|
জনগণের স্বার্থে নতুন উদ্যমে পথ চলা শ্রেয়
শেখ উল্লাস
॥
সরকার
গঠনের তিন বছর পূর্তির প্রাক্কালে ৫ জানুয়ারি,
২০১২
জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন,
জনগণের স্বার্থই তার সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার।
কিন্তু বর্তমানে দেশের জনগণের অগ্রাধিকার কোন্টি সে কথা কি প্রধানমন্ত্রী
এখন জানতে পারছেন?
বা
জানার চেষ্টা করেছেন?
আর
দেশের বর্তমান পরিস্থিতির কথা তিনি জানবেনই বা কীভাবে?
বর্তমানে সংবাদপত্রসহ সকল গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা থাকলেও অবস্থাদৃষ্টিতে
মনে হচ্ছে,
প্রধানমন্ত্রী এখন গণমাধ্যমের কথা বিশ্বাসই করছেন না।
প্রতিদিন গণমাধ্যমে দেশের বাস্তব পরিস্থিতির অনেক তথ্য,
জনগণের অনেক সমস্যার কথা উঠে আসলেও প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বিশ্বাস করেন বলে
মনে হয় না।
কারণ,
জাতির
উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে এসব সমস্যার কথা তিনি এড়িয়ে গেছেন বলেই প্রতীয়মান হয়েছে।
গত
তিন বছরে দেশে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়নি,
সাংবাদিকতাও শক্তিশালী হয়নি।
সাংবাদিকতা শক্তিশালী হলেই হয়তো গণমাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত খবরে তিনি
উদ্বিগ্ন হতেন,
এসব
সমস্যা সৃষ্টির জন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে শাস্তমূলক ব্যবস্থা নিতেন।
এসব
বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে এগুলোর সমাধানে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতেন।
কিন্তু পত্র-পত্রিকা বা গণমাধ্যমের কোন খবরকে তিনি গুরুত্বসহকারে নিচ্ছেন বলে
তা কেউ বলতে পারবে না।
অথচ
জনগণের অগ্রাধিকার কোন্টি বা কী তা খুঁজে পাওয়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হচ্ছে
গণমাধ্যম।
আজকের
দিনে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশেই ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে এ
কথা ঠিক।
কিন্তু এ কথাও ঠিক যে,
বাংলাদেশের গণমাধ্যমে দেশ ও জনগণের অবস্থা সম্পর্কে অনেক কিছুই থাকে।
গণমাধ্যমে উঠে আসা আলোচনা ও সমালোচনাকে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীতে না নিয়ে
ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীতে নেয়াটাই এক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত বলেই মনে করেন দেশের
সচেতন মহল।
আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা থাকলে গণমাধ্যম থেকে দেশ ও জাতির বাস্তব পরিস্থিতি থেকে
ধারণা নেয়া যেতে পারে।
অর্থাৎ,
জনগণের অগ্রাধিকার পূরণের জন্য কাজ করার মতো অনেক দিক নির্দেশনাই গণমাধ্যমে
পাওয়া যেতে পারে।
আওয়ামী লীগের মতো একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সাথে
জনগণের দূরত্ব তৈরি হবে,
অর্থাৎ তারা জনগণের অগ্রাধিকার কোন্টি তা তারা বুঝতে অক্ষম হয়ে উঠবেন-সে কথা
বাহ্যিক দৃষ্টিতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এখন যেন তাই হচ্ছে।
ব্যক্তির চেয়ে দল বড়,
দলের
চেয়ে দেশ বড়-এ
মনোভাব পোষণ করেন এমন নেতাকর্মীর সংখ্যা এ দলটিতেই এখন আশংকাজনক হারে কমে
যাচ্ছে।
জাতির
উদ্দেশ্যে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর বিস্তারিত ভাষণে দেখা গেছে,
বর্তমানে দেশে বিরাজমান অনেক সমস্যা যেমন- বর্তমানে প্রায় অকার্যকর জাতীয়
সংসদ,আগামী
নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু,
নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি,
প্রধান বিরোধী দলের সাথে সংঘাতের রাজনীতি,
সরকারি দল ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলোর অনেক নেতাকর্মীর খাই খাই ভাব,
রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থায় দুঃসহ পরিস্থিতি ইত্যাদি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট
বিষয় নিরসনে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে তেমন কোনো কথাই
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে ছিল না।
যে
জন্য প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণকে অনেকেই গতানুগতিক ভাষণ বলেই উল্লেখ করেছেন।
দিন
বদলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা মহাজোট
সরকারের প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণে তাই স্বভাবতই হতাশ হয়েছেন অনেকেই।
জনগণের চাওয়া-পাওয়া অর্থাৎ জনগণ প্রকৃত অর্থেই কী চায় তা যদি একজন
প্রধানমন্ত্রী বা একটি সরকার বুঝতে না পারে তবে ধরে নেয়া যায় যে,
সরকারের ভেতরে কোথাও না কোথাও একটি গলদ আছে।
যে-গলদের কারণে সরকার বা তার প্রধানমন্ত্রী দেশের বাস্তব পরিস্থিতি বা জনগণের
