|
যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর অপকৌশল!
প্রথমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার একটি মামলার গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী
করেছিলো আদালত।
তারপরই রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাসহ কয়েকটি মামলায় জামায়তের তিন শীর্ষনেতাকে
গ্রেফতার করে পুলিশ।
এদের তিনজনের জন্য ১৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।
জামায়াতের এ তিন নেতা হচ্ছেন সংগঠনের আমির মতিউর রহমান নিজামী,
সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান,
মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং নায়েবে আমির দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী।
কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সুবিধাজনক সময়ে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য
রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জামায়াতের এই তিন নেতার ভূমিকা নিয়ে
ব্যাপক অভিযোগ থাকলেও তারা এতদিন বলতে গেলে বহাল তবিয়তেই এ দেশে ছিলেন।
তথাকথিত ধর্ম-কর্ম,
ব্যবসা-বাণিজ্য,
এমপি-মন্ত্রী হয়ে রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধার ব্যবহার তারাই এতদিন করছিলেন।
রাজনীতিবিদ হিসেবে,
ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসাবে,
অনেক ব্যাংক-বীমা কোম্পানীর কর্ণধার হিসেবেও তারা ছিলেন অগ্রগামী।
তাদের প্রতি ছিল না শুধু সাধারণের ভালবাসা,
শ্রদ্ধা।
আজ স্বাধীনতার প্রায় ৪০ বছর পর যখন তাদেরকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে
বিভিন্ন অপরাধের দায়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে তখন জাতির বিবেকের কাছে মনে
হচ্ছে,
খুলে যাচ্ছে
’৭১
এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ।
কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য হচ্ছে,
দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি পরোক্ষভাবে হলেও জামায়াতের নেতাদের পক্ষে
সুর মিলিয়ে বক্তৃতা-বিবৃতি,
সভা-সমাবেশ করার চেষ্টা করছে,
সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য হরতাল দিচ্ছে।
অবশ্য
জোটগতভাবে যে এ দুদলের মধ্যে অনেক খাতিরের সম্পর্ক রয়েছে তা অস্বীকার
করার কোনো সুযোগ নেই।
তবে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে,
বিএনপির কৌশল হচ্ছে তারা জামায়াতের পাশে থাকলেও যুদ্ধাপরাধের দায় নিতে
যাবে না।
যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব না দেখিয়ে সঠিক বিচারের দাবি
নিয়ে অনঢ় অবস্থানে থাকবে দলটি।
যুদ্ধাপরাধের বিচার থেকে জামায়াত নেতাদের বাঁচাতেই বিএনপি তাদের মুক্তি
দাবি করছে বলে সরকারি দল যে অভিযোগ তুলেছে তা ইতোমধ্যে নাকচ করে দিয়েছেন
বিএনপির শীর্ষ স্থানীয় নেতারা।
বিএনপি নেতাদের দাবি এ বিষয়ে তাদের ভিন্ন অবস্থান রয়েছে।
চারদলীয় জোটের শরীক হিসেবে জামায়াতে নেতাদের মুক্তি চেয়েছে বিএনপি।
একটি ইস্যুর সঙ্গে আরেকটি ইস্যু সম্পৃক্ত করার পক্ষে নয় বিএনপি।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড.খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন,
‘জামায়াতের
শীর্ষ নেতাদের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থেকে বাঁচানোর জন্য যে আমরা তাদের
মুক্তি দাবি করেছি এটা ভাবা ঠিক হবে না।
.........
বিএনপি যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিপক্ষে নয়।
তবে এটা হওয়া উচিৎ সঠিক প্রক্রিয়ায়।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য লে.জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন,
আমরা একটার সঙ্গে আরেকটি ইস্যু গুলিয়ে ফেলতে চাই না।
জামায়াত নেতাদের মুক্তি চাওয়া যে যুদ্ধাপরাধের পক্ষে নেয়া- এটা ভাবা ঠিক
হবে না।
আমরাও যুদ্ধাপরাদের বিচার চাই।
কিন্তু আমাদের দাবি একটাই এই বিচার যাতে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার না হয় -
আমরা চাই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিচার।’
স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন,
‘জামায়াত
নেতাদের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ গ্রেফতার করা হয়নি।
আমরা জোটের শরীক একটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের মুক্তি চাইতেই পারি।
এই মুক্তি দাবির সঙ্গে যুদ্ধাপরাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’
(তথ্যসূত্র-
দৈনিক কালের কণ্ঠ,
৫
জুলাই,
২০১০)
তবে জামায়াতের ভিতরের সব যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে বিএনপির অবস্থান আরো
স্পষ্ট না হলে বিএনপি সম্পর্কে সংশয় থেকেই যাবে।
অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধের বিচারের দায়িত্ব এখন একমাত্র সরকারের ওপর।
কিন্তু সরকারি দলের নেতারা কথায় কথায় যুদ্ধাপরাধী-মানবতাবিরোধীদের
বিচারের কথা বলেছেন।
বিচারকার্য সম্পন্ন করার ইচ্ছা থাকলে চিৎকার না করে তা কাজের মাধ্যমেই
তার প্রমাণ করা উচিত।
সরকার হয়তো ধীরে সুস্থে সেই পথেই যাচ্ছে এবং তাড়াহুড়ো না করে দূরদর্শিতার
সাথেই যুদ্ধাপরাধীদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাইছে।
যা দেশপ্রেমিক,
প্রগতিশীল ও প্রকৃত ধর্মপ্রাণ মানুষদের মনে আশার সঞ্চার করছে যে এবার
বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে।
এই ঘৃণ্য অপশক্তিকে রাখার চেষ্টা যারা করবে তারা নিজের এবং দেশের জন্য
অমঙ্গলই বয়ে আনবে।
অগণিত অভিযোগ এবং এসব অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে তারা যদি দেশের ধর্ম,
রাজনীতি ও ব্যবসা বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠে তবে যা হবার তাই হয়েছে।
মিথ্যাচার কায়েম হয়েছে সর্বত্র,
কোনটা খাঁটি আর কোনটা মেকি বুঝা সাধারণের কাছে অত্যন্ত দুর্বোধ্য যে
কারণে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি আজো অর্জিত হয়নি।
এই পরিপ্রেক্ষিতে এদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি- একাত্তরের ঘাতক
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবার শুরু হবে বলে আশা করা যায়।
বর্তমান মহাজোট সরকারের পক্ষে জনগণের বিরাট সমর্থনও রয়েছে এ ব্যাপারে।
সরকার ইতোমধ্যে গঠন করেছে ট্রাইবুন্যাল,
তদন্তকারী দল আইনজীবী প্যানেল।
এদের বিচার হতেই হ্েব।
এই বিচারের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থনও এখন স্পষ্ট।
কিছুদিন আগে সমাপ্ত ত্রিমহাদেশীয় সম্মেলন শেষে ঢাকা .... তা পরিষ্কার
ভাবে যুক্ত হযেছে।
বর্তমান ও ভবিষ্যত বাংলাদেমের কল্যাণকর স্বার্থে সকল রাজনৈতিক দলকেই এ
বিচার কার্যে সর্বাত্মক সহোযোগিতা করা দরকার।
প্রধান বিরোধীদলের ব্যাপার যেহেতু অনেকের সংশয় রয়েছে সে কারণে তাদেরকে
আরো স্পষ্ট ভূমিকা নেয়া দরকার।
মনে রাখা দরকার যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে কোন অপকৌশল করে এদেশে কেউ টিকে
থাকতে পারবে না।
কেন না এ মাটিতে শুয়ে আছে লাখো শহীদ,
লাখো বাঙালি।
তাদের আত্মদান বৃথা যেতে পারে না।
অনামিকা
আজিমপুর,
ঢাকা।
বিশ্ব
জনসংখ্যা দিবস
১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বে প্রায় ৫০০ কোটি জনসংখ্যা সমষ্টি ছিল।
একটু পিছনে তাকালে দেখা যায় বিশ্বের জনসংখ্যায় যুক্ত হতো ৪ কোটি ৭০ লক্ষ
মানুষ,
১৯৮৫-৯০ খ্রিষ্টাব্দে জনসংখ্যার হার উন্নীত হয় ৮ কোটি ৬০ লক্ষে পৌঁছিয়েছে।
এরূপ জনসংখ্যা এত দ্রুত বৃদ্ধির ফলে বিশ্ববাসী জন্মহার বৃদ্ধি নিয়ে
উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।
তাছাড়া ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে তা বেড়ে ৩০০ কোটিতে দাঁড়ায়।
