তেভাগা এক মৃত্যুহীন সংগ্রাম

 

 

সংলাপ

 

বাংলায় পরম শ্রদ্ধা ও শপথের সঙ্গে পালিত হয়েছে তেভাগা দিবস বাংলার সংগ্রামী কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে ৪ঠা জানুয়ারী লাল অক্ষরে লেখা একটি তারিখ, এইদিনেই প্রকৃতপক্ষে শুরু হয় অবিভক্ত বাংলার ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন

৬৫ বছর আগে ১৯৪৭ সালের ৪ঠা জানুয়ারী অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর থানার তালপুকুর গ্রামে কৃষকের বাঁচার অধিকার অর্জন করতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদী পুলিশের গুলিতে নিহত হন স্থানীয় কৃষক সমিরুদ্দিন এবং শিবরাম মাঝি এঁরাই তেভাগা আন্দোলনের প্রথম দুই শহীদ পরে এই চিরিরবন্দরেই তেভাগার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশ-জমিদারের মিলিত আক্রমণে শহীদ হন গজেন বর্মণ এবং ঝডু বর্মণ শুধু এঁরা নন সমগ্র তেভাগা আন্দোলনে ১৯টি জেলার ৮৬ জন শহীদ হয়ে সংগঠিত গণ-আন্দোলনের ইতিহাসে এক নতুন পর্বের সূচনা করেন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠন, রাজনৈতিক দল, গণ-সংগঠন এমনকি সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলোও মিলিতভাবে ৪ঠা জানুয়ারীকে ঐতিহাসিক তেভাগা দিবস হিসাবে পালনে এগিয়ে এসেছেন শহীদদের স্মৃতিরক্ষা, তাদের উত্তরাধিকারীদের উপযুক্ত মর্যাদাদান, তেভাগা আন্দোলনের প্রকৃত মূল্যায়ন এবং ইতিহাসের পাতায় উপযুক্ত মর্যাদা সময়ের দাবি

 

৪ঠা জানুয়ারী

 

বাংলার মতো কৃষিপ্রধান দেশে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলা যে একান্ত জরুরী একথা প্রথম বুঝেছিলেন বামপন্থীরা তাই ১৯৩৬ সালে কলকাতায় বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সংগঠন কমিটি তৈরি হয় এবং ১৯৩৭ সালে বাঁকুড়া জেলার পাত্রসায়রে প্রথম সম্মেলনের ভেতর দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষকসভা পরবর্তী ১২ বছরে সমগ্র বাংলায় কৃষক আন্দোলনের জোয়ার বয়ে যায় দিনাজপুর জেলাতেও সংগঠিত কৃষক আন্দোলনের সূচনা হয় একদিকে এই জেলা ছিল বাংলার শস্যভান্ডার, অন্যদিকে এই জেলাতেই সবচেয়ে বেশি আয় ছিল দিনাজপুর জেলাতেই কৃষি থেকে সে আমলেই জেলার আয় সাড়ে ছয় কোটি ছাড়িয়ে যায় তবু কৃষকের ঘরে অন্ন নেই একদিকে যেমন দিনের পর দিন ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিলো, অন্যদিকে তেমনি হাজার হাজার বিঘা জমির মালিকও ছিলেন অনেকেই এদের নির্মম শোষণে চাষীর জীবন জেরবার হয়ে উঠেছিল জোতদাররা ছিল খুবই শক্তিশালী বিনা পরিশ্রমে অর্ধেক ফসল নিয়েও তারা খুশি থাকত না নিজের রক্ত জল করে যে চাষ করতো সেই আধিয়ারের অংশ থেকে মার্চা, তহুরী, খোলানচাঁহা, মহলদারী, গোলাপূজা, বরকন্দাজী, সন্ন্যাসী, হাতিখোয়া, মাছখোয়া, পার্বণী, গাজন, থিয়েটার প্রভৃতি বিভিন্ন নামে বেআইনীভাবে দফায় দফায় ধান কেড়ে নেয়া হতো এবং কর্জা ধান পরিশোধের নামে আধিয়ারের অংশ হতে সুদসহ দ্বিগুণ-তিনগুণ ধান কেটে নেয়া হতো ফলে হতো শতকরা ৫০ ভাগ সুদ সুদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন ঋণ নিতে হতো কারণ, উৎপন্ন ফসলের প্রায় সবটা জোতদারের ঘরে তুলে দিয়েও চাষীর ঋণ বকেয়া যেত কাজেই ঘরে ঘরে ক্ষোভের বারুদ জমা হচ্ছিল এই সময় ১৯৪৫ সালে খুলনা জেলার মৌভাগে কৃষকসভার নবম সম্মেলন থেকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ বিষয়ক প্রস্তাবে জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকদের শেষ সংগ্রামের জন্য প্রস'ত হতে আহ্বান করা হয় ওই সম্মেলন থেকেই বর্গাদারদের জন্য তেভাগা আইন প্রণয়নের দাবি করা হয় একই বছরে সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক কৃষক কাউন্সিল থেকে সিদ্ধান্ত হয় যে, তেভাগার লড়াই আসন্ন মরসুমেই শুরু করতে হবে এর পিছনে একটা কারণ ছিল ১৬ই আগস্ট, ১৯৪৬ কলকাতায় ভয়ঙ্কর দাঙ্গা হয়েছে