অগ্রাধিকার কোনটি তা বুঝতে পারছেন না বা তাকে সেই পরিস্থিতি বুঝতে দেয়া হচ্ছে
না।
ফলে
জনগণ ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছে সরকারের ওপর।
আর
মহাজোট সরকারের প্রতি জনগণের আস্থার টানে ভাটা পড়ছে বলে দেখা যাচ্ছে,
যা
দেশের বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম পরিচালিত জনমত জরীপে ইতোমধ্যে
প্রকাশিত হয়েছে।
অবশ্য বিরোধী দলের কর্মকান্ডে যে জনগণ খুশী তাও কিন্ত নয়।
জনমত জরীপগুলোতে দেখা গেছে,
বিরোধী দলের জনপ্রিয়তা কিছুটা বেড়েছে।
কিন্তু সেখানে তাদের কৃতিত্বের কিছু নেই।
আমাদের দেশের রাজনীতির চরিত্রগত একটি দিকই হচ্ছে,
ক্ষমতায় থাকলে জনপ্রিয়তা কমতে থাকে।
এ
সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাজের সুফল জনগণ পাচ্ছে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক অংশের জনগণের মধ্যে সাড়া
জাগিয়েছে-এ কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।
কৃষকদের মধ্যে সার বিতরণ সরকারের আরও একটি বড় অর্জন।
খাদ্য উৎপাদনেও সরকারের কৃতিত্ব রয়েছে।
অর্থাৎ জনগণের স্বার্থ সম্পর্কে যথাযথভাবে অবহিত হয়ে সেগুলো বাস্তবায়নে
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ হয়েছে সেখানে সরকারের সফলতা ঠিকই এসেছে।
জনগণও তার সুফল ভোগ করেছে।
তবে
অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারসাজিতে সাধারণ মানুষ এখনো যে
জিম্মি হয়ে আছে তা সরকারকে বুঝতে হবে।
সব
মিলিয়ে বলা যায়,
আগামী দুই বছরে জনগণের স্বার্থ ও অগ্রাধিকার কোন্টি তা বুঝতে হলে বৃহত্তর
স্বার্থে সরকারকে আরও অনেক আন্তরিক ও সজাগ হতে হবে।
নিজেকে সবজান্তা না মনে করে গণমাধ্যমে উঠে আসা সমস্যাগুলো সমাধানে আরও অনেক
তৎপর হতে হবে।
অযোগ্য ও অদক্ষ মন্ত্রীদের সরিয়ে যোগ্যদেরকে কাজের জায়গা করে দিতে হবে।
সমালোচনাকে ভয় ও উপেক্ষা না করে তা থেকে সমাধানের উপায় বের করে আনতে হবে।
সরকারের প্রতি জনগণের আস্থার যে ভাটা পড়েছে তাকে স্বীকার করে নতুন উদ্যোমে
আবার কাজ শুরু করার এখনই সময়।
নতুবা সবজান্তার পরিণাম যে কত দুঃখজনক হয় তাই তাদের জীবনে সত্য হয়ে দেখা
দিতে পারে।
তেভাগা এক মৃত্যুহীন সংগ্রাম
সংলাপ
॥
বাংলায়
পরম শ্রদ্ধা ও শপথের সঙ্গে পালিত হয়েছে তেভাগা দিবস।
বাংলার সংগ্রামী কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে ৪ঠা জানুয়ারী লাল অক্ষরে লেখা একটি
তারিখ,
এইদিনেই প্রকৃতপক্ষে শুরু হয় অবিভক্ত বাংলার ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন।
৬৫
বছর আগে ১৯৪৭ সালের ৪ঠা জানুয়ারী অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর থানার
তালপুকুর গ্রামে কৃষকের বাঁচার অধিকার অর্জন করতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদী
পুলিশের গুলিতে নিহত হন স্থানীয় কৃষক সমিরুদ্দিন এবং শিবরাম মাঝি।
এঁরাই তেভাগা আন্দোলনের প্রথম দুই শহীদ।
পরে
এই চিরিরবন্দরেই তেভাগার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশ-জমিদারের মিলিত
আক্রমণে শহীদ হন গজেন বর্মণ এবং ঝডু বর্মণ।
শুধু এঁরা নন সমগ্র তেভাগা আন্দোলনে ১৯টি জেলার ৮৬ জন শহীদ হয়ে সংগঠিত
গণ-আন্দোলনের ইতিহাসে এক নতুন পর্বের সূচনা করেন।
বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠন,
রাজনৈতিক দল,
গণ-সংগঠন এমনকি সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলোও মিলিতভাবে ৪ঠা জানুয়ারীকে ঐতিহাসিক
তেভাগা দিবস হিসাবে পালনে এগিয়ে এসেছেন।
শহীদদের স্মৃতিরক্ষা,
তাদের উত্তরাধিকারীদের উপযুক্ত মর্যাদাদান,
তেভাগা আন্দোলনের প্রকৃত মূল্যায়ন এবং ইতিহাসের পাতায় উপযুক্ত মর্যাদা
সময়ের দাবি।
৪ঠা জানুয়ারী
বাংলার মতো কৃষিপ্রধান দেশে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলা যে একান্ত জরুরী একথা
প্রথম বুঝেছিলেন বামপন্থীরা।
তাই
১৯৩৬ সালে কলকাতায় বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সংগঠন কমিটি তৈরি হয় এবং ১৯৩৭
সালে বাঁকুড়া জেলার পাত্রসায়রে প্রথম সম্মেলনের ভেতর দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে
বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষকসভা।
পরবর্তী ১২ বছরে সমগ্র বাংলায় কৃষক আন্দোলনের জোয়ার বয়ে যায়।
দিনাজপুর জেলাতেও সংগঠিত কৃষক আন্দোলনের সূচনা হয়।
একদিকে এই জেলা ছিল বাংলার শস্যভান্ডার,
অন্যদিকে এই জেলাতেই সবচেয়ে বেশি আয় ছিল দিনাজপুর জেলাতেই।
কৃষি থেকে সে আমলেই জেলার আয় সাড়ে ছয় কোটি ছাড়িয়ে যায়।
তবু
কৃষকের ঘরে অন্ন নেই।
একদিকে যেমন দিনের পর দিন ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিলো,