জনসংখ্যা এইরূপ দ্রুত বৃদ্ধির বিষয়টি হয়ে দাঁড়ায় বিপদ সংকেতের মতো।
তারই প্রেক্ষাপটে ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী (ইউএনডিপি) এর
সুপারিশে প্রতি বছর ১০ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ
করেন।
২০০০ সালে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল
‘নারীর
নিরাপদ জীবন আনে সামাজিক উন্নয়ন।
১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্ব জনসংখ্যা ৭০% ছিল উন্নয়নশীল দেশে।
এ
হার বেড়ে এখন ৮০% এ দাঁড়িয়েছে।
দেখা যায়,
জনসংখ্যা বৃদ্ধির ১৫% ঘটে উন্নয়নশীল দেশে।
বর্তমানে বিশ্বের জনসংখ্যা ৬০০ কোটি অতিক্রম করেছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রধান সমস্যা জনসংখ্যা সমস্যা।
কারণ সিংহভাগ জনসংখ্যাই বৃদ্ধি হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে।
বাংলাদেশ এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের শুরু থেকেই বাংলাদেশ জনসংখ্যাকে চিহ্নিত করে এ সমস্যা
সমাধানের জন্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
মাঠ-পর্যায়-গড়ে উঠেছে বিপুল মাঠকর্মী ও সেবাদান প্রকল্প।
মাঠকর্মী গণ সক্ষম সুখী দম্পতিদের ধরে ধরে পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে সদা-সর্বদা
পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিচ্ছে।
এর
ফলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সফলতা লাভ করেছে।
পরিবার-পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারকারীর হার ৭০ দশকে ৮% থেকে ৫১% উন্নীত
হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের গত ২০০৫ সালের মধ্যে দেশে সার্বজনীন পরিকল্পনা ছিল
দু-সন্তানের পরিবার গড়ে তোলা।
৩
জন বাংলাদেশ সরকারের লক্ষ্য ছিল ৭০% সুখী দম্পতিকে পরিবার পরিকল্পনার
সেবা-প্রদানের আওতায় আনা হবে।
নির্ধারিত এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৮ সালের জুলাই মাস হতে
৫ বৎসরব্যাপী স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা প্রোগ্রামকে অত্যাবশ্যকীয় সেবা প্যাকেজ
প্রদানের বহুমুখী কর্মসূচী গ্রহণ করে।
সেবা-মহাবিদ্যালয়,
মহাখালী-ঢাকা প্রতি বৎসর ১২০ জন বি.এসসি. নার্স এন্ড বি. এসসি পাবলিক
হেল্থ নার্স তৈরি করে দেশে ও বিদেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে অবিরাম
মাঠ পর্যায় সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
সেবা-মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষা ফলপ্রসূ হয়েছেন।
তিনি বর্তমানে অক্লান্ত পরিশ্রম করে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন জনসংখ্যা
নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে এই সেবা-দান প্রকল্পের সাথে আমি প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত
আছি।
জনসংখ্যাই আমাদের দারিদ্র্যতার অন্যতম প্রধান কারণ।
১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান বাংলাদেশ নামের এ ভূখন্ডে জনসংখ্যা ছিল ৪ কোটি।
আজ
১২.৫০ কোটিতে পৌঁছিয়েছে।
আশংকা করা হচ্ছে ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে এ সংখ্যা ২১ কোটিতে উপনীত হবে।
জনসংখ্যার এইরূপ দ্রুতবৃদ্ধির ফলে আমাদের দেশের সামাজিক জীবনে,
পরিবেশ সংরক্ষণে,
শিক্ষা,
স্বাস্থ্য,
পুষ্টি এবং কর্মসংস্থানে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
আমার ছেলেরা ভাল শিক্ষা-দীক্ষা নেয়ার পরও এখন পর্যন্ত শিক্ষাগত যোগ্য
সত্ত্বেও ভাল কর্মসংস্থান করতে পারে নাই।
আমি
দেশবাসীর জন্য এবং আমাদের সন্তানদের জন্য করুণাময়ের কৃপা কামনা করছি।
তিনি যেন আমাদের সন্তানদের উত্তরণ দেন সরকারি-হিসাব অনুযায়ী জনসংখ্যা
বৃদ্ধির হার ৩ থেকে ১.৬% এ নেমে এসেছে।
প্রজনন হার মহিলা প্রতি ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ৭ থেকে ৫.২% এ নেমে এসেছে।
সক্ষম দম্পতি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহীতার হার ১৯৭১ এর ৩% থেকে বৃদ্ধি
পেয়ে ৫১% হয়েছে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমস্যা হলেও এর প্রতিক্রিয়া সারাবিশ্বে
বর্তমান।
তাই
বিশ্বের দাতা দেশসমূহ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থাগুলো জনসংখ্যা
অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বোধের জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।
বিশ্বের সর্বত্র জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য উৎসাহিত হচ্ছে জনসংখ্যা দিবস।
১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে গঠিত জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল যথেষ্ঠ সজাগ।
স্বেচ্ছায় দেয়া চাঁদায় গঠিত এ তহবিল জনসংখ্যা খাতে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিয়ে
যাচ্ছে।
ইউএনএফপিএ এর কাজ হচ্ছে আন্তর্জাতিক ভিত্তিতে জনসংখ্যা পরিবার পরিকল্পনার
চাহিদার প্রতি সাড়াদানের সামর্থ্য গড়ে তোলা,
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে গণসচেতনতা বাড়ানো,
জনসংখ্যা কর্মসূচী এবং প্রকল্প প্রণয়নের জন্য সরকারসমূহকে সহায়তা দান এবং
সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করা।
বাংলাদেশ জনসংখ্যা তহবিলের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী ১৯৯০ সন থেকে বিশ্ব
জনসংখ্যা দিবস পালন করে আসছে।
হামিদা নার্গিস
আওয়ামী শব্দটির গুরুত্ব
(২)
সংলাপ
॥
(পূর্ব
প্রকাশের পর)
এর
আগে মুসলিম লীগের উদার ও প্রগতিশীল অংশের ছাত্র যুবকরা মুসলিম লীগের সদস্য
হতে পারেনি।
অথচ
এই প্রগতিশীল ছাত্র-যুবকরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বিরাট ভূমিকা
পালন করেছিলেন।
সব
মিলিয়ে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে চাপা ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ
করছিলো।
কিন্তু পুলিশী নির্যাতনের আতঙ্ক সর্বত্র।
এমনি অবস্থায় সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের
এক সাধকের দরবারে মুসলিম লীগ নামের আগে
‘আওয়ামী’
(যার
আভিধানিক অর্থ সাধারণ জনগণ-আমজনতা) শব্দটি জুড়ে দিয়ে আওয়ামী-মুসলিম লীগ’
নামের একটি সংগঠনের জন্ম দেয়া হলো- যার উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতাসীনদের অনৈতিক
কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কথা বলা।
অর্থাৎ
‘আওয়ামী
মুসলিম লীগ’
দলটির জন্ম পাকিস্তানে।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সেই দলটি পরবর্তীকালে তৎকালীন পূর্ববাংলা এবং আজকের
এই বাংলাদেশেই বেশি বিস্তার লাভ করে।
এমনকি এদেশের বিগত ৬০/৬১ বছরের ইতিহাস এবং স্বাধীনতা,
গণতন্ত্রসহ যাবতীয় আশা আকাঙ্খার সাথে একাত্ম হয়ে গেছে।
যার
কারণে বলা হয়,
যখন
আওয়ামী লীগ হেরে যায় তখন পরাজয় হয় এদেশের জনগণের।
যদিও যখন আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে তখন মুষ্ঠিমেয় কিছু লোক-গোষ্ঠীর জয় হয়।
তবে
শেষোক্ত এই সুবিধাভোগী গোষ্ঠীটি আওয়ামী লীগের মূলধারা নয়।
এদেশের সহজ সরল অসাম্প্রদায়িক জনগোষ্ঠী আওয়ামী লীগের মূলধারা এবং এ
জনগোষ্ঠীটিকে টিকিয়ে রাখতে পারলেই কেবল আওয়ামী লীগ টিকে থাকবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কন্যা আজকের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও এই গোষ্ঠীটির স্বার্থরক্ষার সবক পেয়ে কাজ করে
যাচ্ছেন এবং তিনি সফল হলেই কেবল আওয়ামী শব্দটির গুরুত্ব সবার কাছে উদ্ভাসিত
হবে।
জনগণের স্বার্থে সত্য বলার জন্যই আওয়ামী লীগের সৃষ্টি।
এ
প্রসঙ্গে আবু আল সাঈদ তার গবেষণাধর্মী গ্রন্থ
‘আওয়ামী’
লীগের ইতিহাস প্রকাশক ঃ মফিদুল হক,