জেলায় জেলায় এই দাঙ্গাকে ছড়িয়ে দেবার জন্য কুচক্রীরা খুবই সক্রিয় তাই কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ সক্রিয় আন্দোলন দিয়ে একদিকে জেলায় জেলায় দাঙ্গা প্রতিরোধ করা এবং তেভাগার দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আন্দোলনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় স্লোগান ওঠে: গ্রামে গ্রামে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য গড়ে তোল এবং এই মরসুমেই তেভাগা চাই

আর এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসে কৃষক সমিতির শক্ত ঘাঁটি দিনাজপুর জেলা সেপ্টেম্বর মাসেই জেলাজুড়ে চলে তীব্র খাদ্য আন্দোলন অক্টোবর মাসে জেলা কমিটি এবং কৃষক সমিতি নিজ খোলানে (খামারে) ধান তোল; আধি নাই, তেভাগা চাই; কর্জা ধানের সুদ নাই-এই তিন দাবির ভিত্তিতে জেলায় তেভাগা আন্দোলন শুরুর সিদ্ধান্ত এবং পরিকল্পনা নেয় জেলা সম্পাদক সুশীল সেন, বিভূতি গুহ, রূপনারায়ণ রায়, গুরুদাস তালুকদার, জনার্দন ভট্টাচার্য, হাজী দানেশ, বরদা চক্রবর্তী প্রমুখের নেতৃত্বে শুরু হয় নতুন জনজাগরণ গ্রামের মাঠে মাঠে তখন সোনালী ধানের সমারোহ স্লোগানে স্লোগানে কেঁপে ওঠে সারা দিনাজপুর, পথে পথে লাঠিধারী ভলান্টিয়ার কোথাও সাম্প্রদায়িকতার চিহ্নমাত্র নেই।  সর্বত্র প্রবল উদ্দীপনা জোরকদমে সর্বত্র ধানকাটা চলতে লাগলো ধান উঠতে লাগলো আধিয়ারের খোলানে আতঙ্কিত জোতদাররা দল বেঁধে ছুটলো প্রশাসনিক কর্তাদের কাছে ধান চুরির মিথ্যা অভিযোগে হাজার হাজার গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয় এবার পুলিশ গ্রেফতার করতে গ্রামে ঢুকলে তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় জোতদারদের প্রতি গ্রামীণ সর্বহারা শ্রেণীর তীব্র শ্রেণী ঘৃণার প্রকাশ ঘটে তেভাগা আন্দোলনে

 

প্রথম শহীদ শিবরাম-সমিরুদ্দিন

 