অন্যদিকে তেমনি হাজার হাজার বিঘা জমির মালিকও ছিলেন অনেকেই।
এদের নির্মম শোষণে চাষীর জীবন জেরবার হয়ে উঠেছিল।
জোতদাররা ছিল খুবই শক্তিশালী।
বিনা পরিশ্রমে অর্ধেক ফসল নিয়েও তারা খুশি থাকত না।
নিজের রক্ত জল করে যে চাষ করতো সেই আধিয়ারের অংশ থেকে মার্চা,
তহুরী,
খোলানচাঁহা,
মহলদারী,
গোলাপূজা,
বরকন্দাজী,
সন্ন্যাসী,
হাতিখোয়া,
মাছখোয়া,
পার্বণী,
গাজন,
থিয়েটার প্রভৃতি বিভিন্ন নামে বেআইনীভাবে দফায় দফায় ধান কেড়ে নেয়া হতো এবং
কর্জা ধান পরিশোধের নামে আধিয়ারের অংশ হতে সুদসহ দ্বিগুণ-তিনগুণ ধান কেটে
নেয়া হতো।
ফলে
হতো শতকরা ৫০ ভাগ সুদ।
সুদ
শেষ হওয়ার আগেই নতুন ঋণ নিতে হতো।
কারণ,
উৎপন্ন ফসলের প্রায় সবটা জোতদারের ঘরে তুলে দিয়েও চাষীর ঋণ বকেয়া যেত।
কাজেই ঘরে ঘরে ক্ষোভের বারুদ জমা হচ্ছিল।
এই
সময় ১৯৪৫ সালে খুলনা জেলার মৌভাগে কৃষকসভার নবম সম্মেলন থেকে চিরস্থায়ী
বন্দোবস্ত ও জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ বিষয়ক প্রস্তাবে জমিদারি শোষণের
বিরুদ্ধে কৃষকদের শেষ সংগ্রামের জন্য প্রস'ত
হতে আহ্বান করা হয়।
ওই
সম্মেলন থেকেই বর্গাদারদের জন্য তেভাগা আইন প্রণয়নের দাবি করা হয়।
একই
বছরে সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক কৃষক কাউন্সিল থেকে সিদ্ধান্ত হয়
যে,
তেভাগার লড়াই আসন্ন মরসুমেই শুরু করতে হবে।
এর
পিছনে একটা কারণ ছিল।
১৬ই
আগস্ট,
১৯৪৬ কলকাতায় ভয়ঙ্কর দাঙ্গা হয়েছে।
জেলায় জেলায় এই দাঙ্গাকে ছড়িয়ে দেবার জন্য কুচক্রীরা খুবই সক্রিয়।
তাই
কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ সক্রিয় আন্দোলন দিয়ে একদিকে জেলায় জেলায় দাঙ্গা প্রতিরোধ
করা এবং তেভাগার দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আন্দোলনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
স্লোগান ওঠে: গ্রামে গ্রামে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য গড়ে তোল এবং এই মরসুমেই
তেভাগা চাই।
আর
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসে কৃষক সমিতির শক্ত ঘাঁটি
দিনাজপুর জেলা।
সেপ্টেম্বর মাসেই জেলাজুড়ে চলে তীব্র খাদ্য আন্দোলন।
অক্টোবর মাসে জেলা কমিটি এবং কৃষক সমিতি নিজ খোলানে (খামারে) ধান তোল;
আধি
নাই,
তেভাগা চাই;
কর্জা ধানের সুদ নাই-এই তিন দাবির ভিত্তিতে জেলায় তেভাগা আন্দোলন শুরুর
সিদ্ধান্ত এবং পরিকল্পনা নেয়।
জেলা সম্পাদক সুশীল সেন,
বিভূতি গুহ,
রূপনারায়ণ রায়,
গুরুদাস তালুকদার,
জনার্দন ভট্টাচার্য,
হাজী দানেশ,
বরদা চক্রবর্তী প্রমুখের নেতৃত্বে শুরু হয় নতুন জনজাগরণ।
গ্রামের মাঠে মাঠে তখন সোনালী ধানের সমারোহ।
স্লোগানে স্লোগানে কেঁপে ওঠে সারা দিনাজপুর,
পথে
পথে লাঠিধারী ভলান্টিয়ার।
কোথাও সাম্প্রদায়িকতার চিহ্নমাত্র নেই।
সর্বত্র প্রবল উদ্দীপনা।
জোরকদমে সর্বত্র ধানকাটা চলতে লাগলো।
ধান
উঠতে লাগলো আধিয়ারের খোলানে।
আতঙ্কিত জোতদাররা দল বেঁধে ছুটলো প্রশাসনিক কর্তাদের কাছে।
ধান
চুরির মিথ্যা অভিযোগে হাজার হাজার গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়।
এবার পুলিশ গ্রেফতার করতে গ্রামে ঢুকলে তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়।
জোতদারদের প্রতি গ্রামীণ সর্বহারা শ্রেণীর তীব্র শ্রেণী ঘৃণার প্রকাশ ঘটে
তেভাগা আন্দোলনে।
প্রথম শহীদ শিবরাম-সমিরুদ্দিন
৪ঠা
জানুয়ারী,
১৯৪৭।
চিরিরবন্দর।
কৃষক আন্দোলনের অপেক্ষাকৃত নতুন ঘাঁটি।
দিনাজপুর শহর থেকে মাত্র ৬ মাইল দূরে চিরিরবন্দরের তালপুকুর আর
নানিয়াটিকুড়ি গ্রাম।
আন্দোলনের আহ্বানে এখানকার আধিয়াররা মাঠ থেকে ধান তুলতে শুরু করেন।
জোতদারদের মধ্যে গেল গেল রব ওঠে।
তারা থানায় অভিযোগ করে যে গ্রামে ধান লুট হচ্ছে।
৪ঠা
জানুয়ারী পুলিশবাহিনী তালপুকুর গ্রামে গ্রেফতারির পরোয়ানা নিয়ে আসে অবাধ্য
আধিয়ারদের গ্রেফতার করতে।
কিন'
গ্রামে তখন অবাধ্যতার ঢেউ।
হাজারে হাজারে আধিয়ার মাঠে জড়ো হয়ে ৩০/৪০ জন সশস্ত্র পুলিশকে ঘিরে ফেলে।
হিমালয় সংলগ্ন এই জেলায় জানুয়ারী মাসে প্রচ- শীত নিবারণের জন্য মাথায় সাদা
এক টুকরো কাপড় বেঁধে রাখেন স্থানীয় মানুষজন-তাকেই সাদা বক বলা হতো।
পুলিশ এই সাদা বকের ঝাঁকের ভেতর থেকেই সমিরুদ্দিন এবং শিবরামকে গ্রেফতার
করে নিয়ে যেতে চায়।
সমিরুদ্দিন ছিলেন খেতমজুর।
তাদের পূর্বপুরুষদের সামান্য জমি চলে যায় জমিদার বিশ্বস্তর বড়াল আর মতিলাল
চৌধুরীর লোলুপগ্রাসে।
গ্রামীণ চৌকিদার ছিলেন তিনি,
সামান্য বেতন।
তাই
খেতমজুরি করে কোন রকমে দিন চলতো।
তাকে যখন পুলিশ বন্দুকের বাট দিয়ে মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছে তখন
সমিরুদ্দিনের বিধবা মা পুলিশের পা জড়িয়ে ধরে জানতে চেয়েছিলেন তার ছেলের কী
অপরাধ?