সাহিত্য প্রকাশ-১৯৯৩ এ লিখেছেন-
মুসলিম লীগের পাল্টা একটি রাজনৈতিক দল গঠন উপলক্ষে সরকারি হল বা স্থান
পাওয়া দুষ্কর ব্যাপার ছিল।
এ
কারণে কেউ তার বাসভবন অথবা নিজস্ব স্থান ছেড়ে দেবেন,
সেটা চিন্তা করাও ছিলো দুরাশা মাত্র।
এই
রকম অবস্থায় তখন কে.এম.দাশ লেনের বিখ্যাত রোজ গার্ডেনের হল ঘরটির মালিক
কে.এম.বশির তা নিঃসঙ্কোচে ছেড়ে দিলেন ১৯৪৯ এর ২৩ জুন রোজ গার্ডেনের হল রুমে
সম্মেলন শুরু হলো।
ওই
সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এমন জীবিত লোকের সংখ্যা এখন একান্তই বিরল।
তাদের লিখিত কোনো ভাষ্য অথবা কোথাও প্রকাশিত তাদের সাক্ষাৎকার থেকে ওই
সম্মেলনে কতজন উপস্থিত ছিলেন,
তার
সঠিক সাক্ষ্য মেলে না।
তবে
আজ ৪৫ বছর (১৯৯৩) পর উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী অনেকের যেসব বক্তব্য পাওয়া
গেছে,
তা
পরস্পর-বিরোধী বলেই মনে হয়।
‘দৈনিক
আজাদ’
তখন
মাত্র ঢাকায় এসেছে (অক্টোবর ১৯,
১৯৪৮)।
দু’তিন
লাইনের একটি ছোট প্রতিবেদন করা হয়েছিলো এ ব্যাপারে সেখানে।
এ-ছাড়া বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য থেকে ধারণা করা যায়,
৩০০
থেকে সাড়ে তিন’শ
প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন তাতে।
এতে
সভাপতিত্ব করেন আতাউর রহমান খান।
আবদুল হামিদ খান ভাসানী উদ্বোধনী ভাষণ পাঠ করেন।
এ.কে.ফজলুল হক তখন পূর্ব বাংলা সরকারের অধীনে এডভোকেট জেনারেল পদে অধিষ্ঠিত।
‘আওয়ামী
মুসলিম লীগ’
দলের নামটি প্রায় আগে থেকে স্থির করা ছিলো।
প্রবীণ রাজনীতিবিদ অলি আহাদ বলেছেন,
‘ঢাকা
হাইকোর্টে জনাব দবিরুল যখন ঢাকায় আসিয়াছিলেন,
তখনই তিনি উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ নেতা মানকী শরীফের পীর সাহেবের
অনুকরণে সংগঠনের নাম
‘আওয়ামী
মুসলিম লীগ’
রাখার পরামর্শ দিয়াছিলেন।’
ওই
সময়ই নাকি দলটির শুধু আওয়ামী লীগ করণেরও প্রস্তাব এসেছিলো।
শেষ
পর্যন্ত আওয়ামী মুসলিম লীগ নামই চূড়ান্ত হয়।
খুবই সুন্দর ও সুষ্ঠু পরিবেশে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সাংগঠনিক কমিটি
গঠিত হয়।
ওই কমিটিতে কে কোন পদে ছিলেন,
তা নিয়েও যথেষ্ট দ্বিমত আছে।
সে সময়কার দলিলপত্রাদি আব্দুল হামিদ খান ভাসানী অথবা শেখ মুজিবুর রহমান
কারোর কাছেই ছিলো না।
(চলবে)
জিহ্বা
আস্ফালন (১)
আমাদের সমাজে একদল পালোয়ান লোক আছেন,
তাহারা লড়াই ছাড়া আর কোনো কথা মুখে আনেন না।
তাঁহাদের অস্ত্রের মধ্যে একখানি ভোঁতা জিহ্বা ও একটি ইস্টিল পেন।
তাহারা মে-চ্ছ অনার্যদের প্রতি অবিরত শব্দভেদী বাণ বর্ষণ করিতেছেন ও
পরমানন্দে মনে করিতেছেন তাহারা যে-যাহার বাসায় গিয়া মরিতেছে।
তাহাদের মুখগহ্বর হইতে ঘড়িঘড়ি এক-একটা বড়ো বড়ো হাওয়ার গোলা বাহির হইতেছে
ও তাহাদের কলিত শত্রুপক্ষের আসমান-দুর্গের উপর এমনি বেগে গিয়া আঘাত
করিতেছে ও তাহা হইতে এমনি মস্ত আওয়াজ বাহির হইতেছে যে,
বীরত্বের গর্বে তাহাদের অল্প পরিসর একটুখানি বুক ফুলিয়া ফাটিয়া যাইবার
উপক্রম হইতেছে।
সুতরাং এই-সকল মিলিটেরি ব্যক্তিদিগের নিজের গলার শব্দে নিজের কানে এমনি
তালা ধরিয়াছে যে,
এখন,
কী সৌন্দর্যের মোহন বংশিধ্বনি,
কী বিশ্বপ্রেমের উপর আহ্বানস্বর,
কী বিকাশমান অনন্ত জীবনের আনন্দ উচ্ছ্বাস,
কী পরদুঃখকাতরের করুণ সংগীত,
কিছুই তাহাদের কানের মধ্যে প্রবেশ করিবার রাস্তা পায় না।
যে-কেহ ভাঙা গলায় কামানের আওয়াজের নকল করিতে না চায়,
যে-কেহ শিশুদিগের মতো জুজুর অভিনয় করিয়া চতুর্দিকস্থ বয়স্ক-লোকদিগকে
নিতান্ত শঙ্কিত করিতেছে কল্পনা করিয়া আনন্দে হাত পা না ছোঁড়ে,
তাহারা তাহাদিগের নিকট খাতিরেই আসে না।
তাহারা চান,
ভারতবর্ষের যে যেখানে আছে,
সকলেই কেবল লড়াইয়ের গান গায়,
লড়াইয়ের কবিতা লেখে,
মুখের কথায়,
যতগুলো রাজা ও যতগুলো উজীর মারা সম্ভব সবগুলোকে মারিয়া ফেলে।
যেন বঙ্গসাহিত্যের প্রতি ছত্রে বারুদের গন্ধ থাকে,
যাহাতে শুদ্ধমাত্র বঙ্গসাহিত্য পড়িয়া ভবিষ্যতের পুরাতত্ত্ববিদগণ একবাক্যে
স্বীকার করেন যে,
বাঙালি জাতির মতো এতো বড়ো পালোয়ান জাতি আজ পর্যন্ত জন্মগ্রহণ করে নাই।
ইহারা সর্বদা সশঙ্কিত,
পাছে বঙ্গসমাজ খারাপ হইয়া যায়;
ইহারা বঙ্গসমাজের কানে তুলা দিয়া রাখিতে চান পাছে সে গান শুনিয়া ফেলে ও
তাহার প্রাণ কোমল হইয়া যায়,
পাছে সে উপন্যাস পড়ে ও তাহার চিত্ত দুর্বল হইয়া পড়ে,
পাছে সে নাট্যাভিনয় শোনে ও তাহার হৃদয় আর্দ্র হইয়া যায়।
দিনরাত্রি কেবল বঙ্গসমাজকে ঘিরিয়া বসিয়া তাহার কানের কাছে তূরী ভেরী
জগঝম্প বাজাও,
যেখানে যে আছ ঢাকঢোল গলায় বাঁধো,
ঢুলিতে দেখিলেই পরস্পর পরস্পরকে খোঁচা মারো এবং
'উঠ
উঠ',
'জাগো
জাগো'
বলিয়া অস্থির করিয়া তোলো।
কিন্তু এই বীরপুরুষেরা বড়ো মনের আনন্দে আছেন।
একখানা ছাতা ঘাড়ে করিয়া এই-সকল সরু সরু ব্যক্তিরা কেবলই চারদিকে ছটফট
করিয়া বেড়াইতেছেন,
বিশেষ একটা উদ্দেশ্য নাই,
লক্ষ্য নাই,
কেবল একটা গোলমাল চলিতেছে,
মনে মনে অত্যন্ত সূর্তি যে ভারি একটা কাজ করিতেছি।
আর যত প্রকার কাজ আছে তাহা নিতান্ত অবহেলার চক্ষে দেখেন,
যাহারা অন্যান্য কাজে মগ্ন রহিয়াছে তাহাদিগকে কৃপাপাত্র জ্ঞান করেন,
ঈষৎ হাস্য করিয়া মনে করেন,
আর সকলে কী ছেলেখেলাই করিতেছে! কাজ যা একমাত্র তিনিই করিতেছেন,
কেননা তিনি যে কী করিতেছেন নিজেই তাহা পরিষাররূপে জানেন না,
কেবল এক প্রকার অস্পষ্ট ধারণা আছে যে,
খুব একটা কী কাজ করিয়া বেড়াইতেছি।
সত্য বটে,
এক প্রকার ব্যস্ত কোমরবাঁধা মুষ্টিবদ্ধ উদগ্রভাব সর্বদাই দেখিতে পাওয়া
যায়,
কিন্তু কেন যে এ ভাব তাহা তিনিও জানেন না,
আমিও জানি না।
কী যেন একটা ঘোরতর কারখানা বাঁধিয়াছে,
কী যেন একটা সর্বনাশের উদ্যোগ হইতেছে,
কেবল তিনি জাগ্রত সতর্ক আছেন বলিয়াই কোনো দুর্ঘটনা ঘটিতেছে না।
শ্রাবণের রাত্রে বজ্রবিদ্যুৎ বর্ষণের সময় ব্যাঙের দল নিতান্ত ব্যস্তভাবে
সমস্ত রাত্রি জাগিয়া জগতের কানের কাছে অনবরত মকমক করিতে থাকে,
তাহারাও বোধ করি মনে করে,
ভাগ্যে তাহারা ছিল ও প্রাণপণে সমস্ত রাত্রি চিৎকার করিয়াছে,
জগতে তাই আজ প্রলয় হইতে পারিল না।
আমাদের বীরপুরুষেরাও মনে করেন,
আজি এই দুর্যোগের রাত্রে ভারতবর্ষের ভার বিশেষরূপে তাহাদেরই হস্তে
সমর্পিত হইয়াছে,
এইজন্য উদ্দেশ্যহীনের ন্যায় অবিশ্রান্ত হো হো করিয়া হুটপাট করিয়া
বেড়াইতেছেন ও মনে করিতেছেন জগতের অত্যন্ত উপকার হইতেছে।
কাজেই ইহাদের বুক ক্রমেই ফুলিতে থাকে ও প্রাণ ক্রমেই সংকীর্ণ হইতে থাকে,
বঙ্গসমাজ বা বঙ্গসাহিত্যের সর্বাঙ্গীণ বিকাশকে অত্যন্ত ভয় করেন।
ইহারা চান বঙ্গসাহিত্য কেবলমাত্র দাঁত ও নখের চর্চা করিতে থাকুক আর কিছু
নয়।
ক্ষমতাভেদেও ও অবস্থাভেদে যে প্রত্যেকে স্ব স্ব উপযোগী কার্যে প্রবৃত্ত
হইবে ও এইরূপে সমাজের অন্তর্নিহিত বিচিত্র শক্তি চারিদিক হইতে বিকশিত
হইয়া উঠিবে তাহা তাহাদের অভিপ্রেত নহে।
আজ কয়েক বৎসর ধরিয়া এই শ্রেণীর কতকগুলো সংকীর্ণদৃষ্টি সমালোচক কবিদিগকে
কবিত্ব শিখাইয়া আসিতেছেন ও অবিরত বীররস ফরমাস করিতেছেন এবং অবশিষ্ট আটটি
রসের মধ্যে কোনো একটি রসের ছিঁটাফোঁটা দেখিবামাত্র ননীর পুতুলি
বঙ্গসমাজের স্বাস্থ্যভঙ্গের ভয়ে শশব্যস্ত হইয়া উঠিতেছেন! তাহার কতকটা ফল
ফলিয়াছে,
বীররসটা ফ্যাশান হইয়া পড়িয়াছে।
গদ্য লেখক ও পদ্য লেখকগণ পালোয়ান সমাব্জলোচকদিগের চিৎকার বন্ধ করিয়া
দিবার জন্য তাহাদের মুখে বীররসের টুকরা ফেলিয়া দিতেছেন।
সকলেই বলিতেছে,
উঠ,
জাগো;
বাংলায় ইংরাজিতে গদ্যে,
পদ্যে,
মিত্রাক্ষরে,
অমিত্রাক্ষরে,
হাটে ঘাটে,
নাট্যশালায়,
সভায়,
ছেলে-মেয়ে বুড়ো সকলেই বলিতেছে,
উঠ,
জাগো! সকলেই যে অকপট হৃদয়ে বলিতেছে বা কেহই যে বুঝিয়া বলিতেছে তাহা নহে।
সকলেই বলিতেছে,
'আজ
ঊনবিংশ শতাব্দী',
ঊনবিংশ শতাব্দীটা যেন বঙ্গসমাজের বাবা স্বয়ং রোজগার করিয়া আনিয়াছে!
