ইসলামি ঐতিহ্য-চরিত্র বজায় রেখে যুগের চাহিদা অনুযায়ী খোতবা সংস্কারের
প্রয়োজন নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।
খোতবাকে কেন্দ্র করে কেউ যেন বিতর্ক সৃষ্টির সুযোগ না নিতে পারে সেদিকেও
সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।
উল্লেখ্য,
আল্লাহর কথা জানতে হলে,
বুঝতে
হলে,
মানতে
হলে সবাইকে নিজ নিজ ভাষায় কুরআন পড়তে হবে।
হিন্দুর ভাষা,
খ্রিস্টানের ভাষা,
কাফেরের ভাষা বলে কোন ভাষাকে অবমাননার সুযোগ আল্লাহ কাউকে দেননি।
রাসুল
সা. বলেছেন যে,
প্রত্যেক মানব শিশুই জন্মগত ভাবে মুসলিম,
অর্থাৎ,
নিষ্পাপ,
ভালো
ও শান্ত।
তাই
মানবশিশু জন্মের পর যে ভাষায় কথা বলে তা-ই মুসলমানদের ভাষা।
আল্লাহ তায়ালা জন্মের পর নিষ্পাপ ও পবিত্র মানব-শিশুর মুখে যে ভাষা ফুটিয়েছেন
সে ভাষাতেই দিয়েছেন ইবাদত ও কিতাব শিক্ষার পূর্ণ অধিকার।
স্বয়ং
আল্লাহ তায়ালা যে অধিকার দিয়েছেন কোন মোল্লা তা ছিনিয়ে নিতে পারে না।
আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে তার সব নবী-রাসুলের কণ্ঠে একমাত্র আরবি ভাষা দেননি
এবং নবী-রাসুলদের মাঝে ভাষাগত ঐক্য সৃষ্টি করেননি।
বিশ্বের সকল মানুষের জন্য আরবি ভাষাই যদি কল্যাণকর হতো তবে আল্লাহ এতো ভাষা
সৃষ্টি করতেন না এবং তাঁর সব কিতাবই আরবি ভাষায় অবতীর্ণ করতেন,
এবং
একমাত্র আরবিকেই ইবাদতের যোগ্য ভাষা হিসেবে নির্ধারণ করতেন।
অনারবি ভাষা আল্লাহর ইবাদতের অযোগ্য হলে বিভিন্ন অনারবি ভাষায় বিভিন্ন কিতাব
অবতীর্ণ করতেন না।
অথচ
আল্লাহ তায়ালা হিব্রু ভাষায় ইনজিল,
ইবরানি ভাষায় তাওরাত ও ইউনানি ভাষায় যাবুর অবতীর্ণ করেছেন।
সুতরাং কেবল আরবিই আল্লাহ তায়ালার ভাষা নয়।
আল্লাহ তায়ালা অন্তর্যামী।
সব
মানুষের ভাষাই তাঁর ভাষা।
আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাব না বুঝে আবৃত্তি করার জন্য অবতীর্ণ করেননি।
যে
মানুষ যে ভাষায় তাঁর কিতাব সহজে বুঝতে পারে সে ভাষাই আল্লাহর কাছে প্রিয় ও
পছন্দনীয়।
আল্লাহর ইবাদতে বান্দার মাতৃভাষার চেয়ে উত্তম কোন ভাষা নেই।
এ
লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে মসজিদের ইমাম-খতিবগণ সমাজের
তৃণমূল থেকে ইসলামের প্রচার-প্রসার,
ইসলামি আদর্শ শিক্ষার বিস্তার,
বাস্তবায়ন,
সামাজিক অপরাধ-কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও ধর্মদ্রোহীদের
অপপ্রচার-বিভ্রান্তির অবসানে কার্যকর ও বাস্তবমুখী বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে
সক্ষম।
রাজনৈতিক ইসলাম ও বিভ্রান্তদের প্রচারণা এবং অপতৎপরতা রোধে তাদের দায়িত্ব
ও কর্তব্য অপরিসীম।
এ
লক্ষ্যে খোতবা সংস্কারের মাধ্যমে ইমামদের যুগ চাহিদা পূরণে প্রস্তুত ও অধিক
যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে।
খোতবা যেন সমাজের অভ্রান্ত দিশারী হিসেবে,
আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে তা নির্ণীত ও নিশ্চিত করতে হবে।
কেননা ইমাম-খতীবরা মুসলিম সমাজের ধর্ম বিশেস্নষক হিসাবে সবার মধ্যে খোতবার
আবেদন সৃষ্টি করতে পারেন।
মাতৃভাষায় কুরআন চর্চা
সংলাপ
॥
আলোচনা-সেমিনার,
পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধ-প্রবন্ধ,
এমনকি
কতক লোকের ক্রিয়াকা- দেখে ভ্রম হওয়া স্বাভাবিক যে,