উত্তর না দিয়ে বর্বর পুলিশ পদাঘাতে গুরুতর আহত করে সমিরুদ্দিনের মাকে।
আর
শিবরাম ছিলেন একান্তই গরিব সাঁওতাল আধিয়ার।
এই
দুজনকে যখন পুলিশ মিথ্যা অভিযোগে জোর করে নিয়ে যাচ্ছে তখনই সেই তালপুকুর
মাঠে গ্রামের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে জড়ো হয়ে পুলিশের পথ রোধ করে।
কন্ঠে তাদের স্লোগান ছিল-জান দিব,
ধান
দিব না।
এটা
শুধু স্লোগান ছিল না।
তারা জান দিয়েছে,
তবু
ধান ছাড়েনি।
এই
সময় পুলিশের নির্বিচার গুলি চালনায় সমিরুদ্দিন ও শিবরাম শহীদ হন।
পোহাতু বর্মণ নামে একজন দরিদ্র রাজবংশী কৃষক গুরুতর আহত হন এবং পরে
ডানপা-টি কেটে বাদ দিতে হয়।
এছাড়া বহু নারী এবং পুরুষ পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে দিনাজপুর হাসপাতালে ভর্তি
হন।
সমাবেশে ১০/১২ জন সাঁওতাল এসেছিলেন তাদের সব সময়ের সঙ্গে তীর-ধনুক নিয়ে।
পুলিশের বর্বর আচরণ দেখে সি'র
থাকতে না পেরে তাদেরই একজন তীর ছোঁড়েন।
তাতে গুলিবর্ষণরত একজন পুলিশ নিহত হয়।
পুলিশের গুলিতে নিহত দুই শহীদ সমিরুদ্দিন এবং শিবরামের দেহ ময়নাতদন্তের
জন্য দিনাজপুর শহরে নিয়ে গেলে এই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে দিনাজপুর কলেজের
ছাত্ররা ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে আসে।
দুই
শহীদের শবদেহ পরিবারের হাতে তুলে না দিয়ে গোপনে দিনাজপুর শহরে কবর দেয়া হয়।
এইভাবে ৪৬-এর আগস্টে কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রায়শ্চিত্ত করলেন
তেভাগার দুই শহীদ।
হিন্দু-মুসলমানের মিলিত রক্তে রচিত হলো ইতিহাসের নতুন দিগন্ত।
তালপুকুরের যে মাঠে সমিরুদ্দিন এবং শিবরাম শহীদ হন সেই মাঠ এখন শহীদ ময়দান।
জেলার প্রগতিশীল সংগ্রামী মানুষ তিল তিল করে অর্থ সংগ্রহ করে যে স্থানে এরা
শহীদ হন সেই জায়গাটি সুদৃশ্য শহীদবেদী নির্মাণ করেছেন এবং আশপাশের জায়গা
সংগ্রহ করে শুধু শহীদ স্মৃতি রক্ষাই নয় গণ-আন্দোলনের ইতিহাস চর্চাসহ নানা
পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন।
৪ঠা
জানুয়ারী প্রতি বছরের মতো এবারও শহীদের রক্তস্নাত সেই মাঠেই সারাদিন ধরে
শহীদস্মৃতি স্মরণ এবং নানা অনুষ্ঠান চলেছে।
এতে
যোগ দেবার জন্য বাংলাদেশের নানা প্রান্ত থেকে বহু ইতিহাসবিদ,
রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব,
কৃষক নেতৃত্বসহ হাজার হাজার সংগ্রামী মানুষ সমবেত হন এই মুক্তিতীর্থে।
১২ই
মার্চ,
১৯৪৭ রাজ্য বিধানসভায় দাঁড়িয়ে কমিউনিস্ট নেতা জ্যোতি বসু বলেছিলেন যে,
দিনাজপুরের সমিরুদ্দিন এবং শিবরামের মতো মানুষদের প্রাণদান ব্যর্থ হবে না।
না,
তাদের প্রাণদান ব্যর্থ হয়নি।
বাংলার চিরবঞ্চিত কৃষক বাংলার সবচেয়ে বৈপস্নবিক এবং গৌরবময় সংগ্রামে শামিল
হয়ে যে ঐতিহ্য সেদিন সৃষ্টি করেছিলেন তা আজও আমাদের সকল সংগ্রামের প্রেরণা।
তেভাগা এক মৃত্যুহীন সংগ্রামের নাম।
তাই
এই সংগ্রামের শিখা অনির্বাণ।
আজ
যে দুই বাংলায় কৃষকের অধিকার খানিকটা প্রতিষ্ঠিত এবং শতশত বছরের অবনত মস্তক
আজ মাথা তুলতে পারছে তার পিছনেও মরণজয়ী তেভাগা আন্দোলনের প্রভাব রয়েছে।
ওপার বাংলায় বামফ্রন্ট সরকার গড়ে ওঠার পিছনেও কৃষক আন্দোলনের ভূমিকাকে
উপেক্ষা করা যাবে না।
আজ
কৃষিক্ষেত্রে নতুন করে যখন সংকট দেখা দিচ্ছে,
কৃষকের জীবনে নেমে আসছে অন্ধকার তখন তেভাগা আন্দোলনের অমর শহীদদের স্মৃতির
প্রতি পুনর্বার শ্রদ্ধা জানানো জরুরী হয়ে উঠেছে।
আমরা যেন কোনো স্বর্গমৃগের প্রলোভনে এক মুহূর্তের জন্য ভুলে না যাই যে,
আমাদের সকল অগ্রগতির ক্ষেত্রে কৃষি এবং কৃষকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
রয়েছে।
তেভাগা দিবস পালনের মধ্য দিয়ে বাংলার জনজীবনে কৃষি ও কৃষক আন্দোলন নতুন
করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠুক আজকের দিনে সেটাই সকলের কাম্য।
কৃষকের অনেক দাবিই আজও পর্যন্ত উপেক্ষিত।
বাংলাতেই আবার নতুন আন্দোলনের জোয়ার থেকে আগামীদিনের জন্য নতুন জীবনের
সূত্রপাত হবে এটাই সকল সংগ্রামী মানুষের আশা।
নজরুলের ভিটেতে সংস্কার চাইছে বংশধররা
সংলাপ
॥

ইন্দিরা ভবনে নজরুল একাডেমি গড়ার ব্যাপারে তাদের আপত্তি নেই।
তবে
কবির জন্মভিটে তথা গ্রামের সার্বিক উন্নয়নের দিকেও সরকার নজর ফেরাক,
এমনই দাবি কাজী নজরুল ইসলামের পরিবার তথা ওপার বাংলার বর্ধমানের চুরুলিয়ার
বাসিন্দাদের।
১৯৫৮ সালের ১২ এপ্রিল চুরুলিয়ায় কবির জন্মভিটেতে পরিবার ও গ্রামের লোকেরাই
গড়ে তোলেন নজরুল একাডেমি।
অদূরেই কবি-জায়া প্রমীলা কাজীর সমাধিস্থল।
পাশে রাখা হয়েছে বাংলাদেশে কবির সমাধিস্থল থেকে আনা মাটি।
সামান্য দূরে বেহাল হয়ে পড়ে রয়েছে এক হালে গড়া যুব আবাস।
চুরুলিয়ার নজরুল একাডেমির সম্পাদক,
কবির ভাইপো মজাহার হোসেনের খেদ,
গত
পঞ্চাশ বছর ধরে যখনই যে সরকার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে,
তাদের কাছে যথাযথ মর্যাদা ও উন্নয়নের দাবি জানানো হয়েছে।
কংগ্রেস-তৃণমূল জোট ক্ষমতায় আসার পরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় ও
শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর কাছেও তারা ২৫ দফা দাবি জানান।