'ঊনবিংশ
শতাব্দী'
নামক একটা অনুবাদিত শব্দ বাঙালির মুখে শুনিলে অত্যন্ত হাসি পায়।
যে বাঙালি দুই দিন বিলাতে থাকিয়া বিলাতকে যড়সব বলেন তিনিও ইহা অপেক্ষা
হাস্যজনক কথা বলেন না! ঊনবিংশ শতাব্দী আমাদের কে?
আঠারোটি শতাব্দী যাহাদিগকে ক্রমান্বয়ে মানুষ করিয়া আসিয়াছে,
নিজের বিদ্যালয়ে পাঠাভ্যাস করাইয়াছে,
তাহারাই ঊনবিংশ শতাব্দী লইয়া গর্ব করিতেছে।
আর আমরা আজ দুদিন ইংরাজের সহিত আলাপ করিয়া এমনিভাবে কথাবার্তা আরম্ভ
করিয়াছি যেন ঊনবিংশ শতাব্দীটা আমাদেরই!
যেন ঊনবিংশ শতাব্দীটা অত্যন্ত সস্তা দামে বাংলাদেশে নিলাম হইয়া গিয়াছে,
আর বঙ্গীয় বীরপুরুষ নামক জয়েন্ট স্টক কোম্পানি তাহা সমস্তটা কিনিয়া
লইয়াছেন।
ভাববিশেষ যখন সমাজে ফ্যাশান হইয়া যায় তখন এইরূপই ঘটে।
তখন তাহার আনুষঙ্গিক কতকগুলো কথা মুখে মুখে চলিত হইয়া যায়,
সে কথাগুলোর যেন একটা অর্থ আছে এইরূপ ভ্রম হয়,
কিন্তু জিজ্ঞাসা করিলে কেহ তাহার অর্থ ভালো করিয়া বুঝাইয়া দিতে পারেন না।
(চলবে)
সংগৃহীত।
পরমপুরুষ
শ্রীরামকৃষ্ণ (৫)
(পূর্ব প্রকাশের পর)
দিন
দিন পূজার সময় দীর্ঘ হচ্ছে।
জগন্মাতার দর্শনের ব্যাকুলতা ক্রমশঃ বেড়ে চলেছে শ্রীরামকৃষ্ণের।
সর্বদা ডাকছেন,
দের্ব প্রসন্ন হও।
আমাকে কৃপাদান কর।
বুক
ভেসে যাচ্ছে মাতৃদর্শনাকাঙ্খার অশ্রুতে।
পূজা করতে বসেছেন তো পূজ আর শেষ হয় না।
মাকে মনের মতন করে সাজান।
সাজানোর যেন আর শেষ হয় না।
ভাবেন -মা তো পাষাণময়ী নন,
মা
যে আমার চিন্ময়ী।
এদিকে শ্রীরামকৃষ্ণের অলৌকিক ব্যবহার,
দিব্যভাবাবেশ,
গভীর অভিনিবেশ দর্শন করে অনেকে হাসি ঠাট্টা করতো-ঠাকুরের মাথা খারাপ হয়েছে।
মথুরবাবুর কিন্তু অটল দৃঢ়প্রতিজ্ঞা।
তিনি রাণীকে বললেন,
মহাসুতির ফলে যে পূজক আমরা পেয়েছি তাতে দেবী খুব শীঘ্রই জাগ্রত হয়ে উঠবেন।
তাঁর সমগ্র মনপ্রাণ দিনে দিনে তলিয়ে যাচ্ছিল জগন্মাতার ভাবসমুদ্রে।
মা
বুঝি সন্তানের এই কাতর আর্তনাদ শুনতে পান না।
মার
দেখা বোধ হয় পাবেন না-এই ভেবে তিনি যন্ত্রণায় তখন ছটফট করছেন।
অস্থির হয়ে ভাবছেন- মা যখন দেখা দেবেনই না তখন এ দেহ আর ধারণ করে লাভ কি।
আত্মহত্যা করতে স্থিরসংকল্প করলেন তিন্ি মার হাতের খড়গ লকলক করছে।
হাত
বাড়ালেন তিনি নিজেকে হত্যা করবার জন্য।
এমন
সময় অদ্ভূতভাবে মায়ের দর্শন পেলেন এবং বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে গেলেন।
জ্ঞান ফিরে পেয়েই আনন্দে মা মা বলে ডাকলেন ঠাকুর।
আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ছে দু’চোক
দিয়ে।
কত
না আনন্দ।
শিশু যেমন মায়ের সান্নিধ্য পেলে মা-মা বলে ডেকে আকুল হয়,
ঠিক
তেমনি ঠাকুরও ডেকে ডেকে আকুল হলেন।
এতদিনের আকাঙ্খিত দর্শন কি একমুহূর্তের দর্শনে মন ভরে?
প্রাণ ভরে দর্শন চাই।
দর্শন চাই মাতৃভাবে।
মা
কিন্তু সন্তানের ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন।
তিনি ঠাকুরকে সর্বদাই দর্শন দিতেন-ঠাকুর যখনই তাঁকে ডাকতেন।
মায়ের দর্শন লাভের পর কয়েকদিন মন্দিরের নিত্য পূজা করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব
হয়ে উঠল।
রামকৃষ্ণের এই উন্মাদভাব লক্ষ্য করে হৃদয়রাম খুব ভয় পেয়ে গেলেন।
তিনি অন্য এক ব্রাহ্মণের দ্বারা মায়ের নিত্য পূজার ব্যবস্থা করলেন।
যেদিন একটু আত্মস্থ থাকতেন ঠাকুর সেদিন নিজেই মায়ের পূজার আয়োজন করতেন।
পূজায় বসেই কিন্তু তিনি বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন।
তিনি পাষাণের মধ্যে দেখতে পেতেন প্রাণময়ী জাগ্রত দেবীমূর্তি।
নিজের মায়ের সঙ্গে যেমন ব্যবহার করে মানুষ,
ঠিক
তেমনি ব্যবহার করতেন ঠাকুর মৃন্ময়ী মায়ের সঙ্গে।
মা
যেন তাঁর সঙ্গে নিজের মায়ের মত হেসে কথা বলছেন।
‘এটা
কর্,
ওটা
করিসনে’
বলে
নির্দেশ দিচ্ছেন।
পূর্বে দেবীকে ভোগ নিবেদন করে দেখতেন দেবীর নয়ন হতে অপূর্ব জ্যোতিরশ্মি
নির্গত হয়ে নিবেদিত ভোগ স্পর্শ করছেন।
এখন
দেখছেন জিভ বার করে নিবেদিত ভোগ গ্রহণ করছেন জ্যোতির্ময়ী।
সমগ্র মন্দির রূপের আলোয় প্লাবিত।
ঠাকুর জ্যোতির্ময়ীর রূপ দেখে তন্ময়।
অনেক দিন আবার ভোগ নিবেদন করার আগেই মা গ্রহণ করছেন ভোগ।
ঠাকুর এখন ভাবতন্ময় মাতাল।
যখন
তখন মূর্তির সঙ্গে কথা বলেন।
কখনো নেচে নেচে গান শোনান মাকে।
মাকে ছোট মেয়ের মত আদর করেন,
হাতে ধরে খাওয়ান।
খা
মা খা,
বেশ
করে খা,
বলে
খাওয়ান।
কখনো খুব গম্ভীর হয়ে বলেন,
আমার দেয়া ভোগ খাবিনে?