ইসলাম
মানেই আরবীয় বেশভূষা,
পোশাক-পরিচ্ছদ এবং মুসলিম হলো আরবী ভাষার আবরণে কোনো জীব যাদের কৃষ্টি,
সভ্যতা ও সংস্কৃতি শুধু নয়,
মুখ
নিঃসৃত শব্দও আরবিয় ঢংয়ে উচ্চারিত হবে।
কেননা,
আরবি
ভাষার মাহাত্ম্য এমন যে পড়লে নেকী,
শুনলে
নেকী,
প্রতি
হরফে দশ নেকী।
এ
কারণেই হয়তো বা আরবি উচ্চারণ ও আরবি হরফে বাংলা প্রচলনের কসরৎ কম হয়নি।
উর্দু
ভাষী পাকিস্তানীদের খুশি করতে ওদের নজরানা খেয়ে এ ধরনের উদ্ভট চেষ্টা-তদবির
চলেছে অনেকদিন ধরে।
কারণ,
এ
সমস্ত শিক্ষিতপাপী পরগাছা গোষ্ঠীর প্রভুদের দৃষ্টিতে বাংলা ম্লেচ্ছদের অচ্ছুৎ
ভাষা।
উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করে বাংলার নাম-নিশানা চিরতরে মুছে ফেলার
ষড়যন্ত্রও তাই অভিন্ন উৎস থেকেই।
রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করা,
গান-বাজনা হারাম ঘোষিত হওয়া ভিন্ন চিন্তাধারা প্রসূত নয় আদৌ।
ভাষা
আন্দোলনের দাঁতভাঙ্গা জবাব এদের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ।
বাংলার দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে কুচক্রীদের ষড়যন্ত্রের থাবা ভেঙ্গে
চুরমার করে ফেলে,
যার
সফল পরিণতিই ভাষাভিত্তিক জাতি রাষ্ট্রের বিস্ময়কর অভ্যুদয়।
সারা
পৃথিবীময় এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
উপমহাদেশের মধ্যে বাংলা ভাষাভিত্তিক একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র,
প্রতিবেশি বৃহৎ দেশগুলোর শাসকবর্গের কাছে হুমকিস্বরূপ নিশ্চয়ই।
তা না
হলে এখানে অশান্তির বীজ বপন করার স্বার্থকতা কোথায়! সর্বত্রই চক্রান্ত ও
কূটচালের মরণ ফাঁদ বিছানো।
আমাদের জাতির বিবেক,
গর্ব
এবং জাতীয় অহংকারের প্রতীক - লালন,
রবীন্দ্রনাথ,
নজরুল
প্রমুখ মনীষীদের নিয়ে তেলেসমাতির অন্ত নেই এখনও।
মঙ্গল
প্রদীপ,
তিলক,
ফুলচন্দন,
প্রভাতফেরী,
শহীদ
মিনার,
পুষ্পার্ঘ নিবেদন প্রভৃতি দেশজ কৃষ্টিগুলোকে বিতর্কিত,
কটাক্ষ এবং পরিশেষে হেয় প্রতিপন্ন করার লোকের অভাব নেই।
স্বীয়
রক্ত-মাংস-অস্থিমজ্জার সঙ্গে লেপ্টালেপ্টিভাবে একাকার হয়ে যাওয়া জাতীয়
স্বতন্ত্র অস্তিত্বের প্রতীক কৃষ্টি-সভ্যতা-সংস্কৃতিকে বেদাত অথবা অনৈসলামিক
বা হারাম বলে ফতোয়া প্রদান করা সুস্থ জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেকপ্রসূত ভাবধারা নয়
কোনক্রমেই।
কাবা
ঘরকে বুকে ধারণকারী সৌদি আরবের বিবাহ,
আকিকা,
জন্মোৎসব অনুষ্ঠানে প্রচলিত উলুধ্বনি প্রদান,
বাড়িতে বাড়িতে তুলসী গাছ লাগিয়ে আদর-যত্ন করার দৃশ্য স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করলে
জ্ঞান-বুদ্ধিতে আড়ষ্ট তথাকথিত মোল্লা-মৌলভীদের বন্দি জীবনের করুণ আর্তনাদ
এরূপ নগ্নতায় পর্যবসিত হতে পারতো না নিশ্চিত করে বলা যায়।
নিজের
ভাষা এবং নিজের দেশের আবহাওয়া-জলবায়ু উপযোগী পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে
ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ না করে,
বরং
গ্রহণ করতে উৎসাহী হতো এবং এখনকার মতো এমন পরগাছা-পরজীবী চরিত্র দৃষ্টির
সীমানায় ধরা পড়ে লজ্জায় মুখ ঢাকতে হতো না আমাদেরকেও।
প্রগতিশীল দাবি-দাওয়াও কম কিসে! মন-মানসিকতায় বাঙালি হলে সর্বত্র বাংলা
প্রচলনে বাধা কিসে;
অন্তরায় কি?
