|
সংবিধান অবমাননা শীর্ষক মুক্ত আলোচনা
-
রাষ্ট্রের কি কোন ধর্ম থাকতে পারে?
সংলাপ
॥
সূফী
সাধক আনোয়ারুল হক আর্শীবাদপুষ্ট সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ তার ১৫ বর্ষপূর্তি
উপলক্ষে গত ০৬ ফাল্গুন ১৪১৭,
১৮
ফেব্রুয়ারি ২০১১,
শুক্রবার সংবিধান অবমাননা শীর্ষক এক মুক্ত আলোচনার আয়োজন করে।
ঢাকা
রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে সকাল ১০:০১ মিনিটে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় স্বাগত
বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক শাহ্ আব্দুল বাতেন।
মূল
প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ড.
এমদাদুল হক কাজল।
উদ্বোধন করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান।
মুক্ত
আলোচনায় সুচিন্তিত আলোচনা রাখেন যথাক্রমেঃ ড. মোহাম্মদ মোহাব্বত খান,
সর্বজ্যেষ্ঠ অধ্যাপক,
লোক
প্রশাসন বিভাগ,
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়;
অধ্যক্ষ মোঃ শাহজাহান সাজু,
সদস্য
সচিব,
বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক - কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট;
শাহ্
শেখ মজলিশ ফুয়াদ,
লেখক,
সাংবাদিক;
মোর্শেদ আলী,
সভাপতি,
বাংলাদেশ কৃষক সমিতি;
খালেকুজ্জামান,
সাধারণ সম্পাদক,
বাসদ;
শরীফ
নুরুল আম্বিয়া,
সাধারণ সম্পাদক,
জাসদ;
মোঃ
লোকমান হোসেন,
মেয়র,
নরসিংদী পৌরসভা;
অধ্যাপক ড. শওকত আরা হোসেন,
চেয়ারম্যান,
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়।
মুক্ত
আলোচনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন দ্যা ডেইলি সান
এর
সম্পাদক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন।
প্রথমে জাতীয় সঙ্গীত এবং পরে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপনে
‘আমার
ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি
সঙ্গীতটি পরিবেশনের মাধ্যমে ঠিক ১০টা ১ মিনিটেই শুরু হয় অনুষ্ঠান।
দুপুর
১২ টা ৪৫ মিনিটে
‘আমরা
হাক্কানী,
আমরা
হাক্কানী - দিকদিগন্তে পৌঁছে দেই শান্তির বাণী
এই
শান্তি প্রার্থনা সঙ্গীত
-এর
মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তারা যেসব মূল্যবান বক্তব্য উপস্থাপন করেন পর্যায়ক্রমে সংক্ষেপে
তা তুলে ধরা হলোঃ
শাহ্
আব্দুল বাতেন
লেখক,
গবেষক
- সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ

উপস্থিত,
শ্রদ্ধাভাজনেষু উদ্বোধক,
বিশেষ
অতিথি,
আলোচকবৃন্দ ও সুধীমন্ডলী।
সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ
এর
পক্ষ থেকে আপনাদেরকে জানাচ্ছি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
সূফী
সাধক আনোয়ারুল হক আর্শীবাদপুষ্ট বর্তমান সংলাপ
-এর
নির্ভীক শুভ যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে,
প্রথমে মাসিক হিসেবে।
১৯৯৫
থেকে বর্তমান সংলাপ
সাপ্তাহিক হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
দেশের
শত শত পত্রিকার ভীড়ে বর্তমান সংলাপ কেবল সাধককুলের এক আদর্শে বিশ্বাসী,
সংস্কার ও সৃজনশীল কর্মে সুদৃঢ় প্রত্যয়ী।
যে
কোন ধরনের লোভ-লালসা,
ভয়-ভীতি,
পরশ্রীকাতরতা সংলাপ এর দৃষ্টিতে ঘৃণা ও উপেক্ষার বিষয়।
সকল
দেশ,
জাতি,
সমাজ
ও কালের জন্য প্রযোজ্য এই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি একারণেই সম্ভব যে,
মহান
সাধকগণ ভৌগলিক সীমা রেখার উর্দ্ধে মুক্ত স্বাধীন সত্ত্বা এবং সত্যের ঝান্ডাবাহী
জাতি ধর্ম বর্ণ গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের কল্যাণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠায়
নিবেদিত এবং এটি তাঁদেরই মুখপত্র বলে।
যার
সুস্পষ্ট প্রমাণ এ যাবৎ প্রকাশিত সংলাপ এর সকল সংখ্যা এবং দেশ-বিদেশ জুড়ে তার
অগনণ পাঠক সমাজ।
সাংবাদিকতায় মিথ্যাচারের প্রভাব
শীর্ষক বিষয়বস্তু নিয়ে বর্তমান সংলাপ
ধারাবাহিক মুক্ত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বিগত কয়েক বছর ধরে রাজধানী থেকে
বিভিন্ন জেলার প্রেসক্লাব ধরে।
রাজনীতি না জননীতি
শীর্ষক মুক্ত আলোচনার আয়োজন করেছে সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ।
এতে
রাজনীতি
শব্দটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে তার স্থলে জননীতি
শব্দটি ব্যবহারের অপরিহার্যতা তুলে ধরেছে ধারালো যুক্তিতে।
ধর্মান্ধ জঙ্গিদের অসভ্য মানসিকতার যখন শিকার হয় বাউল ভাস্কর্য,
বর্তমান সংলাপ তখন বিবেকী তাগিদে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজন করে মুক্ত আলোচনা -
ইসলামের দৃষ্টিতে ভাস্কর্য।
বর্তমান সংলাপের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হয় আরেকটি মুক্ত আলোচনা - ভাস্কর্য
বাঙালি জাতির ঐতিহ্য।
তথ্য
প্রমাণ,
বিচার
বিশ্লেষণ আর প্রয়োজনীয় সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে বর্তমান সংলাপ জাতির সামনে তুলে
ধরেছে ৭ মার্চ স্বাধীনতা দিবস ঘোষণার অমোঘ ঐতিহাসিক বাস্তবতার কথা।
চাপা
থাকা,
চেপে
রাখা জিজ্ঞাসা
‘২১শে
ফেব্রুয়ারি না ৮ই ফাল্গুন?
শীর্ষক মুক্ত আলোচনারও আয়োজন করে বর্তমান সংলাপ দুবছর আগে।
বর্তমান সংলাপের উপস্থাপনায় সেই আলোচনায় উঠে আসে শহীদ দিবস পালন করা হোক ৮ই
ফাল্গুন আর ২১শে ফেব্রুয়ারি পালিত হোক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে
যথারীতি।
সত্য
প্রকাশে বর্তমান সংলাপের নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াসেরই ধারাবাহিকতায় আজকের এই
অভূতপূর্ব মুক্ত আলোচনা।
আমরা
বিশ্বাস করি,
মানুষের আশা আকাঙ্খার মূল কেন্দ্রবিন্দু দেশের সংবিধান।
এর
প্রতি শ্রদ্ধা,
শালীন
অনুভূতি,
নিঃস্বার্থ প্রয়োগ ও সতর্ক রক্ষণাবেক্ষণ সকলের পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য।
কিভাবে সংবিধানের প্রতি সত্যিকার অর্থে সম্মান দেখানো যাবে আজকের সংবিধান
অবমাননা
শীর্ষক মুক্ত আলোচনায় বিদগ্ধ আলোচকদের কাছ থেকে আমরা তা জানা,
বুঝা
ও প্রতিপালন করার চেষ্টা করব।
যার
ফলশ্রুতিতে আমাদের সকলের আগামীর পথ সত্য
এর
সিক্ততায় মসৃণ হবে এবং শান্তির স্নিগ্ধ ছায়ায় নিরাপদ আশ্রয় লাভে সক্ষম হবে
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
সম্মানিত বিশেষ অতিথি ও আলোচকবৃন্দ,
বসন্তের এই সুন্দর সকালকে আমরা আমাদের মানসপটে স্মরণীয় করে রাখতে চাই,
বিষয়বস্তুর উপর আপনাদের গভীর চিন্তা ও দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্য শ্রবণের
মাধ্যমে।
এবার
পর্যায়ক্রমে আপনাদের মূল্যবান বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য সাদর আমন্ত্রণ
জানাচ্ছি।
ড.
মিজানুর রহমান,
চেয়ারম্যান,
জাতীয়
মানবাধিকার কমিশন
সম্মানিত অতিথি।
প্রথমেই আমি ধন্যবাদ জানাই সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপকে আজকের এই সংবিধান
অবমাননা
শীর্ষক মুক্ত আলোচনায় আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য।
সংবিধান অবমাননা
বিষয়টি প্রথমে ধোঁয়াশার সৃষ্টি করে।
কোন্
কোন্ বিষয়ের অবমাননা?