বেশ
তবে দেখ আমিই খাচ্ছি।
বলে
নিজেই একটু মুখে দিয়ে আবার মায়ের মুখে দেন।
মন্দিরের আর সব কর্মচারীরা ঠাকুরের এই ব্যবহার অসন্তুষ্ট হয়ে উঠল।
তারা এই সব অনাসৃষ্টি কর্মকে মহাপাপ বলে মনে করে মথুরবাবুকে সব জানাল।
মথুরবাবু সব কথা শুনে নিজেই এসে এর বিহিত করবেন বলে পাঠালেন।
সকলেই ধরে নিল ঠাকুরের চাকরী এবার গেল।
হঠাৎ একদিন মথুরবাবু পূজার নির্দিষ্ট সময়ে মন্দিরে এসে উপস্থিত।
কারো কথাকে বিশ্বাস না করে নিজে চোখে তিনি ঠাকুরের কার্যকলাপ দেখতে চান।
মথুরবাবুর উপস্থিতি খেয়াল নেই ভাববিহ্বল পূজকের।
তিনি তাঁর মাকে নিয়েই সদা ব্যস্ত।
তিনি যেন অন্য এক জগতে তখন বিচরণ করছেন।
পূজা করতে করতে কখনো আকুল হয়ে কাঁদছেন,
আবার কখনো আনন্দ প্রকাশ করছেন,
আবার কখনো অভিমান করছেন অতি আদুরে ছেলের মত।
ভাবে তন্ময় একটি নিবেদিত শরীর।
সংগৃহীত-
ভারতের সাধক
ও সাধিকা
সুধাংশুরঞ্জন ঘোষ।
সূফী সাধক
আনোয়ারুল হক্ এঁর বাণী তাৎপর্য অন্বেষণে
'আমিত্বের
আবরণ দূর করার প্রচেষ্টার অপর নাম এবাদত'
(৩)
ড.এমদাদুল হক
কাজল
॥
(পূর্ব প্রকাশের পর)
বায়েযীদ বিনয়ের সাথে উত্তর দিলেন,
‘আপনি
আমার কাছে পানি চেয়েছিলেন,
ঘরে
পানি ছিল না।
ঝরনা থেকে পানি এনে দেখি আপনি ঘুমিয়ে পড়েছেন।
আপনার ঘুমের ক্ষতি হবে ভেবে আর ডাকিনি।’
মা
বায়েযীদের কথা শুনে আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করলেন,
‘আয়
রাব্বুল আলামীন! আজ আমি বায়েযীদের উপর যেমন খুশি হয়েছি,
আপনিও তার উপর তেমন খুশি হোন’।
আর
আল্লাহ বিনীতদের প্রতি কতটুকু খুশি তার ঘোষণা দিয়েছেন কুরআনে।
আল্লাহ বলছেন - আমার প্রিয় বান্দা তারাই যারা বিনম্রভাবে পৃথিবীতে চলাফেরা
করে (সূরা ফুরকান : ৬৩)।
৭.
আমিত্বের আবরণ দূর করার প্রচেষ্টার আরেকটি উপাদান হচ্ছে লজ্জাশীলতা বৃদ্ধি
করা।
লজ্জা ব্যাপক অর্থবোধক একটি মানবিক গুণ।
সূফীতত্ত্বে লজ্জা বলতে - অন্যায় প্রকাশিত বা জানাজানি হয়ে যাবার ভয় জনিত
সংকোচকে বুঝানো হয়।
মানুষ গোপনে যখন এমন কোন কাজ করে যা প্রকাশিত হয়ে পড়লে লোকসমাজে নিন্দনীয়
হতে হবে তখন তার ভেতরে এক ধরনের ভয় কাজ করে,
এ
ভয়টাই হচ্ছে লজ্জা।
লজ্জাই ধর্ম।
লজ্জা হলো - মাথা ও তৎসংশ্লিষ্ট সব কিছুর হিফাযত করা,
উদরে যা সঞ্চিত হয় সে সবের ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখা।
তাই
যার লজ্জা নাই তার আমিত্ব আছে কিন্তু ধর্ম নাই।
এ
কারণেই মুহাম্মদ সা. লজ্জাকে ঈমানের অঙ্গ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
লজ্জা ও ঈমান একই সূত্রে গ্রথিত রয়েছে।
যখন
এ দুটোর একটি তিরোহিত হয়,
তখন
সাথে সাথে দ্বিতীয়টিও দূর হয়ে যায়।
প্রত্যেক ধর্মেরই একটা বৈশিষ্ট্য থাকে,
ইসলামের বৈশিষ্ট্য - লজ্জাশীলতা।
লজ্জার দ্বারাই আমিত্বকে ধ্বংস করা যায় তাই যাবতীয় গুণের মধ্যে লজ্জাশীলতা
একটা উৎকৃষ্ট গুণ।
যার
ভিতরে লজ্জা রয়েছে,
তা
তাকে সুশোভিত করে,
আর
যার ভেতরে অশ্লীলতা রয়েছে তা তাকে অপমানিত করে।
মানুষ তার আমিত্বকে কতটুকু বিসর্জন দিতে পেরেছে লজ্জাশীলতার মাধ্যমে তা
প্রকাশ পেয়ে থাকে।
নিজের অন্যায় বা ভুলের জন্য লজ্জিত হলে বুঝতে হবে তার মধ্যে আমিত্বের আবরণ
দূর করার প্রচেষ্টা রয়েছে,
অর্থাৎ সে এবাদত করছে।
অন্যদিকে কেউ নির্দ্ধিধায় অন্যায় করতে থাকলে এবং নিজের কৃত অন্যায়ের জন্য
কোন অনুতাপ না থাকলে আমিত্বকে স্ফীত করা হয়।
যখনই লোক চক্ষুর অন্তরালে ব্যক্তি এমন কোন কাজ করতে উৎসাহী হয় যা প্রকাশিত
হওয়া তার জন্য লজ্জাকর হবে তখনই ওই ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকা আমিত্বের আবরণ
দূর করার একটা প্রচেষ্টা।
৮.
আমিত্বের আবরণ দূর করার আরেকটা প্রচেষ্টা হতে পারে দয়াশীলতার চর্চা।
দয়া
করাটাকে আল্লাহ তার নিজের ওপর কর্তব্য বলে স্থির করে নিয়েছেন (সুরা আল
আনয়াম : ১২)।
মুহাম্মদ সা. শিক্ষা দিয়েছেন,
আমরাও যেন আল্লাহ্র দয়ার এ গুণকে আমাদের মধ্যে প্রতিস্থাপন করি,
আল্লাহ্ যেমন দয়া ও করুণায় সিক্ত করেছেন সমগ্র মানবজাতি এবং সৃষ্টিজগতকে,
আমরাও যেন তেমনি মানুষ ও অন্যান্য সৃষ্টিজগতের প্রতি দয়া ও করুণায় সিক্ত হই।
দয়ালু লোকদের প্রতি আল্লাহ্ও দয়া করেন।
ইসলামের শিক্ষা হলো -
‘তোমরা
পৃথিবীর অধিবাসীদের প্রতি দয়া করো তাহলে আকাশের অধিবাসীও তোমাদের প্রতি দয়া
করবেন।’
আল্লাহ্ দয়ালু তাই তিনি দয়ালুকে ভালবাসেন।
‘এক
ব্যক্তি একদিন মাঠে একটা তৃষ্ণার্ত কুকুর দেখতে পেল।
তৃষ্ণায় কাতর হয়ে কুকুরটি বেহুঁস হয়ে পড়ে রয়েছে।
কুকুরটিকে দেখে ওই ব্যক্তির খুব দয়া হলো।
তাড়াতাড়ি করে তিনি নিজের পুটলিকে বালতির মত পাগড়ি দিয়ে বেঁধে কূপ থেকে পানি
উঠিয়ে মুমূর্ষ কুকুরটিকে পান করালেন।
কুকুরটি পানি পান করে সুস্থ হয়ে চলে গেল।
সে
যুগের পয়গম্বর ওই ব্যক্তিকে খবর জানিয়ে দিলেন যে তিনি আল্লাহতে আশ্রিত
হয়েছেন।’
এটা কোন সাধারণ গল্প নয়।
লোকটি আল্লাহতে আশ্রিত হয়েছেন কারণ তিনি তাঁর আমিত্বকে বিসর্জন দিয়েছেন।
আমিত্ব থাকলে তিনি তাঁর মাথার পাগড়ি দিয়ে পুটলি বেঁধে কূপ থেকে পানি
উঠিয়ে একটা কুকুরকে দিতে পারতেন না।
গল্পটিতে আমিত্বের আবরণ দূর করার প্রচেষ্টার সাথে দয়াগুণ মিশ্রিত।
যে দয়া গুণের অনুশীলন করে তার আমিত্ব লোপ পায়।
তিনিই
‘দয়া
প্রবাহী’
যিনি আমিত্ব থেকে মুক্ত।
তাই তিনি আল্লাহর রঙে রঞ্জিত এবং আল্লাহতে আশ্রিত।
৯. যশ-খ্যাতি ও সুনামের মোহ ত্যাগ করার চর্চা আমিত্ব দূর করার অন্যতম
অনুশীলন।
যশ-খ্যাতির মোহ আমিত্বকে মজবুত করে।
প্রশংসা শুনে সন্তুষ্ট হবার অধিকার তারই আছে নিন্দা শুনে যে অসন্তুষ্ট হয়
না।
নিন্দা আমিত্বের জন্য একটা পরীক্ষা।
অন্যের কাছ থেকে নিজের নিন্দা শুনে যে যত বেশি কষ্ট পায় তার আমিত্বও
ততবেশি দৃঢ় হয়।
সূফী সাধকেরা নিন্দা শুনলেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
কারণ - প্রথমতঃ তিনি সন্দেহ করেন,
যে জন্যে নিন্দা করা হচ্ছে তা প্রকৃতই তাঁর মধ্যে থাকতে পারে।
লোকটি সঠিক হলে তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত,
কারণ সে পরিশুদ্ধ হবার সুযোগ করে দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত ঃ নিন্দায় সত্যতা না থাকলে তাতে কষ্ট পাবার কোন কারণও থাকতে
পারে না।
একজন লোক ভুল করে আমার নিন্দা করলে,
অন্যের ভুলের জন্য আমি শাস্তি (কষ্ট) পেতে যাব কেন?