কাউকে
হেয় না করে অথবা অন্য ভাষার প্রতি সামান্যতম বিদ্বেষ পোষণ না করেই জানতে
ইচ্ছে হয়,
নিজস্ব ভাষা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার যোগ্যতা,
শক্তি
কি নেই আমাদের?
স্বকীয় ঋতু বৈশিষ্ট্যের সমাহারে সমৃদ্ধ নির্ভরযোগ্য ও নির্ভুল বর্ষপঞ্জির
অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি দিবসটিও ইংরেজী ২১
ফেব্রুয়ারিতে উদযাপিত হয়,
৮
ফাল্গুন থাকে উপেক্ষিত।
মহামতি সম্রাট আকবর কর্তৃক প্রবর্তিত বাংলা সন হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ ব্যবহার
না করার ফলে।
শুধুমাত্র বৈশাখের মিছিল,
মেলা
আর লোক দেখানো ইলিশ ভাজা ভোজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
মোনাফেকী চরিত্রের প্রকৃত রূপই বটে!
পবিত্র আল কুরআন বর্ণিত প্রকৃত এবং সত্যিকার ইসলাম কিন্তু কোনো ধরনের গোঁড়ামী
ও ধর্মান্ধতা সমর্থন করে না।
যুগে
যুগে নবী রসুলদের আবির্ভাব হয়েছে মানুষকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ্র অনুগত
শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে,
ভাষা
শিক্ষা দেয়ার জন্য নয়।
চৌদ্দশ বছর পূর্বে আরবের মরুভূমিতে মুহাম্মদ (সঃ)-এঁর আগমন ঘটে এ একই
উদ্দেশ্য।
তিনি
(সা) অন্ধকারাচ্ছন্ন,
পথহারা মানব জাতির সামনে আলোকজ্জ্বল প্রদীপ হিসেবে দেখা দিলেন-পথপ্রদর্শক
রূপে মানুষের রাজনৈতিক,
অর্থনৈতিক,
সামাজিক তথা জীবনের সমগ্র দিকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপত্র দিলেন।
তিনি
(সা) যেহেতু আরবি ভাষী তাই তাঁর দেয়া ব্যবস্থাপত্র আরবিতে সংরক্ষণ এবং সংকলন
হয়েছে।
ভাষা
যেহেতু ভাব প্রকাশের বাহক তাই আরবি ভাষায় লিখিত কুরআন প্রত্যেক মুসলিম তাদের
স্ব স্ব মাতৃভাষায় বুঝে,
ভালোভাবে হৃদয়াঙ্গম করে কর্মে প্রতিপালন ঘটাবে - এটাই স্বাভাবিক;
না
বুঝে তোতা পাখির মতো আরবি মুখস্ত করা বা আরবিয় পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করার
মধ্যে আল্লাহ্র আনুগত্য প্রকাশ পায় না।
তাছাড়া সব ভাষাই আল্লাহ্র - বিধর্মীদের ভাষা বলতে পৃথিবীতে কিছুই নেই।
হিন্দি,
উর্দু,
সংস্কৃত,
বাংলা,
পালি
সব ভাষাই আল্লাহ্ বুঝেন।
তবে
বিভিন্ন ভাষার শব্দ প্রয়োগে যথার্থতা নিরূপিত হওয়া উচিৎ।
আরবি
ভাষায় নাম রাখলে মুসলিম হবে এ কথা অযৌক্তিক - কুরআনও সমর্থন করে না।
যেমন
বলা হয়েছে-আমি প্রত্যেক পয়গম্বরকেই তাঁর জাতীয় ভাষায় প্রেরণা দিয়েছি,
যাতে
তিনি তাদের বুঝিয়েছেন;
অতঃপর
যার ইচ্ছা আল্লাহ্র পথে চলে এবং যার ইচ্ছা পথভ্রষ্ট হয়।
কিন্তু আল্লাহ্ সর্বশক্তিমান এবং সুবিবেচক
(সূরা
ইব্রাহীম : ৪)।
আসমান-জমিনের সৃষ্টি,
নানাবিধ ভাষা,
বর্ণও
তাহার অন্যতম নিদর্শন।
সমঝদারদের জন্য এতে প্রভূত নিদর্শন রয়েছে
(সূরা
রম : ২২)।
আমি
তোমার ভাষায় কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে
(সূরা
দুখান : ৫৮)।
আমি
ইহা অবতীর্ণ করেছি আরবি ভাষায় কুরআন রূপে যাতে তোমরা বুঝতে পারো
(সূরা
যুখরুফ : ৩)।
আমি
যদি আজমি ভাষায় (আরবি ব্যতীত অন্য ভাষা) কুরআন অবতীর্ণ করতাম তারা অবশ্যই
বলতো - এর আয়াতগুলো বিশদভাবে বিবৃত হয়নি কেন?