আগের দাবিগুলোর সঙ্গে এ বার যোগ হয়েছে চুরুলিয়ায় নজরুলের নামে
বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার দাবিও।
মজাহার বলেন,
সম্প্রতি রাজ্যের শিক্ষা দফতরের তরফে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
তাতে বলা হয়েছে,
একাডেমি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদেরই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামো তৈরি করে নিতে
হবে।
পরিকাঠামো বলতে কী বলা হচ্ছে,
তা
জানতে আমরা ফের চিঠি পাঠিয়েছি।
কবির পরিবারের আরও দাবি,
জন্মভিটেকে হেরিটেজ ঘোষণা করা হোক।
চুরুলিয়া গ্রামকে আদর্শ গ্রাম এবং সেখানে নজরুল গবেষণাকেন্দ্র গড়ার দাবিও
জানিয়েছেন তারা।
মজাহার জানান,
১৯৯৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী,
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রমোদ মহাজন এবং তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়
চুরুলিয়ায় আসেন।
উন্নয়নের জন্য এক কোটি ২৫ লক্ষ টাকা অনুদানও ঘোষণা করেছিলেন তারা।
মজাহারের খেদ,
সেই
টাকা আমরা এখনও পাইনি।
তার
আর্জি,
সরকার যেখানে চাইছে,
সেখানেই নজরুল একাডেমি হোক।
কিন্তু চুরুলিয়ার দাবিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হোক।
চুরুলিয়া গ্রাম পঞ্চায়েত দীর্ঘদিনই সিপিএমের দখলে।
রাজনৈতিক ফারাক সত্ত্বেও পঞ্চায়েত প্রধান অমিতাভ বন্দোপাধ্যায় বলেন,
নজরুলকে নিয়ে রাজ্য সরকার যে কাজ করতে চাইছে,
তা
গর্বের ব্যাপার।
তবে
এখানে যুব আবাসটির উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা হোক।
তিনি জানান,
মে
মাসে নজরুল উৎসবের সময়ে নানা জায়গা থেকে লোকজন আসেন।
একান্ত বাধ্য হয়েই তারা ওই আবাসে থাকেন।
নজরুলের নামাঙ্কিত স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে কোনও চিকিৎসক নেই।
জামুড়িয়া বস্নক তৃণমূল সভাপতি পূর্ণশশী রায়ের কথায়,
আমরা চাই,
চুরুলিয়ায় একটি সংগ্রহশালা হোক।
এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাও উন্নত করা হোক।
কংগ্রেসের বর্ধমান জেলা (শিল্পাঞ্চল) সম্পাদক তরুণ গঙ্গোপাধ্যায় বলেন,
ইন্দিরা ভবনের নাম অক্ষত থাকুক।
সেই
সঙ্গে সরকার চুরুলিয়ার দিকে নজর দিক।
বিশ্ব উষ্ণায়ন-সভ্যতার সংকট
সংলাপ
॥
নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলাই পরিবেশের ধর্ম।
তাই
পরিবেশ বিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বিজ্ঞানীগণ পরিবেশের অনেক সংজ্ঞা দিয়েছেন।
সহজ
করে বলতে গেলে পরিবেশ হলো আমাদের চারিদিকের সজীব ও নির্জীব বস্তুগুলোর
পারস্পরিক ক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া,
যার
স্থান ও কাল ভেদে পরিবর্তনশীল।
এইসব
সজীব বা নির্জীব বস্তুর নির্দিষ্ট উপাদান আছে।
এই
উপাদানগুলো প্রত্যেক বস্তুর মধ্যেই নির্দিষ্ট পরিমাণে বর্তমান থাকে।
কোন
কারণে সেই উপদানগুলো পরিমাণে কম বা বেশি হয়ে গেলে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।
পরিবেশ বিদ্রোহ করে।
ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় নানারকম বিপত্তি ঘটে।
দুরারোগ্য ব্যাধি,
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি বাস্তব অভিজ্ঞতার নিরিখে পরিবেশ নিয়ে গোটা
পৃথিবীতেই মানুষের ভাবনা চিন্তা বাড়ছে।
শুরু
হয়েছে পরিবেশ দূষণ আন্দোলন।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকেই জন ম্যুর,
গিফোর্ড পিনচোট,
থুরো,
মার্স
প্রমুখ পরিবেশবিদগণ পরিবেশ আন্দোলন সূচনা করলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে
এই আন্দোলন জোরদার রূপ পায়।
১৯৬২
সালে র্যাচেল কারসন সাইলেন্ট সিপ্রং নামে একটি বই প্রকাশ করে প্রাকৃতিক
পরিবেশে রাসায়নিক পদার্থের কুপ্রভাব নিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
পল আর
এহরলিক তার বিখ্যাত বই দ্য পপুলেশন বোম্ব
(১৯৬৮)
- এ পরিবেশের ওপর জনসংখ্যা বৃদ্ধির ভয়াবহ পরিণামের কথা উল্লেখ করেন।
তবে
পরিবেশ দূষণের ভয়াবহতা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় মোটামুটিভাবে ১৯৭২ সাল থেকে।
ওই
বছর স্টকহোমে অনুষ্ঠিত হয় ইউনাইটেড নেশন কনফারেন্স অন দ্য হিউম্যান
এনভায়রনমেন্ট।
রাষ্ট্রগুলো পরিবেশ দূষণের বিপদ সম্বন্ধে মত বিনিময় শুরু করে।
তারপর
থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই চলছে জলবায়ুকে দূষণমুক্ত করার ভাবনাচিন্তা।
পরিবেশ দূষণের অন্যতম ফল বিশ্ব উষ্ণায়ন।
দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ বিশ্ব পরিবেশ আন্দোলনের অংশীদার।
দেশের
মানুষের পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানোর জন্য চাই লাগাতার প্রচার।
কিন্তু সাধারণ মানুষ খুব সহজেই বুঝতে পারেন এমন বই বা পুস্তকার যথেষ্ট অভাব
আছে।
বিশেষ
করে বিজ্ঞানের ছাত্র না হয়েও সহজে পরিবেশ বিজ্ঞান বুঝতে পারে,
এমন
বাংলা বইয়ের সংখ্যা খুবই কম।
জলবায়ু এবং বাসযোগ্য পরিবেশকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় যে নয়টি খুব
গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিপদসীমা অতিক্রম করেছে,
সেই
উপাদানগুলো হলোঃ ১. জলবায়ু পরিবর্তন,
২
সমুদ্রে অম্লতা
বৃদ্ধি,
৩.