সংবিধান হচ্ছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন।
ফলে
রাষ্ট্রে অন্য কোন আইন প্রচলিত থাকতে পারে না,
যে
আইন কিংবা বিষয়ের সাথে এটি সাংঘর্ষিক হতে পারে।
সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া মোটামোটিভাবে চালু হয়েছে এবং আমরা আশা করছি যে
অচিরেই সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদ কর্তৃক যে কমিটি গঠিত হয়েছে সে কমিটি
বিচার বিশ্লেষণ করে বাহাত্তরের সংবিধানে,
মূলে
ফিরে যাওয়ার যে অঙ্গীকার সরকার ব্যক্ত করেছেন এবং যে অঙ্গীকার ছিল বর্তমান
সরকারের একটি নির্বাচনী অঙ্গীকার সে অঙ্গীকারে ফিরে যেতে আমরা সফল হবো।
এই
কামনা আমরা করতে পারি।
তবে
এখানে দুটো কথা না বললেই নয়,
তার
একটি হচ্ছে বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম
এই
কথাটি সংবিধানে রেখে দেওয়া হবে এটি ইতোমধ্যেই আমাদেরকে সংসদীয় কমিটি থেকে
জানানো হয়েছে আরো এবং একটা বিষয় তারা আমাদেরকে জানিয়েছেন যে,
রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম এই বিধানটিও সংবিধানে থাকছে।
তবে
এটাকে রেখে অন্য সকল ধর্ম পালনের সমান সুযোগ নাগরিকরা উপভোগ করবে - এই
নিশ্চয়তাটুকুও সংবিধানে পাকাপোক্ত ভাবে দেয়া হবে।
এসব
ভালো কথা।
যখন
আমরা সংবিধানের অবমাননার প্রশ্ন তুলি এবং বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাবার কথা
বলি,
তখন
এখানে একটু হোচট খেতে হয়।
হোচট
খেতে হয় একটি কারণে যে,
বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম
এই
কথাটি যখনই আমরা বলি তখন শুধু মাত্র একটি নির্দিষ্ট ধর্মে যাদের বিশ্বাস
রয়েছে সেই ধর্মে বিশ্বাসীদের প্রতিই যেন ইঙ্গিত করা হয়।
যদি
আমরা শুধুমাত্র বিশ্বাসীদের জন্যই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করে থাকি যে,
প্রত্যেক নাগরিক কোন না কোন ধর্মে বিশ্বাস করবে তাহলে কিন্তু আমরা রেখে দিতে
পারতাম পরম করুনাময় সৃষ্টিকর্তার নাম নিয়ে শুরু করছি-
তাহলে
সব ধর্মের প্রতিই সমান মর্যাদা দেয়া হতো।
প্রত্যেক নাগরিকেরই একটা ধর্ম রয়েছে যদি রাষ্ট্র তা মনে করে তবে এটা ঠিক হতো।
কিন্তু আমরা জানি যে,
বাস্তব ক্ষেত্রে অনেক নাগরিক রয়েছেন যারা কোন ধর্মেই বিশ্বাস করে না,
ফলে
তাদের অবস্থা কি দাঁড়ায়?
সেখানে কি তাদেরকে একটুখানি সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না?
একটা
সময় ছিল যখন এমন ছিল যে ধর্মটা ছিল মানুষের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল
এবং ধর্মীয় আঙ্গিকের বাইরে কোন কিছু চিন্তা ভাবনা কেউ করতে পারতেন না।
সে
সময়ে একজন দার্শনিককে আর একজন দার্শনিক প্রশ্ন করছেন,
আপনি
কোন্ ধর্মে বিশ্বাস করেন?
তিনি
বলছেন,
আমি
তো নাস্তিক।
তখন
তিনি বলছেন উহ! তার অর্থ নাস্তিকতাটা হচ্ছে আপনার ধর্ম।
অর্থাৎ,
ধর্মের বাইরে চিন্তা করার কোন প্রবণতা কোন ধারণা তখন আমাদের মানুষের ছিল না।
নাস্তিকতাও একটা ধর্ম তার মানে তার মানে কেউ ধর্মের উর্ধ্বে নন।
আমার
প্রশ্নটি হচ্ছে তাই
।
যে
কথাটা স্পষ্ট করে বলতে চাই যে,
যদি
আমরা ধরে নেই,
রাষ্ট্র যদি ধরে নেয় যে প্রত্যেক নাগরিকেরই একটি ধর্ম রয়েছে তাহলে
-বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম
সংবিধানে আরবিতে না লিখে আমরা যদি বাংলায় করতাম যে পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার
নামে শুরু করছি
তাহলে
কিন্তু প্রত্যেক ধর্মকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে এই একই কাজ করা যেতো কোন ধর্মকে
অবমাননা না করে।
বিষয়টি আমার চেয়ে ভালো জানেন ড. আনোয়ার হোসেন স্যার।
কারণ
ইতিহাসবিদ হলেও তিনি একজন রাষ্ট্র বিজ্ঞানীও বটে।
রাষ্ট্রের কোন ধর্ম থাকতে পারে না।
যখনই
বলা হয় যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম তখনই প্রশ্ন আসে যে রাষ্ট্র তো একটি
বিমূর্ত ধারণা,
একটি
বিমূর্ত ধারণার ধর্ম থাকে কেমন করে?
বিমূর্ত ধারণার কোন ধর্ম থাকতে পারে না।
ধর্ম
থাকতে পারে মানুষের,
যারা
সেই ধর্মকে পালন করে,
লালন
করে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে যারা জীবন পরিচালনা করার চেষ্টা করে।
যে
রাষ্ট্র ধর্ম নিরপেক্ষ সে রাষ্ট্রে ধর্মকে আবার রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা
- এই দুটো এমনভাবে সাংঘর্ষিক যে একটিকে বাদ দিয়ে অপরটির কিন্তু আর কোন অর্থই
থাকে না।
এটা
হচ্ছে সংঘর্ষের ব্যাপার।
যারা
সংবিধান নিয়ে বিবেচনা করছেন,
সংশোধনীর কাজ করছেন আমার বিশ্বাস,
তারা
এগুলো খুব সুচিন্তিত ভাবে বিবেচনায় নিয়ে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন যেন আমরা
বুঝতে পারি যে,
বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার জন্য জাতি প্রস্তুত হয়েছে।
সংসদে
যখন উপস্থাপিত হবে,
নিশ্চয়ই যে সমস্ত সংঘর্ষের কথা বলা হচ্ছে তার উত্তরণ ঘটবে এবং আমরা এমন একটি
সংবিধান পাবো যেটি আমাদেরকে বাহাত্তরের সেই চিন্তা চেতনায়,
সেই
মূল্যবোধে,
মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধে ফিরে নিয়ে যেতে আমাদেরকে সহযোগিতা করবে এটাই জাতির
কামনা এবং সেই অঙ্গীকার নিয়েই কিন্তু জাতি চেয়েছেলো যে বাহাত্তরের সংবিধানে
আমরা ফিরে যেতে চাই।
আমার
মনে হয় বিষয়টি বুঝতে কারোরই অসুবিধা হবার কথা নয়।
আপনারা সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ এরকম একটি,
খুবই
যুগোপযোগী,
সময়োপযোগী একটি বিষয় নিয়ে আজকের এই আলোচনার আয়োজন করেছেন যে আমি আপনাদেরকে
কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং আশা করছি যেসব বিদগ্ধ বক্তা এখানে আছেন তারা
তাদের সূচিন্তিত মতামত উপস্থাপন করবেন।
আমার
এই সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ আয়োজিত আজকের এই
সংবিধান অবমাননা
শীর্ষক মুক্ত আলোচনার শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করছি।
ড.
এমদাদুল হক কাজল
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক,
সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ

সম্মানীত উদ্বোধক জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান,
সম্মানিত বিশেষ অতিথি,
আলোচক
ও উপস্থিত সুধীবৃন্দ।
সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ
-এর
আজকের এ আয়োজনে অংশগ্রহণের জন্য সবাইকে কৃতজ্ঞতা ও ফাগুনের উষ্ণ শুভেচ্ছা
জানাই।
সংবিধান রাষ্ট্রের পথপ্রদর্শিকা এবং সর্বোচ্চ বিধান।
বাংলাদেশের সংবিধান মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভুত।
তাই
এই সংবিধান বাংলাদেশের জনগনের মৌলিক অধিকার,
মুক্তির চেতনা,
আশা-আকাঙ্খা ও স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি।
সংবিধান মান্য করা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য।
রাষ্ট্রের কর্ণধারদের শপথ করে বলতে হয়- আমি সংবিধানের রক্ষণ,
সমর্থণ ও নিরাপত্তা বিধান করিব।
রক্ষণ
অর্থ বজায় রাখা ও পালন করা।
পথপ্রদর্শিকায় যেভাবে নির্দেশনা আছে ঠিক সেভাবে পালন করলে তাকে রক্ষণ ও মান্য
করা হয়।
নির্দেশনা পালন না করলে তাকে অমান্য করা হয়।
অমান্য,
অসম্মান ও অবমাননা সমার্থক।
মাত্রাভেদে অবমাননার কয়েকটা স্তর আছে।
লাঞ্ছিত,
নির্যাতিত,
অমান্য,
অবহেলা,
অনাদর
ও অজ্ঞতা।
এর
প্রত্যেকটিই অবমাননার বিভিন্ন স্তর মাত্র।
সংবিধান স্থগিত করলে একে লাঞ্ছিত করা হয়,
জেনে
শুনে সংবিধান পরিপন্থী কর্মে লিপ্ত থাকলে একে নির্যাতন করা হয়,
সংবিধানকে বাস্তবায়িত করার আন্তরিক প্রচেষ্টা না থাকলে একে অমান্য করা হয়,
সংবিধানের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে আপন স্বার্থসিদ্ধির চিন্তায় মগ্ন থাকলে একে
অবহেলা করা হয়,
সংবিধানের চর্চা না করলে একে অনাদর করা হয় এবং সংবিধানকে না জানা বা জানার
চেষ্টা না করলে অজ্ঞতার সৃষ্টি হয়।
আইনের
ভাষায় সংবিধানকে না জানা,
এর
চর্চা না করা কিংবা একে বাস্তবায়িত করার আন্তরিক প্রচেষ্টা না থাকা অবমাননা
না হতে পারে কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধান শুধু আইন নয়।
এটা
একদিকে আইন অন্যদিকে প্রত্যাশা।
মানুষের দুঃখ,
জীবন
যন্ত্রণা,
না
পাওয়ার বেদনা আইনের সীমানায় আবদ্ধ নয়।
প্রয়োগ না থাকলে বিধানের মূল্য কোথায়?