কি
আশ্চর্য যে এর ভাষা আজমি অথচ রাসুল আরবিয়।
বলো :
মুমিনদের জন্য ইহা পথনির্দেশ ও ব্যাধির প্রতিকার।
কিন্তু যারা অবিশ্বাসী তাদের কর্ণে রয়েছে বধিরতা এবং কুরআন হবে এদের জন্য
অন্ধত্ব।
এরা
এমন যে,
যেন
এদেরকে আহ্বান করা হয় বহুদূর হতে
(সুরা
হামিম সিজদা : ৪৪)।
আমি
যদি ইহা কোনো আজমির কাছে অবতীর্ণ করতাম এবং সে উহা পাঠ করে তাদেরকে শুনাতো
তবে তারা উহাতে ঈমান আনতো না
(সূরা
শুয়ারা : ১৮৯,১৯৯)।
আমি
এই কুরআনে মানুষের জন্য সর্বপ্রকার দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছি যাতে তারা
উপদেশ গ্রহণ করে
(সূরা
জুমার : ২৭)।
আরবি
ভাষায় এই কুরআন বক্রতামুক্ত যাতে মানুষ সাবধানতা অবলম্বন করতে পারে
(সূরা
জুমার : ২৮)।
অতএব,
বাংলা
ভাষা-ভাষী কোনো মুসলিম তার নাম খিজির আলী (শুকর আলী) না রেখে যদি সুশান্ত
রাখে তবে অবশ্যই সে কাফের হয়ে যাবে না বা ইসলাম থেকেও খারিজ হবে না।
মনে
রাখতে হবে ঐশীগ্রন্থ কুরআনের সংস্কৃতি সামপ্রদায়িকতার উর্দ্ধে - ভাষা,
বর্ণ,
জনপদের ব্যবধান দিয়ে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা,
দলাদলীর জন্মদান রীতিমতো আহাম্মকী ও গোঁড়ামী।
বিভিন্ন জনপদের অধিবাসীর হরেক রকম ভাষায় কথা বলায় ও অভিন্ন বিধান ইসলামের
অনুসারী হতে কোনোই বাধা নেই।
কেননা,
ইসলাম
কিছু আচরণ-অনুষ্ঠান বা পর্ব পালন নয় অথবা দাড়ি,
টুপি,
পাগড়ি,
সুরমা,
আতর,
পায়জামা-পাঞ্জাবী জাতীয় কিছু পোশাক পরিচ্ছদের নামও নয়।
মানব
কল্যাণ তথা জীব ও জগতের কল্যাণে নিয়োজিত সব ধরনের মহৎ কর্মই ইসলাম।
সৃষ্টির আদি অর্থাৎ হযরত আদম (আঃ) হতেই এই ইসলাম বিভিন্ন নবী-রসুলদের মাধ্যমে
পূর্ণতা পায়।
সুতরাং ইসলামকে গন্ডিবদ্ধ করা ঠিক নয়।
আরবি
নাম ধারণ করে নির্দিষ্ট কয়েকটি আচার-অনুষ্ঠান পালন করলেই কুরআনে বর্ণিত
মুসলিম (অনুগত) হওয়া সম্ভব নয়।
প্রবৃত্তিমুক্ত বিবেকের অনুসারী বাস্তব অভিজ্ঞতায় প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই
মুসলিম পরিচয় দিতে পারে।
বিশেষভাবে স্মর্তব্য যে,
সব
মানুষের জন্ম ও মৃত্যু প্রক্রিয়া একই অর্থাৎ মানুষের উৎস ও পরিণতি অভিন্ন।
সুতরাং জন্ম-মৃত্যুর মধ্যকার সময়টুকুর বিশ্লেষণ,
স্বীকৃতি এবং পরিচয় তাদের স্ব স্ব কর্মানুযায়ী নির্ণীত হয়।