বায়ুমন্ডলের উপরিভাগের ওজন গ্যাসের ক্ষয়,
৪.
প্রাণী ও ভূরসায়ন সম্পর্ক,
৫.
পানীয় জলের ব্যবহার,
৬.
জমির চরিত্র পরিবর্তন,
৭.
জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি,
৮.
বায়ুতে ক্ষতিকারক দূষণ নির্গমন,
৯.
রাসায়নিক দূষণ।
উষ্ণায়নের ফলে গোটা পৃথিবীই আজ মারাত্মক বিপদের সামনে।
স্মরণাতীত কাল থেকে মেরু প্রদেশের জমা বরফ এখন ক্রমাগত গলছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সাত মিটার (মোটামুটিভাবে ২২/২৩ ফুট) পর্যন্ত বেড়ে
যাওযার সম্বাবনা।
পৃথিবীর প্রায় ৪০০ কোটি মানুষের বাস সমুদ্রপৃষ্ঠের ১৫ ফুট উচ্চতার মধ্যে।
তাই
দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর ভবিষ্যত সহজেই অনুমেয়।
হিমবাহ গলে যাওয়ায় ভারত,
বাংলাদেশ প্রভৃতি নদীমাতৃক দেশগুলোর সমস্যা বেড়ে চলেছে।
আগামী
দিনে গোটা পৃথিবী জুড়েই দেখা দেবে মারাত্মক খাদ্যাভাব।
বিশ্ব
উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যাওয়া,
বাতাসে গ্রীন হাউস গ্যাসের অন্যতম উপাদান সিও২ (CO2)
বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের জলে আগের থেকে বেশি (CO2)
অম্লতা
বৃদ্ধি করেছে।
সমুদ্রের প্রাণীদের জীবন সংশয় দেখা দিয়েছে।
প্রাণী জগতের অন্যান্য অংশেও ঠিক একই ঘটনা ঘটছে।
পৃথিবীতে জনসংখ্যার বিস্ফোরণের ফলে তা এখন ৭০০ কোটিতে পৌঁছে গেছে।
ফলে
চাষযোগ্য জমি কমে যাওয়া ছাড়াও তৈরি হচ্ছে বন কেটে বসত।
পরিণামে ভূমিক্ষয় হচ্ছে,
বাড়ছে
নগরের সংখ্যা।
নগরায়নের ফলে বাড়ছে বেহিসেবি কারখানার সংখ্যা।
কারখানার ধোঁয়া এবং বর্জ্য পদার্থ নদনদীর জল দূষিত করে নতুন বিপত্তি ঘটাচ্ছে।
বিদ্যুৎসহ পেট্রোল ডিজেলের চাহিদা মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়ছে।
তৈরি
হচ্ছে পরিবেশ দূষণের আর এক নতুন দিক।
মুনাফার লোভে আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো তেল-যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
এমন
একটি মুহূর্ত নেই যখন যুদ্ধবাজেরা বারুদের ধোঁয়ায় মুক্ত আকাশ বিষাক্ত করে না
তুলছে।
আকাশের কোন সীমানা নেই।
পরমাণু অস্ত্র বা অন্যান্য বিষাক্ত অস্ত্রের পরীক্ষা নিরীক্ষা সভ্যতার
সঙ্কটকে তীব্রতর করে করে তুলছে।
তবে
দেরিতে হলেও আশার কথা এই যে আজ পৃথিবীর বেশিরভাগ রাষ্ট্রই এ বিষয়ে সচেতন হয়ে
এই আত্মহননের পথ থেকে বাঁচার পথ খুঁজছে।
বিভিন্ন সম্মেলনের মাধ্যমে চলছে এইসব দূষণের হাত থেকে বাঁচার পথ খোঁজা।
১৯৮৫
তে প্রথম আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন,
১৯৮৬তে জাতিসঙ্ঘের ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অব ক্লাইমেট চেঞ্জ গঠন,
১৯৯২
তে ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ,
১৯৯৭
তে জাপানে কিয়োটো প্রোটোকল,
২০০২
সালে জাপান,
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য কয়েকটি দেশের কিয়োটো চুক্তিতে স্বাক্ষর,
২০০৯
তে কোপেনহেগেন জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত শীর্ষ বৈঠক,
২০১০
- এ মেক্সিকোর কানকুনে এফ সি সি-র ১৬তম অধিবেশন,
২০১১
সালের ফেব্রম্নয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ষষ্ঠতম মন্ত্রীগোষ্ঠীর সভা।
শ্রেণী বিভক্ত সমাজে গরিব মানুষ যেমন ধনীদের দ্বারা শোষিত হয়,
ঠিক
তেমনি পৃথিবীতেও ধনী দেশগুলো গরিব দেশগুলোকে শোষণ করে।
ওদের বেহিসেবী ভোগের অভিশাপ গরিব দেশগুলোর ওপর বর্তায়।
সারা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতকরা মাত্র ৭ ভাগ ধনী দেশগুলোতে বাস করে।
কিন্তু তারা মোট গ্রিন হাউস গ্যাসের ৫০ ভাগই নির্গমন করে।
আর
গরিব দেশগুলোতে মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫০ ভাগ বাস করলেও তারা নির্গমন করে
মাত্র শতকরা ৭ ভাগ।
ধনী
দেশগুলো তাদের সমস্ত দায় এড়িয়ে যাচ্ছে।
সময়
এসেছে সচেতন হওয়ার।
নয়তো প্রকৃতিও প্রতিশোধ নেবে যা প্রতিহত করার শক্তি কোন রাষ্ট্রের নেই।
স্মরণ রাখতে হবে সাবধানের মার নেই।
গণ-মাধ্যম স্বাধীন কমিশন সময়ের দাবী
সংলাপ
॥
সমাজের
সার্বিক অঙ্গনে সত্য উদ্ঘাটন সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।
দায়িত্ব ও কর্তব্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো সমাজে
বাস্তবায়নে গণ-মাধ্যমের বিকল্প নেই।
বাংলাদেশে রেডিও-টেলিভিশনের পাশাপাশি অনলাইন বার্তা সংস্থা এবং গণ-মাধ্যমের
সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তাতে একটি সমন্বিত আইন প্রণয়ন দরকার।
রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত ব্রডকাস্ট মিডিয়ায় আইন ও নীতিমালা বিষয়ক কর্মশালায়
এ অভিমত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলেছেন,
মিডিয়ার জন্য একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা না হলে বাংলাদেশে গণমাধ্যম বিপাকে
পড়তে পারে।
রাজধানী আগারগাঁওয়ের আইডিবি ভবনে গত রোববার সকালে দুদিনব্যাপী এ কর্মশালা
এই অভিমত ব্যক্ত করেছে।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন,
বাংলাদেশে কোনো কোনো বিদেশী মিডিয়াকে এফএম সম্প্রচার সুবিধা দেয়া হচ্ছে
আবার একই ধরনের আবেদনে অন্য কোনো দেশের মিডিয়াকে এফএম সম্প্রচার সুবিধা দেয়