এখন
পর্যন্ত সংবিধানের কতটা প্রয়োগ হয়েছে,
আদৌ
কোন প্রয়োগ হচ্ছে কি-না,
না-কি
নিজ নিজ কামনায় ধরা দিয়ে সংবিধানের অবমাননা করা হচ্ছে এটাই গুরুত্বপূর্ণ
প্রশ্ন।
সংবিধানে বলা হয়েছে - রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হইবে মেহনতী মানুষকে - কৃষক ও
শ্রমিকের - এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান
করা;
নাগরিকদের জন্য অন্ন,
বস্ত্র,
আশ্রয়,
শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা;
সকল
নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন;
মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার জন্য,
নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করিবার জন্য... রাষ্ট্র কার্যকর
ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন;
রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন;
একই
পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা থাকিবে
আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা
যাইবে না;
প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা থাকিবে;
অর্থনৈতিক জীবনের প্রধান প্রধান ক্ষেত্রে গতিশীল রাষ্ট্রায়ত্ত খাত সৃষ্টি করা
হইবে,
আইনের
দ্বারা নির্ধারিত হইবে ব্যক্তি মালিকানার সীমানা।
সংবিধানের এই কথাগুলো শহীদের রক্তে রঞ্জিত।
এসব
কথায় মিশে আছে নারীর ইজ্জত,
কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের ঘাম ও বাঙ্গালী জাতিসত্তা।
৩৯
বছরে এসব কথার কতটুকু সম্মান আমরা দিতে পেরেছি,
এই
কথাগুলো কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে তা-ই সংবিধানকে কতটুকু সম্মান আমরা দিতে
পেরেছি তা নিরূপণের মানদ
।
আমরা
একটা অচৈতণ্য,
নির্বোধ সমাজে বাস করছি।
এই
সমাজে শব্দের সংযোজন বা বিয়োজন,
মুদ্রণ ও পুনর্মুদ্রণ মান্যতার একমাত্র মানদ
।
শব্দ
নিয়ে খেলা করে বিভ্রান্তির ধোঁয়া দিয়ে সৃষ্টি করা হয় এক অদ্ভুত আঁধার।
যাদের
হৃদয়ে কোন প্রেম নেই,
করুণার আলোড়ন নেই,
মানুষের প্রতি আস্থা ও মমতা নেই ঘুরে ফিরে তাদের হাতে জিম্মি হয় আমাদের
স্বপ্নগুলো।
এটা
এক অদ্ভুত গোলক ধাঁধাঁ।
সংবিধান সম্পর্কে অজ্ঞতা,
অবহেলা ও অনাদর না থাকলে স্বার্থান্বেষীরা একে লাঞ্ছিত,
নির্যাতিত ও অমান্য করার সুযোগ পেতো না।
সুযোগ
পেয়ে স্বার্থান্বেষী মহল ধর্মীয় চেতনা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিভ্রান্ত
করতে সংবিধানে সংযোজন করেছিল বিসমিল্লাহির-রহমানির রহিম
ও
রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম।
ফলে
উৎসাহিত হয়েছে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার।
আমাদের প্রশ্ন - সংবিধানে বিসমিল্লাহির-রহমানির রহিম
থাকলে
সংবিধানের সাথে কি আল্লাহকেও অবমাননা করা হয় না?
রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতা কি সাংঘর্ষিক নয়?
মেকিয়্যাভেলি ব্যবস্থাপত্র দিয়েছিলেন - রাজাকে অবশ্যই ধার্মিক হওয়ার ভান করতে
হবে অথবা ধার্মিক ধার্মিক ভাব দেখাতে হবে।
তাহলে
শাসন ও শোষণ সহজ হবে।
তাই
হয়েছে,
রাজনীতির সাথে ধর্ম মিশিয়ে বিভক্ত হয়েছে ভারত,
৪৭
থেকে ৭১ শোষণ করা হয়েছে বাঙালি জাতিকে।
তাই
একাত্তরে এদেশের গণমানুষের প্রাণের দাবী ছিল বাংলাদেশ এমন একটা রাষ্ট্র
হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে যে রাষ্ট্র ধর্ম সম্পর্কে নিরপেক্ষ থাকবে।
অর্থাৎ - রাষ্ট্র ধর্ম পালনে বাধা দেবে না এবং কোন ধর্মেরই পৃষ্ঠপোষকতা করবে
না।
এখনই
সময়,
ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম রাখার পেছনে কি যৌক্তিকতা আছে তা আমাদের ভাবতে হবে।
রাষ্ট্রের কি কোন ধর্ম থাকতে পারে?
রাষ্ট্র কি আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করতে পারে?
রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার চলতে থাকলে কি ধর্মের নামে সংঘাত আরো শক্তি পাবে না?
সংবিধানে বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম
থাকার
যুক্তি কি?
আল্লাহর রহমান ও রহিম নামের সহিত
কি
অবমাননা করা যায়?
আমরা
চাই - শুধু বাংলাদেশ নয় সারা পৃথিবীরই ধর্ম হোক শান্তি বা ইসলাম।
মানুষে মানুষে হানাহানি বন্ধ হলে,
অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্যতা,
মমত্ব
ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে,
শান্তি বা ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে।
যারা
শান্ত নয় তারা অন্যকে শান্তি দিতে পারে না।
রাজনীতিতে ইসলামের ব্যবহার ইসলামের বিকাশ করে না,
বিনাশ
করে।
সংবিধান শব্দের আভিধানিক অর্থ সম্যক বিধান।
সম্যক
অর্থ হলো সত্য।
তাই
সংবিধান অর্থ - সত্যবিধান।
বিধান
শব্দের অর্থ একদিকে আইন,
অন্যদিকে ব্যবস্থা ও সম্পাদনা।
কর্মের মাধ্যমে যে বিধানকে বাস্তবায়িত করা হয় তা-ই সত্যবিধান।
যে
বিধানের বাস্তবতা তা উপপ্রমেয়।
যে
জাতি যত কম হইবেন এবং করিবেন
এর
মধ্যে থাকে সে জাতি তত উন্নত।
হইবেন
এবং করিবেন
ভবিষ্যতের কথা।
কথা,
কথাই।
কথা ও
বাস্তব এক না হলে কোন কথাই সুন্দর হয় না।
যা
সুন্দর নয় তা সত্যও নয়।
আমার
সৃষ্টিকারী কর্ম ও চিন্তার কারাগারে বন্দী হয়েছে আমাদের
কল্যাণ।
ভাঙ্গতে হবে এই সংকীর্ণতার কারাগার।
নইলে
চলতেই থাকবে অসম্মান ও অবমাননা।
সংবিধানকে সম্মান করা শিখতে হলে নিজেকে নিজের জবানের মূল্য দিতে শিখতে হবে।
যারা
নিজেরা নিজেদেরকে সম্মান করে না,
কথা
দিয়ে কথা রাখে না তারা সংবিধানকেও সম্মান দিতে পারে না।
যারা
সত্য বলে না,
সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত নয় তারা নির্মাণ করতে পারে না সত্যবিধান।
আসুন
- আমরা নিজেরা নিজেদের সম্মান দিতে শিখি,
সত্য
বলি,
সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হই,
নিজেরা বাঁচি,
দেশ ও
জাতিকে বাঁচাই।
প্রতিষ্ঠিত করি সংবিধান।
ড.
মোহাম্মদ মোহাব্বত খান
সর্বজ্যাষ্ঠ,
লোক
প্রশাসন বিভাগ,
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়
আলোচনায়
আমার স্নেহভাজন ড. মিজানুর রহমান স্পষ্টভাবে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন,
সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে তার
বক্তব্য রেখেছেন।
আমি
একটু ভিন্নভাবে বিষয়টি দেখতে চাই।
আমার
মনে হয়,
প্রথমে আলোচনায় বলা উচিত যে সংবিধান রাষ্ট্রের কি এবং কিভাবে তা প্রণীত হয়।
সংবিধান প্রণীত হয় জনগণের একটি দেশের মানুষের আশা আকাঙ্খার প্রতীক হিসেবে।
সেখানে একটা প্রশ্ন উঠে কারা এটা করে?
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অবশ্যই আইনসভা এটি প্রণীত করে এবং এই আইনসভা যখন এটা
করে তখন এটা ধরে নিতে হয় যে যারা আইনসভায় গেছেন তারা জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে
জনগণের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।
১৯৭২
এর সংবিধানের প্রতি যদি আমরা তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে জনগণ যা চেয়েছিলো
সেটাই রূপ পেয়েছে।
পরবর্তীকালে সংবিধান নিয়ে নানাভাবে টানা-হেছড়া করা হয়েছে,
কাটাছেড়া করা হয়েছে এবং সংশোধনীর নামে যা করা হয়েছে তাতে সংবিধানের বিশেষ
কিছু অবশিষ্ট ছিল না।
বাহাত্তরের সংবিধানে চারটি মূলনীতি ছিল।
তারপর
সেটার কি অবস্থা হয়েছে তা আমরা জানি।
কেন
হয়েছে কারা করেছে সেটাও আমরা জানি।
দুঃখের বিষয় হচ্ছে যারা সংবিধানকে সমুন্নত রাখার কথা বলেন,
তারা
বিভিন্ন সময়ে তাদের অবস্থার পরিবর্তন করেছেন।
তারা
সামরিক শাসনের সময় মন্ত্রী হয়েছেন,
উপদেষ্টা হয়েছেন এবং পরবর্তী কালে দেশে যখন গণতন্ত্র এসেছে তখন তারা বিভিন্ন
দলে যোগদান করেছেন এবং তাদের কেউ কেউ আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পেয়েছেন।
তাদের
বক্তৃতা শোনা যায়,
তারা
সংবিধান রক্ষার কথা বলেন।
এ
ধরনের অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে সংবিধান রক্ষা তো দূরের কথা সংবিধান বলেই
কিছু থাকবে না।
রাজনীতিতে যতদিন সৎলোক,
শিক্ষিত লোক এবং মানব দরদী লোক আসবেন না ততদিন এই অবস্থা চলতেই থাকবে।
ড.
