বিশ্ব উষ্ণায়ন-সভ্যতার সংকট

 

 

সংলাপ

 

 

নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে  চলাই পরিবেশের ধর্ম তাই পরিবেশ বিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বিজ্ঞানীগণ পরিবেশের অনেক সংজ্ঞা দিয়েছেন সহজ করে বলতে গেলে পরিবেশ হলো আমাদের চারিদিকের সজীব ও নির্জীব বস্তুগুলোর পারস্পরিক ক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া, যার স্থান ও কাল  ভেদে পরিবর্তনশীল এইসব সজীব বা নির্জীব বস্তুর নির্দিষ্ট উপাদান আছে এই উপাদানগুলো প্রত্যেক বস্তুর মধ্যেই নির্দিষ্ট পরিমাণে বর্তমান থাকে কোন কারণে সেই উপদানগুলো পরিমাণে কম বা বেশি হয়ে গেলে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় পরিবেশ বিদ্রোহ করে ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় নানারকম বিপত্তি ঘটে দুরারোগ্য ব্যাধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি বাস্তব অভিজ্ঞতার নিরিখে পরিবেশ নিয়ে গোটা পৃথিবীতেই মানুষের ভাবনা চিন্তা বাড়ছে শুরু হয়েছে পরিবেশ দূষণ আন্দোলন উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকেই জন ম্যুর, গিফোর্ড পিনচোট, থুরো, মার্স প্রমুখ পরিবেশবিদগণ পরিবেশ আন্দোলন সূচনা করলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই আন্দোলন জোরদার রূপ পায় ১৯৬২ সালে র‌্যাচেল কারসন সাইলেন্ট সিপ্রং নামে একটি বই প্রকাশ করে প্রাকৃতিক পরিবেশে রাসায়নিক পদার্থের কুপ্রভাব নিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন পল আর এহরলিক তার বিখ্যাত বই দ্য পপুলেশন বোম্ব (১৯৬৮) - এ পরিবেশের ওপর জনসংখ্যা বৃদ্ধির ভয়াবহ পরিণামের কথা উল্লেখ করেন তবে পরিবেশ দূষণের ভয়াবহতা আন্তর্জাতিক  স্বীকৃতি পায় মোটামুটিভাবে ১৯৭২ সাল থেকে ওই বছর স্টকহোমে অনুষ্ঠিত হয় ইউনাইটেড নেশন কনফারেন্স অন দ্য হিউম্যান এনভায়রনমেন্ট রাষ্ট্রগুলো পরিবেশ দূষণের বিপদ সম্বন্ধে মত বিনিময় শুরু করে তারপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই চলছে জলবায়ুকে দূষণমুক্ত করার ভাবনাচিন্তা

পরিবেশ দূষণের অন্যতম ফল বিশ্ব উষ্ণায়ন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ বিশ্ব পরিবেশ আন্দোলনের অংশীদার দেশের মানুষের পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানোর জন্য চাই লাগাতার প্রচার কিন্তু সাধারণ মানুষ খুব সহজেই বুঝতে পারেন এমন বই বা পুস্তকার যথেষ্ট অভাব আছে বিশেষ করে বিজ্ঞানের ছাত্র না হয়েও সহজে পরিবেশ বিজ্ঞান বুঝতে পারে, এমন বাংলা বইয়ের সংখ্যা খুবই কম

জলবায়ু এবং বাসযোগ্য পরিবেশকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় যে নয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিপদসীমা অতিক্রম করেছে, সেই উপাদানগুলো হলোঃ ১. জলবায়ু পরিবর্তন, ২ সমুদ্রে অম্লতা বৃদ্ধি, ৩. বায়ুমন্ডলের উপরিভাগের ওজন গ্যাসের ক্ষয়, ৪. প্রাণী ও ভূরসায়ন সম্পর্ক, ৫. পানীয় জলের ব্যবহার, ৬. জমির চরিত্র পরিবর্তন, ৭. জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, ৮. বায়ুতে ক্ষতিকারক দূষণ নির্গমন, ৯. রাসায়নিক দূষণ উষ্ণায়নের ফলে গোটা পৃথিবীই আজ মারাত্মক বিপদের সামনে স্মরণাতীত কাল থেকে মেরু প্রদেশের জমা বরফ এখন ক্রমাগত গলছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সাত মিটার (মোটামুটিভাবে ২২/২৩ ফুট) পর্যন্ত বেড়ে যাওযার সম্বাবনা

