১৩ আগস্ট ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন খ্যাতিমান
চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও এটিএন নিউজের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার
(সিইও) মিশুক মুনীর।
যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবু তাহের,
তিনবারের অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান,
চলচ্চিত্র পরিচালক আলমগীর কবির সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জীবন
কেড়ে নিয়েছে সড়ক দূর্ঘটনা।
দুর্ঘটনার জন্য চালকের দক্ষতা ও সচেতনতার অভাবের বিষয়টি ঘুরেফিরে এলেও
প্রতিকারহীন সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরে পড়ছে মূল্যবান প্রাণ।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের
(এআরআই) তথ্য অনুযায়ী,
দেশে বছরে গড়ে ১২ হাজার সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে।
এমন কোন দিন নেই- যেদিন দেশের কোন না কোন স্থান থেকে সড়ক দুর্ঘটনায়
মানুষের মৃত্যু কিংবা আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করার মর্মান্তিক খবর আসছে
না।
সব মৃত্যুই বেদনার।
তবে অকালমৃত্যুর যাতনা সীমাহীন।
দুর্ভাগ্যের বিষয়,
এদেশের অসংখ্য মানুষ প্রতিদিনই এ ধরনের কষ্টকর পরিস্থিতির মুখোমুখি
হচ্ছে।
বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়।
লাইসেন্সবিহীন চালকদের হাতে স্টিয়ারিং ধরিয়ে দেয়ার অবধারিত ফল এটি।
দেশে এরকম অবৈধ চালকের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ।
প্রতি বছর সড়কপথে অন্তত ৫ হাজার দুর্ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে।
এসব দুর্ঘটনায় মারা যায় কমপক্ষে ৪ হাজার মানুষ ও পঙ্গুত্ব বরণ করে এর
দ্বিগুণ।
আর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।
সড়ক দুর্ঘটনা নিহত বা পঙ্গু ব্যক্তির পরিবারের সারাজীবনের অপূরণীয়
বেদনা ও আর্থিক সংকটে নিপতিত হওয়ার কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
এর প্রভাব পড়ছে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতেও।
একজন কর্মক্ষম সচল মানুষ হঠাৎ করে অক্ষম অচল হয়ে গেলে পরিবার,
সমাজ,
রাষ্ট্র সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সড়ক দুর্ঘটনা অপ্রতিরোধযোগ্য কোন বিষয় নয়।
কিন্তু এ বিষয়ে ইতিবাচক চিন্তা করার ও সেই চিন্তা বাস্তবে রূপায়িত
করার কোন মানুষ দেশে আছে বলে মনে হয় না।
আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনার চিত্র এককথায় ভয়াবহ।
এ অব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়ে যা খুশি তা-ই করে যাচ্ছে দেশের পরিবহন
খাতের মহারথীরা।
তারা একদিকে যাত্রীদের কাছ থেকে গলাকাটা ভাড়া আদায় করছে,
অন্যদিকে অদক্ষ চালকের হাতে গাড়ি চালনার ভার দিয়ে অসংখ্য মানুষের জীবন
নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে।
সবকিছু জানার পরও দেশের মানুষ নিরুপায়।
কারণ তাদের সামনে আর কোন বিকল্প নেই।
রাস্তার ওপর ও ফুটপাতে দোকানপাট,
অপরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থা ও ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজি,
খেয়ালখুশি মতো যত্রতত্র পার্কিং,
মহাসড়কের ওপর ম্যাক্সি-টেম্পোস্ট্যান্ডসহ রাস্তার মাঝখানে ডাস্টবিন ও
হাটবাজার স্থাপন সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হলেও বিষয়টি দেখার যেন কেউ নেই।
আরেকটি সমস্যা হচ্ছে সড়কপথের সংস্কার ও উন্নয়নের কাজটি যথাযথভাবে
সম্পন্ন না করা।
এর ফলে সড়কের সিলকোট ও সুরকি উঠে গিয়ে বিভিন্ন অংশে খানাখন্দের সৃষ্টি
হওয়ায় প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে নানা ধরনের দুর্ঘটনা।
আগামী দশ বছরের মধ্যে দেশে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত ইনজুরি ও মৃত্যুর সংখ্যা
অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রণীত ডিকেড অব
অ্যাকশন অন রোড সেফটি ২০১১-২০২০ এর নির্দেশনা অনুসারে জাতীয় সড়ক
নিরাপত্তা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
এতে জনসাধারণের মধ্যে নিরাপদ সড়ক ব্যবহারে আচরণগত পরিবর্তন আনার উদ্যোগ
গ্রহণ ছাড়াও নিরাপদ সড়ক ও ত্রুটিমুক্ত যানবাহন চলাচলের ওপর জোর দেয়া
হয়েছে।
আমরা আশা করব,
কর্মপরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষ আন্তরিকতার পরিচয় দেবে।