মিজানুর রহমান এবং সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক যেখানে
সাংঘর্ষিক দেখতে পাচ্ছেন সেখানে সাংঘর্ষিক তো হবেই,
কারণ
যারা নিজেরা কোন কিছুতেই একনিষ্ঠতায় থাকতে পারেন না,
যারা
একেক সময় একেক কথা বলেন,
একেক
সময় একেক কাজ করেন তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্যে তো সেখানে একই সাথে
আমরা ধর্ম-নিরপেক্ষতার কথা বলি এবং একই সাথে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের কথা বলি।
আর
একটি কথা হচ্ছে যে,
এসব
কথা বলা হচ্ছে এই কারণে যে আমরা ধর্মটা কি সেটাও আমরা জানি না।
ধর্মকে আমরা রাজনীতির মধ্যে টেনে আনি যার ফলে জনগণের মধ্যে বিভক্তি আসে,
ধর্মে
ধর্মে সংঘাত বাধে।
এবং
মানবতার কথাটা একেবারেই পেছনে চলে যায়।
সংবিধান কি?
ধর্ম
কি?
রাষ্ট্র কি?
প্রত্যেকেরই সংবিধান,
রাষ্ট্র এবং ধর্মের দরকার আছে।
জানতে
হবে ধর্মের ব্যবহারটা কোথায়?
একজন
ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনকে যাতে ভালোভাবে যাপন করা যায় সেটাই ধর্মের কাজ।
ধর্মের কাজ গোষ্ঠিতে গোষ্ঠিতে সংঘর্ষ বাধিয়ে দেয়া নয়।
ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক খারাপ করা নয়।
অথচ
আমরা দেখি ধর্মকে রাজনীতিতে টেনে এনে অত্যন্ত নোংড়া ভাবে ব্যবহার করা হয়।
রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার যতদিন আমরা বন্ধ না করতে পারবো ততদিন সংকটের সমাধান
আসবে না।
ধর্ম
নিরপেক্ষতা এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এ দুটো একসাথে চলতে পারে না।
বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাবার যে কথা বর্তমান সরকার বলেছেন সেটাকে আমরা
প্রশংসা করি কিন্তু তারা একই সাথে সংবিধানের মধ্যে বিভিন্ন অনুচ্ছেদ লাগিয়ে
দিচ্ছেন যাতে বাহাত্তরের সংবিধানের প্রতিফলন ঘটে না।
আমাদের দেশের রাজনীবিদরা কোন নীতিশিক্ষা আমাদের দেশের তরুণ সমাজকে দিতে
পারেননি।
এটা
দেশের জন্য বিপদজনক।
এর
থেকে উত্তরণ না ঘটলে কোন ধরনের মঙ্গল কাজ আমরা করতে পারবো না।
এবং
একইভাবে আর একটা কথা বলতে হবে যে,
আজ
সংবিধান নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
মূল
কথাটা হচ্ছে - একদিকে ধর্মান্ধতা এবং অন্য দিকে মুক্তচিন্তা এ দু্থটোর মধ্যে
একটাকে বেছে নিতে হবে।
মুক্তচিন্তা মানে এই না ধর্মহীনতা নয়।
আমরা
অনেকেই ধর্মে বিশ্বাস করি এবং ধর্ম পালন করি।
কিন্তু তার মানে এই নয় যে আরেকটা ধর্মের সাথে আমাদের সাংঘর্ষিক অবস্থার
সৃষ্টি হবে।
এই
জিনিসটা যতদিন আমরা না বুঝবো ততদিন এই সমস্যা চলবে।
যারা
আজকের এই মুক্ত আলোচনার আয়োজন করেছেন এবং আমাকে এই আলোচনায় অংগ্রহণের জন্য
আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং আজকের এই
মুক্ত আলোচনার সফল পরিসমাপ্তি কামনা করছি।
অধ্যক্ষ মোঃ শাহজাহান সাজু
সদস্য
সচিব,
বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক - কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট

সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ আয়োজিত সংবিধান অবমাননা
শীর্ষক মুক্ত আলোচনায় উপস্থিত অতিথিবৃন্দ ও সুধীমন্ডলী।
মহান
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে সংবিধান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
আমাদের দিয়েছিলেন,
১৫ই
আগষ্টের পর সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কিভাবে এদেশের মানুষের
আশা-আকাঙ্খাকে ধূলিস্যাৎ করে নিজের স্বার্থে ইসলামকে রাজনীতে টেনে এনে একে
কুলষিত করেছেন তা আমরা দেখেছি।
একজন
নাগরিক হিসেবে আমরা যা দেখছি যখন ধর্মকে রাজনীতির সাথে মিশিয়ে দেয়া হলো,
তখন
থেকেই দিনের পর দিন আমরা সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
যারা
ধর্মকে রাজনীতিতে টেনে আনে তারা নিজেরা কি ধর্মের প্রতি অনুরুক্ত ছিলেন?
তারা
আসলে ধর্মকে রাজনীতিতে টেনে এনেছেন রাষ্ট্র ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য।
ধর্ম
কোনদিন সন্ত্রাসে বিশ্বাস করে না।
আজ
সরকার সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে,
আমি
শংকিত সরকার যেটা বিশ্বাস করেন সেটা কার্যকরী করতে পারবেন কি-না।
আজকে
যদি আমরা ধর্মকে রাষ্ট্রের সাথে মিশিয়ে ফেলি তাহলে সমস্যা আরো বাড়তেই থাকবে।
আইন
প্রণয়ন কারা করেন?
মাননীয় সাংসদগণ।
নিজামী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে তো আমরাই ভোট দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছি।
আমরা
যারা সাধারণ নাগরিক আছি আমরা যদি সচেতন না হই তাহলে যারা ধর্মকে নিজের
স্বার্থে ব্যবহার করেন তাদেরকে সংসদে আসার পথ যদি বন্ধ না করি তাহলে কিন্তু
সমস্যা চলতেই থাকবে।
আমরা
যারা সাধারণ নাগরিক আছি তাদেরকেই স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি যেন সংসদে আসতে না
পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে।
আমি
ধন্যবাদ জানাই সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপকে এরকম একটা মুক্ত আলোচনার আয়োজন করার
জন্য।
এসময়
এরকম একটা বিষয় নিয়ে আলোচনার খুব দরকার ছিল।
সরকার
হয়তো ভাবছেন সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ বাদ দিলে বিদ্রোহ হবে।
কিছুটা ঝুঁকি তো নিতেই হবে।
আর
আমাদের নাগরিকদের দায়িত্ব হচ্ছে এ ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করা।
সবাইকে ধন্যবাদ।
শাহ্
শেখ মজলিশ ফুয়াদ
লেখক,
সাংবাদিক
উপস্থিত
সবাইকে ফাল্গুনের শুভেচ্ছা এবং আমাকে বলার সুযোগ দেয়ার জন্য সাপ্তাহিক
বর্তমান সংলাপকে ধন্যবাদ।
সংবিধান হচ্ছে দেশ পরিচালনার একটি দর্শন,
দেশের
জনগণের কল্যাণের দিক নির্দেশনা।
আর এর
অবমাননা হল দেশের প্রতি অবমাননা,
জনগণের প্রতি অবমাননা,
নিজের
প্রতি অবমাননা।
আর
অবমাননার আবিধানিক অর্থ হচ্ছে অপমান,
অনাদর,
অসম্মান বা অশ্রদ্ধা।
সংবিধান একটি স্বাধীন দলিল।
স্বাধীন কোন রাষ্ট্রের জন্য তা অমূল্য সম্পদ।
যে
কারণে আমাদের প্রয়োজন সংবিধানকে রক্ষা করা,
একে
সম্মান করা ও সমুন্নত রাখা।
আর এ
দায়িত্ব জনগণের যারা রাষ্ট্রের মূল চালিকা শক্তি।
রাষ্ট্রের শাসন কর্তা ব্যক্তিবর্গ সংবিধানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত।
তাহলে
সংবিধান অবমাননার সুযোগ কোথায়?