সূফী সাধকদের উপর মিথ্যা দোষারূপ করা হলেও তাঁরা নির্বিকার থাকেন,
যেমন নির্বিকার থাকেন প্রশংসা শুনে।
প্রশংসা ও নিন্দায় নাড়া লাগে আমিত্বে।
সাধক তিনিই যিনি আমিত্বের এই আবরণগুলো দূর করার প্রচেষ্টায় থাকেন।
১০. অন্যের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টাও আমিত্বকেও দৃঢ় করে।
আমরা শত সহস্রভাবে অন্যের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করি।
কেউ আমাদের দিকে কোন মনোযোগ না দিলে আমরা অসস্তি বোধ করি,
নিজেকে অবজ্ঞেয় মনে করি।
অন্যের মনোযোগ আমিত্বের জন্য অক্সিজেনের মত কাজ করে।
সূফী সাধকেরা মনে করেন,
প্রকৃত ভিখারী সে-ই যে অন্যের মনোযোগ ভিক্ষা করে।
তাই অন্যের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা না করাও আমিত্বের আবরণ দূর করার
প্রচেষ্টা।
১১. লোক দেখানো কাজ থেকে বিরত থাকাও আমিত্বের আবরণ দূর করার ক্ষেত্রে
গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা।
ইসলামের পরিভাষায় লোক দেখানো কাজকে রিয়া বলা হয়।
কুরআন লোক দেখানো এবাদতের বিরুদ্ধে সোচ্চার।
কারণ,
এতে আমিত্বের আবরণ দূর করার প্রচেষ্টা থাকে না।
কুরআন বলছে - ধ্বংস সেসব নামাযীদের জন্য যারা লোক দেখানোর জন্য নামায পড়ে
(সুরা মাউন ঃ ৪-৭);
দানের কথা প্রচার করে তোমাদের দানকে ওই লোকের মতো নষ্ট করো না যে লোক
দেখানোর জন্য দান করে (সুরা বাকারা ঃ ২৬৪);
যারা লোক দেখানোর জন্য দান করে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন না।
শয়তান তাদের সঙ্গী হলে সে সঙ্গী কতই না জঘন্য (সুরা নিসা ঃ ৩৮)।
যারা লোক দেখানোর জন্য এবাদত করে শয়তান (আমিত্ব) তাদের সঙ্গী।
তাই আমিত্ব দূর করার প্রচেষ্টা না থাকলে লোকে নামায পড়ে নামাযী বলার জন্য,
হজ্জ্ব করে হাজী সাহেব বলে সম্মান পাবার জন্যে,
দান করে দানবীর খেতাব পাবার জন্য।
তখন তা এবাদত না হয়ে শিরকের পর্যায়ে চলে যায়।
মুহাম্মদ সা. সামান্যতম লোক দেখানো কাজকেও শিরকের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
যারা লোক দেখানোর জন্য অর্থাৎ আমিত্বকে প্রচার করার জন্য এবাদত করে
আল্লাহর কাছে তা পাপ হিসেবে প্রকাশিত হয়।
তাই ‘আমিত্বের
আবরণ দূর করার প্রচেষ্টার নাম এবাদত’
সাধক আনোয়ারুল হকের এই সংজ্ঞাটি যথার্থ এবং পূর্ণ।
১২. ‘নিজের
আল্লাহর সৌন্দর্য্য দর্শনের মাধ্যমেই আমিত্বের অভ্যাস সমূহের বিনাশ হয়
এবং নিজের আমিত্ব বিসর্জন দিতে পারলেই স্রষ্টার দর্শন পাওয়া যায়।
এই বিশ্বাস হচ্ছে সূফীবাদের মূল ভিত্তি।’
নিজের অহং ভাবকে ধ্বংস করতে পারলে সেই স্থলে আল্লাহর অহং ভাব ফুটে উঠে।
নিজের সত্ত্বাকে বিলীন করলে আল্লাহর সত্ত্বায় জীবিত থাকা যায়।
প্রেম হচ্ছে আমিত্ব দূর করার মহৌষধ।
সূফী সাধকগণ প্রেম ও ধ্যানের মাধ্যমে আমিত্বকে বিলীন করে আল্লাহর মধ্যে
ব্যাপ্তি লাভ করেন।
সাধক কবি সা’দী
বলেন,
তুমি প্রেমিক হতে চাইলে আমিত্বকে দূর কর।
তা না পারলে অন্য পথ ধর।
প্রেমের নৌকায় পা দিও না।
প্রেমিক হয়ে প্রেমকে ভয় করো না,
প্রেম তোমাকে মাটি করে দেবে।
প্রেম তোমাকে ধ্বংস করে ফেললেও তুমি চিরদিন স্থায়ী থাকবে।
পরিষ্কার দানায় কখনো গাছ জন্মে না।
দানায় মাটি মাখা না হলে তা অঙ্কুরিত হয় না।
তুমি যতক্ষণ আমিত্বের মধ্যে থাকবে,
প্রেমের পথ পাবে না।
মাওলানা জালালুদ্দীন রূমীর একটা কাহিনী বলি - জনৈক ব্যক্তি বন্ধুর দ্বারে
এসে করাঘাত করল,
বন্ধু জিজ্ঞাসা করল,
‘তুমি
কে?’
আগন্তুক বলল,
‘আমি’।
বন্ধু বলল,
‘চলে
যাও।
যদি তুমি হও,
আমি দরজা খুলব না।
কেননা,
আমার বন্ধুদের মধ্যে এমন কেহ নাই যে নিজেকে আমি বলে।’
ওই বেচারা ফেরত চলে গেল এবং এক বৎসর বন্ধুর বিরহের আগুনে জ্বলে,
পুড়ে ছাই হতে লাগল এবং আবার বন্ধুর বাড়িতে এলো।
অত্যন্ত আদবের সাথে ভয়ে ভয়ে দরজায় টুকা দিল।
বন্ধু হাঁক ছাড়ল -
‘কে?’
লোকটি উত্তর দিল,
‘হে
অন্তরঙ্গ বন্ধু,
দরজায় তুমিই’।
বন্ধু বলল,
‘এখন
যখন তুমি আমি হয়ে গেছ,
সুতরাং ওহে আমি! ভিতরে আস,
ওই সময় তোমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম এই জন্যে যে,
একঘরে আমিত্বধারী দু’জনের
সংকুলান নেই।’
(সমাপ্ত)
ধর্ম
নিরপেক্ষতা (১)
সংলাপ
॥
(পূর্ব প্রকাশের পর)ধর্মনিরপেক্ষতা অর্থ রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতা।
এর
ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ৭২ এর সংবিধানে বলা হয় ঃ
‘ধর্মনিরপেক্ষতা
নীতি বাস্তবায়নের জন্য (ক) সর্বপ্রকার সাম্প্রদায়িকতা (খ) রাষ্ট্র কর্তৃক
কোন ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান (গ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার
এবং (ঘ) কোন বিশেষ ধর্মপালনকারীর প্রতি বৈষম্য বা তাহার নিপীড়ন বিলোপ করা
হইবে।
অর্থাৎ (ক) সামগ্রিক অসাম্প্রদায়িকতা (খ) রাষ্ট্র কর্তৃক সব ধর্মকে সমান
মর্যাদা প্রদান (গ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার রহিতকরণ এবং (ঘ)
সকল ধর্মপালনকারীর প্রতি সমান ন্যায়াচরণ নিশ্চিত করা হবে।
এটা
কি ইসলামসহ সব রকম ধর্মের বিধি ব্যবস্থার সারকথা নয়?