পৃথিবীর প্রায় ৪০০ কোটি মানুষের বাস সমুদ্রপৃষ্ঠের ১৫ ফুট উচ্চতার মধ্যে তাই দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর ভবিষ্যত সহজেই অনুমেয় হিমবাহ গলে যাওয়ায় ভারত, বাংলাদেশ প্রভৃতি নদীমাতৃক দেশগুলোর সমস্যা বেড়ে চলেছে আগামী দিনে গোটা পৃথিবী জুড়েই দেখা দেবে মারাত্মক খাদ্যাভাব

বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যাওয়া, বাতাসে গ্রীন হাউস গ্যাসের অন্যতম উপাদান সিও২ (CO2) বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের জলে আগের থেকে বেশি (CO2) অম্লতা বৃদ্ধি করেছে সমুদ্রের প্রাণীদের জীবন সংশয় দেখা দিয়েছে প্রাণী জগতের অন্যান্য অংশেও ঠিক একই ঘটনা ঘটছে পৃথিবীতে জনসংখ্যার বিস্ফোরণের ফলে তা এখন ৭০০ কোটিতে পৌঁছে গেছে ফলে চাষযোগ্য জমি কমে যাওয়া ছাড়াও তৈরি হচ্ছে বন কেটে বসত পরিণামে ভূমিক্ষয় হচ্ছে, বাড়ছে নগরের সংখ্যা নগরায়নের ফলে বাড়ছে বেহিসেবি কারখানার সংখ্যা কারখানার ধোঁয়া এবং বর্জ্য  পদার্থ নদনদীর জল দূষিত করে নতুন বিপত্তি ঘটাচ্ছে বিদ্যুৎসহ পেট্রোল ডিজেলের চাহিদা মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়ছে তৈরি হচ্ছে পরিবেশ দূষণের আর এক নতুন দিক মুনাফার লোভে আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো তেল-যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এমন একটি মুহূর্ত নেই যখন যুদ্ধবাজেরা বারুদের ধোঁয়ায় মুক্ত আকাশ বিষাক্ত করে না তুলছে আকাশের কোন সীমানা নেই পরমাণু অস্ত্র বা অন্যান্য বিষাক্ত অস্ত্রের পরীক্ষা নিরীক্ষা সভ্যতার সঙ্কটকে তীব্রতর করে করে তুলছে তবে দেরিতে হলেও আশার কথা এই যে আজ পৃথিবীর বেশিরভাগ রাষ্ট্রই এ বিষয়ে সচেতন হয়ে এই আত্মহননের পথ থেকে বাঁচার পথ খুঁজছে বিভিন্ন সম্মেলনের মাধ্যমে চলছে এইসব দূষণের হাত থেকে বাঁচার পথ খোঁজা

১৯৮৫ তে প্রথম আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন, ১৯৮৬তে জাতিসঙ্ঘের ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অব ক্লাইমেট চেঞ্জ গঠন, ১৯৯২ তে ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন  অন ক্লাইমেট চেঞ্জ, ১৯৯৭ তে জাপানে কিয়োটো প্রোটোকল, ২০০২ সালে জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন  এবং অন্যান্য কয়েকটি  দেশের কিয়োটো চুক্তিতে স্বাক্ষর, ২০০৯ তে কোপেনহেগেন জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত শীর্ষ বৈঠক, ২০১০ - এ মেক্সিকোর কানকুনে এফ সি সি-র ১৬তম অধিবেশন, ২০১১ সালের ফেব্রম্নয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ষষ্ঠতম মন্ত্রীগোষ্ঠীর সভা

শ্রেণী বিভক্ত সমাজে গরিব মানুষ যেমন ধনীদের দ্বারা শোষিত হয়, ঠিক তেমনি পৃথিবীতেও ধনী দেশগুলো গরিব দেশগুলোকে শোষণ করে ওদের বেহিসেবী ভোগের অভিশাপ গরিব দেশগুলোর ওপর বর্তায় সারা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতকরা মাত্র ৭ ভাগ ধনী দেশগুলোতে বাস করে কিন্তু তারা মোট গ্রিন হাউস গ্যাসের ৫০ ভাগই নির্গমন করে আর গরিব দেশগুলোতে মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫০ ভাগ বাস করলেও তারা নির্গমন করে মাত্র শতকরা ৭ ভাগ ধনী দেশগুলো তাদের  সমস্ত দায় এড়িয়ে যাচ্ছে সময় এসেছে সচেতন হওয়ার নয়তো  প্রকৃতিও প্রতিশোধ নেবে যা প্রতিহত করার শক্তি কোন রাষ্ট্রের নেই স্মরণ রাখতে হবে সাবধানের মার নেই