কিন্তু সংবিধান অবমাননা হচ্ছে এবং হওয়ার লক্ষণও দেখা যায়।
স্বার্থন্বেষী কর্তামহল সুযোগ পেলেই সংবিধান অবমাননা করে যাচ্ছে।
সাময়িক লাভের সুযোগ নিতে সংবিধান অবমাননার মাধ্যমে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের
প্রতিযোগিতায় মত্ত এই স্বার্থান্বেষীরা।
স্বাধীনরাষ্ট্র বাংলাদেশের জনগণের চাওয়া-পাওয়া কী হবে অর্থাৎ এর শাসনতন্ত্র
বা সংবিধানে কী থাকবে তা ৭১-এ
৯মাসের বাঙালির মুক্তিযুদ্ধকালেই চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৬ই জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে স্বাধীন
বাংলার মাটিতে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রথম বার্ষিক সাধারণ সভায় ভাষণে
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,
‘জাতীয়তাবাদ,
সমাজতন্ত্র,
গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা-এই চারটি আদর্শের ভিত্তিতে আমরা স্বাধীনতা সংগ্রাম
করেছি এবং এইসব আদর্শের ভিত্তিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে এটাও আপনারা নিশ্চয়ই
বিশ্বাস করেন।
আমরা
এই চারটি আদর্শের ভিত্তিতেই দেশের শাসনতন্ত্র তৈরি করতে চাই।
কিন্তু গণতন্ত্রেরও একটা মূলনীতি আছে।
গণতন্ত্রের অর্থ পরের ধন চুরি,
খুন-জখম,
লুটতরাজ বা পরের অধিকার হরণ করা নয়।
তার
জনকল্যাণমূলক একটা নীতিমালা আছে।
সাংবাদিকতারও একটা নীতিমালা আছে।
(তথ্যসূত্র:
এই দেশ এই মাটি (প্রবন্ধ,
বক্তৃতা,
বাণী,
নির্দেশ ও সাক্ষাৎকার- শেখ মুজিবুর রহমান,
(প্রকাশনায়-
বঙ্গবন্ধু ললিতকলা একাডেমী)।
বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণের ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা লাভের এক বছর পার হওয়ার আগেই
একটি সংবিধান জাতিকে উপহার দেয়া হয়েছিল।
তৎকালীন জাতীয় সংসদে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর প্রথমবারের মত সংবিধানের খসড়া
প্রস্তাব উত্থাপিত হয়।
সেজন্য দিনটি সংবিধান দিবস
হিসেবে বর্তমান জাতীয় সংসদে গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হয়েছে।
সদ্য
স্বাধীন দেশে ওই সংবিধানে (যা ৭২-এর সংবিধান হিসেবে পরিচিত) ছিল একটি স্বাধীন
ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের চলার প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা।
বিশেষ
করে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত দেশটির উঠে দাঁড়ানোর মত নীতি ও সকল
আদর্শ যেমন - গণতন্ত্র,
সমাজতন্ত্র,
ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে করা হয় রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতি।
স্বাধীনতাবিরোধী দেশী-বিদেশী অপশক্তি এবং তাদের দোসররা হয়তো তখন আড়ালে লুকিয়ে
ছিলো এবং দেশের রাজনীতি-অর্থনীতি নিয়ে কোনো কথা বলার শক্তি সামর্থ্য তাদের
ছিল না সেহেতু
১৯৭২-এর
সংবিধানের বিরুদ্ধে কোনো কথাও তখন শোনা যায়নি।
দেশের
মানুষ যে স্বপ্ন নিয়ে এদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল অথবা
মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিল,
যাবতীয় ত্যাগ-তিতিক্ষা নিয়ে দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছিল -
১৯৭২-এর
সংবিধানে তা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় তাই এর প্রতি জনগণের সমর্থনও ছিল অকুন্ঠ।
কিন্তু ইতিহাস বলে,
১৯৭৪
সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ঢাকা সফরকে কেন্দ্র
করে স্বাধীনতা বিরোধীরা আড়াল থেকে বের হয়ে আসতে থাকে এবং দেশের বিভিন্ন
স্থানে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে লিপ্ত হয় চক্রান্তে-ষড়যন্ত্রে।
১৯৭৫
সালের ১৫ আগষ্ট তারা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে এদেশকে আবারো
পাকিস্তান বানাবার আয়োজনে মেতে উঠে।
’৭২-এর
সংবিধানের মূলনীতিগুলোকে ধুয়ে মুছে দেয়।
মুক্তিযুদ্ধের সব অর্জন নিশ্চিহ্ন করতে ৭২- এর সংবিধানকে মুছে দেয়ার চেয়ে
মোক্ষম কোন পথ তাদের কাছে বুঝি আর একটিও ছিল না! এক্ষেত্রে এই ৭২-এর
সংবিধানের বিরোধীরা যথেষ্ট সফলই হয়েছে বলা যায়।
সামরিক শাসন,
স্বৈরাচারি শাসন ও আমলাতন্ত্রকে দুর্নীতিগ্রস্থ করে রাখতেই ধর্মের নামে
যাবতীয় অধর্মের কাজই বেশি হয়েছে
১৯৭২-এর
সংবিধানকে অবমাননা করার পর।
বর্তমান জাতীয় সংসদের এক অধিবেশনে মাননীয় সংসদ নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনা তাই বলেছিলেন,
১৯৭২-এর
সংবিধান আজ পর্যন্ত দেশে কায়েম থাকলে স্বাধীনতার ৩৮ বছর পরে এসে দেশের অবস্থা
অন্যরকম হতো।
দারিদ্র্যমুক্ত,
শোষণমুক্ত সমাজপ্রতিষ্ঠা সম্ভব হতো।
শক্তি
হিসাবে স্বাধীনতাবিরোধীদের অস্তিত্ব ও বিকাশতো দূরের কথা,
উদ্ভবই হতো না।
যেমন
থাকে না আলোর উপস্থিতিতে অন্ধকারের অস্তিত্ব।
ঐতিহাসিক ৬-দফা আর ১১- দফার মৌল চেতনার আলোয়
১৯৭০-এর
ঐতিহাসিক নির্বাচনী ইশতেহারের ভিত্তিতে প্রণীত হয়েছিল
১৯৭২-এর
সংবিধান যাতে প্রতিফলন ঘটেছিল মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদের স্বপ্ন,
সাড়ে
সাত কোটি মানুষের গণ আকাঙ্খার।
পবিত্র সংবিধানকে সম্মান ও মর্যাদার আসনে রাখার জন্য আমাদের সকলকে আরও
যত্নবান হওয়া দরকার।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার আলোকে বর্তমান সময়ের দাবি ডিজিটাল বাংলাদেশ
প্রতিষ্ঠা করতে হলে সংবিধানকে এদেশের প্রতিটি মানুষের কাছে পবিত্র আমানতও
বাধ্যতামূলক করা হিসেবে অধিষ্ঠিত করা প্রয়োজন।
ভুলে
গেলে চলবে না যে বঙ্গবন্ধু সারা জীবনের সংগ্রামী ছিল এদেশের জন্য এমন একটি
শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করা যার ভিত্তিতে এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক,
রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে।
সবাইকে আবারো ধন্যবাদ।
মোর্শেদ আলী
সভাপতি,
বাংলাদেশ কৃষক সমিতি

মাননীয় উদ্বোধক,
উপস্থিত আলোচকবৃন্দ,
ভাই ও
বোনেরা।
গতকাল
নোয়াখালীতে কৃষকদের একটা সভায় যোগদান করেছিলেম।
আমি
সভাপতি হিসেবে আমার মতো করে বক্তব্য দিচ্ছি এমন সময় এক কৃষক বলে উঠলেন,
আমি
যে বিএডিসি থেকে টমেটোর বীজ এনে বুনেছি তা থেকে কোন চাড়া গজায়নি এ সম্পর্কে
কিছু বলেন।
এই যে
কৃষকের ভালো বীজ পাবার অধিকার,
সার
পাওয়ার অধিকার তাতো আমাদের সংবিধানে স্পষ্টভাবে দেয়া আছে।
একটু
আগে ড. এমদাদুল হক কাজল এবং বিজ্ঞ আলোচকগণ সংবিধানে সাধারণ মানুষের কি অধিকার
আছে তা বলে গেছেন।
সংবিধানে সবার জন্য শিক্ষা ও খাদ্যের ব্যবস্থা করার কথা বলা আছে।
বিগত
চল্লিশ বছরে এ বিষয়ে কি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা মূল্যায়নের বিষয়।
জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েও কিন্তু সংবিধানের অবমাননা চলেছে।
ভোট
জিনিসটাকেও আমাদেরকে বুঝতে হবে।
ভোট
কিনতে টাকার খেলা চলে।
নির্বাচনে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করা যায়।
কোটি
টাকা খরচ করে একজন এমপি হন এটা কি সাংবিধানিক?
এই
ফেব্রুয়ারি মাসে যত জায়গায় ওয়াজ হচ্ছে তাতেও আমাদের সংবিধানে সাথে সাংঘর্ষিক
বক্তব্য আসছে।
ইসলামের প্রচারের নামে জনগণের স্বার্থবিরোধী প্রচারণা চলছে।
ইসলামের নামে ব্যাংক,
বীমা,
ইনসিওরেন্স করে ইসলামের নামে ব্যবসা চলছে।
সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ আজ সংবিধান অবমাননা শীর্ষক যে মুক্ত আলোচনার আয়োজন
করেছে তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
আমি
সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপকে এজন্য ধন্যবাদ জানাই।
খালেকুজ্জামান
সাধারণ সম্পাদক,
বাসদ
আজকের
এই মুক্ত আলোচনায় উপস্থিত সম্মানিত অতিধি বক্তাবৃন্দ এবং উপস্থিত সুধি।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের পক্ষ থেকে আপনাদের সবাইকে ফাল্গুনের শুভেচ্ছা।
গত ৪০
বছর ধরেই সংবিধান অবমাননা করা হচ্ছে।
আমাদের এই সংবিধান মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রণীত হয়েছিলো।
এতে
জনগনের আকাঙ্খা প্রতিফলিত হয়েছিলো।
কিন্তু স্বাধীনতা উত্তর কালে যারা দেশ শাসন করেছেন তারা জনগণের স্বার্থ
দেখছেন না বলেই আমরা সংবিধানের অবমাননা লক্ষ্য করছি।
এদেশে
এখনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়িত হয়নি এবং যুদ্ধপরাধীদের বিচার সম্পন্ন
হয়নি।
নির্বাচিত হলেই কোন সরকার গণতান্ত্রিক হয় না।
তার
নজির অনেক আছে।
গণতান্ত্রিক বিধি বিধান আইন কানুন সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হলে কোন
সরকার গণতান্ত্রিক হয় না।
আমরা
নির্বাচিত এবং অনির্বাচিত এই ধরনের অগণতান্ত্রিক সরকারের শাসনে আছি বিগত ৪০
বছর।
সংবিধান এখন পর্যন্ত ১৪ বার সংশোধিত হয়েছে।
জনগণের কল্যাণে কিংবা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাস্তবায়নের স্বার্থে কোন
সংশোধনী হয়নি।
আপনারা বলছেন বাহাত্তরের সংবিধানে প্রেরত যাবেন।
সংবিধানে যা আছে তাই-তো বাস্তবায়িত করতে পারবেন না।
যেমন
আমাদের সংবিধানে আছে যে,
একই
পদ্ধতির শিক্ষা ব্যবস্থা থাকবে।
কিন্তু আমাদের দেশে ৩ পদ্ধতির শিক্ষা ব্যবস্থা আছে।
মাদ্রাসা শিক্ষা,
ইংলিশ
মিডিয়াম ও বাংলা মিডিয়াম।
তাহলে
আপনার সংবিধানে একই পদ্ধতির শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলছেন কেন?