এমতাবস্থায়,
ধর্মনিরপেক্ষতার উক্ত সাংবিধানিক ব্যাখ্যার পরও ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে
ধর্মসম্মত এবং ধর্মের নামে কোন আপত্তি ওঠার কথা ছিল না।
কারণ,
৭২
এর সংবিধানে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ও বিশেষ অর্থে
ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসাবে গৃহীত হয়।
আর
তা হলো,
ধর্মের ব্যাপারে রাষ্ট্রের পক্ষপাতহীনতা,
ধর্মের বিরুদ্ধতা নয়।
যারা রাষ্ট্রের ধর্ম নিরপেক্ষতা তথা পক্ষপাতহীনতার বিরোধিতা করে,
প্রকারান্তরে তারা ধর্মের ব্যাপারে রাষ্ট্রের পক্ষপাতিত্ব সমর্থন করছে।
অথচ
যার যার পছন্দের ধর্মানুষ্ঠান পালনে অনুমোদন থাকলেও সব ধর্মেই পক্ষপাতমূলক
কর্মকান্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
শুধু তাই নয়,
একাধিক পক্ষীয় বিষয়ে নিরপেক্ষ বিচারের জন্য সব ধর্মেই ধর্মীয় বিধানেই জোর
তাগিদ রয়েছে।
এমতাবস্থায় ধর্মের অনুষ্ঠানাদির মতো একটি বহু পক্ষিয় বিষয়ে রাষ্ট্রের আচরণ
সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং পক্ষপাতহীন হওয়াই তো ধর্মসম্মত।
ধর্মমতে পক্ষপাতিত্ব,
‘জুলুম’।
আর
জালেমের হন্য কুরআন নির্ধারিত রেখেছে,
‘জাহান্নাম’।
বলাই বাহুল্য যে,
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত যে ব্যক্তি সকল ব্যবস্থায় ধর্মের প্রতি
সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং পক্ষপাতহীন সমান আচরণ করতে পারেন,
বস্তুত ঃ তিনিই প্রকৃত ধার্মিক এবং গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রনায়ক।
অন্যকথায়,
প্রকৃত ধার্মিকই কেবল পারেন,
ধর্মের সকল ব্যবস্থার প্রতি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং পক্ষপাতহীন সমান আচরণ ও
সম্মান প্রদর্শন করতে।
জেরুযালেম জয় করেও হযরত ওমর (রাঃ) বাইতুল মুকাদ্দাসের ভিতরে নামাজ আদায়
করেননি।
মুসলিমগণ উহাকে নিজেদের মসজিদে রূপান্তরিত করতে পারে,
এ
ভয়ে।
এটাই ইসলামের ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সকলের ধর্মীয় ব্যবস্থার সমমর্যাদার
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
এর
এ অর্থেই পূর্ণ ব্যাখ্যাসহ ৭২ এর সংবিধানে
‘ধর্মনিরপেক্ষতা’
অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসাবে গৃহীত হয়।
সুতরাং এটাকে ধর্মের বিরুদ্ধতা হিসাবে ব্যাখ্যা করা অথবা এর দোহাই দিয়ে কোন
ধর্মের প্রতি উন্নাসিক বা বৈরি আচরণ করা,
দু’টোকেইে
আমরা সংবিধানের লংঘন,
অধর্মের কাজ বলে মনে করি।
অথচ
ধর্মনিরপেক্ষতা নামে ঢাকার
‘সলিমুল্লাহ্
মুসলিম হল’
এর
নাম থেকে
‘মুসলিম’
শব্দ মুছে ফেলা এবং
‘নজরুল
ইসলাম কলেজ’
এর
নাম থেকে
‘ইসলাম’
শব্দ বাদ দেয়া হয়।
শুধু কি তাই;
একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কারের কথা না বলে,
একেবারে ধর্মীয় শিক্ষা
‘অপ্রোয়জনীয়’
বলে
ফতোয়া দেন।
এ
কাজগুলো করেন,
স্বাধীনতার ঊষালগ্নে,
ধর্মনিরপেক্ষতার নামে,
কতিপয় ইসলাম এলার্জিগ্রস্ত উন্নাসিক তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী,
মুক্তযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষশক্তির পক্ষপুটে থেকে।
ফলে,
স্বাধীনতা বিরোধীদের সুবিধা হয়।
তারা ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ পায় এবং
ধর্মের নামে জনগণকে বিভ্রান্ত করা তাদের জন্য সহজ হয়।
বস্তুতপক্ষে ধর্মনিরপেক্ষতাই রাষ্ট্রের ধর্ম হওয়া বাঞ্চনীয়।
কারণ,
প্রথমত ঃ রাষ্ট্র,
ধর্মের সম্বোধিত পক্ষ নয়।
রাষ্ট্রকে উদ্দেশ্য করে ধর্মের কোন বিধান প্রবর্তন করা হয়নি।
রাষ্ট্রের যে চার উপাদান সংযুক্ত ভূখন্ড,
জনগণ,
সরকার ও সার্বভৌমত্ত - এর কোনটির প্রতিই ধর্মের কোন আবেদন নেই।
ধর্মের আবেদন বা বিধানাবলী কেবলমাত্র ব্যক্তিমানুষের উদ্দেশ্যে।
এ
জন্য কুরআনে বলা হচ্ছে,
‘কেউ
কারো বোঝা বহন করবে না,
প্রত্যেকেই নিজ নিজ কৃত ভাল-মন্দের ফলাফল ভোগ করবে’।
দ্বিতীয়ত ঃ রাষ্ট্রের আইন সকলের জন্য সমভাবে বাধ্যতামূলক।
আর
ধর্মের মৌলদর্শন হলো-
‘ধর্মে
কোন জবরদস্তি বা বাধ্যবাধকতা নেই’
এবং
‘তোমাদের
জন্য তোমাদের ধর্ম আর আমার জন্য আমার ধর্ম’
(আল-কুরআন)।
অপর
দিকে রাষ্ট্রের জনগণ একই ধর্মের অনুসারী নাও হতে পারে।
এমতাবস্থায়,
রাষ্ট্র কোন ধর্মের পক্ষাবলম্বন করলে ভিন্ন মতাবলম্বীর উপর জবরদস্তি ও
বাধ্যবাধকতার প্রশ্ন অবশ্যই আসবে।
অথচ
আল কুরআনে তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
উপরন্তু একটি রাষ্ট্রের সকল জনগণ একই ধর্মের তথা ইসলামের অনুসারী হলেও
জবরদস্তি এবং বাধ্যবাধকতার প্রশ্ন আসতে পারে,
শুধু তাই নয়;
অতীতে এসেছে এবং এর ফলে মুসলিমদের মধ্যে হানাহানি,
রক্তারক্তি ও প্রচুর খুনাখুনির মতো লজ্জাজনক ও কলঙ্কময় ইতিহাস রয়েছে।
আব্বাসী-ফাতেমী তথা শিয়া সুন্নী ঝগড়ায় মুসলিমদের হাতে লক্ষ লক্ষ মুসলিমের
প্রাণহানি ঘটেছে।
হযরত আবু হানিফা,
আহমদ-বিন-হাম্বাল এবং ইমাম গায্যালীসহ অনেক মনীষী নির্যাতিত হয়েছেন,
শুধু ধর্মের রাষ্ট্রীয় ব্যবহারের কারণে।
সাল্জুকরা ইমাম গায্যালীর অনুসারিদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করেছে।
তাঁর কেতাব যে ঘরে পেয়েছে,
সে
ঘর পর্যন্ত জ্বালিয়ে দিয়েছে।
ইতিহাসে ধর্মের কারণে যত মুসলিম নিহত হয়েছে,
আমাদের ধারণা,
তার
অধিকাংশই নিহত হয়েছে মুসলিমদের হাতে ধর্মের রাষ্ট্রীয় পক্ষপাতমূলক
ব্যবহারের কারণে।
বর্তমানে ইসলামী রাষ্ট্র পাকিস্তানে কী হচ্ছে?
মসজিদে মসজিদে কারা বোমা হামলা চালাচ্ছে?
আর
মুসল্লিদের হত্যা করছে?
আফগানিস্তানের কথা আর কি বলব;
সেখানে কমিউনিস্ট সরকারের আমলে যে সংখ্যক লোক নিহত হয়েছে,
তার
চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক আফগান নিহত হয়েছে তালেবান আমলে,
তথাকথিত ইসলামের নামে।
কারণ একটিই,
আর
তা হলো ধর্মের রাষ্ট্রীয় ব্যবহার।
ধর্মের অনুরূপ রাষ্ট্রীয় ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট হানাহানি আর হত্যাযজ্ঞের
ইতিহাস লিখলে কয়েক হাজার পৃষ্ঠার বই হতে পারে।
সুতরাং এ ক্ষুদ্র পরিসরে এ বিষয়টিকে আর দীর্ঘায়িত করব না।
মোদ্দাকথা,
ধর্মের পক্ষপাতমূলক রাষ্ট্রীয় ব্যবহার বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীতো বটেই,
ইসলামের অনুসারীদের মধ্যেও তো হানাহানি ও রক্তপাত ঘটিয়েছে,
ঘটাচ্ছে এবং ঘটাবে।
কারণ,
ধর্মের পক্ষপাতমূলক রাষ্ট্রীয় ব্যবহার আল-কুরআনের মৌল দর্শনের অনুকূল নয়।
ধর্মের রাষ্ট্রীয় ব্যবহার যদি কুরআনের মৌলদর্শনের অনুকূলই হবে,
তা হলে,
তাতে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কথা বাদই দিলাম,
মুসলিমদের মধ্যে হানাহানি ও রক্তপাতের মতো অনাসৃষ্টি এবং অন্য
ধর্মাবলম্বীদের কাছে লজ্জিত হবার মতো ঘটনা ঘটাবে কেন?
কোন মৌলদর্শন কি মানুষে মানুষে,
বিশেষ করে,
তার অনুসারীদের মধ্যে হানাহানির পক্ষে?
কখনই তা নয়।
এমতাবস্থায় রাষ্ট্রের যেরূপ ব্যবহার মানুষের ঐক্য,
কল্যাণ ও শান্তির অনুকূল,
তাই আল-কুরআনের শিক্ষা।
আর তা হলো,
রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ আচরণ ও ব্যবহার।
৭২ এর সংবিধানের ব্যাখ্যায় তাই বলা হয়েছে।
(চলবে)
পেনশন
ভাতা (১)
খালেদ মতিন
॥
ওহিদের চাকরি এ কলেজে প্রায় তিরিশ বছর।
তা বলে এখানেই এর শুরু।
তা সত্য নয়।
আগে আরো তিনটি কলেজে চাকরি করেছে।
এটির মতো ওগুলোও বেসরকারি।
তাই তো স্বাভাবিক।
সরকারি থেকে বেসরকারিতে তো কেউ আসে না।
সুতরাং বেসরকারি থেকে বেসরকারি।
আর এখানে সরকার কাউকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বদলিও করে না।
বিভিন্ন কারণে,
(যদিও
সে সব কারণ খোড়া অজুহাত মাত্র) নিজের বদলি নিজেই হয়।
ওহিদও সেভাবেই সর্বমোট চারটি কলেজে চাকরি করে,
ধারণা লাভ করেছে,
আর কলেজ পরিবর্তনে লাভ নেই।
ঢেকি স্বর্গে গেলেও বাড়া ভানে।
তাই বিগত তিরিশ বছর যাবত বাড়া ভানার কাজটা এখানেই করছে।
তিরিশ বছর অন্তে নাটকের যবনিকাপাত।
জীবনের যবনিকাপাতই বা আর কতদূর?
