যুদ্ধাপরাধীরা দিশেহারা

সাগর

'আম্মু তুমি পাকিস্তানে যেও না ওরা খুবই খারাপ একাত্তরে ওরা আমাদের মেরেছিল - অনেক মানুষ মেরেছিল তুমি পাকিস্তানে যাবে না আম্মু, কিছুতেই- যাবে না' - এই ছিল একটি শিশুর দাবি এবং জেদ মাত্র সাত বছর বয়সী শিশু কন্যার চাপাচাপিতে মায়ের পাকিস্তান যাত্রার ফ্লাইটে সে যাত্রা বাতিল করতে হয়েছিল বাস্তব এই ঘটনাটি ঘটেছিল এদেশেরই একজন উদীয়মান নারী সাংবাদিকের জীবনে কর্মরত এই সাংবাদিক সার্কভুক্ত দেশসমূহের সাংবাদিকদের একটি সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য পাকিস্তানে যাওয়ার কথা ছিল পরে অবশ্য মেয়েকে বুঝিয়ে রাজী করিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল তরুণ ওই রিপোর্টার তাও একথা বলে যে তিনি পাকিস্তানে গিয়ে পাকিস্তানীদের সাবধান হওয়ার জন্য বলবেন ওরা যেন ভবিষ্যতে আর কাউকে না মারে এবং তখনই জেদী মেয়েকে রাজী করানো সম্ভব হয়েছিল তার নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে

১৯৭১ সালের নরহত্যাযজ্ঞ, পশ্চিম পাকিস্তানীদের অবিশ্বাস্য বর্বরতা যারা দেখে প্রত্যক্ষ করেছিল তাদের স্মৃতিতে প্রোজ্জ্বল সে বিভীষিকার স্মৃতি যারা দেখেনি অথচ জেনেছে শুনে কিংবা ইতিহাস পড়ে তারাও শিউরে উঠে সেই নৃশংসতার দৃশ্য কল্পনা করে ছোট্ট শিশু দীপ্তির মনেও সে কাহিনী পড়ে আর টিভির পর্দায় দেখে যে ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছিল তাই তাকে অজান্তেই তাড়িত করেছে মাকে পাকিস্তানে যেতে বাধা দিতে

'৭১ এই বর্বরতা এই পৈশাচিকতা এ প্রজন্মের শিশুকে নাড়া দিলেও, দেশের কোটি কোটি মানুষকে ভারাক্রান্ত করলেও নিষ্ঠুর পরিহাস হচ্ছে তা রাষ্ট্রের অতীত বর্তমান নীতি নির্ধারকদের মনকে ছুঁতে পারেনি ফলে স্বাধীনতার ৩৭ বছরেও এদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়নি, করা যায়নি, করেনি সাবেক-বর্তমান কোনো শাসকেরা অথচ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া জরুরি এবং তা মানবতাকে প্রতিহত করার জন্য, যুদ্ধাপরাধের পুনরাবৃত্তির পথ বন্ধ করার জন্য এদেশের শাসকেরা, দায়িত্ববানরা কাজটি বছরের পর বছর উপেক্ষা করে গেলেও সময় বসে নেই নিশ্চুপ হয়ে 'যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই' আওয়াজ আজ তাই মানুষের ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়েছে কণ্ঠে, সভা-সমাবেশে উচ্চকিত হয়ে ক্রমশই তা হয়ে উঠছে গগন বিদারী শ্লোগানে যার নেতৃত্ব দিচ্ছে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে রণাঙ্গনে নেতৃত্বদানকারী বীর যোদ্ধারা সেক্টর কমান্ডারের উদ্যোগে গড়া সংগঠন 'সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম' কিন্তু শ্লোগান, বক্তৃতা দাবিনামাই কি যথেষ্ট? এসব তো কম বেশি আগেও ছিল - গত তিন দশক ধরেই শ্লোগান, বক্তৃতা, সভা-সমাবেশে পরিবেশ তৈরি হয় - কিন্তু ঘটনাটি ঘটে উপযুক্ত কর্মে যাকে বলে 'অ্যাকশন' সমাজে প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি বাঙালিকে নিজ নিজ শ্রেণী-পেশার অবস্থান থেকেই দরকার যুদ্ধাপরাধীদের প্রতিরোধ-নির্মূলে এগিয়ে আসা, ভূমিকা রাখা নিজেদের মতো করে

সাংবাদিক সংবাদপত্র সর্বোপরি সংবাদ মাধ্যম সমাজ ও রাষ্ট্রের আর সব উপাদানের মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষভাবে ক্ষমতাধর প্রশ্ন হচ্ছে, যুদ্ধাপরাধীদের মোকাবিলায়-নির্মূলে সাংবাদিকদের কি কোনো কার্যকর ভূমিকা থাকতে পারে না? অবশ্যই পারে এবং সংবাদ মাধ্যমগুলো যা পারে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ খুবই প্রয়োজনীয়-জরুরিও বটে আর সেটি হচ্ছে সংবাদমাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীকে কোনো খবর না ছাপানো-যুদ্ধাপরাধীদের ছবি না ছাপানো, বৈদ্যুতিন মাধ্যমে ওদের খবর ও ছবি না দেখানো একজন ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধীদের 'নিউজ কভার' করার জন্য একজন দেশপ্রেমিক সাংবাদিক ছুটছেন এটাও লজ্জাজনক, অবমাননাকর স্বাধীন এই দেশটিতে স্বাধীনতার সুফল ভোগকারী কোনো সংবাদ মাধ্যম স্বাধীনতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের খবর প্রকাশ প্রচার করবে এটা প্রকারান্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের অসম্মান করার নামান্তর-খোদ স্বাধীনতার চেতনাকে অবমাননা করার সামিল

সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ যুদ্ধাপরাধীদের এর খবর ও ছবি পাতায় স্থান না দেয়ার যে নীতি গ্রহণ ও লালন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমগুলো তার সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করা কি সম্ভব নয় মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার উপর পবিত্র আমানত হেফাজত করার জন্য জাতির কাছে আর কি কিছু আছে? এর বাস্তবায়নেও উদ্যোগী ভূমিকা রাখতে পারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অনুষ্ঠানে নেতৃত্বদানকারী 'সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম'।  ফোরাম সংবাদ মাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিক, সম্পাদক ও মালিকদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে বৈঠক, এর বাস্তবায়নে মতবিনিময় সভার আয়োজন করতে পারে - যার মধ্যে দিয়ে সৃষ্টি হবে ঐক্যমত সংবাদ মাধ্যম থেকে চিরতরে অপসারিত হবে যুদ্ধপরাধীদের কুৎসিত মুখ, পাপ-সংলাপ, নাপাক-চেহারা চিরতরে