৪ঠা জানুয়ারী, ১৯৪৭ চিরিরবন্দর কৃষক আন্দোলনের অপেক্ষাকৃত নতুন ঘাঁটি দিনাজপুর শহর থেকে মাত্র ৬ মাইল দূরে চিরিরবন্দরের তালপুকুর আর নানিয়াটিকুড়ি গ্রাম আন্দোলনের আহ্বানে এখানকার আধিয়াররা মাঠ থেকে ধান তুলতে শুরু করেন জোতদারদের মধ্যে গেল গেল রব ওঠে তারা থানায় অভিযোগ করে যে গ্রামে ধান লুট হচ্ছে ৪ঠা জানুয়ারী পুলিশবাহিনী তালপুকুর গ্রামে গ্রেফতারির পরোয়ানা নিয়ে আসে অবাধ্য আধিয়ারদের গ্রেফতার করতে কিন' গ্রামে তখন অবাধ্যতার ঢেউ হাজারে হাজারে আধিয়ার মাঠে জড়ো হয়ে ৩০/৪০ জন সশস্ত্র পুলিশকে ঘিরে ফেলে হিমালয় সংলগ্ন এই জেলায় জানুয়ারী মাসে প্রচ- শীত নিবারণের জন্য মাথায় সাদা এক টুকরো কাপড় বেঁধে রাখেন স্থানীয় মানুষজন-তাকেই সাদা বক বলা হতো।  পুলিশ এই সাদা বকের ঝাঁকের ভেতর থেকেই সমিরুদ্দিন এবং শিবরামকে গ্রেফতার করে নিয়ে যেতে চায় সমিরুদ্দিন ছিলেন খেতমজুর তাদের পূর্বপুরুষদের সামান্য জমি চলে যায় জমিদার বিশ্বস্তর বড়াল আর মতিলাল চৌধুরীর লোলুপগ্রাসে গ্রামীণ চৌকিদার ছিলেন তিনি, সামান্য বেতন তাই খেতমজুরি করে কোন রকমে দিন চলতো তাকে যখন পুলিশ বন্দুকের বাট দিয়ে মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছে তখন সমিরুদ্দিনের বিধবা মা পুলিশের পা জড়িয়ে ধরে জানতে চেয়েছিলেন তার ছেলের কী অপরাধ? উত্তর না দিয়ে বর্বর পুলিশ পদাঘাতে গুরুতর আহত করে সমিরুদ্দিনের মাকে আর শিবরাম ছিলেন একান্তই গরিব সাঁওতাল আধিয়ার এই দুজনকে যখন পুলিশ মিথ্যা অভিযোগে জোর করে নিয়ে যাচ্ছে তখনই সেই তালপুকুর মাঠে গ্রামের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে জড়ো হয়ে পুলিশের পথ রোধ করে কন্ঠে তাদের স্লোগান ছিল-জান দিব, ধান দিব না এটা শুধু স্লোগান ছিল না তারা জান দিয়েছে, তবু ধান ছাড়েনি এই সময় পুলিশের নির্বিচার গুলি চালনায় সমিরুদ্দিন ও শিবরাম শহীদ হন পোহাতু বর্মণ নামে একজন দরিদ্র রাজবংশী কৃষক গুরুতর আহত হন এবং পরে ডানপা-টি কেটে বাদ দিতে হয় এছাড়া বহু নারী এবং পুরুষ পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে দিনাজপুর হাসপাতালে ভর্তি হন সমাবেশে ১০/১২ জন সাঁওতাল এসেছিলেন তাদের সব সময়ের সঙ্গে তীর-ধনুক নিয়ে পুলিশের বর্বর আচরণ দেখে সি'র থাকতে না পেরে তাদেরই একজন তীর ছোঁড়েন তাতে গুলিবর্ষণরত একজন পুলিশ নিহত হয় পুলিশের গুলিতে নিহত দুই শহীদ সমিরুদ্দিন এবং শিবরামের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য দিনাজপুর শহরে নিয়ে গেলে এই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে দিনাজপুর কলেজের ছাত্ররা ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে আসে দুই শহীদের শবদেহ পরিবারের হাতে তুলে না দিয়ে গোপনে দিনাজপুর শহরে কবর দেয়া হয় এইভাবে ৪৬-এর আগস্টে কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রায়শ্চিত্ত করলেন তেভাগার দুই শহীদ হিন্দু-মুসলমানের মিলিত রক্তে রচিত হলো ইতিহাসের নতুন দিগন্ত