লিখেছেন এক ধরনের শিক্ষা থাকবে আর চালাচ্ছেন তিনটা।
বলা
আছে কোন ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করতে পারবে না।
অথচ
প্রতিবছর কালো টাকা সাদা করছেন।
এটা
সংবিধানের লঙ্ঘন।
লিখে
রেখেছেন পরিকল্পিত অর্থনীতির মাধ্যমে দেশ পরিচালিত হবে,
আর
বাস্তবায়িত করছেন মুক্ত বাজার।
তাহলে
আগে তো সংশোধন করে নেবেন।
সংবিধানে বলা আছে সাম্রাজ্যবাদ,
ঔপনিবেশবাদ বা বর্ণবৈষবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের
ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করিবেন।
অথচ
ইরাকের উপর আক্রমণ চালিয়ে ১০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করো কিন্তু আজ পর্যন্ত
বাংলাদেশ একটা প্রতিবাদ পর্যন্ত করলো না।
আমাদের বাংলাদেশে প্রায় ৪৫টি জাতিসত্তা আছে।
তারাও
যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে কিন্তু সাংবিধানিকভাবে তাদের কোন স্বীকৃতি দেয়া
হয় নাই।
একদিকে বলছেন নারী-পুরুষ সমান।
কিন্তু সম্পদের উত্তরাধিকার প্রশ্নে সেটাকে অস্বীকার করছেন।
ধর্মীয় বিধান সেখানে চালু করে রেখেছেন।
সংবিধানে নুন্যতম মুজরীর কথাও বলা আছে।
তথ্যানুযায়ী এখন চারজনের পরিবারে ১৪ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরী হওয়া উচিত।
অথচ
এখন ২ থেকে ৩ হাজার টাকা হচ্ছে ন্যূনতম মজুরী।
এখন
বলছেন সংবিধানে বিসমিল্লাহ রেখে দেয়া হবে।
সংবিধান কোন ধর্মগ্রন্থ নয়।
আমরা
একাত্তরে কোন ধর্মযুদ্ধ করি নাই আমরা করেছিলাম মুক্তিযুদ্ধ।
জিবরাইল এসে প্রথমে মুহাম্মদকে বলেন নাই যে,
বলো
বিসমিল্লাহ।
জিব্রাইল মোহাম্মদকে বলেছেন ইকরা
অর্থাৎ পড়।
মদীনা
সনদে কি বিসমিল্লাহ আছে?
হযরত
মুহাম্মদের কোন বিখ্রাত ভাষণে বিসমিল্লাহ নাই।
বিদায়
হজ্বের ভাষণেও তিনি বিসমিল্লাহ বলেন নাই।
মদীনা
সনদে বিসমিল্লাহ লাগে না,
বিদায়
হজ্বের ভাষণে বিসমিল্লাহ লাগে না আপনারা সংবিধানে এসে বিসমিল্লাহ দিচ্ছেন কেন?
এটার
নাম ধোঁকাবাজি,
প্রতারণা।
অবৈধ
ক্ষমতাকে বৈধ করার জন্য সেদিন তারা ধর্মের নামে প্রতারণা করেছিল।
আর
আজকে আপনারা কি করছেন?
একদিকে বিশ্ব বেহায়া আর অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধী নিয়ে আপনারা বসে আছেন।
তারপরও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা থাকে কিভাবে?
সংবিধান অবমাননা
বললে
অনেকটা নরমভাবে বলা হয়।
যা
লেখা হচ্ছে এবং যা করা হচ্ছে এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য বিশাল।
যদি
আমরা সত্যিকার অর্থে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা প্রতিষ্ঠিত করতে চাই তাহলে যে
শাসন ব্যবস্থা এতদিন ধরে চলে আসছে এটা দিয়ে তা করা যাবে না।
একটা
শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে
প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না।
আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।
শরীফ
নুরুল আম্বিয়া
সাধারণ সম্পাদক,
জাসদ

প্রথমে আজকের এই মুক্ত আলোচনা সভায় আয়োজকদেরকে আমি ধন্যবাদ জানাই।
ধন্যবাদ জানাই একারণে যে এ ধরনের আলোচনা সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে প্রতিষ্ঠিত
করতে সহায়ক।
এখন
সংবিধান অবমাননা এজন্য হচ্ছে যে,
মুক্তিযুদ্ধের সময় জনগণ যেভাবে ঐক্যবদ্ধ ছিল,
এখন
সেই ঐক্যবদ্ধতা নেই।
দেশের
জনগণের মধ্যে মেজরিটি মুসলমান থাকলে এটা সংবিধানে রাখার তো দরকার নেই।
আর
যারা রাখছেন তারা মতলববাজ।
ধর্ম
মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়।
রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকলে জঙ্গি,
সন্ত্রাসীরা এটাকে অপব্যবহার করবে।
আমাদেরকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।
যারা
এটাকে রাখার পক্ষ্যে ওকালতি করছেন তাদের একটা মতলব আছে।
আর
যারা চাপে পড়ে এটাকে রাখতে চাচ্ছেন তারা মনে করছেন এটাকে তুলে দেবার মতো
যথেষ্ট শক্তি তাদের নেই,
অথবা
তারা মতলবটা উপেক্ষা করছেন।
এদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ যদি স্পষ্টভাবে তাদের মতামত ব্যক্ত না করেন তাহলে
আমার মনে হয় আবার একটা বড় রকমের ভুল হবে।
এখন
যদি আওয়ামীলীগ মনে করে যে এটা রাখবে তাহলে পার্লামেন্টে এটাই পাশ হয়ে যাবে।
আমি
আজকের আলোচনায় বলতে চাই যে আমাদেরকে সজাগ থাকতে হবে,
সতর্ক
থাকতে হবে এবং এই শক্তিকে মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
মুসলিম লীগের বাংলাদেশ করার জন্য এদেশের মানুষ যুদ্ধ করে নাই।
আবার
যাতে আমরা বড় রকমের কোন ভুল না করে বসি এজন্য আমাদের সংঘবদ্ধ হতে হবে।
যদি
এবার না হয় তাহলে ভবিষ্যতেও আমাদেরকে এটা সংশোধন করতে হবে।
জনগণের স্বার্থে যেসব কথা সংবিধানে আছে তার পক্ষে যদি সংগঠন এবং রাজনৈতিক
শক্তি গড়ে না উঠে তাহলে এসব কথা কাগজেই থেকে যাবে।
ধন্যবাদ।
মোঃ
লোকমান হোসেন
মেয়র,
নরসিংদী পৌরসভা
সংবিধান
অবমাননা
শীর্ষক মুক্ত আলোচনায় আগত,
সমাগত,
সম্মানিত উপস্থিতি।
আমি
আপনাদের সকলকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।
সংবিধান অবমাননা এদেশে প্রতি মুহূর্তে হচ্ছে।
এবং
সংবিধানের এই অবমাননা কারা করছে?
যার
যার স্বার্থে বিভিন্ন সময়ে সংশোধনী এনে যেমন এটিকে অবমাননা করা হচ্ছে
পাশাপাশি একথাটাও সত্য যে আমার প্রিয় বাংলাদেশে প্রতিমুহূর্তে সংবিধান
অবমাননা হচ্ছে।
কারা
অবমাননা করছে?
যারা
সংবিধান বুঝে,
সংবিধান পড়তে পারে এবং এ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে তারাই সংবিধানকে অবমাননা করছে।
সকল
নাগরিকের সমান অধিকার কথাটা যদি সত্য হয়ে থাকে,
তাহলে
আমরা যারা এদেশের সাধারণ মানুষ মফস্বলে থাকি,
জেলা
শহরে বসবাস করি আমরা তো প্রতি মুহুর্তেই দেখি যে সংবিধান অবমাননা হচ্ছে।
যে
দেশে মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যায় সেদেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি,
মন্ত্রীরা বিদেশে যাচ্ছেন চিকিৎসার জন্য।
বর্তমান সংলাপে অনেক দিন আগে একটা লেখা পড়ে ভাল লেগেছিল।
একটা
সেরা উক্তি ছিল যে,
এদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী অন্তত শপথ করে বলুক যে তিনি অন্তত চিকিৎসার জন্য
বিদেশ যাবেন না।
যখন
এদেশের ভুখা-নাঙ্গা মানুষ ৫টি টাকার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে আর তার পাশে
দিয়ে যখন মন্ত্রী ফ্লাগ উড়িয়ে যান,
এটাওতো সংবিধান অবমাননা।
তিন
প্রকার শিক্ষানীতি থাকা সংবিধানের জগণ্যতম অবমাননা।
এখন
একটু অন্য বিষয়ে আমি একটু আলোকপাত করতে চাই।
আমার
এই প্রিয় স্বদেশ যে দেশ একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ
করেছিল অবশ্য অবশ্য তা বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে।
৩০
লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছে।
কৃষক
শ্রমিক ছাত্র কেউ ঘরে বসে ছিল না।
আমার
ধারণা আজকের যে শ্রেণী সুবিধাভোগী সেদিনও কিন্তু সেই শ্রেণী সুবিধাভোগী ছিল।
যারা
আজ জাতিকে জ্ঞান দান করেন,
সুন্দর সুন্দর কথা বলেন তাদের অনেকেই কিন্তু সেদিন মুক্তিযুদ্ধে যান নাই।
মুক্তযুদ্ধ করেছে একেবারে সাধারণ পরিবারের মানুষ কৃষক,
শ্রমিক,
ছাত্র।
দেশ
স্বাধীন হলো. সংবিধান রচনা হলো।
গত
চল্লিশ বছরে এই সংবিধান কাদের স্বার্থে ব্যবহার হয়েছে?