সনদ অনুযায়ী বয়সই তো ষাট পেরিয়ে।
এই তো কয়েক বছর আগেই চাকরি অন্তে ছিল ছাতি আর লাঠি সম্বল।
এরপর বৃদ্ধ বয়সে,
ওপরে অনন্ত আকাশ,
ও
সামনে বিস্তৃত পৃথিবী।
তারই মধ্যে জীবনের অনিশ্চিত বাকি কয়েকটা দিন।
ইদানিং সে অবস্থার কিঞ্চিত হেরফের হয়েছে।
হয়ত একান্ত শেষ জীবনে,
এ
সব অবাঞ্ছিত কীটদের অসহায় অবস্থা কল্পনা করে,
সরকার তাদের প্রতি কিঞ্চিত সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে।
এ
লোটপাটের দেশে,
সরকারের কত টাকাই তো কতভাবে লোটপাট হচ্ছে।
তাছাড়া দুই নম্বরী কোন সুযোগ সুবিধাও এ চাকরিতে নেই যে,
সামান্য পিয়ন হয়েও কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া যায় এবং কাউকে এ জন্য কোন
হিসেবও দিতে হয় না।
তাই,
বিভিন্ন বিবেচনায়,
শেষ জীবনের অবলম্বন হিসেবে না হয়,
কিছু দেয়া গেল।
তাতে সরকারের মুখও রক্ষা হয়।
না হয়,
এদের কেউ কেউ যদি,
শেষ উপায় হিসেবে,
ভিক্ষাবৃত্তিকেই বেছে নেয়,
তাতেই কি বলার আছে?
কিন্তু তাতে,
সরকারের মুখ থাকে কই?
চাকরি অন্তে,
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব,
কাগজপত্র দাখিল করাটাই বিধেয় মনে করে ওহিদ।
কারণ টাকাটা এ দেশের কোটি কোটি পতিদের দৃষ্টিতে যৎসামান্য অথবা উপহাস্পদ
মনে হলেও,
তার কাছে তাই গণিমত।
কারণ,
তার জন্য তো বাকি জীবনের এটুকুই অবলম্বন।
পি,এফ
এবং মূল বেতনভাতা মিলে,
আট লাখ টাকার কম নয়।
আর ওহিদ সারাজীবনই হিসেবি মানুষ।
না হয়,
এ
সামান্য আয়ের চাকরিতেই দুটি কন্যাসন্তান ও মা বাবা নিয়ে,
ছ’জনের
একটি পরিবার চালিয়ে এসেছে।
এবং সুষ্ঠুভাবেই চালিয়ে এসেছে।
হয়ত বিধাতাও তার অনুকূল ছিল।
তাই বড় রকম রোগব্যাধি,
বালা মসিবত তাকে পায়নি।
গরিবের আল্লাহ্ হয়ত এভাবেই গরিবকে রক্ষা করে।
এখনো তার পরিকল্পনা কম নয়।
(কাট
ইউর কট একরডিং টু ইউর ক্লথ). ইংরেজি এ প্রবাদটি সে জীবনে কখনো ভুলেনি।
দু’চারটা
টাকা হাতে পেলে,
বিলাস ব্যাসনের নামে ছিটেফোঁটা অপচয়ও তার ধাতে নেই।
পেনশন ভাতার নামে,
আট লাখ বা তারও কিছু বেশি টাকা।
এ
মুদ্রাস্ফীতির বাজারেই বা কম কি?
সে জীবনেও এতগুলো টাকা কোনদিন একত্র করে দেখেনি।
তাদের টাকা ব্যাংক থেকে,
ব্যাংকে ঘুরে বেড়ায়।
তা বলে,
ওহিদের বেলায় এ কথা তো আর সত্য নয়।
আট লাখ কেন,
ব্যাংকে জমাকৃত তার টাকা হাজারের হিসাবকেও ছাড়াতে পারেনি।
এবারই তার জীবনে বিরল ব্যতিক্রমী ঘটনাটি ঘটতে যাচ্ছে।
অবশ্য এখনো তা ভবিষ্যৎ,
বর্তমান হয়ে অতীতে রূপ নেয়নি।
এ
অনিশ্চয়তার দেশে,
এ
বিষয়ে,
একশভাগ গ্যারান্টি দিয়ে,
তাই কিছু বলা যায় না।
ষাট বছর অন্তে চাকরিও পঁচিশ বছরের কিছু বেশি।
এটুকুই বা কজনের দ্বারা সম্ভব হয়?
এ
কলেজেই দর্শনের প্রভাষক এবং তার এককালীন ঘনিষ্ঠ সহকর্মী সফিউল ইসলাম আজ
কোথায়?
আশিতে চাকরিতে ঢুকে,
নব্বইয়ের ডিসেম্বরে,
দুরন্ত লিভার সিউরিসিসে আক্রান্ত হয়ে,
শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।
অংকের প্রফেসর মোজাম্মেল হক,
ইসলামের ইতিহাসের সিদ্দিক আলী তালুকদার,
আজ তারা কোথায়?
কেউই তাদের সময়কাল পার করতে পারেনি।
সে বিবেচনায় সে যথেষ্ট ভাগ্যবান।
(চলবে)
শ্রীলংকায়
জাতিসংঘের দপ্তর অবরোধ
সংলাপ
॥
শ্রীলংকায় কয়েকটি বিদেশী দূতাবাস জাতিসংঘের দপ্তরে গণ-অবরোধের ব্যাপারে
ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।
বৃটেন,
যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানীর কূটনৈতিক মিশনসহ দশটি বিদেশী দূতাবাস এক বিবৃতিতে
বলেছে,
জাতিসংঘের কার্যালয় অবরুদ্ধ করতে দেয়া এবং জাতিসংঘের কর্মীদের ভয় দেখানো
আন্তর্জাতিক আইনের লংঘন।
সম্প্রতি শ্রীলংকার শত শত জনতা কথিত যুদ্ধ অপরাধের ব্যাপারে জাতিসংঘের
তদন্তের বিরুদ্ধে দেশটির রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করছে।
বিক্ষুব্ধ জনতা কলম্বোয় জাতিসংঘের দপ্তরও কিছু সময়ের জন্য ঘেরাও করে
রেখেছিল।
দশটি বিদেশী দূতাবাসের বিবৃতিতে এইসব প্রতিবাদ মিছিলের নিন্দা জানানো হয়
এবং শ্রীলংকায় জাতিসংঘ দপ্তরের ও জাতিসংঘের কর্মীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা
নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তামিল গেরিলাদের সাথে যুদ্ধের সময় শ্রীলংকার সরকারি সেনারা যুদ্ধ অপরাধে
লিপ্ত হয়েছে এমন অভিযোগের তদন্তের চেষ্টা করছে জাতিসংঘ।
শ্রীলংকা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং এ জন্য তদন্তের দরকার নেই বলে
উল্লেখ করে আসছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানবাধিকার লংঘন বা যুদ্ধ অপরাধের
তদন্তের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের নিরপেক্ষতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ অপরাধের তদন্ত করা সহ সম্প্রতি গাজামুখী ত্রাণবাহী
জাহাজে ইসরাইলী হামলার তদন্তের ব্যাপারে জাতিসংঘ অকার্যকর ভূমিকা রাখায়
এই বিশ্ব সংস্থার দ্বিমুখী আচরণের সমালোচনা জোরদার হয়েছে।
ব্রিটেনে
১৩ হাজার রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী
মাসুদুর রহমান
॥
ব্রিটেনে বাংলাদেশীসহ ১৩ হাজার রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী অনিশ্চয়তার মধ্যে
পড়েছে।
জানা গেছে,
ব্রিটেনের অন্যতম শীর্ষ চ্যারাটি লিগ্যাল অ্যাডভাইজারি ফার্ম রিফিউজি
অ্যান্ড মাইগ্রেন্ট জাস্টিস (আরএমজি) নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে।
তারা বলছে,
সরকারের আর্থিক অনুদান না পাওয়ায় নিজেদের দেউলিয়ায় ঘোষণা ছাড়া গত্যন্তর
ছিল না।
কেননা,
সরকার তাদের জন্য যে অনুদান রেখেছে তা তাদের প্রয়োজনীয় ব্যয় পরিচালনার
জন্য অত্যন্ত কম।
শত চেষ্টায়ও তারা সরকারের কাছ থেকে অর্থ সরবরাহের কোনো আশ্বাস পায়নি।
প্রতিষ্ঠানটি বাধ্য হয়ে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশীসহ ১৩ হাজার রাজনৈতিক
আশ্রয়প্রার্থীর ব্রিটেনে বসবাস ও রাজনৈতিক আশ্রয়সংক্রান্ত মামলা
অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ল।
তাদের মধ্যে পিতামাতা অভিভাবকবিহীন ৯০০ শিশুও রয়েছে।
এ
দিকে আরএমজি সরকারি খরচ কমানোর প্রতিবাদে বিচার মন্ত্রণালয়ের সামনে
বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ প্রদর্শন করা হয়েছে।
লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের আয়োজিত সমাবেশে লন্ডনের সাবেক মেয়র কেন
লিভিংস্টোন বলেন,
গত ২০ বছর যাবত সরকার রাজনৈতিক প্রার্থীদের জন্য এ দেশকে কঠিন থেকে
কঠিনতর করছে।
তিনি বলেন,
সরকার বিশ্ববাসীকে বার্তা দেয়ার চেষ্টা করছে যে,
ব্রিটেন আর কাউকে এ দেশে স্বাগত জানায় না।
তিনি অবিলম্বে সরকারের এতদসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের আহ্বান জানান।
ব্রিটেনে প্রায় ২০ হাজার ব্যর্থ আশ্রয়প্রার্থী অবর্ণনীয় দুর্দশার মধ্যে
জীবন কাটাচ্ছে।
তারা বেঁচে আছে বিভিন্ন চ্যারাটির দেয়া খাবারের ওপর।
জীবনযাপন করছে রাস্তা,
গ্যারেজ,
প্লাটফর্ম বা ঝোপে শুয়ে।
|