তালপুকুরের যে মাঠে সমিরুদ্দিন এবং শিবরাম শহীদ হন সেই মাঠ এখন শহীদ ময়দান জেলার প্রগতিশীল সংগ্রামী মানুষ তিল তিল করে অর্থ সংগ্রহ করে যে স্থানে এরা শহীদ হন সেই জায়গাটি সুদৃশ্য শহীদবেদী নির্মাণ করেছেন এবং আশপাশের জায়গা সংগ্রহ করে শুধু শহীদ স্মৃতি রক্ষাই নয় গণ-আন্দোলনের ইতিহাস চর্চাসহ নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন ৪ঠা জানুয়ারী প্রতি বছরের মতো এবারও শহীদের রক্তস্নাত সেই মাঠেই সারাদিন ধরে শহীদস্মৃতি স্মরণ এবং নানা অনুষ্ঠান চলেছে এতে যোগ দেবার জন্য বাংলাদেশের নানা প্রান্ত থেকে বহু ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, কৃষক নেতৃত্বসহ হাজার হাজার সংগ্রামী মানুষ সমবেত হন এই মুক্তিতীর্থে

১২ই মার্চ, ১৯৪৭ রাজ্য বিধানসভায় দাঁড়িয়ে কমিউনিস্ট নেতা জ্যোতি বসু বলেছিলেন যে, দিনাজপুরের সমিরুদ্দিন এবং শিবরামের মতো মানুষদের প্রাণদান ব্যর্থ হবে না

না, তাদের প্রাণদান ব্যর্থ হয়নি বাংলার চিরবঞ্চিত কৃষক বাংলার সবচেয়ে বৈপস্নবিক এবং গৌরবময় সংগ্রামে শামিল হয়ে যে ঐতিহ্য সেদিন সৃষ্টি করেছিলেন তা আজও আমাদের সকল সংগ্রামের প্রেরণা তেভাগা এক মৃত্যুহীন সংগ্রামের নাম তাই এই সংগ্রামের শিখা অনির্বাণ আজ যে দুই বাংলায় কৃষকের অধিকার খানিকটা প্রতিষ্ঠিত এবং শতশত বছরের অবনত মস্তক আজ মাথা তুলতে পারছে তার পিছনেও মরণজয়ী তেভাগা আন্দোলনের প্রভাব রয়েছে ওপার বাংলায় বামফ্রন্ট সরকার গড়ে ওঠার পিছনেও কৃষক আন্দোলনের ভূমিকাকে উপেক্ষা করা যাবে না আজ কৃষিক্ষেত্রে নতুন করে  যখন সংকট দেখা দিচ্ছে, কৃষকের জীবনে নেমে আসছে অন্ধকার তখন তেভাগা আন্দোলনের অমর শহীদদের স্মৃতির প্রতি পুনর্বার শ্রদ্ধা জানানো জরুরী হয়ে উঠেছে আমরা যেন কোনো স্বর্গমৃগের প্রলোভনে এক মুহূর্তের জন্য ভুলে না যাই যে, আমাদের সকল অগ্রগতির ক্ষেত্রে কৃষি এবং কৃষকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তেভাগা দিবস পালনের মধ্য দিয়ে  বাংলার জনজীবনে কৃষি ও কৃষক আন্দোলন নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠুক আজকের দিনে সেটাই সকলের কাম্য কৃষকের অনেক দাবিই আজও পর্যন্ত উপেক্ষিত।  বাংলাতেই আবার নতুন আন্দোলনের জোয়ার থেকে আগামীদিনের জন্য নতুন জীবনের সূত্রপাত হবে এটাই সকল সংগ্রামী মানুষের আশা