হচ্ছে না;
এটা
কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন,
তিন
স্তরের মিডিয়া ছাড়াও বাংলাদেশে ইন্টারনেট ভিত্তিক অনলাইন বা অল্টারনেট
মিডিয়ার সংখ্যা বাড়ছে।
এ
খাতে হয়তো বিদেশী বিনিয়োগের সুযোগ বিবেচনার সময় আসবে।
এ
জন্য মিডিয়ার জন্য লাগসই আইন কিংবা নীতিমালা করতে না পারলে চীন ও ভারতের
চেয়ে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে পড়বে।
বক্তারা আরো বলেন,
সরকারের গতিশীল নেতৃত্বের কারণেই নতুন নতুন কমিউনিটি রেডিও এবং টেলিভিশন
আসছে।
এখন
এসব মিডিয়া সচেতন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলে উন্নয়নকে তরান্বিত করতে ভূমিকা
রাখে কিনা সেটাই দেখার বিষয়।
রাজধানীতে মেট্রোরেল হচ্ছে
সংলাপ
॥

রাজধানীর মেট্রোরেল জটিলতার অবসান হয়েছে।
জাতীয়
সংসদের পাশ দিয়েই যাচ্ছে মেট্রোরেল।
আগামী
মার্চেই জাইকার সঙ্গে ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর হবে।
জাপান
বাংলাদেশকে দুই বিলিয়ন ডলার ঋণ দিচ্ছে।
বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত শিরো সাদোশিমা গত রবিবার যোগাযোগমন্ত্রীর সঙ্গে
এ বিষয়ে বৈঠক করেছেন।
মেট্রোরেলের স্পেশাল প্রজেক্ট অর্গানাইজেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী
বলেন,
জাইকা
দুটি রুট পছন্দ করলেও বিমানবাহিনীর আপত্তির কারণে বিকল্প রুটটি চূড়ান্ত হয়েছে
খামারবাড়ি হয়ে সংসদ ভবনের পাশ দিয়েই মেট্রোরেল রুট।
মার্চেই জাইকার সঙ্গে ঋণ চুক্তি হবে।
উত্তরা তৃতীয় ফেজ থেকে পল্লবী
হয়ে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর,
রোকেয়া সরণি,
ফার্মগেট,
দোয়েল চত্বর হয়ে প্রেসক্লাব থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত এ রুট নির্ধারণ
করা হয়েছে।
এ
রুটে মোট ১৫টি বিরতির স্থান থাকবে।
মেট্রোরেল প্রকল্পের পুরো ব্যয় মেটানো হবে জাইকার সহজ শর্তের ঋণ দিয়ে।
রাজধানীর দুঃসহ যানজট নিয়ন্ত্রণে মেট্রোরেল হতে পারে বড় আশীর্বাদ।
মেট্রোরেল রুট চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ইতোমধ্যে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে
প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
অযাচিত মতবিরোধের মধ্যে গত বছর সেপ্টেম্বরে জাইকা সদর দফতরের পরিচালক
তোমোহিদে ইচিগুচির নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সরকারের কাছে
দ্রুত মতামত দেয়ার অনুরোধ জানায়।
রুট
নির্ধারণ নিয়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় বিপত্তিতে পড়লে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
২৬ অক্টোবর সংসদে মেট্রোরেলের রুট পরিবর্তন করা হবে না বলে জানান।
২০০৫ সালে মহানগরীতে তিনটি রুটে প্রায় ৫৮ কিলোমিটার মেট্রোরেল পথ নির্মাণের
জরিপ কাজ শেষ করে জাইকা।
এর
মধ্যে এমআরটি-৬ প্রকল্পটি সর্বাধিক গুরুত্ব পায়।
এমআরটি-৬ এর আওতায় ২০ কিলোমিটার রেললাইনে মোট স্টেশন হবে ১৫টি।
ল্যান্ডিং স্টেশনের আওতা হবে এক বর্গকিলোমিটার।
মেট্রোরেল ঘণ্টায় ৬০/৮০ হাজার যাত্রী বহন করতে পারবে।
পরিসংখ্যান বলছে,
প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ১৩৬ জন মানুষ ঢাকায় আসে।
ঢাকার বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি।
সরকারি হিসেবে জনসংখ্যা বাড়ছে ১ দশমিক ৪০ শতাংশ হারে।
কিন্তু রাজধানী বাড়ছে ৬ শতাংশ হারে।
এ
বৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকলে ১০ বছর পর রাজধানীতে জনসংখ্যা দাঁড়াবে ৩ কোটি ২০
লাখ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
উড়াল সড়ক ও মেট্রোরেলের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে রাজধানীতে বসবাস
পুরোপুরি অনুপযোগী হয়ে পড়বে।
জাপানী রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে মন্ত্রী বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার
উন্নয়নে জাপান সরকারের অব্যাহত সহযোগিতার জন্য রাষ্ট্রদূতকে ধন্যবাদ জানান।
এ
সময় তিনি ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসনে জাপান সরকারের সহায়তা চান।
বৈঠকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মেঘনা-গোমতী সেতুর মেরামত এবং দ্বিতীয়
মেঘনা-গোমতী সেতু নিয়ে আলোচনা হয়।
এ
বিষয়ে জাপানের সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতির জন্য মন্ত্রী রাষ্ট্রদূতকে
ধন্যবাদ এবং প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিতে অনুরোধ করেন।
তিনি ঝুঁকিপূর্ণ মেঘনা সেতুর মেরামত এবং দ্বিতীয় মেঘনা সেতু নির্মাণে জাপান
সরকারের সহযোগিতা চান।
বৈঠকে জাপান সরকারের অর্থায়নে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন
ইস্টার্ন বাংলাদেশ ব্রিজ ইম্প্রভমেন্ট প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়।
এ
প্রকল্পে ব্যয় হবে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা।
জাইকা এ প্রকল্পে ৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দিচ্ছে।
বৈঠকে সরকারের পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সড়ক দুর্ঘটনা কি অপ্রতিরোধ্য?
