জনগণের স্বার্থে নতুন উদ্যমে পথ চলা শ্রেয়

 

শেখ উল্লাস ॥ 

 

সরকার গঠনের তিন বছর পূর্তির প্রাক্কালে ৫ জানুয়ারি, ২০১২ জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জনগণের স্বার্থই তার সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার কিন্তু বর্তমানে দেশের জনগণের অগ্রাধিকার কোন্‌টি সে কথা কি প্রধানমন্ত্রী এখন জানতে পারছেন? বা জানার চেষ্টা করেছেন? আর দেশের বর্তমান পরিস্থিতির কথা তিনি জানবেনই বা কীভাবে? বর্তমানে সংবাদপত্রসহ সকল গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা থাকলেও অবস্থাদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী এখন গণমাধ্যমের কথা বিশ্বাসই করছেন না প্রতিদিন গণমাধ্যমে দেশের বাস্তব পরিস্থিতির অনেক তথ্য, জনগণের অনেক সমস্যার কথা উঠে আসলেও প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বিশ্বাস করেন বলে মনে হয় না কারণ, জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে এসব সমস্যার কথা তিনি এড়িয়ে গেছেন বলেই প্রতীয়মান হয়েছে গত তিন বছরে দেশে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়নি, সাংবাদিকতাও শক্তিশালী হয়নি সাংবাদিকতা শক্তিশালী হলেই হয়তো গণমাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত খবরে তিনি উদ্বিগ্ন হতেন, এসব সমস্যা সৃষ্টির জন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে শাস্তমূলক ব্যবস্থা নিতেন এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে এগুলোর সমাধানে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতেন কিন্তু পত্র-পত্রিকা বা গণমাধ্যমের কোন খবরকে তিনি গুরুত্বসহকারে নিচ্ছেন বলে তা কেউ বলতে পারবে না অথচ জনগণের অগ্রাধিকার কোন্‌টি বা কী তা খুঁজে পাওয়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হচ্ছে গণমাধ্যম আজকের দিনে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশেই ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে এ কথা ঠিক কিন্তু এ কথাও ঠিক যে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমে দেশ ও জনগণের অবস্থা সম্পর্কে অনেক কিছুই থাকে গণমাধ্যমে উঠে আসা আলোচনা ও সমালোচনাকে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীতে না নিয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীতে নেয়াটাই এক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত বলেই মনে করেন দেশের সচেতন মহল আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা থাকলে গণমাধ্যম থেকে দেশ ও জাতির বাস্তব পরিস্থিতি থেকে ধারণা নেয়া যেতে পারে অর্থাৎ, জনগণের অগ্রাধিকার পূরণের জন্য কাজ করার মতো অনেক দিক নির্দেশনাই গণমাধ্যমে পাওয়া যেতে পারে

আওয়ামী লীগের মতো একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের  সাথে জনগণের দূরত্ব তৈরি হবে, অর্থাৎ তারা জনগণের অগ্রাধিকার কোন্‌টি তা তারা বুঝতে অক্ষম হয়ে উঠবেন-সে কথা বাহ্যিক দৃষ্টিতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এখন যেন তাই হচ্ছে ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়-এ মনোভাব পোষণ করেন এমন নেতাকর্মীর সংখ্যা এ দলটিতেই এখন আশংকাজনক হারে কমে যাচ্ছে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর বিস্তারিত ভাষণে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে বিরাজমান অনেক সমস্যা যেমন- বর্তমানে প্রায় অকার্যকর জাতীয় সংসদ,আগামী নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, প্রধান বিরোধী দলের সাথে সংঘাতের রাজনীতি, সরকারি দল ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলোর অনেক নেতাকর্মীর খাই খাই ভাব, রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থায় দুঃসহ পরিস্থিতি ইত্যাদি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিরসনে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে তেমন কোনো কথাই প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে ছিল না যে জন্য প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণকে অনেকেই গতানুগতিক ভাষণ বলেই উল্লেখ করেছেন দিন বদলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা মহাজোট সরকারের প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণে তাই স্বভাবতই হতাশ হয়েছেন অনেকেই জনগণের চাওয়া-পাওয়া অর্থাৎ জনগণ প্রকৃত অর্থেই কী চায় তা যদি একজন প্রধানমন্ত্রী বা একটি সরকার বুঝতে না পারে তবে ধরে নেয়া যায় যে, সরকারের ভেতরে কোথাও না কোথাও একটি গলদ আছে যে-গলদের কারণে সরকার বা তার প্রধানমন্ত্রী দেশের বাস্তব পরিস্থিতি বা জনগণের অগ্রাধিকার কোনটি তা বুঝতে পারছেন না বা তাকে সেই পরিস্থিতি বুঝতে দেয়া হচ্ছে না ফলে জনগণ ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছে সরকারের ওপর আর মহাজোট সরকারের প্রতি জনগণের আস্থার টানে ভাটা পড়ছে বলে দেখা যাচ্ছে, যা দেশের বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম পরিচালিত জনমত জরীপে ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে

অবশ্য বিরোধী দলের কর্মকান্ডে যে জনগণ খুশী তাও কিন্ত নয় জনমত জরীপগুলোতে দেখা গেছে, বিরোধী দলের জনপ্রিয়তা কিছুটা বেড়েছে কিন্তু সেখানে তাদের কৃতিত্বের কিছু নেই আমাদের দেশের রাজনীতির চরিত্রগত একটি দিকই হচ্ছে, ক্ষমতায় থাকলে জনপ্রিয়তা কমতে থাকে

এ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাজের সুফল জনগণ পাচ্ছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক অংশের জনগণের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছে-এ কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না কৃষকদের মধ্যে সার বিতরণ সরকারের  আরও একটি বড় অর্জন খাদ্য উৎপাদনেও সরকারের কৃতিত্ব রয়েছে অর্থাৎ জনগণের স্বার্থ সম্পর্কে যথাযথভাবে অবহিত হয়ে সেগুলো বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ হয়েছে সেখানে সরকারের সফলতা ঠিকই এসেছে জনগণও তার সুফল ভোগ করেছে তবে অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারসাজিতে সাধারণ মানুষ এখনো যে জিম্মি হয়ে আছে তা সরকারকে বুঝতে হবে

সব মিলিয়ে বলা যায়, আগামী দুই বছরে জনগণের স্বার্থ ও অগ্রাধিকার কোন্‌টি তা বুঝতে হলে বৃহত্তর স্বার্থে সরকারকে আরও অনেক আন্তরিক ও সজাগ হতে হবে নিজেকে সবজান্তা না মনে করে গণমাধ্যমে উঠে আসা সমস্যাগুলো সমাধানে আরও অনেক তৎপর হতে হবে অযোগ্য ও অদক্ষ মন্ত্রীদের সরিয়ে যোগ্যদেরকে কাজের জায়গা করে দিতে হবে সমালোচনাকে ভয় ও উপেক্ষা না করে তা থেকে সমাধানের উপায় বের করে আনতে হবে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থার যে ভাটা পড়েছে তাকে স্বীকার করে নতুন উদ্যোমে আবার কাজ শুরু করার এখনই সময় নতুবা সবজান্তার পরিণাম যে কত দুঃখজনক হয় তাই তাদের জীবনে সত্য হয়ে দেখা দিতে পারে