কাদেরকে রক্ষা করার জন্য ব্যবহার হয়েছে?
এই
সংবিধান কাকে রক্ষা করছে আর কাকে শোষণ করছে?
কোন
সরকারই কৃষক-শ্রমিক সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য কাজ করেনি।
রাজনীতিবিদদের মধ্যে অবশ্যই মন্দ মানুষ আছে একথা সত্য।
কিন্তু বাংলাদেশে যত উচ্চ শিক্ষিত যত আমলা,
সরকারী কর্মকর্তা তারা কি সাধু?
কেউ
সাধু না।
একজন
ইউনিয়ন চেয়ারম্যানকে সিনেমাতে ভিলেন বানানো হয়,
এমনকি
একটা কোমল পানীয়ের বিজ্ঞাপনেও একজন চেয়ারম্যানকে চোর হিসেবে দেখানো হয়েছে।
আমি
বলতে চাই,
বাংলাদেশের সকল ইউনিয়ন চেয়ারম্যান,
সবাই
কি চোর?
আমি
ধরে নিলাম ২৫% মন্দ মানুষ আছে।
বাংলাদেশের ২৫% চেয়ারম্যান যদি সব বরাদ্ধ চুরি করেন একজন এক্জিকিউটিভ
ইঞ্জিনিয়ারের সমান চুরি করতে পারবেন না।
আজ
পর্যন্ত কোন সিনেমা বা নাটকে কেউ কি তাদের সেই চরিত্র তুলে ধরেছে জাতির সামনে?
আমি
মনে করি উচ্চ শিড়্গিত চাকরিজীবী চোরের চেয়ে রাজনীতিবিদ চোর অনেক ভাল।
বেশির
ভাগ মানুষ নষ্ট হয়ে গেছে।
কিছু
মানুষ ভালো আছে এটা আমি স্বীকার করি।
জেলা
পর্যায়ে একজন এক্জিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারের পোষ্টিং নিতে ৩০ লাখ টাকা না-কি লাগে।
৩০
লাখ টাকা দিয়ে কেন তিনি পোষ্টিং নেন তা বুঝতে হবে।
তিনি
রাষ্ট্রের যত টাকা লুট কররেন তার সঙ্গে কিন্তু মানুষের কোন সাক্ষাত নাই।
সে
তার নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত।
তার
পৃথিবী তার পরিবার।
এমনকি
অনেকে তাদের মা ভাইবোনদেরকে তার বাড়িতে জায়গা দেন না শুধু শুশুরকুলের কিছু
আত্মীয়-স্বজন তাদের লুটের টাকা ভোগ করে।
আমি
২০/৫০ জন ইউপি চেয়ারম্যানের জীবনী ষ্টাডি করেছি,
শেষ
জীবনে তারা চিকিৎসার টাকা পর্যন্ত পান নাই।
কারণ,
তারা
প্রতিনিয়ত মানুষের কাছে থাকে।
আমলারা তাদের টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত রেখে মারা যাচ্ছে।
তাদের
বাড়িতে কোন ভিক্ষুক যেতে পারে না,
সমাজে
কষ্টে আছে এমন কোন মানুষ তাদের সংস্পর্শে যেতে পারে না।
এভাবে
চলছে।
জানিনা আর কতদিন চলবে।
আমি
আশাবাদী মানুষ।
এতক্ষণ শুধু হতাশার কথা বললাম।
আমি
বিশ্বাস করি এভাবে একটা দেশ দীর্ঘদিন চলতে পারে না।
বঙ্গবন্ধু উঠে এসেছিলেন বাংলার শ্যামল মাটি থেকে।
এমন
ভাবে এরকম আর একজন মানুষের অপেক্ষায় আছি আমি।
একজন
মানুষ একটা জাতিকে বদলে দিতে পারেন,
নেতৃত্ব দিতে পারেন।
আমরা
সেই মানুষের অপেক্ষায় আছি যার ডাকে জ্ঞান ফিরে পাবো,
চেতনা
ফিরে পাবো।
আসুন
সেই নেতৃত্বের জন্য আমরা প্রার্থনা করি সঠিক নেতৃত্ব বর্তমানে আমাদের দেশে
নাই।
যারা
নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা আমাদের ভুল পথে পরিচালিত করছেন।
আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমি বিদায় নিচ্ছি।
অধ্যাপক ড. শওকত আরা হোসেন
চেয়ারম্যান,
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়

সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে শুরু করছি।
আজকের
আলোচ্য বিষয় সংবিধান অবমাননা।
বাংলাদেশ হয়েছিলো যুদ্ধের বিনিময়ে।
৩০
লাখ লোক শহীদ হয়েছিলো,
২ লাখ
মা-বোনের অবমাননা হয়েছিলো।
তারপর
আমাদের দেশ স্বাধীন হয়।
দেশে
এখন পর্যন্ত সংবিধান সংশোধন হয়েছে ১৪ বার।
এতগুলো সংশোধনী কেন আনা হয়েছিলো?
এভাবে
সংবিধানকে লাঞ্ছিত করা কি আমাদের উচিত হয়েছে?
এই
সংশোধন কারা করেছে?
হ্যাঁ,
জাতীয়
প্রতিনিধিরা করেছেন।
সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী,
সপ্তম
সংশোধনী,
অষ্টম
সংশোধনী জাতি হিসেবে আমাদেরকে অনেক নিচে নামিয়েছে।
মার্শাল ল
কোন ল
না।
মার্শাল ল কেন আসবে?
১৯৭৫
এ মার্শাল ল কেন এসেছিল আমরা সবাই জানি।
জাতির
পিতাকে হত্যা করা হয়েছিলো।
তার
দোষটা কি ছিল?
তার
দোষটা ছিল তিনি বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশ হিসেবে তৈরি করা।
তার
উদ্দেশ্য ছিল ৩০ লাখ লোক যারা জীবন দিলেন তাদের মান সমুন্নত রাখা।
পঞ্চম
সংশোধনীর মাধ্যমে শুধু শহীদদের প্রতিই নয় বঙ্গবন্ধুর আদর্শকেও মেরে ফেলা
হয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানে বিসমিল্লাহ নিয়ে আমার একটা কথা।
আল্লাহর সার্বভৌমত্ব কি শুধু বাংলাদেশের জন্য?
তা
কি সারা পৃথিবীর জন্য না?
এটি
কি লিখিত হতে হবে?
ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেয়া হলো সমাজতন্ত্র বাদ দেয়া হলো।
আপনারা লক্ষ্য করলে দেখবেন সমাজতন্ত্রের অনেক বিষয় ইসলামে আছে।
ইসলাম এবং সমাজতন্ত্র কোনটাই সম্পদকে কুক্ষিগত করা সমর্থন করে না।
বাংলাদেশে আছে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম।
ইন্ডিয়াতে কিন্তু নাই যে রাষ্ট্রধর্ম হিন্দু।
আমেরিকাতেও নাই যে রাষ্ট্রধর্ম ক্যাথলিক বা প্রোটেষ্ট্যান্ট।
মানুষের চাইতে কিন্তু সৃষ্টিকর্তাও বড় না।
সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।
আমরা ঈশ্বরকে বড় করতে যেয়ে না পারলাম তাকে বড় করতে না পারলাম মানুষকে বড়
করতে।
বাহাত্তরের সংবিধানে যদি আমরা ফিরে যেতে চাই তাহলে বাহাত্তরের সংবিধানে যা
ছিল ঠিক সে অবস্থায় ফিরে যেতে হবে।
সবাইকে ধন্যবাদ।
অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন
সম্পাদক,
দ্যা ডেইলি সান
সম্মানীত
উপস্থিতি।
সবার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।
আজ
সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ
-এর
১৫ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত মুক্ত আলোচনায় যে আলোচনার বিষয়বস্তুটি
নির্ধারণ করা হয়েছে সেজন্য হাক্কানী মিশন এবং এই পত্রিকাটিকে ধন্যবাদ জানাই।
এই
পত্রিকাটি সবসময় ভিন্ন মাত্রার বক্তব্য নিয়ে আমাদের সামনে হাজির থাকে।
শুধু ভিন্ন মত নয়,
ভিন্ন মাত্রা নয়,
যুক্তি এবং বিবেকের মিথষ্ক্রিয়ায় যে বক্তব্যগুলো শানিত হয়ে উঠে সে
বক্তব্যগুলো তারা হাজির করে।
সেজন্যে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা।
এবং
তারচেয়েও অনেক বড় ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি এই কারণে যে বাংলাদেশের জন্য
এই সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে তারা আলোচনার আয়োজন করেছেন,
যা
এই পর্যন্ত বাংলাদেশে যত এনজিও আছে,
বুদ্ধিবৃত্তিক সংগঠন আছে কেউ করতে পারেনি।
আমাদের সংবিধান অনেকটা কাজীর গরুর মত।
কিতাবে আছে,
গোয়ালে নাই।
বাহাত্তরে যখন আমরা সংবিধান প্রণয়ন করেছিলাম তখন এই দলিলটি ছিল আমাদের
আত্মগর্বের।
আমরা ৯ মাসের কম সময়ে এই দলিলটি পেয়েছিলাম।
এই
পরিপ্রেক্ষিতে আমার বক্তব্য - এই সংবিধানটি শুরু থেকেই সমস্যায়।
বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে আমরা প্রগলভ বক্তৃতা করি কিন্তু খতিয়ে দেখি না যে,
বাহাত্তরের মূল সংবিধানেই অনেক ভুল ত্রুটি আছে।
গত
৪০ বছরে বাংলাদেশের প্রতিটি সরকার এই সংবিধানকে ছারখার করে দিয়েছে।
কোন
সংবিধান চূড়ান্ত দলিল নয়,
সময়ের প্রয়োজনে এতে সংশোধনী আনা যায়।
আমাদের সংবিধানেও ১৪ টি সংশোধনী এসেছে।
দুটি ছাড়া সবগুলোই সংশোধন নয় বিকৃতকরণ।
সমপ্রতি যে কাজটি করা হলো সেটিও বিকৃতকরণ।
এটা
বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়া হলো না।
ঘটনাগুলো কিভাবে ঘটলো সেটা এখনো এতটা সচেতন ভাবে আমরা খতিয়ে দেখিনি।
আমরা আবেগ তাড়িত হয়ে অনেক কথা বলি,
জীবনের প্রয়োজনের দিকে তাকিয়ে যদি আমরা কথা বলতাম তাহলে আমাদের কথাগুলো
অন্যরকম হতো।
সেটা হয়নি।
রাজনীতিবিদদের প্রতি কোন আস্থা আমার নাই।
প্রত্যেকের প্রতি সামাজিক শ্রদ্ধা আমার আছে।
বাহাত্তরের সংবিধানটি মূলেই ত্রুটিপূর্ণ।
বাহাত্তরের সংবিধানের শিরোনামে ভুল।
বাংলা শিরোনাম দেয়া হয়েছে গণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।
প্রজা মানে?