সংলাপ
॥
সড়ক
দুর্ঘটনায় একজন সাংবাদিক তার পা হারানোর মাত্র দশদিনের মাথায় অপর একজন
সাংবাদিক নির্মম মৃত্যুর শিকার হয়েছেন।
গত
রোববার একমাত্র মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথে বেপরোয়া বাসের চাকায়
পিষ্ট হয়ে মারা যান সিনিয়র সাংবাদিক দীনেশ দাশ।
গত ২৮
ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিআরটিসির বাসের চাপায় গুরুতর আহত হন
দৈনিক কালের কণ্ঠের সিনিয়র সাংবাদিক নিখিল ভদ্র।
গত ৭
সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়ায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন স্থানীয় সরকার,
পল্লী
উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের ছেলে
ফাহিম।
১৩
আগস্ট ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার
তারেক মাসুদ ও এটিএন নিউজের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার (সিইও) মিশুক মুনীর।
যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবু তাহের,
তিনবারের অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান,
চলচ্চিত্র পরিচালক আলমগীর কবির সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জীবন কেড়ে
নিয়েছে সড়ক দূর্ঘটনা।
দুর্ঘটনার জন্য চালকের দক্ষতা ও সচেতনতার অভাবের বিষয়টি ঘুরেফিরে এলেও
প্রতিকারহীন সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরে পড়ছে মূল্যবান প্রাণ।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই)
তথ্য অনুযায়ী,
দেশে বছরে গড়ে ১২ হাজার সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে।
এমন
কোন দিন নেই- যেদিন দেশের কোন না কোন স্থান থেকে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের
মৃত্যু কিংবা আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করার মর্মান্তিক খবর আসছে না।
সব
মৃত্যুই বেদনার।
তবে
অকালমৃত্যুর যাতনা সীমাহীন।
দুর্ভাগ্যের বিষয়,
এদেশের অসংখ্য মানুষ প্রতিদিনই এ ধরনের কষ্টকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।
বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়।
লাইসেন্সবিহীন চালকদের হাতে স্টিয়ারিং ধরিয়ে দেয়ার অবধারিত ফল এটি।
দেশে এরকম অবৈধ চালকের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ।
প্রতি বছর সড়কপথে অন্তত ৫ হাজার দুর্ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে।
এসব
দুর্ঘটনায় মারা যায় কমপক্ষে ৪ হাজার মানুষ ও পঙ্গুত্ব বরণ করে এর দ্বিগুণ।
আর
আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।
সড়ক
দুর্ঘটনা নিহত বা পঙ্গু ব্যক্তির পরিবারের সারাজীবনের অপূরণীয় বেদনা ও
আর্থিক সংকটে নিপতিত হওয়ার কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
এর
প্রভাব পড়ছে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতেও।
একজন কর্মক্ষম সচল মানুষ হঠাৎ করে অক্ষম অচল হয়ে গেলে পরিবার,
সমাজ,
রাষ্ট্র সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সড়ক
দুর্ঘটনা অপ্রতিরোধযোগ্য কোন বিষয় নয়।
কিন্তু এ বিষয়ে ইতিবাচক চিন্তা করার ও সেই চিন্তা বাস্তবে রূপায়িত করার
কোন মানুষ দেশে আছে বলে মনে হয় না।
আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনার চিত্র এককথায় ভয়াবহ।
এ
অব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়ে যা খুশি তা-ই করে যাচ্ছে দেশের পরিবহন খাতের
মহারথীরা।
তারা একদিকে যাত্রীদের কাছ থেকে গলাকাটা ভাড়া আদায় করছে,
অন্যদিকে অদক্ষ চালকের হাতে গাড়ি চালনার ভার দিয়ে অসংখ্য মানুষের জীবন নিয়ে
ছিনিমিনি খেলছে।
সবকিছু জানার পরও দেশের মানুষ নিরুপায়।
কারণ তাদের সামনে আর কোন বিকল্প নেই।
রাস্তার ওপর ও ফুটপাতে দোকানপাট,
অপরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থা ও ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজি,
খেয়ালখুশি মতো যত্রতত্র পার্কিং,
মহাসড়কের ওপর ম্যাক্সি-টেম্পোস্ট্যান্ডসহ রাস্তার মাঝখানে ডাস্টবিন ও
হাটবাজার স্থাপন সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হলেও বিষয়টি দেখার যেন কেউ নেই।
আরেকটি সমস্যা হচ্ছে সড়কপথের সংস্কার ও উন্নয়নের কাজটি যথাযথভাবে সম্পন্ন
না করা।
এর
ফলে সড়কের সিলকোট ও সুরকি উঠে গিয়ে বিভিন্ন অংশে খানাখন্দের সৃষ্টি হওয়ায়
প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে নানা ধরনের দুর্ঘটনা।
আগামী দশ বছরের মধ্যে দেশে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত ইনজুরি ও মৃত্যুর সংখ্যা
অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রণীত ডিকেড অব
অ্যাকশন অন রোড সেফটি ২০১১-২০২০ এর নির্দেশনা অনুসারে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা
কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
এতে
জনসাধারণের মধ্যে নিরাপদ সড়ক ব্যবহারে আচরণগত পরিবর্তন আনার উদ্যোগ গ্রহণ
ছাড়াও নিরাপদ সড়ক ও ত্রুটিমুক্ত যানবাহন চলাচলের ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
আমরা আশা করব,
কর্মপরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষ আন্তরিকতার পরিচয় দেবে।
|