তাই
আল্লাহ্র দরবারে মুসলিম,
হিন্দু,
বৌদ্ধ,
খৃষ্টান,
ইহুদী,
জৈন
ইত্যাদির কোনোই স্থান নেই।
যারা
অনুগত ও ভদ্র এবং ন্যায় পবিত্রভাবে ঐশিগ্রন্থের আলোকে ব্যক্তিজীবন ধারণ করে
সৃষ্টির সেবায় নিয়োজিত থাকে তারাই আল্লাহ্র পছন্দনীয় - তারাই সৃষ্টির
শ্রেষ্ঠ।
যেমন
বলা হয়েছে -
‘নিঃসন্দেহে
যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে তারাই উৎকৃষ্টতম সৃষ্টি
(সূরা
বায়্যিনাহঃ৭)।
মনের
ভাব আদান-প্রদান করার জন্যই ভাষা।
শ্রুতিমধুর,
সহজ-সরল,
অর্থবোধক শব্দ প্রয়োগে যদি ভাব ও বক্তব্য সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে প্রকাশ করা যায়
তবে তা গ্রহণ করায় আপত্তি থাকা উচিৎ নয়।
হোক
না তা সংস্কৃত,
ইংরেজি,
ফার্সি,
উর্দু
তথা যে কোনো ভাষার শব্দ।
তবে
আল্লাহ্কে খোদা,
সালাতকে নামাজ (যার অর্থ চন্দ্র,
সূর্য,
পাহাড়,
পবর্ত
ইত্যাদিকে পূজা করা) বললে যাদের ধর্ম নষ্ট হয় না বরং ধর্ম নষ্ট হয় অর্থবোধক
বিশ্রদ্ধ বাংলা শব্দ প্রয়োগ করলে,
তাদের
বাপারে বলার কি বা থাকতে পারে।
এক্ষেত্রে কুরআনের একটি আয়াত উল্লেখ
করা যেতে পারে - আর প্রত্যেক উম্মতের জন্য এক একজন রসুল রয়েছেন,
সুতরাং তাদের সেই রসুল যখন এসে পড়েন (তখন) তাদের মীমাংসা করা হয় ন্যায়ভাবে আর
তাদের প্রতি অবিচার করা হয় না
(সূরা
ইউনুসঃ৪৭)।
এখানে
একটি কথা বলা প্রয়োজন যে,
আল্লাহ্র বাণীই প্রচারিত হয় রসুলদের মাধ্যমে যা সর্বজনীন,
যে
ভাষাতেই বর্ণিত হোক না কেন।
সুনিশ্চিত যে মুসলমান,
ইহুদী,
নাছারা এবং সাবেঈন সমপ্রদায় যারা বিশ্বাস রাখে আল্লাহ্ এবং কেয়ামতের প্রতি
আর নেক কাজ করে তাদের জন্য পুরস্কার রয়েছে।
তাদের
প্রভুর কাছে তাদের কোনো ভয়ও নাই,
তারা
শোকান্বিতও হবে না
(সূরা
বাকারা : ৬২)।
অতএব নির্দ্বিধায় এবং দ্ব্যর্থহীনভাবেই বলা যায় যে,
ঐশীগ্রন্থ বা কুরআনের পরিপূর্ণ অনুসরণ ব্যতীত অনুগত,
ভদ্র বা মুসলিম হওয়া সম্ভব নয়।
কারণ কুরআন অনুসরণ করতে হলে প্রথমেই মাতৃভাষা বুঝতে হবে।
মাতৃভাষার মাধ্যমে কুরআনকে আঁকড়ে ধরা এবং জীবনদর্শন হিসেবে ব্যক্তিজীবনে
প্রতিষ্ঠিত করাই নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এঁর উম্মত দাবিদারদের জন্য বেশি প্রয়োজন।
|
|