গণ
মানে?
আমরা আমজনতা প্রজা হয়ে গেলাম।
প্রজা কোথায় থাকে?
যেখানে রাজা থাকে।
রাজার রাজ্যে মানুষ হয় প্রজা।
আমার কি রাজা আছে?
আমার কি রাজ্য আছে?
আমি
যখন প্রজা হয়ে যাই তখন কোন নাগরিক অধিকার আমার থাকে না।
রিপাবলিক
ইংরেজি শব্দের বাংলা কখনো প্রজাতন্ত্র হয় না।আমরা
আমাদের ইতিহাস পড়ি না,
বুঝি না,
উপলব্ধি করি না বলেই এই ভ্রান্তিটি হয়েছে।
খৃষ্টপূর্ব ৬ শতাব্দিতে আমাদের এই অঞ্চলে গণরাজ্য ছিল।
এই
গণরাজ্যে রাজা নির্বাচিত হতেন একটা পর্ষদ দ্বারা।
রাজা সেই পর্ষদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রশাসন চালাতো।
আস্থা হারালে রাজাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হতো।
এটাইতো গণতন্ত্রের প্রথম সোপান।
সেই
কথাইতো বলা উচিত ছিলো আমাদের সংবিধান প্রণেতাদের।
বাংলাদেশ হবে গণরাষ্ট্র।
বাংলাদেশের নাম হবে গণরাষ্ট্র বাংলাদেশ।
গণপ্রজাতন্ত্রী নয়।
আমি
প্রজা নই।
আমি
নাগরিক।
এটি
বাহাত্তরের প্রথম ভুল।
দ্বিতীয় ভুল আমাদের একটি মাত্র আদর্শ থাকা উচিত ছিল - গণতন্ত্র।
গণতন্ত্রের পরে ধর্মনিরপেক্ষতা লিখছি কেন?
গণতন্ত্র অর্থই হচ্ছে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা।
তারপর বলা হয়েছে সমাজতন্ত্রের কথা।
কিভাবে সম্ভব?
গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র তো মিলছে না।
তারপরে বলা হয়েছে জাতীয়তাবাদের কথা।
সারা পৃথিবীতে কোন সংবিধানে জাতীয়তাবাদ মূলনীতি থাকে না।
বাংলাদেশের সংবিধানে একটি মূলনীতিই থাকা উচিত ছিল সেটা হচ্ছে গণতন্ত্র।
কাজেই
১৯৭২
এর সংবিধানে ফিরে যাবার দাবি বা উচ্ছসিত বক্তব্য অযৌক্তিক।
সংবিধানের মূলে যে ত্রুটি আছে তা সংশোধন করতে হবে।
আমার কাছে পুনর্মুদ্রিত সংবিধান গ্রহণযোগ্য নয়।
এটা
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী,
আকাঙ্খাবিরোধী।
তারপরে আসি মূল প্রস্তাবনায়।
আমরা সরকারি ঘোষণা শুনলাম - বিসমিল্লাহও থাকবে এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলামও
থাকবে।
তারপরেও নাকি আমি বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে গেলাম।
আমরা এতটা মূর্খ নই।
কিছু দুপাতা যৎসামান্য লেখাপড়া করেছি।
রাষ্ট্রের কোন ধর্ম থাকে না এটা সবাই বলেছেন।
আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর
রহমান অত্যন্ত সুন্দরভাবে বলে গেছেন,
তিনি একটি সরকারী দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও বিবেকী সাহস নিয়ে যা উচ্চারণ করে
গেছেন তার জন্য তাকে অভিবাদন ও অভিনন্দন।
আমরা এই ধরনের বিবেকী মানুষ চাই সরকারে এবং সরকারের বাইরে।
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম
এটি
উপহার দিয়ে গেছেন জিয়াউর রহমান আর রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম- এটা উপহার দিয়ে গেছেন
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।
বর্তমান সরকার এই দুজনকেই সম্মান জানিয়ে এই দুটো বিষয় সংবিধানে রেখেছেন।
যদি
বলা হয় যে বর্তমান সরকার এই দুজনকে সম্মান দেন না আমি কি করে বিশ্বাস করবো?
আমি
তো কাজে বিশ্বাস করি।
কথায় না।
আমি
তো দেখলাম বর্তমান সরকার জিয়াউর রহমান এবং এরশাদ এই দুজনকেই আত্মার আত্মীয়
ভেবে সম্মানিত করলেন,
এজন্য অভিবাদন অভিনন্দন মহাজোট সরকার।
কিন্তু আপনারা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন।
আপনারা ইসলামের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন।
আপনাদের ঈমান খারিজ হয়ে গেছে।
আমি
দায়িত্ব নিয়ে বলছি কারণ,
আমার নামের আগে সৈয়দ আছে।
আমি
ইসলাম সম্পর্কে যা বলবো দায়িত্ব নিয়ে বলবো।
কুরআন শরীফের কোন সূরায় কোন আয়াতে রাষ্ট্রধর্মের কথা আছে?
কেউ
যদি আমাকে তা দেখিয়ে দিতে পারেন তাহলে তার পায়ে নতজানু হয়ে আজীবন আমি ইসলাম
সম্পর্কে শিক্ষা নেবো।
আর
যদি না দেখাতে পারেন তাহলে যারা এই কাজ করেছেন তারা ইসলামের বিরুদ্ধে
অবস্থান নিয়েছেন।
নবী
করিম (সা.) কোথায় কোন হাদীসে রাষ্ট্রধর্মের কথা বলছেন?
পারবেন না দেখাতে।
যখনই শাসক অবৈধ হয়,
জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংশয়ে থাকে তখনই সে ধর্মের উপরে নির্ভর করে।
নবীজি কখনো এ কাজ করেননি।
মদীনা সনদ পৃথিবীর প্রথম লিখিত আধুনিক সংবিধান।
সেখানে কোথায় বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম
লেখা আছে?
সেখানে কোথায় রাষ্ট্রধর্মের কথা লেখা আছে?
এটাই তো আল্লাহ্র নির্দেশ ছিল যে,
তোমার জন্য তোমার ধর্ম,
আমার জন্য আমার ধর্ম।
আল্লাহ বলে দিয়েছেন - আল্লাহ ইচ্ছে না করলে পৃথিবীতে মন্দির মসজিদ ইত্যাদি
থাকতো না।
কাজেই রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এটা অযৌক্তিক ও উদ্ভট।
এটা
করে তারা তাদের মেধা,
মনন
সবকিছুকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন তবে প্রশ্নবিদ্ধ করেননি তাদের ভোট প্রত্যাশী
রাজনীতিকে।
এই
ব্যবস্থাগুলো আমরা মানবো কি করে সেটাই প্রশ্ন।
এই
নিয়ে কোন প্রতিবাদ হয় না।
সরকার সরকারের মতো ছারখার করে যাচ্ছে সংবিধানকে।
সংবিধান লঙ্ঘিত হয়ে আসছে সবসময়।
৭০
ধারায় যা আছে সেটি কি গণতন্ত্র উপযোগী?
সেটি নিয়েওতো প্রশ্ন উঠে না।
আমি
মনে করি সংবিধানে মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনাটি ছিলো বাহাত্তরের সংবিধানেই তার
যথার্থ প্রতিফলন ঘটেনি তারপর থেকে ক্রমাগতভাবে আমরা দূরে সরে এসেছি।
নবীজি যা করেননি কুরআনে যার নির্দেশনা নেই সেটা করে ইসলামকে রক্ষা করা যায়
না।
সুতরাং আমার একটি বিনীত কামনা যে,
আমরা একটু আমাদের বিবেক বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে দেশ ও জনগণ নিয়ে ভাবতে শুরু
করি এবং দেশটাকে সামনে এগিয়ে নেবার একটা চেষ্টা করি।
যে
কারণে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিলো সে কারণটি হারিয়ে গেছে বিগত ৪০ বছরে।
সে
কারণটিকে পুণরুদ্ধার করি।
আমরা মানুষের বাংলাদেশ চাই।
মানুষের বাংলাদেশ হবে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।
মূল
প্রবন্ধে সুন্দর করে বলা হয়েছে যে ইসলামকে রাজনীতিতে ব্যবহার করে ইসলামকে
বিনাশ করা হচ্ছে।
আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।
|